সাংবাদিক নির্যাতনে প্রভাবশালীদের ‘আশীর্বাদ' ৫৭ ধারা
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট


একদিনে দু'জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিতর্কিত তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা হয়েছে৷কয়েকটি মামলার ধরন দেখে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি প্রধানত প্রভাবশালীরা সাংবাদিকদের হয়রানি ও নির্যাতনে  ‘আশীর্বাদ' হিসেবে কাজে লাগাচ্ছেন৷

গত ৩ জুলাই বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল যমুনা টিভির সিনিয়র রিপোর্টার নাজমুল হোসেনসহ চার জনের বিরুদ্ধে দিনাজপুরে তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা হয়৷ জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী হযরত আলী বেলাল বাদী হয়ে মামলাটি করেন৷ ‘বিচারপতির লাল সিঁড়ি ও দেলোয়ারের ক্রাচ' শিরোনামে একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসের কারণে এই মামলা হয়েছে৷ পোস্টটিতে নাজমুল ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাবার সময় কমলাপুর রেলস্টেশনে ট্রেনে ওঠার দু'টো বিপরীত চিত্রের বর্ণনা দেন৷ ভিড়ের কারণে এক নবদম্পতির ট্রেনের কামরায় ওঠার চেষ্টা, শেষমেশ এক ভিক্ষুকের ক্রাচের সহযোগিতায় একরকম যুদ্ধ করে উঠতে সমর্থ হওয়া এবং অন্যদিকে হাইকোর্টের একজন বিচারকের প্রটোকলের সুবিধা নিয়ে ট্রেনে ওঠার দুই বিপরীত চিত্র তুলে ধরেন তিনি৷ এই স্ট্যাটাসের কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়৷ মামলার অভিযোগে বলা হয়, এই স্ট্যাটাসের মাধ্যমে বিচারক ও বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা হয়েছে৷

একই দিনে আরেকটি মামলা করা হয়েছে দৈনিক সমকালের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান, সিনিয়র রিপোর্র্টার তৌফিকুল ইসলাম বাবরের বিরুদ্ধে৷ চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানায় মামলাটি করা হয়৷ গত ২২ জুন ‘খুনের মামলার আসামিরা হাছান মাহমুদের ক্যাডার' শিরোনামে একটি প্রতিবদেন প্রকাশ করায় এই মামলা করেন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক ইকবাল হোসেন চৌধুরী৷

এর আগে গত মাসে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর প্রতিবেদক গোলাম মুজতবা ধ্রুব'র বিরুদ্ধে একই আইনে মামলা করেন মানিকগঞ্জের এক বিচারক৷ ১১ জুন ‘একটি অসুস্থ শিশু, বিচারকের ট্রাক ও একটি মামলা...' শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় মামলাটি করেন সিনিয়র সহকারী জজ মাহবুবুর রহমান৷

আর ৭ জুন সাংবাদিক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আফসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি আইনে গুলশান থানায় মামলা করেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী৷ মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, আফসান চৌধুরী সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও তার ছেলেকে নিয়ে ফেসবুকে উস্কানিমূলক মন্তব্য করেছেন৷

২০১৫ সালে প্রণয়ন করার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এ আইনে মামলার খবর জানা যায়৷ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলাগুলো করেছেন রাজনৈতিক ও সমাজিকভাবে প্রভাবশালী ব্যাক্তিরা৷ মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এটা স্পষ্ট যে, রাষ্ট্রযন্ত্রে যাঁদের প্রভাব আছে, তাঁরাই মামলাগুলো করছেন৷ আগে বলা হতো তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৪ ধারা সাংবাদিক নির্যাতনের হাতিয়ার৷ এখন দেখছি সাংবাদিকদের হয়রানি এবং নির্যাতনে প্রভাশালীদের জন্য এই আইনটি আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দিয়েছে৷''

কী আছে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায়:

(১ উপ-ধারা): ‘‘কোনো ব্যক্তি যদি ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ৷''

(২): ‘‘কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১)-এর অধীন অপরাধ করিলে তিনি অনধিক চৌদ্দ বছর এবং ন্যূনতম সাত বৎসর কারাদণ্ডে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন৷''

নূর খান বলেন, ‘‘এই আইনটি নিজেই হয়রানির সুযোগ করে দিয়েছে৷ কারণ, এখানে মানহানি, ভাবমূর্তি বা অনুভূতি'র কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি৷ আর কী কাজ করতে তা আঘাতপ্রাপ্ত হবে তা-ও নির্দিষ্ট করে বলা নাই৷ ফলে কোনো সাংবাদিক যদি কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক নেতার দুর্নীতি নিয়ে সঠিক তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন করেন এবং তা অনলাইনে প্রকাশ হয়, তাহলে ওই সাংবাদিক মামলার শিকার হতে পারেন৷ এবং হচ্ছেও তাই৷''

বাংলাদেশে এখনো এই আইনে কোনো সাংবাদিক দণ্ডের শিকার না হলেও হয়রানি চলছে৷ কারণ, মামলা হওয়ার পর গ্রেপ্তার এবং পরে জামিন পেলেও আদালতে হাজিরার হাত থেকে রেহাই নেই৷

২০১৫ সালের ১৬ আগস্ট এক প্রভাবশলী মন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রতিবেদন এবং ফেসবুক স্ট্যাটাস দেয়ায় ঢাকায় আটক করা হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান সাংবাদিক প্রবীর শিকদারকে৷ পরে সাংবাদিকদের প্রতিবাদের মুখে তাঁকে জামিনে ছাড়া হলেও মামলা প্রত্যাহার হয়নি৷ ফরিদপুরে দায়ের করা তথ্য প্রযুক্তি আইনে ৫৭ ধারার মামলার বিচার শুরু হয়েছে ঢাকার সাইবার ক্রাইম ট্রাবুন্যালে৷ প্রবীর শিকদার সম্প্রতি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমার বিচার শুরু হয়ে গেছে৷ আমাকে এখন নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে৷'' তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘‘এ দেশের সাধারণ মানুষ আইনি হয়রানির শিকার হয়৷ আমিও তো একজন সাধারণ মানুষ৷ এই হয়রানি তো আমাকে মেনে নিতেই হবে৷''

চট্টগ্রামে সমকালের সাংবাদিক তৌফিকুল ইসলাম বাবরের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে সাবেক মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগেরপ্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদের বিরুদ্ধে খবর প্রকাশ করায়৷ মামলা করেছেন তাঁরই অনুগত আওয়ামী লীগ নেতা ইকবাল হোসেন চৌধুরী৷ সাংবাদিক বাবর ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘আমার প্রতিবেদনে অন্য আওয়ামী লীগ নেতাসহ ১০ জন নেতা ও ব্যবসায়ীর ভাবমূতি কিভাবে ক্ষুন্ন হলো তা বুঝকে পারছি না৷'' তিনি বলেন, ‘‘এখন অবশ্য তাঁরা আদালতে মামলাটি প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন৷''

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিক নেতাদের বলেছিলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এই আইনটির যাতে অপপ্রয়োগ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা হবে৷ কিন্তু বাস্তবে এখন এই আইনটি সাংবাকিদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা হচ্ছে৷''

এদিকে দিনাজপুরে সাংবাদিক নাজমুল হোসেনের বিরুদ্ধে মামলার বাদী একজন আইনজীবী৷ বাদী আইনজীবী হযরত আলী বেলাল ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এই আইনটি অপপ্রয়োগের সুযোগ আছে৷ তাই এই আইনের বিরুদ্ধে কথা হচ্ছে৷ তবে আমি মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে আইনটির অপপ্রয়োগ বা অপব্যবহার করিনি৷'' তারপরও ‘‘বিতর্কিত এই আইনে কেন মামলা করলেন, আর কি কোনো আইন নাই?-'' এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, ‘‘এই আইন হওয়ার পর আগের আইন আর কার্যকর নাই৷''

তবে তিনি এ-ও দাবি করেন, ‘‘যারা সমালোচনা করে করুক৷ আমি চাই আইনটি থাকুক৷ বাতিল যেন করা না হয়৷''

নূর খান বলেন, ‘‘সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য দণ্ডবিধিতে আরো আইন আছে৷ প্রেস কাউন্সিল আছে৷ যারা হয়রানি করতে চায়, সাংবাদিকদের নির্যাতন করতে চায়, তারাই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা করে৷ এবং তারা ক্ষমতাবান৷ আইনটি বাতিল করা হবে বলে সরকার বললেও এখনো এর অপব্যবহার করা হচ্ছে৷'' -ডয়েচেভেলে



 


০৬ জুলাই, ২০১৭ ২১:২৭:৪৩