ব্লু হোয়েল গেম নিয়ে বাংলাদেশে আতঙ্ক
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
ঢাকায় এক কিশোরীর আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে বিতর্কিত অনলাইন গেম ব্লু হোয়েল নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে৷ মনোবিজ্ঞানী এবং অনলাইন গেম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিভাবকদের সতর্ক হতে হবে আর বিটিআরসিকে ব্যবস্থা নিতে হবে৷ গত বৃহস্পতিবার ভোররাতে হলিক্রস স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী অপূর্বা বর্ধন স্বর্ণা তাদের সেন্ট্রাল রোডের বাসায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে৷ পুলিশ বলছে সে আত্মহত্যা করেছে৷ তবে ব্লু হোয়েল গেম খেলে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়েছে তার প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি৷ পরিবারের আবেদনে ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বর্ণার লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে৷ পুলিশ একটি চিরকুটও উদ্ধার করেছে৷ তাতে বড় করে লেখা, ‘আমার আত্মহত্যার জন্য কেউ দায়ী নয়৷' লেখা শেষে একটি হাসির চিহ্ন (স্মাইলি) আঁকা৷

তবে সংবাদমাধ্যমে স্বর্ণার বাবা অ্যাডভোকেট সুব্রত বর্মন নিজেই ব্লু হোয়েল গেমের আশঙ্কার কথা বলেছেন৷ তিনি দৈনিক মানবজমিনকে বলেছেন, ‘‘স্বর্ণা কয়েক বছর ধরে কম্পিউটার ও অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ব্যবহার করছিল৷ প্যারা, রচনাসহ বিভিন্ন বিষয় ডাউনলোড করে পড়তো, ব্যবহার করতো ফেসবুক৷ কিছুদিন আগে আমাদের মনে সন্দেহ জাগে৷ গত পনের দিন আগে আমি তার মোবাইল চেক করলে সে অভিমান করে৷ মনে হয়েছে, আমি তার কক্ষে ঢোকার আগেই হয়তো সে কিছু গোপন জিনিস ডিলিট বা সরিয়ে ফেলেছে৷ তখন তাকে মোবাইলে একটি প্যারা পড়তে দেখি৷ আত্মহত্যা নির্বিঘ্ন করতে আগেই সে পরিকল্পনা করে৷ চট্টগ্রাম থেকে বেশ কয়েকদিন কাজ করে ক্লান্ত হয়ে গত বুধবার বাসায় ফেরার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইনসুলিন নেয়ার আগে সে আমাকে একটি ঘুমের ওষুধ খাওয়ায়৷ তার কক্ষে এসি থাকায় আমি তার কক্ষে শুয়ে পড়ি৷ তাকে তার মা ও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের কক্ষে ঘুমাতে বলি৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার চোখে ঘুম চলে আসে৷ রাত একটার দিকে সে আমাকে জাগিয়ে নিজের কক্ষে যেতে বললে আমি ঘুম ঘুম চোখে চলে যাই৷ আত্মহত্যার আগে-পরের নানা পরিস্থিতি ও আলামত বিবেচনা করে আমার বদ্ধমূল বিশ্বাস যে, আমার মেয়ে ব্লু হোয়েলের শিকার৷''

স্বর্ণা হলিক্রসের আগে ওয়াইডাব্লিউসিএ স্কুলে পড়ত৷ অত্যন্ত মেধাবী স্বর্ণা সেখানে ক্লাসে প্রথম হত৷ ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে সে হলিক্রস স্কুলে পড়ত৷ আর এই স্কুলে ভর্তির পরই তার মধ্যে পরিবর্তন আসে৷ সে অনলাইন এবং অনলাইন গেমে আসক্ত হয়ে পড়ে৷ ডয়চে ভেলের পক্ষ থেকে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও স্বর্ণার বাবা –মা বা পরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি৷

তবে এই ঘটনার পর বাংলাদেশে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে৷ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘অনেক অভিভাবক আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন৷ এমনকি গেমটির ২১-২০তম পর্যায়ে আছেন দাবি করেও কেউ কেউ বেরিয়ে আসার পথ জানতে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন৷''

তিনি বলেন, ‘‘আমি গেমটি সম্পর্কে যা জেনেছি তাতে এটি একটি অনলাইনে নির্দেশনামূলক গেম৷ প্রতিটি স্তর পার হতে হয় নির্দেশনা মত৷ আর সেই কাজের ছবি আপ করতে বলা হয়৷ এক তরুণ আমাকে বলেছে তাকে ঠোঁট সেলাই করতে বলা হয়৷ আর তার ছবি আপ করতে বলা হয়৷ ছবি আপ করলেই তাকে পরবর্তী স্তরে যাবার সুযোগ দেয়া হবে৷ এই পর্যায়ে সে গেমটি ত্যাগ করে৷ জেনেছি ৫০তম স্তরে আত্মহত্যার মাধ্যমে এই গেম শেষ হয়৷''

ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘‘এই গেমের নেপথ্যে যারা কাজ করে তারা হতাশা এবং হিরোইজমকে ব্যবহার করে৷ আর ধীরে ধীরে আত্মহননের পথে নিয়ে যায়৷ এটা মোটেই অসম্ভব নয়৷ মানুষের মানসিক অবস্থাকে ব্যবহার করতে পারলে তাকে দিয়ে অনেক কিছুই করানো সম্ভব৷''

তিনি বলেন, ‘‘আপনি যদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খেয়াল করেন তাহলে দেখবেন অনেক তরুণ-তরুণী এই গেম খেলার আগ্রহ দেখাচ্ছে৷ তারা লিংক চাইছে৷ কেউ লিংক পাওয়ার ঘোষণাও দিচ্ছে৷ তারা মনে করছে তাদের এই গেম কোনো ক্ষতি করতে পারবেনা৷ তারাও হিরোইজম দেখাতে চাইছে৷ কিন্তু এভাবেই ফাঁদে পড়ে৷''

গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ম্যাসিভ স্টার স্টুডিও লি.-এর সিইও এসএম মাহবুব আলম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এরকম অনেক গেমই আছে যা আত্মহত্যাসহ নানা ধরণের আত্মবিধ্বংসী কাজে প্ররোচিত করতে পারে৷ তবে প্রথম কাজ হচ্ছে অভিভাবকদের সচেতন থাকা৷ আমার সন্তান অনলাইনে কী করছে তা আমাকেই খেয়াল রাখতে হবে৷ তাই অভিভাবকদেরও এখন অনলাইন এডুকেটেড হতে হবে৷ অনলাইন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে৷ এই অষ্টম শ্রেণি পডুয়া মেয়েকে যদি ইন্টারনেট কানেকশনসহ অ্যান্ড্রয়েড 

‘‘এরকম অনেক গেমই আছে যা আত্মহত্যাসহ নানা ধরণের আত্মবিধ্বংসী কাজে প্ররোচিত করতে পারে’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘এখানে বিটিআরসিরও দায় রয়েছে৷ তাদের উচিত হবে এই ধরণের অনলাইন গেমের উৎস বন্ধ করতে পদক্ষেপ নেয়া৷'' বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং সংবাদমাধ্যমে এইকিশোরীর আত্মহত্যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে৷ কথা হচ্ছে ব্লু হোয়েল গেম নিয়ে৷ কিশোরীটি এই গেমের শিকার কিনা তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও স্বর্ণা যে অনলাইন আসক্ত হয়ে পড়েছিল তা নিশ্চিত৷ বিষয়টি সরকারকেও ভাবিয়ে তুলেছে৷ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল সোমবার বিকেলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘বিটিআরসির চেয়ারম্যানকে এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বলেছি৷ আমরা শুনেছি, ইন্টারনেটনির্ভর একটি গেমে আসক্ত হয়ে একজন আত্মহত্যা করেছে৷ এ ঘটনাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে বিটিআরসি চেয়ারম্যানকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে৷''

এদিকে, বিটিআরসির মুখপাত্র সারওয়ার আলম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেব৷ আমাদের কাছে যেসব লিংক বা ইউআরএল আসবে আমরা তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেব৷'' -ডয়েচেভেলে

 

 

 

 

১০ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০:১১