সাক্ষাৎকার
‘লজ্জা হয় যে, আমি প্রায়ই টাকা চুরি করতাম'
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
শুধু মনের জোরে ও কিছু মানুষের সহযোগিতায় মাদকের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে এসেছেন অভিক রহমান (ছদ্মনাম)৷ তাঁর সে সময়কার জীবন, সংকটময় মুহূর্তগুলো নিয়ে কথা বলেছেন ডয়চে ভেলের সঙ্গে৷ শুধু মনের জোরে ও কিছু মানুষের সহযোগিতায় মাদকের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে এসেছেন অভিক রহমান (ছদ্মনাম)৷ তাঁর সে সময়কার জীবন, সংকটময় মুহূর্তগুলো নিয়ে কথা বলেছেন ডয়চে ভেলের সঙ্গে৷

ডয়চে ভেলে: মাদক থেকে বেরিয়ে আসার পর আপনার এখনকার অনুভূতি কী? কতদিন হলো আপনি এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়েছেন?

অভিক রহমান: আমার অনুভূতি হলো নিজের ভেতর অনেক শান্তি লাগে৷ হালকা লাগে৷ ভারমুক্ত মনে হয়৷ ভালো লাগে৷ আজ পর্যন্ত ১০ বছর ২৪ দিন হলো আমি মাদক মুক্ত আছি৷

আপনি কীভাবে মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন?

আমি তখন কলেজ ফার্স্ট ইয়ার-এ পড়ি৷ আমাদের বাসায় আমার এক কাজিন এলো থাকতে৷ ও নেশা করতো৷ আমি জানতাম৷ তার সাথে আমার ঘোরাঘুরি করতে ভালোই লাগতো৷ ও নেশা করতে মাদক স্পটে যেত৷ আমি ওর সাথে যেতাম৷ দেখতাম কীভাবে খায় এবং খেয়ে কী করে৷ একটা সময় আমারও ইচ্ছা জাগে খাওয়ার৷ তাই এক দিন ঢাকা থেকে বাসে করে কুমিল্লায় এলাম রাত ৯টার পর৷ বাসস্ট্যান্ডের পাশে ছিল ট্রেন স্টেশন এবং একটি বস্তি, যেখানে মাদক বিক্রি হতো৷ আমাকে আমার কাজিন বললো, চল স্পটে যাই৷ তুই খাবি? আমি বললাম, আমি যদি বাসায় ধরা খাই? বললো এমন কিছু হবে না৷ তারপর সে এক বোতল ফেনসিডিল নিল৷ আমি ঐখান থেকে চার ভাগের এক ভাগ খেলাম৷ তারপর বাসায় গিয়ে ভাত খাওয়ার পর আমার শরীরে কেমন ঘাম বের হতে লাগলো৷ আমি গোসল করে ঘুম দিলাম৷ সকালে উঠেও আমার মধ্যে মাদকের নেশা ছিল৷ আমার ভালো লাগছিল৷ আমি কাজিনকে বললাম, আমি আজকেও খাবো৷ বাসায় যেহেতু ধরা খাইনি, তাহলে তো আর সমস্যা নেই৷ এভাবে আস্তে আস্তে আমি মাদকের প্ৰতি দুর্বল হয়ে গেলাম৷

আমি শেষ দু'বছর হেরোইন খেতাম৷ আমি তখন একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করতাম৷ ভালো বেতন পেতাম৷ তখন আমার এক বন্ধু বাসায় এসে হেরোইন ও ইয়াবা খেত৷ আমি ইয়াবা খেতাম না৷ কারণ ওটা খেলে নাকি ঘুম আসে না৷ আমার যুক্তি ছিল, নেশা করার পর যদি ঘুমই না আসে, সেই নেশা কেন করব? যাই হোক, ওর সাথে হেরোইন খাওয়া শুরু করলাম৷ কিন্তু হেরোইন খাওয়ার কিছু টেকনিক আছে, তাই হেরোইন খেতে ঐ টেকনিক না জানলে যে জানে তার ওপর নির্ভরশীল হতে হয়৷ আমিও আমার বন্ধুর ওপর নির্ভরশীল ছিলাম৷ তাই একদিন ও হেরোইন খাওয়ার ছবি তুলে ফেললো মোবাইলে এবং আমাকে ব্ল্যাকমেল করা শুরু করলো৷ প্রতিদিন আমাকে দিয়ে হেরোইন কেনাতো এবং একসাথে খেতে বাধ্য করত৷ তাতে আমি হেরোইনের প্রতি আসক্ত হয়ে গেলাম এবং টেকনিকও শিখে গেলাম৷ সেটাই ছিল আমার সর্বনাশের শেষ ধাপ৷

কেন জড়ালেন মাদকে? কোনো হতাশা ছিল? বা অন্য কোনো কারণ? নাকি শুধু কৌতূহল থেকেই?

আমি আসলে সঙ্গদোষে মাদকে জড়িয়ে ছিলাম৷ আমার কাজিনের নেশাগ্রস্ততা আমার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে৷ বলতে পারেন, কৌতূহল বশেই প্রথম মাদক সেবন করা৷ আমি কিন্তু কখনোই হতাশা থেকে মাদক সেবন করিনি৷ সবসময় আনন্দের জন্য মাদক সেবন করি৷ কিন্তু হেরোইনের আসক্তি আমার হয় সেই বন্ধুর ব্ল্যাকমেলিংয়ের জন্য৷ এই নেশা আমাকে শেষ করে দিয়েছিল৷

আপনি আর কী কী ধরনের মাদক সেবন করেছেন?

আমি ৯ বছর ফেনসিডিল এবং গাঁজা খেয়েছি৷ দু'বছর হেরোইন নিয়েছি৷

কীভাবে এ থেকে বেরিয়ে আসলেন?

একদিন রাত ১২ টার পর ঘুম ভেঙে গেলে আমার নেশা করার জন্য মাথা খারাপ হয়ে যায়৷ আমি তখন বোনের বাসায় থাকি৷ আমি আস্তে আস্তে বাসার দরজা খুলে ছাদে গিয়ে হেরোইন নিলাম৷ এরপর সিরিঞ্জ ফেলে আসি ছাদে৷ তার একটু পর আমার বোন জামাই ছাদে গিয়ে সিরিঞ্জটি পেয়ে যান৷ বাসায় এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেন৷ আমার মাথা তখন খারাপ হয়ে যায়৷ আমি আমার ভাগ্নেকে মাথার উপর তুলে ছুড়ে মারতে যাই৷ কিন্তু সেটি শেষ পর্যন্ত করিনি৷ এরপর বাসা থেকে বের হয়ে যাই৷ পরদিন আমার চাচা আসেন ঢাকায় এবং আমি ফিরে এলে আমাকে বলেন যে, আমি অনেক অন্যায় করেছি৷ খারাপ ব্যবহার করেছি৷ তাই উনি বললেন, চলো কুমিল্লায় তোমার আব্বা-আম্মার কাছে মাফ চাইবে৷ আমি রাজি হলাম৷ কুমিল্লায় বাস থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে কিছু লোক আটক করেন এবং একটি বাসায় নিয়ে যান৷ পরে বুঝি, ওটা রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার৷ তারপর ঐ সেন্টারেই ৩ মাস প্রোগ্রাম করি৷ প্রোগ্রামের প্রথম দুই মাস আমার মধ্যে অনেক রাগ, জেদ ছিল পরিবারের প্রতি যে, কেন আমাকে তারা সেন্টারে দিলেন? কিন্তু একদিন কাজ করতে গিয়ে গরম পানি আমার পায়ে পড়ে এবং আমাকে সম্পূর্ণ বেড রেস্ট-এ চলে যেতে হয়৷ তখন রাতে চিন্তা করতাম, আমি কী করেছি, কী হারিয়েছি, আর কী করা উচিত, সেসব৷ তখন সেন্টারেই একজন ইন্সট্রাক্টর ছিলেন৷ তিনিও আমাকে বোঝাতেন৷ ওনার যুক্তিগুলো আমার ভালো লাগছিল৷ তখন পণ করি যে, আমি মাদকমুক্ত হবো এবং তার জন্য যা যা করা দরকার আমি তা-ই করবো৷ সে থেকেই আসলে শুরু মাদকমুক্ত থাকার লড়াই৷ আজ ১০ বছর পার করলাম৷ আলহামদুলিল্লাহ৷

এ সময় কাদের সহযোগিতা পেয়েছেন?

প্রোগ্রাম চলাকালীন রিকভারি ভাইদের সহযোগিতা পেয়েছি৷ পাশাপাশি সেন্টারের সেই ইন্সট্রাক্টর তো ছিলেনই৷ তাঁর সংস্পর্শে থাকতাম সবসময়৷ সেন্টারের একজন কাউন্সেলর ছিলেন৷ খারাপ লাগলে ওনার সাথে শেয়ার করতাম৷ পাশাপাশি আমার পরিবার এবং আমার কিছু ভালো বন্ধুদের সহযোগিতা পেয়েছিলাম৷

মাদকের কারণে আপনার পরিবারের সঙ্গে আপনার সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন ঘটেছিল কি?

ঘটেছিল৷ আমার বাবা আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন৷ আমি আমার বোনের বাসায় থাকতাম৷ আমার মাদক সেবনের কারণে আমার বোনের সাথে আমার বোনের স্বামীর প্রায়ই ঝগড়া হতো৷ আমার সাথে আমার আত্মীয়স্বজন কথা বলতেন না৷ তাদের ছেলে-মেয়েদের বলতেন আমার সাথে কথা না বলতে৷ আমার বন্ধুরা আমাকে এড়িয়ে চলত৷ একদিন আমার খুব কাছের চার বন্ধু আমাকে মেরেছিল৷ আমার দুলাভাই আমাকে সহ্য করতেন না৷ সবচেয়ে কষ্টের ছিল আমার মা সঠিক সময় ট্রিটমেন্ট না করার কারণে ওনার ক্যানসার হয়ে গিয়েছিল৷

সেসময়ের এমন কোনো ঘটনা মনে পড়ে, যার কারণে আপনি এখনো লজ্জিত বোধ করেন?

পড়ে৷ আমি প্রায়ই টাকা চুরি করতাম মানুষজনের পকেট থেকে৷ যার জন্য আমার এখনো লজ্জা হয়৷ কিন্তু আমি অনেকের কাছে ক্ষমা চেয়েছি৷

তরুণ প্রজন্ম কেন মাদকে জড়ায় বলে আপনার মনে হয়?

ফ্যান্টাসি থেকে৷ আর একটা কারণ হলো, ও খায়, তাই আমারও খাওয়া দরকার৷ অন্যথায় স্ট্যাটাস কমে যাবে৷

যারা মাদকে জড়িয়ে পড়েছে, এ থেকে বের হতে পারছে না, তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী? কিংবা তাদের পরিবার বা বন্ধুবান্ধবদের প্রতি আপনার কোনো বক্তব্য আছে কি?

আগে নিজে চাইতে হবে যে, আমি ভালো থাকতে চাই৷ এবং মাদক মুক্ত থাকতে চাই৷ আমরা কেউ জন্মের পর থেকে এ মাদক গ্রহণ করিনি৷ যতদিন পর্যন্ত আমরা মাদক গ্রহণ করি নাই, ততদিন পৃথিবীটা অনেক সুন্দর ছিল৷ যখনই মাদক গ্রহণ করা শুরু করেছি তখন থেকে সব শেষ৷ স্বাভাবিক কিছুই ভালো লাগেনি৷ তাই আমার মতে এক বার হলেও রিহ্যাব সেন্টার থেকে প্রোগ্রাম করা উচিত (কমপক্ষে তিন মাস৷ তারপর কাউন্সেলিং করা উচিত এবং রিকভারি ফেলোদের সাথে টাচ-এ থাকতে হবে৷ ডিটোক্সিফিকেশন বা ইনহাউস কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে রিহ্যাবিলিটেশন করতে হবে৷ মেডিসিন দিয়ে কখনো মাদক ছাড়া যায় না৷ মাদক গ্রহণের কারণই হচ্ছে মানসিক৷ তাই এটা ছাড়াতে হলে কাউন্সেলিংয়ের কোনো বিকল্প নেই৷ খারাপ বন্ধুদের সঙ্গ ছাড়তে হবে এবং পরিবারকে বেশি বেশি সময় দিতে হবে৷ সর্বোপরি নিজেকে বোঝাতে হবে যে, যা করছি ভুল করছি৷ আমিও পারি ভালো থাকতে, মাদক ছাড়া থাকতে এবং জীবনে যে কোনো পরিস্থিতিতে কখনো মাদক গ্রহণ করবো না এই কথাটা মনে প্রাণে মেনে চলতে হবে৷ আমার মতে পরিবারের উচিত বেশি করে সময় দেয়া৷ মাদকের ক্ষতির দিকসমূহ খোলামেলা আলোচনা করা৷ বেশি করে খোলামেলা আলোচনা করা৷ -ডয়েচেভেলে

১৯ জুন, ২০১৮ ২৩:৩০:১১