আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার আশা ড. কামালের
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
সিলেটে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের প্রথম সমাবেশে ড. কামাল হোসেন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন৷ তিনি বলেছেন, ‘‘হারানো গণতন্ত্র পুরনরুদ্ধার সহজ নয়, এজন্য জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে৷'' সিলেটে ঐক্য ফ্রন্টের এই সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল ২৩ অক্টোবর৷ কিন্তু পুলিশ তখন অনুমতি দেয়নি৷ এরপর তারিখ একদিন পিছিয়ে ২৪ অক্টোবর করা হলেও অনুমতি মেলেনি৷ তারপর আদালতের দ্বারস্থ হয় ঐক্য ফ্রন্ট৷ ২১ অক্টোবর সিলেট বিএনপি'র সাধারণ সম্পাদক আলি আহম্মদ হাইকোর্টে রিট করলে পুলিশ প্রশাসন বিকালেই সমাবেশের অনুমতি দেয় তড়িঘড়ি করে৷

সিলেটের রেজিস্ট্রি মাঠে বুধবার বেলা ২টার দিকে কোরআন তেলাওয়াত ও গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে এ সভার কর্যক্রম শুরু হয়৷ এর আগে নেতারা হযরত শাহজালালের মাজার জিয়ারত করেন৷ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এই জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. কামাল হোসেন৷ বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জনসভার প্রধান বক্তা৷

বিকাল ৫ টার পর প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. কামাল হোসেন বলেন,‘‘সংবিধান অনুযায়ী দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ৷ দেশের মানুষ দেশের মালিকানা থেকে বঞ্চিত৷ এ কারণে জনগণের ঐক্য অপরিহার্য৷ সবাইকে এসে বলতে হবে, সুষ্ঠু নিবাচন চাই৷ হারানো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার সহজ নয়৷ শক্তভাবে তা ফিরিয়ে আনতে হবে৷ ইনশাল্লাহ দেশের মালিকানা মানুষ ফিরে পাবে৷ আমরা ক্ষমতায় আসবো৷ জনগণকে স্বৈরাচারের কবল থেকে মুক্ত করবো৷ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে দেশের মালিকানা ফিরিয়ে আনা হবে৷''

তিনি বলেন, ‘‘এই জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে দেশের মালিকানা ১৬ কোটি মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আমরা আন্দোলনে নেমেছি৷ সিলেটের এই সমাবেশ থেকে আজ সেই ঐক্যের সূচনা হলো৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালে জনগণের ব্যক্তি স্বাধীনতা ও দেশ সকল মানুষের, এটা প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন৷ দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল৷ তাই আমরাও ১৬ কোটি মানুষের অধিকার আদায়ে আজ রাজপথে নেমেছি৷ একটি স্বাধীন দেশে জনগণের মালিকানা না থাকলে গণতন্ত্র থাকে না৷ গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেমেছি৷ এই আন্দোলনে সবাইকে অংশ নিতে হবে৷''

তিনি তাঁর বক্তব্যে এই সরকারের আমলে দুর্নীতি ও লুটপাটের কথা বলেন৷ তিনি বাক-স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার অভিযোগ করেন৷ প্রধান বক্তা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘‘আমাদের দাবিগুলো যৌক্তিক৷ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা আমাদের দাবি আদায় করব৷ আমাদের পরিষ্কার দাবি, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে, তফসিলের আগে সংসদ ভেঙে দিতে হবে, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে, নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে, ইভিএম ব্যাবহার করা যাবে না এবং খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে হবে৷''

তিনি বলেন,‘‘আমরা কোনো অশান্তি চাই না৷ সবাইকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা আমাদের দাবি আদায় করব৷''

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘‘সৌদি আরব থেকে ফিরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ছাল-বাকল দিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা হয়েছে৷ আমরা বলতে চাই, দ্রুত পদত্যাগ করুন৷ নইলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে টের পাবেন৷ জনগণের দাবি মেনে না নিলে আপনাদের ছাল-বাকলও থাকবে না৷''

বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে গত ১৩ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেন কামাল হোসেন৷ এই জোটে বিএনপি ও গণফোরামের সঙ্গে আছে জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য৷ সাত দফা দাবিতে জনমত গঠনে এটাই তাদের প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচি৷

বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে এ জনসভার বিএনপি নেতাদের মধ্যে খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, বরকতউল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, এজেডএম জাহিদ হোসেন, মনিরুল হক চৌধুরী, হাবিবুর রহমান হাবিব, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির আসম আবদুর রব, আবদুল মালেক রতন, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণফোরামের মোস্তফা মহসিন মন্টু, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সুলতান মো. মনসুর ও মোস্তফা মহসিন মন্টু উপস্থিত ছিলেন৷

সমাবেশে ঐক্য ফ্রন্টের অন্যতম নেতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘‘আমি প্রস্তাব রাখবো, ‘আসেন আমরা সবাই বনানীতে তাজউদ্দীন সাবের কবর জিয়ারত করি, এরপর কোকোর কবর জিয়ারত করে চন্দ্রিমা উদ্যানে গিয়ে জিয়ার মাজার জিয়ারত করি৷ এরপর বত্রিশ নাম্বারে গিয়ে শ্রদ্ধা জানাই৷ ড. কামাল হোসেনেন কাছে আমার প্রস্তাব থাকল৷''

জাফরুল্লাহ চৌধুরী আরো বলেন, ‘‘বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে৷ এজন্য আইনের সংস্কার করতে হবে৷ কামাল হোসেন, মইনুল হোসেন এটা ভালো করতে পারবেন৷

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশে ২০ দলীয় জোটের কয়েকজন নেতাও যোগ দেন৷ জোটের শরিক এলডিপির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ, যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম, কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান, জমিয়ত কাসেমী অংশের সহ-সভাপতি শাহীনুর পাশা চৌধুরী, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের প্রমুখ জনসভায় যোগ দেন৷

পুলিশ যে রেজিষ্ট্রি অফিস মাঠে সমাবেশের অনুমতি দেয় সেখানে বেশি মানুষের জড়ো হওয়ার জায়গা না থাকলেও সমাবেশে জনসমাগাম আশপাশের সড়ক ছাড়িয়ে অনকে দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে৷ জনসভা মঞ্চের ব্যানারে অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন; খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তিসহ ৭ দফা দাবির কথা লেখা হয়৷ সিলেটের সাংবাদিক তুহিনুল হক তুহিন ডয়চে ভেলেকে বলেন,‘‘সমাবেশের মাঠটি ছোট হলেও লোকজন চারদিকের সড়কে অবস্থান নেন৷ আশপাশের মার্কেটেও তাঁরা অবস্থান নেন৷ পুরো এলাকায় তখন তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না৷''

তিনি আরো জানান, ‘‘সকাল থেকেই সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ছিল র‌্যাব পুলিশের তল্লাশি ও টহল৷ পুলিশ মোট ৬৮ জনকে আটক করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে৷''

ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. শান্তনু মজুমদার ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এই রাইড সহজ হবে বলে মনে হয় না৷ কারণ, ক্ষমতাসীনরা তাদের এই জোটকে সহজভাবে নেবে না৷ বিএনপি এই ফ্রন্টে যোগ দেয়ার আগ পর্যন্ত সরকারের মনোভাব ছিল একরকম৷

কিন্তু বিএনপিতে যোগ দেয়ার পর মনোভাব বদলে গেছে৷ তারা এটাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছে৷ তাই তাদের নানা কাজে সরকার ভেবে-চিন্তে পদক্ষেপ নেবে৷ সিলেটে তাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সমাবেশের অনুমতি পায়নি৷ আমার কথা হলো, এ ধরনের সমাবেশ বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দেয়া বা অনুমতি না দেয়া কোনোভবেই সমর্থন করা যায় না৷''

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘এখন দেখার বিষয়, এই ঐক্য কিভাবে থাকে৷ এবং নির্বাচন পর্যন্ত একইভাবে থাকে কিনা, কারণ, ড. কামাল হোসেনকে কেন্দ্র করে এই ঐক্য৷ সেখানে জামায়াত ইস্যু এবং ২১ অগাস্টের গ্রেনেড হামলার রায়ের পর প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়েছে৷ এখন ড. কামাল এই দু'টি ইস্যুকে কিভাবে হ্যান্ডেল করবেন, তার ওপর এই ঐক্যের ভবিষ্যৎ চেহারা নির্ভর করছে৷ দ্বিতীয়ত, আসন ভাগাভাগির প্রশ্ন যখন আসবে, তখন আরেকটি সংকট দেখা দেবে৷ এই ঐক্য ফ্রন্ট বিএনপি'র ভোটের ওপর নির্ভরশীল৷ বিএনপি ছাড়া আর যারা আছেন, তাদের মানুষ চেনে, কিন্তু ভোট নেই৷ এখন আসনের ক্ষেত্রে যাঁদের ভোট আছে, তাঁরা প্রাধান্য পাবেন, না যাঁদের টেলিভিশনে চেহারা দেখে মানুষ চেনে, তাঁরা প্রাধান্য পাবেন৷ যদি ভোটের হিসেবে প্রাধ্যান্য দেয়া হয়, তাহলে বিএনপিকে শেষ পর্যন্ত জামায়াতের কাছেই থাকতে হবে৷''

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে নতুন রাজনৈতিক জাটকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ‘‘রাজনীতি করার অধিকার সকলেরই রয়েছে৷ আমি বিশ্বাস করি, রাজনৈতিকভাবে বিভিন্ন দল জোট করে নির্বাচনে আসবেন। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন৷ এতে গণতন্ত্রের ভিত্তিটা আরো মজবুত হবে৷'' তিনি আরো বলেন, ‘‘আমরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করতে পিছপা হই না৷ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আমরা রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করি৷''

তিনি জোট নেতাদের সমালোচনা করে বলেন, ‘‘যারা এখানে যুক্ত হয়েছে, এরা কেউ কেউ তো মানুষকে সম্মান রেখেও কথা বলতে পারছে না৷ তাদের যে কথাবার্তা, যা কিছু মানুষ জানতে পারছে৷ নারীবিদ্বেষী মনোভাব, মেয়েদের প্রতি অশালীন কথা থেকে শুরু করে অনেক কিছুই আমরা যারা জোট করছে তাদের থেকে শুনতে পারছি৷ জনগণের জন্য কাজ করতে গেলে যে সহনশীলতা দরকার, ত্যাগ দরকার তা তাদের মাঝে নেই৷ তবে, আশা করি তারা আরো সংযত হবে৷ এদেশে সত্যিই রাজনৈতিক একটা জোট করে এগিয়ে যেতে চাইলে তাদেরকে সেভাবে চলতে হবে৷ তবে কেউ যদি জঙ্গি, সন্ত্রাস বা অশালীন উক্তি করে, মানুষ যদি বিচার চায়, তার বিচার করাটা রাষ্ট্রের কর্তব্য৷ রাষ্ট্র তা করবে এবং করে যাচ্ছে৷'' -ডয়েচেভেলে

২৫ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০২:৫৯