কী করতে চান জামায়াতের সংস্কারপন্থিরা?
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
জামায়াত থেকে বাদ পড়া এবং জামায়াত মনোভাবাপন্নরা একটি নতুন প্লাটফর্ম গঠন করে তারা নাম দিয়েছেন ‘জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ'৷ তারা শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগকে একটি রাজনৈতিক দলে রূপ দিতে চান৷

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের জামায়াত থেকে পদত্যাগ জামায়াতের রাজনীতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল৷ জামায়াতের এই সংস্কারপন্থী নেতা এখন লন্ডনে অবস্থান করছেন৷ সেখান থেকেই তিনি গত জানুয়ারিতে পদত্যাগ পত্র পাঠিয়ে দেন৷ ধারণা করা হয়েছিল জাময়াতের সংস্কারপন্থী এই নেতা জামায়াত রাজনীতির নতুন কোনো ধারার জন্ম দিতে পারেন৷ কিন্তু তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হবেন না তিনি৷ এরপর জামায়াত থেকে বহিস্কার করা হয় মজলিসে সুরা সদস্য ও মহানগর জামায়াতের সদস্য মজিবুর রহমান মনজুকে৷ তিনি জাময়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি৷ তিনিও জামায়াতে সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন৷

জামায়াতে আরো কিছু সংস্কারপন্থী থাকলেও এখন তারা চুপচাপ আছেন৷ তবে তাদের সংখ্যা কম৷ আর ওই দুই সংস্কারপন্থী লিখিতভাবে সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন৷ যার মধ্যে অন্যতম ছিলো মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে জামায়াতের অবস্থান পরিস্কার করা এবং ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া৷

কিন্তু তাদের কোনো সংস্কার প্রস্তাবই জামায়াত গ্রহণ করেনি, যদিও জাময়াতের সাংগঠনিক সংস্কারের জন্য একটি ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়৷ তবে সেই কমিটি কিছু করেছে কিনা তা জানা যায়নি৷

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালে জামায়াতের শীর্ষ নেতারা দণ্ডিত হয়েছেন৷ তাদের অধিকাংশকেই ফাঁসির দণ্ড দেয়া হয়েছে এবং তা কার্যকর হয়েছে৷ আর আদালতের নির্দেশে জাময়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে৷ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীরা ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করলেও তাদের কেউ পাশ করতে পারেননি৷

সর্বশেষ জামায়াত থেকে কিছু সদস্যের বের হয়ে গিয়ে নতুন রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গঠনের চেষ্টাকে সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা৷ তারা দেখতে চাইছেন এর উদ্দেশ্য কী? আর এটা আদৌ কোনো সফল প্রচেষ্টা হবে কিনা৷

‘জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ' আত্মপ্রকাশ করে শনিবার৷ এর প্রধান মজিবুর রহমান মনজুর সঙ্গে আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে ছিলেন অধ্যাপক আবদুল হক, গোলাম ফারুক, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মোস্তফা নূর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন, মাওলানা আবদুল কাদের, নাজমুল হুদা অপু, মো. সালাউদ্দিন, ছাত্র শিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সেক্রেটারি ব্যারিস্টার জোবায়ের আহমেদ ভূইয়া ও আবদুল হক৷ এছাড়া যুক্তফ্রন্টের নেতা সাবেক প্রতিমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন আল আজাদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, নুরুল ইসলাম ভূইয়া ছোটন, গৌতম দাশ, রবী আমাতুল্লাহ, ২০ দলীয় জোটের শরিক একটি দলের নেতা সুকৃতি কুমারসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন৷ তবে এদের একটি অংশ সেখানে ছিলেন পর্যবেক্ষক হিসেবে৷

মজিবুর রহমান মনজু ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমাদের টার্গেট হলো নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করা৷ তার সাথে জামায়াতের কোনো সম্পর্ক থাকবে না বা নেই৷ আমরা সরকারের সহায়তায়ও কিছু করছিনা৷ আমরা সবাইকে আমাদের দলে আহ্বান জানাবো৷''

তিনি বলেন, ‘‘অধিকার ও কল্যাণ রাষ্ট্রই আমাদের রাজনীতি৷ সবাইকে ধারণ করার ইসলামের যে সুমহান আদর্শ সেটাকে আমরা ধারণ করি৷ আমরা মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা পাই৷ এটা কোনো ধর্মীয় দল নয়৷''

এটা আসলে জামায়াতকে ভিন্ন প্লাটফর্মের মাধ্যমে সামনে নিয়ে আসার একটা প্রক্রিয়া কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমরা কোনো ধর্মীয় রাজনৈতিক দল গঠন করছিনা৷ জামায়াতের সঙ্গে এই দলের কোনো সম্পর্ক নেই৷ থাকবেনা৷ কেউ কেউতো আবার বলেন আমরা সরকারের হয়ে কাজ করছি৷ আমরা কারুর হয়েই কাজ করছিনা৷''

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘জামায়াত থেকে পদত্যাগকারী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে এখনো আমাদের কথা হয়নি৷ তবে প্রয়োজন হলে আমরা তার সঙ্গে কথা বলব৷ তার পরামর্শ নেয়ার চেষ্টা করব৷''

জামায়াতের বাইরে গিয়ে জামায়াতপন্থিদের এই নতুন উদ্যোগ নিয়ে জাময়াতের কেন্দ্রীয় কোনো নেতা বা জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি৷ জামায়াতের নায়েবে আমীর মিয়া গোলাম পরওয়ারকে বার বার টেলিফোনে চেষ্টা করেও মন্তব্য পাওয়া যায়নি৷ আর জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘‘এ নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করবো না৷''

তবে ফেনী জেলা জামায়াতের আমীর একেএম শামসুদ্দিন ডয়চে ভেলেকে বলে, ‘‘এটা নিয়ে আমরা কোনো রকম চিন্তিত নই৷ এর কোনো প্রভাব আমাদের দলে পড়বেনা৷ এর কোনো প্রভাব আমাদের দলে নেই৷ আমাদের দলে এ নিয়ে কোনো সাড়াশব্দ নেই৷ আর যারা এটা করেছেন তারা এখন আর আমাদের দলের কেউ না৷ তাদের নিয়ে আমরা কথা বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না৷''

জামায়াত থেকে বের হয়ে যাওয়াদের এই নতুন উদ্যোগের উদ্দেশ্য কী ? আর এই উদ্যোগ কতটা সফল হতে পারে?

এই প্রশ্নের জবাবে জাময়াতের রাজনীতি নিয়মিভাবে পর্যবেক্ষণকারী বাংলা ট্রিবিউনের সিনিয়র রিপোর্টার সালমান তারেক শাকিল ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এই উদ্যোগ জামায়াতের মধ্যে কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে বলে আমরা মনে হয়না৷ জামায়াতের যে সাংগঠনিক পদ্ধতি ও কাঠামো সেখানে এই ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রভাব ফেলা কঠিন৷ আর গত জানুয়ারিতে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক পদত্যাগ করেছেন৷ তার দাবিও ছিল সংস্কার৷ জামায়াত একটি ৫ সদস্যের সংস্কার কমিটি করলেও তাও এগিয়েছে বলে মনে হয়না৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘এই উদ্যোগের সঙ্গে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের কোনো সম্পর্ক নেই৷ আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি৷ তিনি শুভ কামনা জানিয়েছেন৷ আর পরামর্শ চাইলে দেবেন বলেছেন৷ জন আকাঙ্খার বাংলাদেশ-এর কোনো সুনির্দিষ্ট আদর্শ আছে বলে আমরা কাছে মনে হয়নি৷ এটা একটা ব্যক্তিগত উদ্যোগ বলে আমার কাছে মনে হয়েছে৷''

তিনি বলেন, ‘‘এখানে তো জামায়াত থেকে একটি অংশকে আসতে হবে৷ সেই লক্ষণ আমি দেখছিনা৷''

তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রহমান মনে করেন এর একটা প্রভাব জামায়াতের ওপর পড়বে৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এই দলটি জামায়াতের ওপর এটা চাপ সৃষ্টি করবে সেটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই৷ এটা একটি বিকল্প জামায়াত হিসেবে থাকবে৷ তবে এটা কতটা শক্তিশালী হবে তা এখনই বলা যায়না৷ এটার কাজ শুরু হলে , তাদের তৎপরতা শুরু হলে বোঝা যাবে৷''

তিনি বলেন, ‘‘এই দলটি আসলে আগে যারা জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির করতেন তাদের দল হবে৷ সেখান থেকেই বেশি সদস্য আসবে এখানে৷ আমার মনে হয় সাবেক ছাত্র শিবির সদস্যদের ডেডিকেটেড একটি দল হবে এটি৷ এরা জামায়াতের কাছাকাছি আদর্শের হবে৷'' -ডয়েচেভেলে

 

২৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:৩০:৩৫