বাড়ছে নৃশংসতা, পারিবারিক কলহে হত্যাকাণ্ড
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
রাজধানী ঢাকায় ১১ ঘন্টার ব্যবধানে দুই পরিবারের মা-ছেলে ও বাবা-মেয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নগরবাসীকে আতঙ্কিত করে তুলেছে৷ প্রশ্ন উঠেছে নিরপত্তা নিয়ে৷ প্রশ্নের মুখে পড়েছে পারিবারিক সম্পর্কও৷ এ ধরনের নৃশংস হত্যাকান্ড কেন বাড়ছে? গত বুধবার সন্ধ্যায় কাকরাইলের ‘মায়াকানন'-এর পঞ্চম তলায় শামসুন্নাহার (৪৬) ও তার ছোট ছেলে সাজ্জাদুল করিম ওরফে শাওনকে (১৮) ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়৷ নিহতের স্বামী ব্যবসায়ী আবদুল করিম ও তাঁর তৃতীয় স্ত্রী শারমিন মুক্তাকে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য সন্দেহ করছে পুলিশ৷ আবদুল করিম, শারমিন এবং শারমিনের ছোট ভাইকে  আসামি করে হত্যা মামলা দয়ের করেছেন নিহত শামসুন্নাহারের ছোট ভাই আশরাফ আলী৷ পুলিশ আবদুল করিম ও শারমিনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নিয়েছে৷ পুলিশ ধারণা করছে, ধনাঢ্য এই পরিবারের সম্পত্তি ও পারিবারিক বিরোধের কারণেই মা ও ছেলে খুন হয়েছেন৷

বাড্ডার ময়নারবাগ ‘পাঠানবাড়ি' নামের চারতলা একটি বাড়ির তৃতীয় তলার একটি ঘর থেকে বৃহস্পতিবার সকালে গাড়িচালক জামাল শেখ (৩৮) ও তার মেয়ে নুসরাত আক্তার জিদনির (৯) লাশ উদ্ধার করা হয়৷ নুসরাত দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী৷ ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, জামালকে ভারি কিছু দিয়ে  আঘাত করে এবং   নুসরাতকে  শ্বাসরোধ রাধ করে হত্যা করা হয়েছে৷ পুলিশ জানায়, এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে পারিবারিক কলহ এবং অনৈতিক সম্পর্কের ঘটনা রয়েছে৷ পুলিশ জামাল শেখের স্ত্রী আরজিনা বেগমকে বৃহস্পতিবারই আটক করে৷ শুক্রবার তাদের বাসায় সবলেট থাকা যুবক শাহীন মল্লিক ও তার স্ত্রী মাসুমাকে খুলনা থেকে আটক করা হয়েছে৷ পুলিশ ধারণা করছে, বাবাকে হত্যার বিষয়টি দেখে ফেলায় মেয়েকেও হত্যা করা হয়৷

এর আগে ১০ জানুয়ারি মিরপুর দারুস সালামে দুই সন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন মা৷ ৮ জুন রাজধানীর তুরাগে তিন শিশুকন্যাকে হত্যার পর মায়ের মা আত্মহত্যা করেন৷ ৯ জুলাই মিরপুরের রূপনগরে এক পুলিশ কর্মকর্তা নিজের পিস্তল দিয়ে দ্বিতীয় স্ত্রীর মাথায় গুলি করে নিজেও আবার আত্মহত্যা করেন৷ এইসব ঘটনার পিছনেও রয়েছে পারিবারিক কলহ এবং দ্বন্দ্ব৷ এই ধরনের উদাহরণ চাইলে আরো বাড়ানো যাবে৷ এ বছর রাজধানীতে পারিবারিক কলহ ও দ্বন্দ্বের কারণে এ রকম অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ জানায়৷

পুলিশের তথ্যানুযায়ী, বছরে মোট হত্যাকাণ্ডের শতকরা ৪০ ভাগ হয় পারিবারিক কলহের কারণে৷ নিরপরাধ শিশুরাও স্বামী-স্ত্রীর বিরোধের কারণে হত্যার শিকার হয়৷ ২০১৬ সালের প্রথম আট মাসে সারা দেশে ৩ হাজার ৬১টি খুনের ঘটনা ঘটে৷ এ সময়ে রাজধানীতে ১৭২ জন খুন হয়৷ এর মধ্যে ১৬২টি খুনের কারণ সামাজিক ও পারিবারিক৷ পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য মতে, দেশে প্রতিদিন গড়ে খুন হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ জন৷ এর অধিকাংশই পারিবারিক ও সামাজিক কারণে হচ্ছে৷ আর এর প্রধান শিকার হচ্ছে নারী ও শিশু৷

ঢাকা মহানগরে গত পাঁচ বছরে খুনের মামলা হয়েছে এক হাজার ২০০টি৷ এসব হত্যাকণ্ডের বড় একটি অংশ ঘটেছে পারিবারিক কলহ ও দ্বন্বে৷ হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যানে ঢাকাই শীর্ষে৷ তবে আয়তন বিবেচনায় ঢাকার জনসংখ্যাও সবচেয়ে বেশি৷

শুধু ঢাকা নয়, পুরো দেশেই পারিবারিক কলহ আর দ্বন্দ্বের কারণে হত্যা বাড়ছে৷ গত মে মাসে সারাদেশে ১২৯ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন৷ বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের ডকুমেন্টেশন বিভাগের জরিপে দেখা যায়, মে মাসে যৌতুকের কারণে ৪ জন, পারিবারিক সহিংসতায় ২৫ জন, সামাজিক সহিংসতায় ৩৫ জন,  রাজনৈতিক কারণে  ৯ জন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহত ৭ জন, বিএসএফ কর্তৃক হত্যা ২ জন, চিকিৎসকের অবহেলায় মৃত্যু ৪ জন, গুপ্ত হত্যা ৪ জন, রহস্যজনক মৃত্যু ৩১ জন, ধর্ষণের পর হত্যা ৩ জন ও অপহরণের পর ৫ জনকে হত্যা করা হয়েছে৷ ২৫ অক্টোবর বরগুণার আমতলীতে কলেজ ছাত্রীর সাত টুকরা লাশ উদ্ধার করা হয়৷ ২ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ায় এক নারীর ৩৫  টুকরা লাশ উদ্ধার করা হয়৷

জুন মাসে সাতক্ষীরার বকচরায় আট বছর বয়সি এক ঘুমন্ত শিশুকে তার দাদা কুপিয়ে হত্যা করে৷ ২২ এপ্রিল রাজধানীর পল্টন এলাকার ফকিরাপুলের শাহীন আবাসিক হোটেল থেকে এক নারীর মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ৷ গলায় ওড়না পেচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাঁকে হত্যা করা হয়৷ ১৮ এপ্রিল আব্দুল্লাহপুর নীলা আবাসিক হোটেল থেকে পুষ্প রানী (৪৫) নামে এক নারীর গলা কাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ৷

জুন-জুলাই মাসে বুড়িগঙ্গা নদী থেকে অন্তত ৯ টি লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ৷ এদের অনেকের পরিচয় এখনও জানা সম্ভব হয়নি৷ কোনও কোনও লাশের  হাত-পা বাঁধা ছিল৷ ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘পারিবারিক কলহের কারণে হত্যাকাণ্ড বাড়ছে, তেমন নয়৷ সম্প্রতি দু'টি ঘটনা পর পর ঘটায় অনেকের কাছে এমন মনে হচ্ছে৷ আর আমরা পারিবারিক কলহের পিছনে প্রধান দু'টি কারণকে দেখছি৷ স্বামী বা স্ত্রীর বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক এবং সহায় সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব৷ যৌতুক আরেকটি বড় কারণ৷ তবে এর বাইরেও আরো অনেক কারণে পারিবারিক কলহ হয়৷ অর্থনেতিক অস্বচ্ছলতা অথবা অধিক স্বচ্ছলতাও পারিবারিক কলহ সৃষ্টি করে৷''

তিনি বলেন, ‘‘নৃশংসতা বাড়ার পেছনে অসহিষ্ণুতা প্রধান কারণ৷ লোভ আর তিক্ততা নৃসংশতায় রূপ নেয়৷''

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও অপরাধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা এমন একটা সময় পার করছি যখন কৃষি ভিত্তিক সমাজ থেকে শিল্প ভিত্তিক সমাজে যাচ্ছি৷ তাই নারী-পুরুষ, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে পরিবর্তন  আসছে৷ পুরুষের আগে থেকেই সুযোগ ছিল৷ নারীরও এখন সুযোগ হয়েছে৷ প্রযুক্তি মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সম্পর্কের ধারণা পরিবর্তন করছে৷ সম্পর্কের নানা দিক দেখিয়ে দিচ্ছে৷ যার প্রভাব পড়ছে আচরণে৷ পারিবিবারিক কলহ বাড়ছে৷ আর বাড়ছে পারিবারিক কলহ ও দ্বন্দ্বের কারণে হত্যা৷ বিশ্বায়নেরও প্রভাব আছে৷ আর সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব তো নতুন কিছু নয়৷ তবে এই কারণে হত্যাকাণ্ড এখন বাড়ছে৷ বাড়ছে নৃশংসতা৷ আমরা পরিবর্তনের সঙ্গে মূল্যবোধ ও মানবিকতাকে সমানভাবে ধরে রাখতে পরছি না৷''

তিনি বলেন, ‘‘আর এর ফলে সমাজে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হচ্ছে৷ নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীন এখন৷ কিন্তু সমাজকে টিকিয়ে রাখতে হলে, রাষ্ট্রকে সুশৃঙ্খল রাখতে হলে, বাসযোগ্য করতে হলে, আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধকে শক্ত করতে হবে৷ এর চর্চা করতে হবে৷ শুধু আইন দিয়ে সব কিছু হবেনা৷'’ -ডয়েচেভেলে

 

০৫ নভেম্বর, ২০১৭ ১০:১৮:৪৫