রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরতে বাধ্য করা উচিত হবে না: অ্যামনেস্টি
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মনে করে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরতে বাধ্য করা ঠিক হবে না৷ রাখাইনে সহিংসতা ও নির্যাতন বন্ধ হওয়ার আগে সেখানে ফেরত পাঠানোর মানে হবে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়া৷

অ্যামনেস্টি বলছে, ‘‘জোর করে যেন রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো না হয়, তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একসঙ্গে কাজ করতে হবে৷ বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠককে ইতিবাচক উল্লেখ করে অ্যামনেস্টির আন্তর্জাতিক বিষয়ক পরিচালক অড্রি গোরান বলেন, ‘‘রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেশে ফেরার ব্যাপারটি অবশ্যই স্বেচ্ছামূলক হতে হবে৷ তাঁদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং তাঁদের মর্যাদার ব্যাপারটি খেয়াল রাখতে হবে৷ ভয়াবহ মানবাধিকার হরণ, কাঠামোগত বৈষম্য আর পৃথকীকরণের পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকা অবস্থায় তাঁদের ফিরতে বাধ্য করা যাবে না৷’’

জাতিসংঘের মঙ্গলবারের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ৫ লাখ ৯ হাজার রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে৷ জাতিসংঘের আবাসন বিষয়ক সমন্বয়ক রবার্ট ওয়াটকিনস বলেন, ‘‘কক্সবাজারে থাকা রোহিঙ্গারা খুবই নাজুক অবস্থায় আছে৷ তাঁদের অনেকেই এখন সেই বিভীষিকা কাটিয়ে উঠতে পারেনি৷ তাঁদের বসবাসও করতে হচ্ছে অনেক মানবেতর পরিস্থিতিতে৷ আমাদের লক্ষ্য, ১২ লাখ রোহিঙ্গার মানবিক সহায়তা নিশ্চিতের জন্য প্রস্তুত থাকা৷ কারণ, ইতোমধ্যে ৮ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে বাংলাদেশে৷ আর আগামী ৬ মাসে আরও ৩ লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে৷’’

এএফপির খবরে বলা হয়েছে, এখনও রাখাইনে থেকে যাওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অবশিষ্ট মানুষকে তাড়িয়ে দিতে দ্বিগুণ শক্তিতে অভিযান শুরু করেছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী৷ এতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে থাকা রোহিঙ্গাদের স্রোত আবারো বেড়েছে৷ বাংলাদেশে অবস্থানরত ৯ লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে সেখানকার অবশিষ্ট ৩ লাখ রোহিঙ্গা যুক্ত হলে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১২ লাখে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে৷

রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার ঘোষণার পর রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীরা এএফপিকে বলছেন, ‘‘পশ্চিম রাখাইনে থেকে যাওয়া অবশিষ্ট রোহিঙ্গাকে দেশছাড়া করতে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী ফের তাণ্ডব শুরু করেছে৷ রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিতে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান দ্বিগুণ জোরদার করা হয়েছে৷’’ পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছেন, ‘‘প্রতিদিন বাংলাদেশের সীমান্তে ছুটছে হাজার হাজার মানুষ৷ বহু গ্রাম এখন একেবারেই জনমানবশূন্য৷’’ এএফপি জানিয়েছে, ‘‘বাংলাদেশে চার সপ্তাহে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয়ার পর কয়েকদিন ঢল কিছুটা থেমেছিল৷ তবে গত কয়েকদিনে তা আবারও বেড়েছে৷ এখন প্রতিদিন ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসছে৷’’

এদিকে জতিসংঘের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জাতিসংঘ কর্মকর্তারা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ব্যাপারে বাংলাদেশের মানসিকতাকে ‘মানবতার অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন৷ রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশে তিন দিনের মিশনে অংশ নেন জাতিসংঘের জরুরি ত্রাণ সমন্বয়ক মার্ক লোকক এবং ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্থনি লেক৷ মিশন শেষে তারা সাধারণ উদারতার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানান৷ তাঁরা বলেন, ‘‘২৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ লাখ মানুষ মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসেছে৷ তাঁদের জন্য বাংলাদেশের নেতৃত্ব ‘মানবতার একটি অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ৷’’

তিন দিনের মিশনে জাতিসংঘ ও ইউনিসেফের এ দুই কর্মকর্তা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করেন৷ শরণার্থীদের বসবাসের অবস্থা দেখেন৷ তাঁরা জানান, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর পরিস্থিতির যে উন্নতি হয়েছে, তাতে তাঁরা অভিভূত৷ তবে তাঁরা সেখানে মানবিক সাহায্যকর্মীদের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন৷

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাবার, আশ্রয়স্থল, পানি, স্যানিটেশন সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই মুহূর্তে জরুরিভিত্তিতে তহবিল প্রয়োজন৷

ইতিমধ্যে শরণার্থীরা বহু কষ্ট ভোগ করেছেন৷ সাহায্যের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হলে নিজ দেশ থেকে পালিয়ে আসা এই মানুষগুলো আরেকটি বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারেন৷

জাতিসংঘ ও ইউনিসেফের দুই কর্মকর্তাই রোহিঙ্গাদের ভয়ংকর পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন৷ তাঁরা বলেন, এখনও মিয়ানমার থেকে লোকজনের বাংলাদেশে পালিয়ে আসা অব্যাহত রয়েছে৷

মিয়ানমার সরকারের প্রতি রাখাইন রাজ্যে পরিপূর্ণ ত্রাণ তৎপরতার অনুমতি দেওয়ার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন এই দুই কর্মকর্তা৷

রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাঁদের আশ্রয়দানকারী দেশ বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘের ৪৩৪ মিলিয়ন ডলারের ত্রাণ সাহায্যের পরিকল্পনা রয়েছে৷ এছাড়া নতুন ১২শ' শরণার্থীর জন্য আশ্রয় শিবির নির্মাণে অতিরিক্ত ১২ মিলিয়ন ডলারের তহবিল দিয়েছে সেন্ট্রাল ইমারজেন্সি রিলিফ ফান্ড (সিইআরএফ)৷

মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি৷ মিয়ানমার সেনাবাহিনী এখনো রাখাইনে নির্যাতন ও সহিংসতা অব্যাহত রেখেছে৷ সেখানে এখনো বাড়ি-ঘরে আগুন দেয়া হচেছ৷ রোহিঙ্গাদের এই পরিস্থিতিতে ফেরত পাঠানো হলে তাঁদের বিপর্যয়ের মুখেই ঠেলে দেয়া হবে৷’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অথবা ‘সেফ জোন’ তৈরি করার পরই তাঁদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যেতে পারে৷’’

আরেক প্রশ্নের জবাবে নূর খান বলেন, ‘‘মিয়ানমার আসলে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার কথা বলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সময় পার করার কৌশল নিয়েছে৷ কারণ, তারা একদিনের জন্যও সহিংসতা বন্ধ করেনি৷ জাতিসংঘের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া  মিয়ানমারে সাহিংসতা বন্ধ হবে না৷’’-ডয়েচেভেলে

০৬ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০৯:২১