মামলা দিয়ে শিশু নির্যাতন আর কত?
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ১০ মাসের একটি শিশুকে মারামারি ও চুরির মামলার চার্জশিটে আসামি করেছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা৷ যখন ওই শিশুর বিরুদ্ধে মামলা হয়, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৮ দিন৷ এই ধরণের ঘটনা বাংলাদেশে এই প্রথম নয়৷ মিরপুর থানায় গত বছরের ২৬ জুন মারামারি ও চুরির অভিযোগ এনে হাবিবুর রহমান নামে এক ব্যক্তি মামলা করেন৷ মামলা তদন্ত শেষে মিরপুর থানার এসআই মারুফুল ইসলাম গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রুবেল, আরিফুর রহমানসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন৷ আর তখন জানা যায়, রুবেল নামের যে আসামির বয়স ৩০ বছর দেখানো হয়েছে, তার বয়স মাত্র ১০ মাস৷ মামলা দায়েরের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ২৮ দিন৷ আর আরিফুর রহমান মারা গেছেন চার বছর আগে৷

এই ঘটনা আদালতের নজরে এলে আদালত তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত এবং ব্যাবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন৷ এরইমধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কর্তৃপক্ষ এসআই মারুফুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে৷ নানা অজুহাতে গরহাজির থেকে তিনি রবিবার আদালতে হাজির হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন৷ তিনি দাবি করেছেন, অনিচ্ছাকৃতভাবে শিশু ও মৃত ব্যক্তির নামে অভিযোগপত্র দিয়েছেন৷ আদালত মঙ্গলবার এ নিয়ে আদেশ দেবেন৷

ডিএমপির উপ কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এসআই মারুফুল ইসলামকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলছে৷ প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি মামলার তদন্ত না করেই চার্জশিট দিয়েছেন৷ মামলা নেয়া এবং চার্জশিট দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি আসামির বয়স ও ঠিকানা আইন অনুযায়ী যাচাই করেননি৷ তদন্তে অবহেলা স্পষ্ট৷’’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু বিবেচেনা করা হয়৷ আর সর্বনিম্ন ৯ বছর বয়সির বিরুদ্ধে মামলা দেয়া যায়৷ তবে সেক্ষেত্রে শিশু আইন, আলাদা অভিযোগপত্র , এজাহার এবং আদালত– এসব বিধান মানতে হবে৷’’

বাংলাদেশে শিশুদের বেআইনিভাবে মামলার আসামি করা এই প্রথম নয়৷ চলতি বছরের ২ মে শেরপুর মূখ্য মহনগর হাকিম আদালতে চাচার কোলে চড়ে হাজির হয়ে জামিন নেয় পাঁচ বছরের শিশু রনি৷ রনিকে মারপিট এবং দাঙ্গা হাঙ্গামা মামলার আসামি করা হয়েছিল৷

জানা যায়, গত ১৩ এপ্রিল শেরপুর সদর উপজেলার বেতমারী উত্তরপাড়া গ্রামের আব্দুল খালেক ও অন্য দু'জন ৫৫ হাজার টাকা নিয়ে গরু কেনার জন্য পাশ্ববর্তী জামালপুর জেলার বারুয়ামারী বাজারে যাচ্ছিলেন৷ পথে বেতমারী পশ্চিমপাড়া গ্রামের সুমন মিয়া তার সহযোগীদের নিয়ে খালেকের ওপর হামলা চালায়৷ লাঠি ও লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে খালেককে গুরুতর আহত করে সব টাকা ছিনিয়ে নেয় তারা৷

এ ঘটনায় পরের দিন খালেকের বড় ভাই ইমান আলী বাদী হয়ে ৮ জনের নামে শেরপুর সদর থানায় একটি মামলা করেন৷ ওই মামলায় বেতমারী পশ্চিমপাড়ার ধানী মিয়ার ছেলে পাঁচ বছর বয়সি রনির বয়স ২৬ বছর দেখিয়ে তাকে আসামি করা হয় এবং পুলিশ মামলাটি গ্রহণ করে৷

আদালত বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন৷

২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল ঝিনাইদহে সাত বছরের শিশু সজীব মিয়াকে ধর্ষণ মামলার আসামি করা হয়৷ পুলিশ তদন্ত করে একই বছরের ৩০ জুন তার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিটও দেয়৷ বয়স লেখা হয় ১০ বছর৷ গত বছরের ১০ জানুয়ারি সজীব বাবার কোলে চড়ে আদালতে হাজির হয়ে জামিন নেয়৷ সজীব ঘটনার সময় স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র ছিল৷ জানা গেছে, ধর্ষণ মামলার শিকার এক ছাত্রীকে ধর্ষণ মামলার আসামির কথায় সজীব ডেকে এনেছিল৷ তাই তাকে মামলায় ধর্ষকের সহযোগী আসামি করা হয়৷

সিলেটের কোম্পানিগঞ্জে ২০১৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আপ্তাব মিয়া নামে ১৪ মাসের এক শিশুর বিরুদ্ধে ভোজ্য তেলে ভেজাল দেয়ার অভিযোগে মামলা হয়েছিল৷ শুধু মামলা নয়, তার বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরওয়ানাও জারি করা হয় তখন৷ আর এই মামলা দায়ের করেছিলেন সিলেটের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর মো. শামসুদ্দিন৷ শিশুটিকে তার মা কোলে করে আদালতে হাজির করেছিলেন৷ সেবার স্যানিটারি ইন্সপেক্টরও আদালতে  ক্ষমা চেয়ে রেহাই পান৷ তিনি তখন আদালতে বলেন, ‘‘কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরফিন বাজার পরিদর্শনকালে আপ্তাব স্টোরে ভেজাল সরিষার তেল তৈরির প্রমাণ মেলে৷ তাৎক্ষণিক মামলা করায় ভুলক্রমে শিশুকে আসামি করা হয়৷ আসলে দোকানটির মালিক আপ্তাবের বাবা৷’’

মানবাধিকার কর্মী এবং বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘মামলার আসামিদের বয়স এবং ঠিকানা যাচাই করা বাধ্যতামূলক৷ এটা না করে মামলা এবং অভিযোগপত্র দাখিলের কারণ আর্থিক লেনদেন এবং কখনো কখনো অদক্ষতা ও দায়িত্বে অবহেলা৷ কোনো কোনো তদন্ত কর্মকর্তা টাকার বিনিময়ে অফিসে বসেই মনগড়া তদন্ত রিপোর্ট তৈরি করে আদালতে জমা দেন৷ কিন্তু ঘনটাস্থল পরিদর্শন, আসামি এবং বাদীর ঠিকানা ও বয়স তাদের আবাসস্থলে গিয়ে নিশ্চিত হওয়া তদন্তের প্রথম কাজ৷’’

তিনি আরো বেন, ‘‘মিরপুরের ঘটনায় তদন্ত কর্মকতাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করাই যথেষ্ট নয়৷ তাকে চাকরি থেকে বিদায় করে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মামলা করা উচিত৷ তার উচিৎ ছিল বাদী অসৎ তথ্য দেয়ায় বাদীর বিরুদ্ধে মামলা করা৷ তদন্ত কর্মকর্তা তা না করে অর্থের বিনিময়ে বাদীর অসত্য এজাহারকেই তদন্ত রিপোর্ট হিসেবে আদালতে পাঠিয়েছেন৷’’

প্রসঙ্গত, আদালত মিরপুরে ১১ মাসের শিশুকে মামলার আসামি করার ঘটনায় মামলার বাদী হাবিবুর রহমানকেও তলব করেছেন৷ -ডয়েচেভেলে

৩০ মে, ২০১৭ ০০:১৬:২২