মাদকবিরোধী অভিযানে ‘বাণিজ্য’, কিছু ক্ষেত্রে তদন্ত শুরু
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে আটকের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়া, এমনকি টাকা না পাওয়ায় ‘বন্দুক-যুদ্ধে’ হত্যার অভিযোগও উঠছে৷ তদন্তও শুরু হয়েছে কয়েকটি জায়গায়৷ এইসব অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় এরইমধ্যে কিছু পুলিশ সদস্যের কিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে৷ চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আকরাম হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে সোমবার৷ তিনি একজন মাদক ব্যবসায়ীকে আটকের পর টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ৷ অধিকতর তদন্তের জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে৷ অভিযাগে বলা হয়েছে, চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনার ঈশ্বরচন্দ্রপুরের ‘মাদক ব্যবসায়ী’ সেলিম উদ্দিন ঝন্টুকে আটকের পর ৭ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দেন ওসি আকরাম হোসেন৷ শুধু তাই নয়, তাকে এলাকা থেকে পালিয়ে যেতে সহযোগিতাও করেন৷ তার বিরুদ্ধে ওই এলাকার মাদকবিরোধী অভিযানের নামে নিরীহ ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়ে অর্থ আদারেয়রও অভিযোগ আছে৷

এদিকে ফরিদপুরের চরভদ্রাসন থানার এএসআই জুয়েল হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে একই ধরনের অভিযোগে৷ তিনি অন্তত দু'জন ‘মাদক ব্যবসায়ীকে’ আটকের পর ঘুস নিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ৷

ওই ঘটনায় তিনি মোট তিনজনকে আটক করেন৷ দু'জন টাকা দিয়ে ছাড়া পেলেও আরেকজন টাকা দিতে না পরায় তার বিরুদ্ধে ইয়াবা পাচারের মামলা করেন এএসআই জুয়েল৷ তার বিরুদ্ধে আরো অনেক লোককে আটক এবং টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়ার অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে৷ নিরীহ লোকজনকে মাদকের মামলায় আটকের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও আছে এসআই জুয়েলের বিরুদ্ধে৷

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে টাকার বিনিময়ে দুই মাদক ব্যবসায়ীকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে৷ ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) তাজুল ইসলাম ও আতাউর রহমান গত শনিবার রাতে আড়াই লাখ টাকার বিনিময়ে দুই  ‘মাদক ব্যবসায়ীকে’ ছেড়ে দেন৷

ফেনির ফুলগাজীতেও উঠেছে ভয়াবহ অভিযোগ৷ টাকা না পাওয়ায় ‘বন্দুক যুদ্ধে’ হত্যার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে৷ ২৩ মে রাতে ফুলগাজী উপজেলা আনন্দপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ আনন্দপুর গ্রামে ‘মাদক চোরাকারবারিদের’ সঙ্গে পুলিশের গোলাগুলির সময় সাহমিত হোসেন শামীম (২৫) ও মজনু মিয়া মনির (২৩) নামে দুইজন নিহত হয় বলে পুলিশ জানায়৷ তবে শামীমের মা আনোয়ারা বেগম সংবাদ মাধ্যমের কাছে দাবি করেন, বুধবার দুপুরে বাড়ির পাশের জমিতে গরুর জন্য ঘাস কাটছিল তাঁর ছেলে৷ বেলা ২টার দিকে ফুলগাজী থানার এসআই শফিক এসে সেখান থেকে শামীমকে নিয়ে যায়৷ আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘‘পরে পুলিশ আমাদের কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করে৷ টাকা দিতে না পারায় রাতে ওকে গুলি করে হত্যা করেছে৷’’ একই ধরনের অভিযোগ করেছেন মজনু মিয়া মনিরের বোন রেজিনা বেগম৷ তিনি বলেছেন, ‘‘গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে এসে একদল লোক বুধবার রাতে ফেনী শহরের বড় মসজিদ এলাকার বাসা থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায়৷ পরে দেড় লাখ টাকা দাবি করে৷ রাতে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গেলে আমাদের তাড়িয়ে দেয়৷ টাকা দিতে না পারায় ভোর রাতে পুলিশ মনিরকে গুলি করে মেরেছে৷’’ তবে পুলিশ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে৷

অন্যদিকে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী এলকার একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় তুলেছে৷ অভিযোগ– জমিজমা নিয়ে দ্বন্দ্বের জের হিসেবে এক প্রভাবশালী প্রতিপক্ষের হয়ে পুলিশ সমর চৌধুরী নামে এক বয়স্ক ব্যক্তির হাতে ইয়াবা ও অস্ত্র ধরিয়ে দিয়ে মামলায় ফাঁসিয়ে দিয়েছে৷ তাঁকে পুলিশ আগে তুলে নেয়৷ এরপর ক্রসফয়ারের ভয় দেখায়৷ সর্বশেষ মামলায় ফাঁসিয়ে দিয়ে কারাগারে পাঠায়৷ এলএলবি পাস সমর চৌধুরী আইনজীবীর সহকারী হিসেবে কাজ করেন এবং এলাকায় সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত৷ এর আগেও পুলিশ ওই প্রভাবশালী ব্যক্তির পক্ষ নিয়ে সমর চৌধুরীকে নানাভাবে হয়রানি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে৷

গত ২৬ মে রাতে কক্সবাজারের টেকনাফে র‌্যাবের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন কাউন্সিলর একরামুল হক৷ পরে তাঁর স্ত্রী আয়েশা বেগম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘‘আমার স্বামীকে সাজানো বন্দুক যুদ্ধের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে৷ তিনি কোনোভাবেই কোনো মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না৷’’ সংবাদ সম্মেলনে তাঁর দুই মেয়ে তাহিয়াত (১৪) ও নাহিয়ানসহ (১১) পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন৷

আয়েশা বেগম দাবি করেন, তাঁর স্বামীকে অন্যায়ভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে৷ তিনি বলেন, ‘‘আমার স্বামী কোনোদিন ইয়াবা তো দূরের কথা, কোনো ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সাথে পর্যন্ত চলাফেরা করেনি৷ র‌্যাবের সাথে কোনোভাবে বন্দুকযুদ্ধ হয়নি৷ বন্দুকযুদ্ধের নামে আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে৷ ঘটনাস্থল থেকে যে ইয়াবা ও অস্ত্র উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ সাজানো৷’’ তবে র‌্যাব দাবি করেছে, একরামুল হক ‘তালিকাভূক্ত’ মাদক ব্যবসায়ী এবং তিনি বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন৷

দেশের বিভিন্ন থানা এালাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেণির সদস্য চলমান মাদকবিরোধী অভিযানকে টাকা আয়ের সুযোগ হিসেবে নিয়েছে৷ তারা কয়েকভাবে টাকা আদায় করেন বলে অভিযেগ৷ গ্রেপ্তারে ভয় দেখিয়ে, গ্রেপ্তার করে ছাড়ার বিনিময়ে, নিরীহ লোককে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে তালিকভূক্ত করার ভয় দেখিয়ে এবং তালিকা থেকে নাম কাটার বিনিময়ে৷ এছাড়া ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ভয়কে তারা মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে৷

জানাগেছে, কেন্দ্রীয়ভাবে মাদক ব্যবসায়ীদের একটি তালিকা থাকলেও স্থানীয়ভাবে থানা পর্যায়েও তালিকা করা হয়েছে এবং  হচ্ছে৷ অভিযোগ, থানা পর্যায়ের তালিকায়ই কোনো কোনো পুলিশ সদস্য ‘ঘুস বাণিজ্যে’র কাজে লাগাচ্ছেন৷ ‘ইন্সপেক্টর (তদন্ত)-এর কাছে এই তালিকার দায়িত্ব থাকলেও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা অর্থ আদায়ের জন্য তাদের ইচ্ছেমতো তালিকায় নাম অন্তর্র্ভূক্ত করছেন, বাদও দিচ্ছেন৷ এমনকি সর্কেল এএসপি এবং এএসপিরাও এই তালিকা সম্পর্কে অবগত নন৷ অর্থ আদায়ের জন্য মাদকের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয় এমন ব্যক্তিদের নামও তালিকায় ঢোকানো হচ্ছে৷

পুরো বিষয়ে বক্তব্য জানতে পুলিশ সদর দপ্তরে যোগাযোগ করেও কোনো তথ্য বা বক্তব্য জানা যায়নি৷  পুলিশ সদর দপ্তরের জনসংযোগ বিভাগ ডয়চে ভেলেকে বলছে, সাংবাদিকের পরিচয় নিশ্চিত না হয়ে কোনো তথ্য দেয়া যাবে না৷ আর পরিচয় নিশ্চিতের পদ্ধতি হিসেবে সশরীরে পুলিশ সদর দপ্তরে যাওয়াকে একমাত্র উপায় হিসেবে জানানো হয়৷

মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘প্রথম থেকেই আমার প্রশ্ন ছিল, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এই মাদকবিরোধী অভিযানকে তাদের অর্থ বাণিজ্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে কিনা৷ আজকে এই পর্যায়ে এসে অনেক ক্ষেত্রেই তাই মনে হচ্ছে৷ আমরা এরই মধ্যে অনেক অভিযোগ দেখছি৷ টাকা নিয়েও ক্রসফায়ার দেয়া হয়েছে৷ আবার ক্রসফয়ারের ভয় দেখিয়েও টাকা নেয়া হয়েছে৷’’

তিনি বলেন, ‘‘এই অভিযানে সমন্বয়ের অভাব দেখা যাচ্ছে৷ ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব হচ্ছে৷ আর শুরু থেকে তালিকায় নাম দেয়া এবং নাম না দেয়া নিয়ে বাণিজ্যেল অভিযোগ আছে৷ ফলে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে সহজে বের হওয়া সম্ভব হবে বলে আমরা মনে হয় না৷ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ কেউ এটাকে অর্থবাণিজ্যের কাজে লাগাবে৷’’

আর পুলিশের সাবেক আইজি মোহাম্মদ নূরুল হুদা ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ক্ষমতা থাকলে তার তো অপব্যবহার হয়ই, এট তো আর নতুন কিছু না৷ এখানে দেখতে হবে, যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন সেখানে অ্যাকশন নিতে হবে৷ আর যার কাছে এই কো-আর্সিভ ক্ষমতা থাকে, ধরার ক্ষমতা থাকে, সেখানে বাড়াবাড়ি হতেই পারে৷ বাড়াবাড়ি হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে৷ সুপারভাইজারি অফিসারদের দায়িত্ব নিয়ে এটা দেখতে হবে৷ তা না করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে৷’’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রীওতো বলেছেন, বাড়াবাড়ি হলে তার অ্যাকশন নেয়া হবে৷ বাড়াবাড়ি হবে বলে তো আর অভিযান বন্ধ করে দেয়া যায় না৷ এটা ব্যক্তির দায় বা বিচ্যুতি৷ এটার জন্য তো কোনো বাহিনী দায়ী নয়৷ ব্যক্তি অপরাধ করলে ব্যবস্থা নিতে হবে৷’’

প্রসঙ্গত, মাদকবিরোধী অভিযানে এ পর্যন্ত ১৩৮ জন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে৷ আর গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১০ হাজারেরও বেশি৷ -ডয়েচেভেলে

 

০১ জুন, ২০১৮ ০০:১১:০৫