অপহরণ-নিখোঁজের কাহিনি কি কখনোই জানা যাবে না?
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
বাংলাদেশে গত সাড়ে তিন বছরে ২৮৪ জন অপহরণের শিকার বা নিখোঁজ হন৷ এঁদের বড় অংশই আর ফিরে আসেনি৷ যাঁরা এসেছেন বা যাঁদের উদ্ধার করা হয়েছে, তাঁরা অপহরণ নিয়ে কিছু বলছেন না৷ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও তদন্তে আগ্রহী নয়৷

ফরহাদ মজহার নিখোঁজ হওয়ার ১৬ ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার হয়েছেন৷ উদ্ধার হওয়ার পর তিনি পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন৷ আর জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, ভোরে ওষুধ কিনতে বাসা থেকে বের হলে মাইক্রোবাসে করে দুর্বৃত্তরা তাঁকে অপহরণ করে৷ তবে পুলিশ এখন এটাকে অপহরণ মানতে নারাজ৷ তারা বলছে, ‘‘এটা সরকারকে বিব্রত করতে একটি সাজানো ঘটনা৷'' এই ‘অপহরণ' ঘটনার বেশ জোরেশোরে তদন্ত করছে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ৷ শেষ পর্যন্ত উলটে ফরহাদ মজহারের বিরুদ্ধে মামলা হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না৷

কিন্তু পুলিশ কি সব ঘটনার তদন্ত করে? যাঁরা অপহরণের পর ফিরে আসেন, তাঁরা কেন কথা বলেন না?  ফিরে আসার পর অপহরণের ঘটনা তদন্ত করলে অনেক রহস্যই তো বেরিয়ে আসতে পারে৷ পুলিশ সেই তদন্তে কেন জোর দেয় না? 

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত নিখোঁজ বা অপহরণের শিকার হয়েছেন ২৮৪ জন৷ তাঁদের মধ্যে মৃতদেহ উদ্ধার হয় ৪৪ জন ব্যক্তির৷ নিখোঁজের পর গ্রেপ্তার দেখানো হয় ৩৬ জনকে এবং পরিবারের কাছে বিভিন্নভাবে ফিরে আসেন ২৭ জন৷ তবে এখনও ১৭৭ জনের কী অবস্থা তা জানা যাচ্ছে না৷ তাঁদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা পরিবার বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ বলতে পারছেন না৷

আসক-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, এর মধ্যে অনেককেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে৷ এমনকি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাকেও অপহরণের অভিযোগ আছে৷ আর প্রতিটি অপহরণ বা নিখোঁজের ঘটনার পরই পরিবারের পক্ষ থেকে সহায়তার জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিতে গেলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাঁদের কোনো উত্তর দিতে পারে না৷

গত বছরের ১৬ মার্চ অপহৃত হন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা৷ হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনার তদন্তের নানা দিক নিয়ে গণমাধ্যমে মতামত দেওয়ার পর তাঁকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকা থেকে তুলে নেয়া হয়৷

সাত দিন পর তাঁকে এয়ারপোর্ট রোড এলাকায় পাওয়া যায়৷ তিনি সেখানে উদভ্রান্তের মতো ঘুরছিলেন৷ জোহা ফিরে আসার পর এই বিষয় নিয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি৷ তাঁর পরিবারের সদস্যরা কথা বললেও তাতে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই৷ তবে গত ১৯ জুলাই ডয়চে ভেলের সঙ্গে কথা বলেন তিনি৷

জোহা জানান, ‘‘আমাকে আটকের পর মাইক্রোবাসে তুলে চোখ বেঁধে ফেলা হয়৷ এরপর আমাকে কোথায় নেয়া হয়েছে, কোথায় রাখা হয়েছে তার কিছুই আমি বুঝতে পারিনি৷ আমাকে কতদিন আটক রাখা হয়েছিল তা-ও আমি বুঝতে পারিনি৷ উদ্ধার হওয়ার পর পরিবারের কাছ থেকে জানতে পেরেছি৷'' তিনি আরো বলেন, ‘‘তবে আমাকে যে প্রথমেই ইনজেকশন পুশ করা হয়েছিল তা আমি বুঝতে পেরেছি৷ যারা আমাকে মাইক্রোবাসে তুলেছিল আদের কাউকেই আমি চিনতে পারিনি৷ আমি শুরুতে জানতে চেয়েছিলাম – তোমরা কারা? তারা কোনো জবাব দেয়নি৷'' 

গার্মেন্ট ব্যবসায়ী ও পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-র প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওনা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিক ফিরে আসার পরও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি৷ আর পুলিশও এটা নিয়ে কোনো তদন্ত করেনি৷

লক্ষীপুরের চিকিৎসক মুহাম্মদ ইকবাল মাহমুদ গত বছরের ১০ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)-এ দুই মাসের একটি প্রশিক্ষণ নিতে ঢাকায় আসেন৷ এরপর বাড়ি গিয়ে ১৫ অক্টোবর রাতে রাজধানীতে ফেরার সময় সায়েন্স ল্যাবরেটরির মোড় থেকে তিনি অপহৃত হন৷ ঘটনার সাড়ে সাত মাস পর এ বছরের ১ জুন চোখ বাঁধা অবস্থায় লক্ষীপুরে তাঁকেও ফেলে যায় অপহরণকারীরা৷ বিষয়টি ধানমন্ডি থানা পুলিশের পাশাপাশি লক্ষীপুর থানা পুলিশও তদন্ত করেছে৷ তিনিও অপহরণের বিষয়ে মুখ খোলেননি৷ ফিরে আসার পর পরিবার ও সাংবাদিকদের ডাক্তার ইকবাল মাহমুদ জানান, তাঁকে তিন বেলা খেতে দিতো নিয়মিত৷ এমনকি নামাজের সময়ও দিত৷ তবে নির্যাতন করেনি৷ তাঁকে অপহরণের রহস্যও উদঘাটন করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী৷

ইকবালের বাবা নুরুল আলম বলেন, ‘‘আমার ছেলে কোনো কিছুই বলতে পারে না৷ ঘটনার পর আমরা দৌড়াদৌড়ি করেছি৷ সবার সহযোগিতায় তাকে ফিরে পেয়েছি৷ ইকবাল এখন মোটামুটি ভালো আছে৷ চলাফেরা করছে৷''

চিকিৎসক ইকবালের অপহরণ মামলাটি সর্বশেষ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করে৷ সিআইডি-র সহকারি পুলিশ সুপার রতন কৃষ্ণ নাথ মামলাটি তদন্ত করেন৷ ইকবাল উদ্ধার হওয়ার পর এই তদন্ত কর্মকর্তাই ইকবালকে আদালতে নিয়ে যান এবং তিনি আদালতে জবানবন্দি দেন৷ এরপর তাঁর পরিবারের সঙ্গে পুলিশ আর যোগাযোগ করেনি৷ মামলারও কোনো অগ্রগতি  নেই৷ 

সূত্রাপুর থানা ছাত্রদলের সভাপতি সেলিম রেজা পিন্টুকে ২০১৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তুলে নেয়া হয়৷ তিনি পল্লবীতে তাঁর আরেক ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন৷ সেখান থেকে অস্ত্রধারীরা তুলে নেয়৷ তাঁর বড় বোন রেহানা বানু ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘তাকে সরকারি সংস্থার লোক পরিচয়ে বাসা থেকে বের করে মাইক্রেবাসে তুলে নেয়া হয়৷ সাত থেকে আটজন সশস্ত্র ব্যক্তি নিজেদের সরকারি সংস্থার সদস্য পরিচয় দিয়ে তুলে নেয়৷  তারা সময়ও দেয়নি৷ মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমার ভাইকে নিয়ে যায়৷ কিন্তু এরপর পুলিশ, ডিবি র‌্যাবে যোগাযোগ করলে কেউই তাকে নেয়ার কথা স্বীকার করেনি৷ আমরা থানায় গেলে পুলিশ দুই দিন ঘুরিয়ে জিডি নেয়৷ ২০১৫ সালে মামলা নেয়৷''

তিনি জানান, ‘‘মামলায় ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া হয়েছে৷ আর তাতে বলা হয়েছে, তাকে তুলে নেয়া হয়েছে৷ কিন্তু কারা বা কেন তুলে নিয়েছে তা জানা যায়নি৷ ভবিষ্যতে জানা গেলে আবার তদন্ত হবে৷''

রেহানা আরো জানান, ‘‘আমরা আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছি৷ কেউ তার খোঁজ দিতে পারছে না৷ পুলিশের মধ্যেও কোনো চেষ্টা দেখছি না৷''

অপহরণের কিছু ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছেন একুশে টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি দীপু সরওয়ার৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এ ব্যাপারে প্রধান সমস্যা হচ্ছে, সহজে তথ্য পাওয়া যায় না৷ যাঁরা অপহৃত হন, তাঁদের পরিবারও যেমন কোনো তথ্য দেয় না, আবার তদন্তকারী পুলিশও কোনো তথ্য দিতে চায় না৷ আর যাঁরা ফিরে আসেন, তাঁরা মুখ বন্ধ রাখেন৷ ফলে কোনো ঘটনা  সম্পর্কে ধারণা করা গেলেও অপরাধীদের সরাসরি চিহ্নিত করা যায় না৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘আমরা অভিযোগ পাই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নামে তুলে নেয়া হয়েছে৷ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে৷ কিন্তু সেটা নিয়ে পরে আর কাজ করার তেমন সুযোগ পাওয়া যায় না৷ অনেক ঘটনাই বলতে গেলে সূত্রবিহীন৷''

ঢাকা মেট্রাপলিটন পুলিশের উপ কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য অপহরণে জড়িত এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি৷ তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হয়৷ তবে কোনো অপরাধীচক্র আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ব্যবহার করতে পারে৷''

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘কেউ নিজে আত্মগোপনে চলে যান৷ আবার পারিবারিক কারণেও নিখোঁজ এবং অপহরণের ঘটনা ঘটতে পারে৷ এসব ক্ষেত্রে অপহরণের পর পরিবারের সদস্যরা তথ্য গোপন রাখেন, আবার ফিরে আসার পরও তথ্য প্রকাশ করতে চায় না৷ ফলে তদন্তে অনেক সময়ই অনেক তথ্য জানা যায় না৷'' 

নিখোঁজদের কেউ কেউ আবার পাঁচ-ছ'মাস পরে গ্রেপ্তারও হন৷ এ প্রসঙ্গে মাসুদুর রহমান বলেন, ‘‘অপরাধীরা পালিয়ে থাকে৷ তাদের পরিবার মনে করে নিখোঁজ৷ পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে যখন খুঁজে পায় তখন৷''

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এখানে দায়িত্ব এড়ানোর কোনো সুযোগ নাই৷ নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজ রাষ্ট্র এবং সরকারকেই দিতে হবে৷ এটা রাষ্ট্রের আইন ও সাংবিধানিক দায়িত্ব৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘ব্যক্তির নিরাপত্তার নিশ্চয়তা যদি রাষ্ট্র দিতে না পারে, সেটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা৷''

সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরাও অপরহরণ এবং গুমের শিকার হচ্ছেন৷ তাঁদের মধ্যে বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম, ইলিয়াস আলী, সালাহ উদ্দিন আহমেদের নাম উল্লেখযোগ্য৷-ডয়য়েচেভেলে

 

 

 

২৫ জুলাই, ২০১৭ ০৯:০৮:৩৪