রাজনৈতিক উসকানি আর আধিপত্য থেকে পাহাড়ে খুনোখুনি
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
প্রতীকী ছবি
পার্বত্য চট্টগ্রামে খুনোখুনির আশঙ্কা আগেই ছিল৷ হঠাৎ করেই এই ঘটনাগুলো ঘটেনি৷ গত কয়েকমাস মাস ধরে অস্থিরতা ছিল পার্বত্য এলাকার পরিবেশে৷ তারই বিস্ফোরণ ঘটেছে গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার৷ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনে জাতীয় নির্বাচন৷ ফলে রাজনৈতিক আধিপত্য কাজ করছে৷ পাশাপাশি শান্তিচুক্তির মূল অংশগুলোর বাস্তবায়ন না হওয়া রাজনৈতিক উস্কানির সঙ্গে যোগ হয়েছে৷ এর বাইরে আধিপত্য বিস্তারতো আছেই৷ ওই এলাকায় একটা শ্রেণি নিজেদের বঞ্চিত মনে করে৷ তাদেরও ক্ষোভ আছে৷ সবকিছু মিলিয়ে এমন কিছু যে ঘটতে যাচ্ছে সেটা আঁচ করা যাচ্ছিল অনেকদিন ধরেই৷ প্রশাসন আগে থেকেই পদক্ষেপ নিলে এই খুনোখুনি বন্ধ করা যেত বলে মনে করেন পার্বত্য এলাকা নিয়ে কাজ করা গবেষকরা৷

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমেনা মহসিন৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘ওখানকার পরিস্থিতির বিস্তারিত বলা যাবে না৷ আমি গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি, পার্বত্য শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন না হওয়ায় একটা প্রধান কারণ৷ চুক্তির মূল বিষয়গুলোই এখনো বাস্তবায়ন হয়নি৷ যে কারণে অপরাধীরা সুযোগ পাচ্ছে৷'' 

তিনি বলেন, ‘‘পাশাপাশি রাজনৈতিক বিষয়গুলো এবং আঞ্চলিক বিষয়গুলো এসব ঘটনায় কাজ করেছে৷ অনেকদিন ধরেই ওখানে একটা গুমোট ভাব আমরা লক্ষ্য করছিলাম৷''

দুই দশক আগের শান্তিচুক্তি পাহাড়ে রক্তক্ষয় অবসানের প্রত্যাশা জাগালেও এরপর থেকে চলছে পাহাড়ি সংগঠনগুলোর নিজেদের কোন্দল, যার পরিণতিতে গত চার মাসে প্রাণ হারিয়েছেন ১৬ জন৷ এক সময়ের একক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ভেঙে এখন অন্তত চারটি দল সক্রিয় পাহাড়ে৷ তাদের কোন্দলের সর্বশেষ নজির গত দুই দিনে ছয়জনের মৃত্যু৷

এসব হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে রাঙামাটির পুলিশ সুপার আলমগীর কবির ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র তৎপরতা এবং এমন বেপরোয়া হত্যার ঘটনাকে সরকার গুরুত্বসহকারে নিয়েছে৷ ঘটনার পেছনের কারণ আমরা জানতে পেরেছি৷ তবে কাউকে গ্রেফতার করতে পারিনি৷''

আগের হত্যাকাণ্ডগুলোর ঘটনায় জড়িত কাউকে কি গ্রেফতার করা গেছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘না কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি৷ আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি৷''

প্রসঙ্গত, ১৯৯৭ সালে সরকার এবং জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার (সন্তু লারমা) নেতৃত্বাধীন জেএসএসের মধ্যে পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর তার বিরোধিতায় গড়ে ওঠে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)৷ সেই থেকে দুই দলের বিরোধে ২০১৬ পর্যন্ত সশস্ত্র সংঘাতে মারা গেছে প্রায় এক হাজার নেতা-কর্মী৷ ২০১৬ সালে দুই দলের মধ্যে অলিখিত ও অপ্রকাশ্য এক সমঝোতায় সশস্ত্র সংঘাত থামলে কিছুটা স্বস্তি আসে পাহাড়িদের মনে৷ কিন্তু এরই মধ্যে জেএসএস থেকে বেরিয়ে জেএসএস (এমএন লারমা) এবং ইউপিডিএফ ভেঙে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দল গড়ে ওঠে, যা সংঘাতে আনে নতুন মাত্রা৷ 

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২০ বছর পূর্তিতে এক আলোচনা সভায় জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমা হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, চুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা পাহাড়ে আবার আগুন জ্বালাবে৷ পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা অনেক দিন ধরেই লক্ষ্য করছিলাম, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে৷ আমরা যেহেতু বুঝতে পারছিলাম, আমার মনে হয় প্রশাসনও বুঝতে পেরেছে৷ অথচ তারা কোন ব্যবস্থা নেয়নি৷''

তিনি বলেন, ‘‘তারা যদি আগে থেকে ব্যবস্থা নিত তাহলে এই ধরনের খুনোখুনি থামানো যেতে বলেই আমি মনে করি৷ এখানে এখন চারটি গ্রুপ সক্রিয়৷ তারা নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে তৎপরতা চালাচ্ছে৷ এর সঙ্গে সামনের নির্বাচনও একটা বড় কারণ৷ আর শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন না হওয়া তো আরো বড় কারণ৷ এখনই সমাধানের উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে৷''

এদিকে, পাহাড়ে শান্তি বিনষ্টকারী কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল৷ অচিরেই পাহাড়ে শান্তি ফিরে আসবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি৷ শনিবার বাংলা একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন৷

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘পাহাড়ে এখন অশান্তি বিরাজ করছে৷ এর আগেও দীর্ঘদিন পাহাড়ে অশান্তি ছিল৷ ১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শান্তিচুক্তি হয়৷ সেই চুক্তি অনুযায়ী পাহাড়িদের জন্য অনেকগুলো উন্নয়নমূলক কাজ হাতে নেওয়া হয়৷ সেগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে৷'' 

এছাড়া, ঢাকায় অন্য এক অনুষ্ঠানে পাহাড়ে রক্তপাতের সাম্প্রতিক ঘটনায় বিএনপির সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের৷

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন সাংবাদিক সারোয়ার সুমন৷ চট্টগ্রামের এই সাংবাদিক ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘হঠাৎ করেই এই খুনোখুনি হয়নি৷ ঘটনার পরম্পরা আমরা যদি দেখি, গত নভেম্বর থেকে উত্তপ্ত পরিস্থিতি এই এলাকায় বিরাজ করছিল৷ এই ধরনের একটা ঘটনা ওখানে অনিবার্য হয়ে পড়েছিল৷''

তিনি বলেন, ‘‘সর্বশেষ আমরা যেটা দেখলাম দুই দিনে ৬ জন মারা গেলেন৷ এখনই এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া না হলে সামনে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে এটা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি৷ কারণ নির্বাচনের বছরে ওখানে রাজনৈতিক উসকানি যেমন আছে, আছে ক্ষোভ-বিক্ষোভও৷ আর আধিপত্যতো আছেই৷''

উল্লেখ্য, পাহাড়ে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে সোম ও মঙ্গলবার হরতাল ডেকেছে বাঙালি ছাত্র পরিষদ ও পার্বত্য নাগরিক পরিষদ৷ মাটিরাঙ্গায় অপহৃত তিন বাঙালির মুক্তি, শুক্রবার নানিয়ারচরের বেতছড়িতে হামলায় মাইক্রোবাস চালক সজীব হাওলাদারের হত্যাকারীদের গ্রেফতার এবং জেএসএস ও ইউপিডিএফসহ সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধের দাবিতে দুই দিনের এই হরতালের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে৷ -ডয়েচেভেলে

০৬ মে, ২০১৮ ০০:০৫:১১