প্রাণের টানে সমৃদ্ধ বাঙালির নববর্ষ
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
বাঙালির নববর্ষ পহেলা বৈশাখ৷আর এই আয়োজনে সবাই অংশ নেন প্রাণের টানে৷ থাকে না কোনো বিশাল বাজেট৷ তারপরও প্রাণপ্রাচুর্য আর বর্ণিল আয়োজনে সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক ও সার্বজনীন উৎসব৷ বাঙালির প্রাণের উৎসব৷ বাংলা বর্ষবরণের এই উৎসব শহর থেকে গ্রামে সবখানেই নানা আয়োজনে সমবেত মানুষের প্রাণের টানে এক মহাউৎসবে পরিণত হয়৷ ঢাকায় রমনা বটমূলে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের গানে গানে বর্ষবরণের ঐতিহ্য ১৯৬৭ সাল থেকে৷ পাকিস্তানি শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বাঙালি সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্য থেকেই রমনা বটমূলের উন্মুক্ত প্রাঙ্গনে বাংলা বর্ষবরণের আয়োজন করা হয়৷ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বছর বর্ষবরণের এই অনুষ্ঠান হয়নি৷ আর ২০০১ সালে এই অনুষ্ঠানে জঙ্গি হামলায় ১০ জন নিহত হন৷

ছায়ানটের শিক্ষক এনামুল হক ওমর ২০০১ সালের সেই দিনের ঠিক সেই মুহূর্তে তবলা বাজাচ্ছিলেন৷ আর ২১ নং গান গাইছিলেন নাসিমা শাহিন ফেন্সি৷ গাইছিলেন ‘একি অপরূপ রূপে মা তোমার...৷' ওমর বলেন, ‘‘ শব্দ৷

তারপর মানুষগুলো স্লো-মোশনে পড়ে যাচ্ছিল৷ চিৎকার আর কান্না৷'' তারপরও তো প্রতিবছর ছায়ানটের আয়োজন হয় ভয়হীন চিত্তে৷ এর প্রাণশক্তি কোথায়? জবাবে ওমর বলেন, ‘‘এটাই বাঙালি সংস্কৃতির শক্তি৷ পরাভব মানে না৷ কোনো ভয় করে না৷ সবাইকে এক জয়গায় নিয়ে আসে৷ পহেলা বৈশাখে বাঙালি তার প্রাণের উৎসবে মেতে ওঠে৷''

এত বড় আয়োজন, প্রতি বছর৷ খরচের জোগান দেন কীভাবে? জবাবে তিনি বলেন, ‘‘প্রাণের শক্তিতে খরচের বহর আর থাকে না৷আমরা যারা শিল্পী, তারা সম্মানী নেই সামান্যই৷ আর কিছু খরচ হয় সাউন্ড সিস্টেমে৷ ছায়ানটের আয় থেকেই তা বহন করা হয়৷ বর্ষবরণের দিন শাড়ি পোশাকের খরচও ভাগ করে বহন করা হয়৷''

চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয় ১৯৮৯ সাল থেকে৷ এই বর্ণিল শোভাযাত্রায় থাকে নানা প্রতিকৃতি৷ মুখোশ আর চিত্রকলা৷ এবার কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় চারুকলায় ঢুকে আন্দোলনকারীরা অনেক ক্ষতি করে৷ এর ফলে চারদিন কাজ পিছিয়ে যায়৷ মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রস্তুতি কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক চারুকলার শিক্ষার্থী আবু সুফিয়ান ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘এ কারণে আমরা চারদিন কাজ করতে পারিনি৷ তারপরও শেষ পর্যন্ত সব কাজ গোছানো হয়ে গেছে৷''

এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার স্লোগান, ‘‘মানুষ ভজলে, সোনার মানুষ হবি৷ এর মাধ্যমে মানবতারই জয়গান গাইছে এই শোভাযাত্রা৷ বাঙালি সংস্কৃতি তুলে ধরে এই শোভাযাত্রা৷'' এই মানবিক শোভাযাত্রা ২০১৬ সাল থেকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায়৷ শোভাযাত্রায় প্রতিবছর খরচ কেমন হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমরা চারুকলার সব বর্ষের ছাত্ররা স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করি৷ আমাদের শিক্ষকরা আমাদের সঙ্গে থাকেন৷ আমরা যে মুখোশ, মোটিফ, সরাচিত্র তৈরি করি তার একটা অংশ বিক্রি করি৷ এ থেকেই আসলে খরচ উঠে যায়৷''

এবারে নগরজুড়ে থাকছে আরো নানা আয়োজন৷ ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে দু'বছর পর বিকেলে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের বর্ষবরণ হচ্ছে৷ গত দু'বছর এ অনুষ্ঠান হয়নি৷ জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘নিরাপত্তার কারণে বিকেল পাঁচটার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করতে বলায় আমরা অনুষ্ঠান করিনি৷ কারণ আমাদের অনুষ্ঠানই হয় বিকেলে৷ এবার আমাদের সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত অনুমতি দেয়ায় আমরা বর্ষবরণের অনুষ্ঠান করছি৷''

কিন্তু সাধারণভাবে এবারও সবাইকে বিকেল ৫টার মধ্যেই বাইরের অনুষ্ঠান শেষ করতে বলা হয়েছে৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়, চারুকলা, সোহরাওয়ার্দি উদ্যান, রমনা পার্কে ব্যাপক নিরাপত্তা৷ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বৃহস্পতিবার রমনা পার্কের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখার পর বলেন, ‘‘পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে৷ এবার এই শোভাযাত্রায় বিদেশি মেহমানরা থাকতে পারেন৷ সেজন্য মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ঘিরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যাপ্ত নিরাপত্তা থাকবে৷ তিনি আরো বলেন, ‘‘বিকাল পাঁচটার পর বাইরে কোনো অনুষ্ঠান চলবে না৷ আপনারা সন্ধ্যার পর সবাই যে যার বাড়িতে ফিরে যাবেন৷''

নিরাপত্তার কোনো ঝুঁকি আছে কিনা প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা প্রস্তুত আছি৷ আমরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছি যেন কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে৷''

ঢাকার মতো এবার যশোরসহ দেশের জেলায় জেলায় মঙ্গল শোভাযাত্রা, আছে ভোরের গানে নতুন বর্ষকে আহ্বান৷ বৈশাখী মেলা৷ আছে বর্ণিল সব আয়োজন৷''

গোলাম কুদ্দুস বলেন, ‘‘হুমকি আর নানা বাধা পেরিয়ে বঙালি সব সময়ই তার এই প্রাণের উৎসবে মিলিত হয়েছে৷ এটা বঙালি সংস্কৃতির শক্তি৷ তাই আমরা বলেছি, মানুষকে উৎসব পালন করতে দিতে হবে৷ ঘরে আটকে রাখা যাবে না৷ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই সেই সুযোগ দিতে হবে৷''

তিনি বলেন, ‘‘সেই কবে কবি চণ্ডিদাস বলে গেছেন, শোনো হে মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই৷ বাঙালি সংস্কৃতি মানুষের কথা বলে৷ মানুষে মানুষে মিলবার কথা বলে৷ তাই কোনো অপপ্রচার বা কটুক্তি দিয়ে একে ঠেকানো যায় না৷ বাংলা ১৪২৫ সাল তাই মানবতার বার্তা নিয়ে আসছে৷ মানুষের মুক্তির বার্তা নিয়ে আসছে৷ পহেলা বৈশাখের আয়োজনও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত৷'' -ডয়েচেভেলে

 

 

 

 

 

 

 

 

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ১২:৫৩:৫৯