সাক্ষাৎকার
বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি অনেক উন্নত: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন একান্ত সাক্ষাৎকারে ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘‘বাংলাদেশে মানবাধিকারের অবস্থা অনেক ভালো৷''  ভারতের সঙ্গে তিস্তাসহ সব সমস্যার সমাধান এবং রোহিঙ্গা সংকট নিরসনেও আশাবাদী তিনি৷

ডয়চে ভেলে: রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কি আপনার বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে?

পররাষ্ট্রমন্ত্রী: রোহিঙ্গা আমাদের একটা বড় সমস্যা৷ আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁদের আশ্রয় দেয়ায় পৃথিবী একটা বড় রকমের জেনোসাইড থেকে রেহাই পেয়েছে৷ তবে তাঁরা আমাদের দেশে বেশিদিন থাকলে এই এলাকায় অস্থিতিশীলতা দেখা দেবে৷ তাতে অনেকের অনেক ক্ষতি হবে৷ যেসমস্ত রাষ্ট্র এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাদের অনেকেরই ক্ষতি হবে৷  সেজন্য এর সামাধান আমাদের অতি তাড়াতাড়ি করতে হবে৷ আমরা আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ওপর বিশ্বাস করেছিলাম যে, তারা যে অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছে সেইভাবে তাদের লোকগুলোকে ফেরত নিয়ে যাবে৷ সেই ব্যাপারে তারা খুব অগ্রসর হচ্ছে না৷ এই পরিস্থিতিতে আমরা চিন্তা করছি কিভাবে এগুলোর মীমাংসা করতে পারি৷ একাধির পরিকল্পনা আমাদের হাতে আছে৷ একটি হচ্ছে, আমরা চাই একটি ‘সেফ জোন ইনসাইড রাখাইন' করতে৷ মিয়ানমারের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোই ওখানে তদারকি করবে৷ এটাতে আমার ধারণা হয়তো মিয়ানমার রাজি হবে৷ বিদেশি শক্তি নয়, তাদেরই আসিয়ান, চায়নাকে দিয়ে একটা সেফ জোন করা৷ এটা ইউএন মডেল৷ আরেকটি হলো, ইন্টারিম পিরিয়ডে তাদের (রোহিঙ্গ) আমরা বিভিন্ন দেশে শেয়ার করতে পারি৷ তাছাড়া এদের আমরা বিভিন্ন কাজে নিয়োগের চিন্তা করছি৷ এরকম একাধিক পরিকল্পনা আছে আমাদের৷ তবে সবগুলিই নির্ভর করছে মিয়ানমারের অবস্থার ওপর৷ তারা কতটুকু সহনশীল হয়, তারা পৃথিবীর আইনগুলো কতটুকু মানে, তার ওপর৷''

ভারতওচীনেরভূমিকাএক্ষেত্রেকেমনআশাকরছেন?

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ভারত ও চীনের বিশেষ ভূমিকা রাখা উচিত৷ কারণ, মিয়ানমার চীনের কথা শোনে৷ আর এখানে কোনো অশান্তি বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে ভারতসহ সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে৷

এই অঞ্চলে আমরা উন্নয়নের মহাসড়কে যাত্রা শুরু করেছি৷ আগামীতে এশিয়া হবে এই পৃথিবীর আকর্ষণ৷ এই আকর্ষণে একটা ক্ষত হয়ে যাবে৷সেই কারণে ভারত, চীন, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড সবাইকে নিয়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে৷ তাদের বিশেষ ভূমিকা প্রয়োজন৷ বিশেষ করে বারত ও চীনের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন৷

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি নিয়ে কিছু অমীমাংসিত বিষয় আছে৷ আপনি তা নিয়ে কী ভাবছেন?

ভারত হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র৷ আমরা গণতান্ত্রিক নিয়ম মেনে সরকার গঠন করেছি৷ তাদের সাথে আমাদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক৷ সংস্কৃতি বলেন, ভাষাগত বলেন, বিভিন্নভাবে আমরা ভারতের সাথে সম্পৃক্ত৷ আর এখন আমাদের সবচয়ে উষ্ণ সম্পর্ক৷ এই অবস্থায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিয়েছেন৷ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছেন৷ তাঁর দেশ সফরের আমন্ত্রণ জনিয়েছেন৷ তারা একটা বন্ধু দেশ৷ আমি বন্ধুত্বের কারণে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি পরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আমার প্রথম সফরে ভারতে যাবো সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কটাকে জিইয়ে রাখার জন্য৷ এটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য৷

আর যেগুলো সমস্যা আর যে সমস্যার কথা বলেছেন, এগুলো প্রতিবেশী দেশের মধ্যে থাকে৷ কিন্তু যদি মন উদার থাকে, মন ঠিক থাকে, সম্পর্ক যদি মধুর থাকে, তাহলে সব সমস্যা আপনাতেই শেষ হয়৷ আমি প্রায়ই বলে থাকি৷ আপনার বউয়ের সাথে যদি সম্পর্ক মধুর থাকে, আপনার ছোটখাট সমস্যা এগুলো এমনিতেই সামাধান হয়৷ আর সম্পর্ক যদি তিক্ত হয়, তাহলে ছোট অসুবিধাটাও বড় আকারে দেখা দেয়৷

তিস্তার পানি নিয়ে তো উদ্বেগ আছে...

আমাদের ৫৪টা নদী৷ তিস্তা নিয়ে আপনি চিন্তা করেন৷ তিস্তা নিয়ে আমাদের মধ্যে অনেক আলাপ-আলোচনা হয়েছে৷  এবং এক পর্যায়ে এটার সমাধানের পথ মোটামুটিভাবে নির্ধারিত হয়েছিল৷ ওদেরও অসুবিধা আছে৷ আমাদেরও অসুবিধা আছে৷ আমরা ইউএন-এতে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, অঞ্চলের অববাহিকায় যারা থাকে, তাদের মঙ্গলের জন্য এই ওয়াটার শেয়ারিং হবে৷ আমার বিশ্বাস, এটা ওরাও যেমন চিন্তা-ভাবনা করছে, আমরাও চিন্তা করছি৷ এগুলো সমস্যা আর সমস্যা থাকবে না৷

বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্বেগ আছে৷ সেটাকে আপনি কিভাবেন দেখেন?

পৃথিবীতে অনেকগুলো দেশ মানবাধিকার বলেন আর সন্ত্রাস বলেন, এগুলো বলা হয় আপনাকে একটু চাপে রাখার জন্য৷ ইউরোপে যেমন মানবাধিকার, আমাদের দেশেও তা সমান৷ আপনি এ দেশেও যা বলতে চান, আপনার টিভি চ্যানেল খুলে দেখেন, সরকারের চৌদ্দ পুরুষ এখানে ডাউন করতেছে৷ কোনো আপত্তি নে, চলছে৷ এখানে যত পত্র-পত্রিকা বের হয়, তা প্যারিস শহরেও বের হয় না৷ সারা ইউরোপে কত পেপার বের হয়, আমি জানি না? এখানে যত পেপার বের হয়, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, পৃথিবীর খুব কম দেশেই তা আছে৷ আমরা এখানে মানুষের বলা কথার কোনো সেন্সর করি না৷ অ্যামেরিকা হলো ফ্রিডম অব স্পিচের দেশ৷ সেখানে যদি আপনি আল জাজিরা দেখতে চান, তাহলে মাসে ২৭০ ডলার দিতে হয়৷ আপনি যদি আরটি দেখতে চান, অনেক টাকা দিতে হবে৷ ব্যান্ড না, কিন্তু অনেক টাকা দিতে হয়৷ আর এখানে মাসে ১৫ ডলার দিয়ে সব চ্যানেল দেখা যায়৷ আমাদের এখানে এ ধরনের কোনো বৈষম্য নেই৷

আমরা মনে করি, আমি বিশ্বাস করি, মানুষের উন্নয়ন, মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার সবচেয়ে বড় মানবাধিকার৷ তাকে সুষ্ঠুভাবে, উন্নতভাবে বাঁচিয়ে রাখার অধিকারটা হলো সবচেয়ে বড় মানবাধিকার৷

এটায় বাংলাদেশ সরকার অনেক এগিয়ে৷ আগে দারিদ্র্যসীমার নীচে লোক ছিল ৫৮ ভাগ৷ ২০০৯ সালে ছিল ৪২ ভাগ৷ এখন কমে গিয়ে হয়েছে ২১ ভাগ৷ আর অতি দারিদ্র্য কমে হয়েছে ১০ ভাগ৷ আমরা তাঁদের মানবাধিকার নিশ্চিত করেছি৷ আমরা চাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে৷ সবার জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা নিশ্চিত করতে৷ সব জনগণ, সব নাগরিকের জনগণের জন্য সমান অধিকার, সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা আমাদের প্রত্যাশা৷ সোনার বাংলা গড়তে চাই আমরা৷ সুতরাং এই যে মানবাধিকার নিয়ে কথা ওঠে, ‘এটা করেন, ওটা করেন', এগুলো অলীক৷ দেখতে হবে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার, তাঁর খাওয়ার অধিকার, তাঁর বাড়ির অধিকার আমরা নিশ্চিত করছি কিনা৷ এগুলোর জন্য আমরা কাজ করছি৷

কিন্তু বিচারববির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, নিখোঁজ , খুন এসবের কথা তারা বলেন...

আপনি চিন্তা করেন, অ্যামেরিকায় প্রতিবছর ৩৩ হাজার লোক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়৷ ৩৩ হাজার লোক৷ তার মানে, প্রতিদিন কত লোক কিল্ড হয়৷ আর  আমাদের এখানে বছরে যদি ১০টি লোক কিল্ড হয়, এটাই বড় করে দেখেন আপনি?৩৩ হাজার লোক, অ্যামেরিকার টেলিভিশনে কখনো এগুলো দেখায় না যে, কাকে মেরে ফেলল৷ ট্রাফিক লাইটে সে পার হয়ে গেছে, পুলিশ ওখানে গিয়ে তাকে গুলি করে মেরে ফেলেছে৷ ইদানিং সেলফোন বের হওয়ার কারণে মাঝেমধ্যে কিছু তথ্য বের হয়৷ এগুলো তাদের মিডিয়া কখনো প্রকাশ করে না৷

ইউরোপে যেখানেই টেররিজম হয়, আপনি কখনো দেখেছেন, ওদের বিচার হয় কোর্টে? ওদের সাথে সাথে মেরে ফেলে৷ আমাদের দেশে কিন্তু কোর্টে গিয়ে ওদের বিচার হয়৷ মানবাধিকার কোন দেশে কত আছে সেটা যদি আপনি হিসেব করেন, আমরা অনেক উর্ধে আছি৷ কিন্তু আমাদের পত্রপত্রিকা, আমাদের মিডিয়া এগুলো নিয়ে খুব সোচ্চার৷ সোচ্চার হোক আপত্তি নেই৷ কারণ, আমরা চাই, আমাদের সরকার চায়, একটি লোকও যেন বিনা বিচারে হত্যার শিকার না হয়৷ তবে তারপরও হয়৷ কিন্তু আমাদের সংখ্যা অনেক কমে গেছে৷ ২০০২, ২০০৩, ২০০৪ সালে আপনি শুনেছেন বিচারবহির্ভূত হত্যা কত হয়েছে- ১২শ'৷ আর এখন সারা বছরে কয়টা হয়েছে? একটাও আমি চাই না৷ কিন্তু ১০-১২টাও যদি হয় তা-ও আমার জন্য দুঃখ৷

অ্যামেরিকায় প্রতিবছর ৩৩ হাজার লোক বিনা বিচারে হত্যার শিকার হয়৷ সেখানে জেল ভর্তি লোক, যার শতকরা ৯২ ভাগ কালো মানুষ৷ এগুলো কি মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়?

মঙ্গা মানবাধিকারকে হরণ করে৷ না খেয়ে মারা যাওয়া সবচেয়ে বড় মানবাধিকারের লঙ্ঘন৷ আমার সরকার মানুষের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করে মানবাধিকার রক্ষা করছে৷ এই সরকার টিকে থাকলে আমরা বিশ্বাস করি, অতি দরিদ্রের সংখ্যা আমরা ৫ ভাগে নিয়ে আসব৷ আমরা সেই লক্ষ্যে কাজ করছি৷ -ডয়চে ভেলে

 

২৪ জানুয়ারি, ২০১৯ ০৮:০৪:২১