হুমায়ূন আহমেদের ৬৮তম জন্মদিন আজ
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম
অ+ অ-প্রিন্ট
সমকালীন বাংলা সাহিত্যের জননন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদের ৬৮তম জন্মদিন আজ রবিবার। নেত্রকোনার কুতুবপুরে, ১৯৪৮ সালের এই দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বিংশ শতাব্দীর বাঙালির জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম হুমায়ূন আহমেদ। তাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী শ্রেষ্ঠ লেখক হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, নাট্যপরিচালক, গীতিকার ও চলচ্চিত্রকার। হ্যাঁ, আমি বাংলা সাহিত্যে কিংবদন্তি প্রবাদ পুরুষের কথাই বলছি। 

হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত বর্তমান নেত্রকোনা জেলার (তৎকালীন মহকুমার) কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে মামাবাড়ি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা শহিদ ফয়জুর রহমান আহমেদ ও মা আয়েশা ফয়েজ। তার পিতা একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন এবং তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পিরোজপুর মহকুমায় কর্তব্যরত অবস্থায় শহীদ হন। তার বাবা পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করতেন। বগুড়ায় চাকরিরত অবস্থায় তিনি একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন যার নাম ‘দীপ নেভা যায়’। তার মায়ের লেখালেখির অভ্যাস না থাকলেও তিনি একটি আত্মজীবনী গ্রন্থ রচনা করেছেন যার নাম ‘জীবন যে রকম’। 

পিতার সরকারি চাকরিসূত্রে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করেছেন বিধায় হুমায়ূন আহমেদ দেশের বিভিন্ন স্কুলে লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি কৈশোর ও শৈশবে অন্য আট-দশ জন সাধারণ বালকের মতো করেই উপভোগ করেছেন তার শৈশবকে। তার নিজের লেখা কিছু শৈশব গ্রন্থ থেকে এর আঁচ করা যায়। তিনি বগুড়া জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন এবং রাজশাহী বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। তিনি পরে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন বিজ্ঞান বিভাগে সেখানেও তিনি কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন এবং প্রথম শ্রেণীতে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। পরে দেশে ফিরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় প্রথম বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’ রচনা করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। লেখালেখিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় এক সময় তিনি অধ্যাপনা ছেড়ে দেন। শিক্ষক হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন এই অধ্যাপক। তিনি ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য টেলিভিশন ধারাবাহিক এবং টেলিফিল্ম রচনা শুরু করেন। এ সময়ে নির্মিত নাটকগুলো তাকে রাতারাতি দর্শকপ্রিয় করে তোলে। সরকারি-বেসরকারি প্রায় সকল চ্যানেলের জন্য তিনি নাটক নির্মাণ করে গেছেন আজীবন। তার নাটকগুলো আজও দর্শকের হৃদয়ে দাগ কাটে। ১৯৯০-এর গোড়ার দিকে তিনি চলচিচত্র নির্মাণ করেন। তার পরিচালনায় প্রথম চলচিচত্র ‘আগুনের পরশমণি’ মুক্তি পায় ১৯৯৪ সালে। তারপর একে একে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে গেছেন। হলবিমুখ দর্শককে তার ছবি দেখার জন্য হলে উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করা যায়। তার নির্মাণকৃত ছবিগুলোতে নিজের লেখা গানের প্রভাব লক্ষ করা যায়। তিনি যে সব উপন্যাস রচনা করেছেন তার মধ্যে সেই সময়কার তরুণ-তরুণীর মনে ঠাঁই করে নিয়েছিল হিমু, রুপা আর মিসির আলীর মতো চরিত্রগুলো। হিমু, রুপা আর মিসির আলীর চরিত্র ছাড়াও তিনি শুভ্র, শুভ্রা, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, আত্মজীবনী, জীবনী প্রভৃতি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় বিচরণ করেছেন অবাধে। সাহিত্যের বিভিন্ন ধরনের জাতীয় ও সামাজিক সংগঠনের নানা পুরস্কারে ভূষিত হন। এর মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হল- বাংলা একাডেমি পুরস্কার, শিশু একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, জাতীয় চলচিচত্র পুরস্কার, লেখক শিবির পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন পদক, বাচসাস পুরস্কার, হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, জয়নুল আবেদীন স্বর্ণ পদক প্রভৃতি। এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিনের যৌথ উদ্যোগে হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়েছে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার সময় তার দেহে মলাশয়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে। শেষ মুহূর্তে শরীরের অজ্ঞাত ভাইরাস আক্রমণ করায় তার অবস্থা অবনতির দিকে চলে যায়। কৃত্রিম লাইভ সাপোর্টে রাখার পর ১৯ জুলাই ২০১২ হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের লাখো-কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে চলে যান না ফেরার দেশে। তাকে নুহাশ পল্লীতে দাফন করা হয়। তার মৃত্যুর ফলে বাংলা সাহিত্য ও চলচিচত্র অঙ্গনে এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়।

যথাযথ মর্যাদায় হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উদযাপনের জন্য পারিবারিকভাবে এবং বিভিন্ন সংগঠন, সংবাদ মাধ্যম ও টিভি চ্যানেল নানা কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন জনকণ্ঠকে বলেন, বরাবরের মতো পারিবারিকভাবে এদিন হুমায়ুন আহমেদকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে। ধানম-ির বাসা দক্ষিণ হাওয়াতে শনিবার রাত ১২টায় জন্মদিন উপলক্ষে কেক কাটার পর হুমায়ূন আহমেদের গড়া গাজীপুরের পিরুজালী গ্রামের নুহাশপল্লীতে তার সমাধিতে ফুল দেয়া হবে। ঢাকায় ফিরে চ্যানেল আইয়ের হিমু মেলায় যোগদান করা হবে। হুমায়ুন আহমেদের জন্মদিন উপলক্ষে চ্যানেল আই চেতনা চত্বরে আজ রবিবার বেলা আড়াইটায় আয়োজন করা হয়েছে ‘ডিউ-চ্যানেল আই হিমু মেলা’। এরপর সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে হুমায়ূন আহমেদের একক বইমেলায় যোগদান করবেন।

হিমু পরিবহনের আয়োজনে ঢাকা মেডিক্যালে শনিবার থেকে শুরু হয়েছে স্বেচ্ছায় রক্ত দান কর্মসূচী। সংগঠনের পক্ষ থেকে আজ সকালে নুহাশপল্লীতে তাঁর সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, বিকেল সাড়ে ৪টায় শিশু একাডেমিতে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও হিমু পরিবহনের ওয়েবসাইট উদ্বোধন করা হবে। বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে শনিবার বিকেলে প্রদান করা হয় ‘এক্সিম ব্যাংক অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার’। এবার কথাসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক এবং নবীন সাহিত্য শ্রেণীতে স্বকৃত নোমান তার ‘কালকেউটের সুখ’ উপন্যাসের জন্য এ পুরস্কার পেয়েছেন।

হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উপলক্ষে এটিএন বাংলায় আজ সকাল ৮টা ২০ মিনিটে প্রচার হবে সঙ্গীতানুষ্ঠান ‘চাঁদনী পসর’। হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্র আর নাটকের গানগুলো সংশ্লিষ্ট শিল্পীর মাধ্যমে তুলে ধরা হবে এই অনুষ্ঠানে। সঙ্গে থাকবে শিল্পীর সঙ্গে গানের প্রেক্ষাপট নিয়ে আলাপচারিতা। অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দী, সেলিম চৌধুরী ও বারি সিদ্দিকী। বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে প্রচার হবে হুমায়ূন আহমেদের রচনা ও পরিচালনায় বিশেষ নাটক ‘চরণ রেখা’।

হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর পিতৃভূমি নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের উদ্যোগে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচীর আয়োজন করা হয়েছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কুতুবপুর গ্রামের শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠের পক্ষ থেকে কোরানখানি, র‌্যালি, প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, কেক কাটা, চিত্রাঙ্কন ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

১৩ নভেম্বর, ২০১৬ ০৮:১১:১০