মানব পাচার থামছেনা, বাংলাদেশের অবস্থার অবনতি
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
মানব পাচার সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি হয়েছে৷ মার্কিন সরকারের ‘ট্র্যাফিকিং ইন পারসন' শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যৌন ও শ্রম ক্ষেত্রে মানব পাচার বিষয়ে তদন্ত কমে গেছে৷

বাংলাদেশে মানব পাচারবিরোধী কাজে সক্রিয় মানবাধিকার কর্মী এবং অ্যাক্টিভিস্টরা মনে করেন, বাংলাদেশে মানবপাচার ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে৷ আইন প্রয়োগে অস্বচ্ছতা ও অদক্ষতা ছাড়াও দারিদ্র্যের সুযোগ নিচ্ছে পাচারকারীরা৷

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভিক্টিমস অফ ট্র্যাফিকিং অ্যান্ড ভায়েলেন্স প্রোটেকশন অ্যাক্ট' অনুযায়ী, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়  মানবপাচার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর পাঁচটি ধাপে টিআইপি প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে৷ প্রতিবেদনে মানব পাচার মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশের উদ্যোগ ও সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর ১৮৮টি দেশের র‌্যাংকিং করে থাকে৷

তাদের র‌্যাংকিংয়ের মানদণ্ড অনুযায়ী, যারা পাচারের শিকার হন, তাদের প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ গ্রহণকারী দেশগুলো স্থান পায় প্রথম ধাপে (টায়ার ওয়ান)৷ পাচার রোধে সব উদ্যোগ না নিতে পারলেও উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ গ্রহণকারীদের স্থান হয় দ্বিতীয় ধাপে৷ ২০১৫ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল দ্বিতীয় ধাপে৷ তবে ২০১৬ সালে এসে বাংলাদেশের অবস্থান নেমে গেছে৷ টায়ার টু থেকে বাংলাদেশ টায়ার টু'র পর্যবেক্ষণ তালিকায় স্থান পেয়েছে৷ মার্কিন সরকারের বিধান অনুযায়ী, যেসব দেশ মানদণ্ড অর্জনের চেষ্টা করছে, কিন্তু কার্যকর ক্ষেত্রে তার পর্যাপ্ত প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়, তারা এই তালিকায় স্থান পায়৷ এইসব দেশে উল্লেখযোগ্য হারে মানুষ পাচারের শিকার হয় এবং পাচারের নানা পন্থা থাকে৷ বাংলাদেশের অবস্থান এই পর্যবেক্ষণ তালিকায় নেমে এসেছে৷

২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে যৌন ও শ্রম ক্ষেত্রে মানব পাচার বিষয়ে তদন্তের পরিমাণ কমে যাওয়াকে বাংলাদেশের অবস্থান নেমে যাওয়ার যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে যুক্তরাষ্ট্র৷ তাদের দাবি, মানবপাচার রোধে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে না বাংলাদেশ৷ আগের বছরের তুলনায় পাচারের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে৷

গত বছর বাংলাদেশ সরকার ১২২টি যৌন ও ১৬৮টি শ্রম সংক্রান্ত মানব পাচারের ঘটনা তদন্ত করে৷ অন্যদিকে ২০১৫ সালে যৌন সংক্রান্ত ১৮১টি ও শ্রম সংক্রান্ত ২৬৫টি পাচারের ঘটনা তদন্ত করা হয়৷ গত বছর এসব অপরাধে শাস্তির ঘটনা ছিল তিনটি, যা ২০১৫ সাল থেকে চারটি ও ২০১৪ সাল থেকে ১৫টি কম৷

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘‘‘পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব ক্ষেত্রে শাস্তির ঘটনা খুবই বিরল৷ তদন্তের জন্য সরকার সুনির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত জনবল না দেয়া ও তাড়াহুড়ো করে মামলা শেষ করার প্রবণতার কারণে এবং প্রায় ক্ষেত্রেই যথেষ্ট প্রস্তুতির অভাবে বিচারকাজ কোনো ইতিবাচক ফল দিতে পারেনা৷''

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ‘‘বিদেশগামী শ্রমিকদের কাছ থেকে উচ্চ হারে টাকা আদায় করা হচ্ছে৷ সরকার ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ'কে ক্রমাগতভাবে বিদেশগামী শ্রমিকদের ওপর উচ্চ হারে ফি ধার্য করার সুযোগ দিচ্ছে, যা শ্রমিকদের দারিদ্র্য ও পাচারের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে৷''

প্রতিবেদনে অনুযায়ী, মানব পাচার রোধে বাংলাদেশ আগেরবারের তুলনায় কোনো পদক্ষেপ বৃদ্ধি করেনি৷ গত বছরের তুলনায় মানবপাচারের শিকারদের পুনবার্সন যথাযথ ছিল না৷ কয়েকটি এনজিও জানায়, অযত্নের কারণে কয়েকজন পুনরায় পাচারের শিকার হয়েছে৷

মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাস্তবিক অর্থেই বাংলাদেশে মানব পাচার রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি৷ মানবপাচারের মামলাগুলোর তদন্ত, অপরাধীদের আটক এবং তাদের বিচারের আওতায় আনার আইনি পদক্ষেপ খুবই দুর্বল৷ ফলে মানবপাচার বন্ধ হয় না৷  সরকার মুখে মানবপাচার রোধে অনেক পদক্ষেপের কথা বললেও বাস্তবে তার ফলাফল হতাশাব্যঞ্জক৷''

তিনি বলেন, ‘‘মানবপাচার, বিশেষ করে নারী ও শিশু পাচারের ঘটনায় রিসিভিং কান্ট্রির দায় বা দায়িত্ব আছে৷ তাদের সহায়তা ছাড়া এটা বন্ধ করা যায় না৷''

২৯ জুন, ২০১৭ ০৯:৪৯:২২