কেন ঝরে গেল শিশুটির প্রাণ?
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
এক শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে তিনটি তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে৷ শিশুটির মৃত্যুতে চিকিৎসায় অবহেলা এবং ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠেছে৷ এসব অভিযোগে কর্তব্যরত চিকিৎসকসহ তিনজনকে আটক করা হলেও পরে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়৷ গত শুক্রবার রাতে চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপতালে মারা যায় পৌনে তিন বছর বয়সের শিশু রাইফা খান৷ তার বাবা সাংবাদিক রুবেল খানের অভিযোগ, অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার কারণে তাঁর শিশু কন্যা মারা গেছে৷ওই রাতে  তিনি তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে চকবাজার থানায় মামলাও করতে গিয়েছিলেন৷ কিন্তু বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)-র নেতারা থানায় গিয়ে হুমকি দেন বলে তিনি অভিযোগ করেন৷ রুবেল খান বলেন, ‘‘সাংবাদিকরা সমঝোতায় এসে তদন্তের পর মামলার সিদ্ধান্ত নেন তারা৷’’

রুবেল খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বৃহস্পতিবার আমার মেয়েকে গলায় ব্যথা নিয়ে হাসপপাতালে ভর্তি করিয়েছিলাম৷ প্রথম দফা তাকে অ্যান্টিবায়োটিক দিলে তার খিচুনি হয়৷ এর একদিন পর আবারো তাকে সেই অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া হয়৷ এর ফলে তার মৃত্যু হয়েছে৷’’ তিনি আরো অভিযোগ করেন, ‘‘অ্যান্টিবায়োটিক দেয়ার পর আমার মেয়ে যখন মৃত্যুর মুখে, তখনো ডাক্তার আসেনি৷’’

এ নিয়ে চট্টগ্রামের সাংবাদিকরা আন্দোলন করছেন৷ তাঁরা দায়ী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন৷ চট্টগ্রাম সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাসান ফেরদৌস ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা, পুলিশ ও চিকিৎসক এই তিনপক্ষ সমঝোতার মাধ্যমে মামলা থেকে বিরত আছি৷ তিনটি তদন্ত কমিটি হয়েছে৷ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মামলা হবে৷ আমরা মনে করি, আমাদের সহকর্মী রুবেল খানের সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে৷ তারপরও আমরা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে চাই৷’’

তিনি আরো অভিযোগ করেন, ‘‘ম্যাক্স হাসপতালটি শুধু ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে চলছে৷ তাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো অনুমোদন নেই৷ হাসপাতালটিও বন্ধ করে দেয়ার দাবি জানাই৷’’

এই ঘটনায় চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে৷ ডা. আজিজুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমাদের তদন্ত চলছে৷ তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো মন্তব্য করা যাবে না৷ তবে তদন্তে অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে৷’’

এদিকে ম্যাক্স হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লিয়াকত আলী ডয়চে ভেলের কাছে দাবি করেন, ‘‘আমাদের  অভ্যন্তরীণ তদন্তও চলছে৷ আমরা এখন পর্যন্ত অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার প্রমাণ পাইনি৷ তাই আমাদের ধারণা শিশুটি মৃগী রোগে মারা গেছে৷ খিচুনির বিষয়টি চিকিৎসককে জানালে হয়তো এমন হতো না৷’’

হাসপাতালের অনুমোদন না থাকার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘‘তদন্তকারীরা বলেছেন, আমাদের হাসপাতালের অনুমোদনের কাগজে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যে কর্মকর্তা সই করেছেন, তার অনুমোদন দেয়ার ক্ষমতা নেই সেটা আমাদের দোষ নয়৷’’

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘তদন্তে ভুল চিকিৎসা বা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে৷’’

এদিকে মারা যাওয়া শিশুটির বাবা রুবেল খান বলেন, ‘‘অ্যান্টিবায়োটিক দেয়ার পর প্রথম দফা খিচুনি হওয়ার পর চিকিৎসককে জানানো হয়েছে৷ তারপর অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করা হয়৷ এরপরও ডা. বিধান রায় দ্বিতীয়বার একই অ্যান্টিবায়োটিক দেন৷ আমার সন্তান যখন মারা গেছে, তখনও ওই ডাক্তারকে পাওয়া যায়নি৷ এর আগে ডিউটি ডাক্তারকে ডাকলেও আসেননি৷’’

বাংলাদেশে প্রায়ই হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার কারণে রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া যায়৷ তবে এসব ঘটনায় সরসরি ফৌজদারী মামলা করা যায় না বললেই চলে৷ দু'একটি মামলা হলেও শেষ পর্যন্ত তার তদন্ত শেষ হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া যায় না৷ তবে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)-তে অভিযোগ করার সুযোগ আছে৷ বিএমডিসির চেয়ারম্যান ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা অভিযোগ পেলে তদন্ত করি৷ অভিযোগ প্রমাণ হলে ব্যবস্থাও নিই৷’’ তবে এ ধরনের অভিযোগের সংখ্যা এবং কোনো অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে কিনা তাৎক্ষণিকভাবে তিনি তা জানাতে পারেননি৷ আর এর জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত রেজিষ্ট্রারের সঙ্গেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি৷

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালে ৩৩৩টি অভিযোগের হিসাব আছে বিএসডিসি’র কাছে৷ এর মধ্যে ভুল চিকিৎসা বা অবহেলার অভিযোগ আলাদা করা নেই৷ তবে অধিকাংশ অভিযোগই চিকিৎসকদের ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহারের বিরুদ্ধে৷ ওই বছরে চিকিৎসায় অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার ৫টি অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়৷ তবে তাতে অভিযোগ প্রমাণ হয়নি বলে জানা গেছে৷ তবে ভুক্তভোগীদের অনেকেই মনে করেন, এইসব অভিযোগ তদন্তে একটি আলাদা স্বাধীন কমিশন হওয়া প্রয়োজন৷ -ডয়েচেভেলে

 

০৩ জুলাই, ২০১৮ ০৮:৩৭:১৬