বিদায় ২০১৭, স্বাগত ২০১৮
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
এদেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে। লিখে গেছেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। আঙ্গিক আলাদা। কিন্তু, আজ সেই আঠারোরই অপেক্ষা শেষ। স্বাগত ২০১৮। বিশ্বের প্রথম কোনও বড় শহর হিসেবে ২০১৮ সালকে বরণ করে নিলো নিউজিল্যাণ্ডের অকল্যান্ড। শহরের কেন্দ্রস্থলের ১ হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতার স্কাই টাওয়ারে বর্ণিল আলোকচ্ছটার মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করা হয়। অকল্যান্ডের স্কাই টাওয়ারে ঝুলন্ত একটি বিশাল ঘড়ির সময় দেখে রাত ১২টা বাজার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে সেখানে জড়ো হওয়া মানুষ। শুরু হয় কাউন্টডাউন। আর ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে আকাশে দেখা যায় আতশবাজির বর্ণিল ছটা। এরপর একে একে ২০১৮ সালকে বরণ করে নেয় গোটা বিশ্ব। বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে নিউজিল্যান্ড সর্বপ্রথম ২০১৭ কে বিদায় জানিয়ে বরণ করেছে ২০১৮ কে। নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডের রিপোর্ট অনুযায়ী জানা গেছে, দেশটির শত শত মানুষ নববর্ষ উদযাপনের লক্ষ্যে শহরের কেন্দ্রে ভিড় জমায়।

বিশ্ব জুড়ে চলছে বর্ষবরণ পালা৷ বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাও মেতে ওঠে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে। এই বছরের সকল দুঃখ-বেদনা ভুলে রোববার দিনগত রাতে বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নতুন আশা নিয়ে স্বাগত জানাবে ২০১৮ সালকে। বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীরা রাত ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ইংরেজি নববর্ষ ২০১৮ সালকে স্বাগত জানায়। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলাদা বাণী প্রদান করেছেন।

বাংলাদেশের জন্য ২০১৭ সাল ছিল বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্জনের একটি বছর। এই বছর রাজনীতি, অর্থনীতি, কৃষি, জঙ্গি দমন ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ আশাতীত সাফল্য অর্জনসহ মধ্য আয়ের দেশে এগিয়ে যাবার পথে অনেক ধাপ এগিয়েছে। এই বছরে বিশ্ব সূচকেও বাংলাদেশের অনেক সাফল্য রয়েছে। দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ। রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত থাকায় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনেও এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। নতুন বছর উদযাপনে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে নির্দেশ জারি করা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

বিদায় নিল সুখ-দুঃখের আরেকটি বছর ২০১৭ সাল। বিশ্বজুড়ে কত ঘটনা, কত হাসি-কান্না, বিষাদ ও উত্তেজনা- সবকিছুকে ছাপিয়ে স্বপ্ন আর দিনবদলের অপরিমেয় প্রত্যাশার রক্তিম আলোয় উদ্ভাসিত ইংরেজি ক্যালেন্ডারের শুভ নববর্ষ। নতুন বছরে নতুন রঙে শুরু হোক আমাদের পথচলা।

দেশের রাজনৈতিক পটভূমিতে ২০১৮ সাল শুরু হয়েছে সংঘাতমুক্ত শান্ত পরিবেশে। বিদায়ী ২০১৭ সাল ছিল মোটামুটি হরতাল ও অবরোধমুক্ত। রাজনৈতিক সংঘাত-হানাহানি তেমন ছিল না। ধ্বংসাত্মক কোনো কর্মসূচিও ছিল না। তবে সমালোচনা ও বিরোধিতা ছিল। বিতর্কও ছিল। প্রধান বিচারপতির ছুটি এবং পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে রাজনীতিতে কিছুটা উত্তাপ ছিল। বছর শেষের রংপুর সিটি করপোরেশনে প্রমবারের মতো দলীয় পরিচয়ে নির্বাচনে বিএনপিসহ প্রধান দলগুলোর অংশগ্রহণ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইতিবাচক বাতাবরণের ইঙ্গিতবহ। একই সঙ্গে সর্বমহলে নির্বাচনটি গ্রহণযোগ্য হওয়া ইসি ও সরকারের প্রতি জনআস্থা বাড়িয়েছে। নতুন বছরের শুরু থেকেই সব কিছু ছাড়িয়ে আলোচনায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইসি তাদের রোডম্যাপ অনুযায়ী এগাচ্ছে। তবে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক চলমান। অতীতে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীদের নির্বাচন বিরোধিতার আন্দোলনের নামে নাশকতা ও নৃশংসতার যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে, তাতে এ পুনরাবৃত্তি নিশ্চয়ই আর কেউ আশা করবেন না।

অর্থনৈতিক-মানবিক উন্নয়ন সূচকে দেশের অগ্রগতি বিশ্ব স্বীকৃতি পেয়েছে কয়েক বছর আগেই। উন্নয়ন ও অগ্রগতির এই ধারাবাহিকতা বিগত বছরেও অব্যাহত ছিল। দারিদ্র্য মোচন, প্রবৃদ্ধি, রিজার্ভ, এডিপি বাস্তবায়ন, রেমিট্যান্স আর রপ্তানি আয়ের পরিসংখ্যানে ইতিবাচক ধারায় ছিল ২০১৭। প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু এখন দৃশ্যমান। দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে কাজ। ৪৯ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার স্বপ্ন দেখছে সরকার। সেই লক্ষ্যে সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজও এগিয়ে চলছে। শুরু হয়েছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজ।

তবে বিদায়ী বছরের নেতিবাচক দিক দেখলে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় সামাজিক অপরাধের প্রসঙ্গ। খুনখারাবি, গুম, পারিবারিক সহিংসতার মাত্রা দিনদিন না কমে বরং বাড়ছে। সামাজিক অপরাধ হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়া নিশ্চয়ই উদ্বেগের। তবে জঙ্গি আস্ফালন রুখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ছিল উল্লেখযোগ্য। বছরজুড়ে বিচারাঙ্গন আলোচনায় থাকলেও বিদায়ী বছরে এক রকম স্থবিরই ছিল যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে কিশোরগঞ্জের দুজন ও গাইবান্ধার ঘোড়ামারা আজিজসহ ছয়জন মিলিয়ে মোট আট যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ডের রায় আসে। সব প্রতিবন্ধকতা জয় করে নতুন বছরে যুদ্ধাপরাধের বিচার গতি পাবে- এই প্রত্যাশা সবার।

যে বছরটি হারিয়ে গেল ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে, তার সবই কি হারিয়ে যাবে? অনেক ঘটনা হয়তো ঢাকা পড়বে বিস্মৃতির ধুলোয়। কিন্তু আলোড়ন তোলা অনেক ঘটনার রেশ নিয়েই মানুষ এগিয়ে যাবে। যে প্রত্যাশার বিশালতা নিয়ে একটি বছর আগে ২০১৭-এর প্রথম দিনটিকে বরণ করা হয়েছিল, সেই প্রত্যাশার সব কিছু পূরণ হয়নি। নতুন বছরের কাছে আরো অনেক প্রত্যাশার বীজ বুনে গেছে বিদায়ী বছর। বিগত বছরের ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠা আর সাফল্যকে সংহত করার প্রত্যয় নিয়ে আমরা বরণ করছি নতুন বছরকে। আমরা চাই, উন্নয়ন-অগ্রগতির ধারা অব্যাহত থাকুক। রাজনৈতিক সংকট ও অনিশ্চয়তার অবস্থার অবসান হোক। সংকীর্ণ ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের কল্যাণ-চিন্তায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ায় একমত হোন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক মহল। ২০১৮ সালের প্রতিটি দিন হোক সুন্দর ও কল্যাণময়।

০১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:৫৩:২৬