রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৬তম জন্মজয়ন্তী আজ
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
আজ পঁচিশে বৈশাখ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৬তম জন্মজয়ন্তী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আধুনিক বাঙালির মননে ও সৃজনে জ্যোতির্ময় এক প্রতীক। বাঙালির প্রাণের মানুষ তিনি। কবিগুরু প্রায় একক প্রচেষ্টায় বাংলা সাহিত্যকে আধুনিকতায় উজ্জ্বল করে তুলে বিশ্বসাহিত্য আসরে সুপ্রতিষ্ঠিত করে বাংলা ও বাঙালিকে অনন্য এক মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন। এ প্রবল অনুরাগ ও অকুণ্ঠ শ্রদ্ধার আসনে প্রতিটি বাঙালির প্রাণে তার অধিষ্ঠান। সুখে ও সংগ্রামে, বেদনা ও উচ্ছ্বাসে, প্রেম ও প্রকৃতিতে তার ছিল অবাধ বিচরণ। কোথায় নেই তিনি। গানে, কবিতায়, নাটক-উপন্যাস ও গল্পে তিনি বাংলা ও বাঙালিকে ব্যাঙময় করে বর্ণিল রঙে রাঙিয়ে গেছেন।

১২৬৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে রবন্দ্রীনাথের জন্ম। জন্মের এত বছর পরেও তিনি বাঙালির জীবনে প্রবাদের মতো আছেন। তিনি চির নতুনের কবি, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের কবি। জন্মদিন মানে নতুনের আবাহন। এটাই ভাবতেন আমাদের বিশ্বসেরা কবি রবীন্দ্রনাথ। তাই নিজের জন্মদিনে নিজেই আরো লিখে গেছেন- উদয় দিগন্তে ওই শুভ্র শঙ্খ বাজে মোর চিত্ত-মাঝে, চির নূতনেরে দিল ডাক, পঁচিশে বৈশাখ।

বাংলা সাহিত্যকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে তার সাহিত্য। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। বাঙালির জাতিসত্তা মহিমান্বিত ও গৌরবান্বিত যার লেখা, দর্শন ও চিন্তাচেতনায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজ কর্মের মাধ্যমে নতুন একটি কালের সূচনা করে গেছেন। কৈশোর পেরোনোর আগেই বাংলা সাহিত্যের দিগন্ত বদলে দিতে শুরু করেন। তার পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিণত হয়েছে বাঙালির শিল্প-সাহিত্য। তিনি উপহার দেন ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস ও ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্য সংকলন। তার সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প ও ১৯১৫টি গান যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

সাহিত্যের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের গান বাংলা সংগীত ভাণ্ডারকে দারুনভাবে সমৃদ্ধ করেছে। এর আবেদন কোনোদিনও ফুরোবার নয়। যত দিন যাচ্ছে ততই রবীন্দ্রসংগীতের বাণী ও সুরের ইন্দ্রজালে নিজেকে জড়িয়ে নিচ্ছে বাঙালি। তাদের আবেগ-অনুভূতি কবিগুরুর গানের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। বহু প্রতিভার অধিকারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায় সত্তর বছর বয়সে নিয়মিত ছবি আঁকা শুরু করেন। ১৯২৮ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে অঙ্কিত তার স্কেচ ও ছবির সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নানা কারণে বাংলাদেশের এক হার্দিক যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছিল। কবির গান-কবিতা, বাণী এই অঞ্চলের মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তির ক্ষেত্রে প্রভূত সাহস যোগায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে শুধু নয়, চিরকালই কবির রচনাসমূহ প্রাণের সঞ্চার করে। কবির লেখা গান ‘আমার সোনার বাংলা/আমি তোমায় ভালোবাসি’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কবির বিভিন্ন রচনা স্বাধীনতা অর্জনে বিপুল প্রেরণা যুগিয়েছিল। এ জাতির সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র, কথাসাহিত্য, কৃষি, সমাজ ব্যবস্থা, রাজনীতি ও জাতীয়তাবাদের জাগরণে পথিকৃতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ। আজও যার স্পন্দন প্রবহমান।

প্রতি বছরের মতো নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নোবেল বিজয়ী এই বাঙালি কবিকে এবারো স্মরণ করবে তার অগণিত ভক্তরা। শুধু দুই বাংলার বাঙালিই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাংলা ভাষাভাষী কবির জন্মবার্ষিকীর দিবসটি পালন করবে হৃদয় উৎসারিত আবেগ ও শ্রদ্ধায়। জাতীয় পর্যায়ে কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার।

ঢাকাসহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দিবসটি যথাযোগ্যভাবে উদযাপন করা হবে। বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনও বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এবার কবিগুরুর জন্মবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠান হবে রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত নওগাঁর পতিসরে। নওগাঁয় রবীন্দ্র কাচারি বাড়ির দেবেন্দ্র মঞ্চে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এ ছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী মুহা. ইমাজউদ্দিন প্রামাণিক ও নওগাঁ-৬ আসনের এমপি মো. ইসরাফিল আলম উপস্থিত থাকবেন।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মোল্লা আহমদ কুতুবুদ-দ্বীন জানান, এবার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৬তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘মানুষের ধর্ম: রবীন্দ্রনাথ ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা’। এ বিষয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্মারক বক্তব্য রাখবেন অধ্যাপক ড. হায়াৎ মামুদ। আলোচনার পর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজন করা হয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে তিন দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ উৎসবের উদ্বোধন করবেন। কবিগুরুর জন্ম বার্ষিকীর অনুষ্ঠানমালার পাশাপাশি আয়োজন করা হয়েছে গ্রামীণ মেলা।

২৫ বৈশাখ উপলক্ষে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচির আলোকে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত শাহজাদপুরের রবীন্দ্র কাছারিবাড়িতে ৩ দিনব্যাপী রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর আয়োজন করা হয়েছে। এদিন সকাল ১০টায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ৩ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম। এতে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন স্থানীয় এমপি আলহাজ হাসিবুর রহমান স্বপন।

খুলনার দক্ষিণডিহি ও পিঠাভোগসহ ঢাকায় যথাযোগ্য মর্যাদায় জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হচ্ছে। এ উপলক্ষে চ্যানেল আইয়ে দিনব্যাপী রবীন্দ্রমেলা, রবীন্দ্রবিষয়ক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। ছায়ানট মিলনায়তনে আজ সন্ধ্যা ৭টায় রয়েছে রবীন্দ্রনাথের ওপর আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শিশু একাডেমি আয়োজন করেছে রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন ও শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের। বিকেল ৪টায় শিশু একাডেমি মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তিন দিনব্যাপী কবির চিত্রশিল্প প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বাংলা একাডেমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সহযোগিতায় পতিসরের আলোকে কবিগুরুর জন্মবার্ষিকীর স্মরণিকা ও পোস্টার মুদ্রণ করেছে।

আজ বাংলা একাডেমিতে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে আজ সন্ধ্যা ৬টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে প্রবন্ধ উপস্থাপন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আযোজন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সভাপতিত্বে মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকবেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ঢাবির নিয়োজিত রবীন্দ্র অধ্যাপক ড. মহুয়া মুখার্জি। ঢাকাসহ দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী যথাযোগ্যভাবে উদযাপন করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসসমূহ এ উপলক্ষে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। জাতীয় পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও অন্যান্য অনুষ্ঠানমালা বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ বেসরকারি গণমাধ্যমসমূহ সম্প্রচার করবে

০৮ মে, ২০১৭ ১১:৪১:৪৬