আহমদিয়াদের ওপর হামলার উদ্দেশ্য কী?
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
প্রতীকী ছবি
পঞ্চগড়ে আহমদিয়া মুসলিম জামায়াতের অনুসারীদের ওপর একটি গোষ্ঠী বারবার ওপর হামলা চালিয়ে আসছে৷ এবারের হামলার সময় বেশ কিছু ঘর-বাড়ি, দোকানপাটে ভাংচুর চালানো হয়৷ হামলায় আহত হয়েছে ৪০জন৷ আহমদিয়া মুসলিম জামাতের পূর্ব ঘোষিত বাৎসরিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান ‘জলসা'-কে কেন্দ্র করে পঞ্চগড়ের আহমদ নগর এলাকায় হামলা হয় মঙ্গলবার রাতে৷ ওই এলাকাটি আহমদিয়া সম্প্রদায়অধ্যুষিত৷ আহমদিয়া মুসলিম জামাত ২২ থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আহমদ নগর এলাকায় তিন দিনের বার্ষিক ‘সালানা জলসা' আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছিল৷ সেই জলসা বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছিল খতমে নবুওয়ত সংরক্ষণ পরিষদ, ঈমান আকিদা রক্ষা কমিটি, ইসলামী যুব সমাজ ও স্থানীয় তৌহিদি জনতার ব্যানারে বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক সংগঠন৷ 

সংগঠনগুলো মঙ্গলবার রাতে পঞ্চগড় শহরে জলসা বন্ধের দাবিতে মিছিল বের করে৷ মিছিল শেষে তারা শেরেবাংলা পার্ক মোড় সংলগ্ন পঞ্চগড়-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে৷ আহমদিয়া সম্প্রদায়বিরোধীরা আহমদনগর এলাকায় যেতে চাইলে পুলিশ তাদের আটকে দেয়৷ এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে ধাওয়া-পালটা ধাওয়া হয়৷ এরমধ্যেই রাত ১০টার পর একটি গ্রুপ আহমদনগর এলাকায় প্রবেশ করে বাড়িঘর-দোকানপাটে হামলা চালায়৷ তারা ১০-১২টি বাড়িঘর এবং দোকানপাটে ভাঙচুর ও আগুন দেয়৷ এ সময় তাদের হামলায় পুলিশসহ কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়৷ আহমদিয়া মুসলিম জামায়াতের পক্ষ থেকে তাদের ৪০ জন আহত হওয়ার তথ্য জানানো হয়েছে৷ ২১ জনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে৷ এক জনের অবস্থা গুরুতর৷ হামলার পর ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে৷

মঙ্গলবার রাতে চালানো এই হামলায় পুলিশসহ অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছে৷ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পঞ্চগড় শহর ও আহমদনগর এলাকায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে৷ আহমদিয়া মুসলিম জামাতের ন্যাশনাল আমির মোবাশশেরউর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এখন পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে৷ ওই এলাকায় পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে৷'' তিনি আরো বলেন, ‘‘দেশের অন্যান্য এলাকায় কোনো সমস্যা আপতত নেই৷''

বাংলাদেশে আহমদিয়া মুসলিম জামায়াতের অনুসারী এক লাখের মতো হবে৷ সারা বাংলাদেশে তাঁদের পাঁচশ' মসজিদ আছে৷ ঢাকার বকশি বাজার ও তেজগাঁ ছাড়া পঞ্চগড়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরা, জামালপুর– এসব এলাকায় আহমদিয়া জামায়াতের অনুসারী বেশি৷

মোবাশশেরউর রহমান বলেন, ‘‘ইসলামের মূল বিশ্বাস আর আকিদা নিয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো পার্থক্য নেই৷ কালেমা, নামাজ রোজা , হজ, জাকাত আমরা একইভাবে অনুসরণ করি৷ তবে আমরা ভারতে জন্ম নেয়া হযরত মীর্জা গোলাম মোহাম্মদ কাদিয়ানিকে ইমাম মাহদি বলে বিশ্বাস করি৷ তিনিই আমাদের আহমদিয়া মুসলিম জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা৷''

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘ইসলামে তো বিভিন্ন দল উপদল, ফেরকা পরস্পরকে বিভিন্ন সময় কাফের বলেই যাচ্ছে৷ মতের সাথে না মিললেই অন্যদের কাফের বলে৷ আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয় যে, আমরা মীর্জা গোলাম মোহাম্মদ কাদিয়ানিকে নবি বলি৷ এটা অপপ্রচার ছাড়া আর কিছুই নয়৷''

আহমদিয়াদের ওপর এই হামলা নতুন নয়৷ ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তাঁদের ওপর অনেক হামলা হয়৷ তেজগাঁ এলাকায় তাঁদের মসজিদ দখলের চেষ্টা হয়৷ এর আগে ঢাকার বকশিবাজারে তাঁদের প্রধান কেন্দ্র এবং মসজিদে হামলা ও আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে৷ ২০১৬ সালে রাজশাহীর বাগমারায় এই সম্প্রদায়ের একটি মসজিদে জুমার নামাজের সময় আত্মঘাতী বোমা হামলায় একজন নিহত হন৷

ন্যাশনাল আমির বলেন, ‘‘এই হামলার উদ্দেশ্য রাজনৈতিক৷ যারা হামলা করে, তারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে৷ তারা এটাকে পুঁজি করে ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করে৷ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে৷ এই হামলার সাথে যারা জড়িত, তারা স্থানীয় কেউ নয়৷ তারা বহিরাগত৷ ২০৭ বছর ধরে পঞ্চগড়েরর আহমদ নগর এলাকায়  আমাদের অনুসারীরা আছেন৷ আমরা সেখানে প্রতিবছর জলসা করি৷ স্থানীয়রা আমাদের জলসায় যোগ দেন৷ তাদের সাথে আমাদের কোনো সমস্যা নেই৷''

এদিকে জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে জলসা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল৷ তারপরও বিক্ষোভ করে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালানো হয়েছে৷ এর জন্য যারা দায়ী তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে৷ এ নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে৷''

পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার গিয়াস উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘‘বিচ্ছিন্ন একটি গ্রুপ এই হামলা চালিয়েছে৷ আমাদের তদন্ত চলছে৷ তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায়  আনবো৷''

পঞ্চগড়ের খতমে নবুয়ত সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি মো. আব্দুল্লাহ অবশ্য দাবি করেন, ‘‘প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকের পর প্রশাসন যখন জলসা স্থগিতের কথা জানায়, তখন আমরা আন্দোলন থেকে সরে আসি৷ কিন্তু বিক্ষুব্ধ জনতার সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হয়৷ তারপর কে বা কারা হামলা চালিয়েছে তা আমরা জানি না৷ তাদের চিনিও না৷ আমাদের কেউ এই হামলা চালায়নি৷''

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘আমি নিজে আহমদ নগর এলাকার বাসিন্দা না৷ আর আহমদিয়া বিরোধী আন্দোলনে ওই এলাকার কেউ আছে কিনা আমার জানা নেই৷''

শোলাকিয়ার ইমাম মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আহমদিয়াদের সাথে আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের পার্থক্য আছে৷ সেটা নিয়ে আমরা কথা বলছি৷ আমরা যৌক্তিকভাবে আমাদের কথা তুলে ধরব৷ কিন্তু হামলা চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়৷ এটা কোনো প্রকৃত মুসলামান করতে পারে না৷ যারা করে, তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে৷ সরকার যেখানে আহমদিয়াদের অনুষ্ঠান স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারপরও কেন হামলা? এর কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে? এই হামলা নিন্দনীয়৷''

তবে তিনি মনে করেন, ‘‘আহমদিয়াদের পরিভাষা, বিশ্বাস মুসলমানদের জন্য বিভ্রান্তিকর৷ তাদের মাধ্যমে মুসলমানরা বিভ্রান্ত হতে পারেন৷'' এদিকে আহমদিয়া সম্প্রদায়কে সরকারিভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম৷ বুধবার চট্টগ্রামে এক সংবাদ সম্মেলনে হেফাজতের পক্ষে লিখিত বক্তব্য দেন শাহ আহমদ শফীর ছেলে মাওলানা আনাস মাদানী৷-ডয়েচে ভেলে

 

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১২:৪৮:০৪