গণমাধ্যমের সংবাদে নারী আগ্রহী নয় কেন
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম
অ+ অ-প্রিন্ট
সংবাদমাধ্যমে খবরের দশ ভাগের মোটে একভাগ খবর নারীদের নিয়ে
পারভিন আক্তার দুপুরে বাড়ি ফিরেছেন ঘরের কাজ খানিকটা এগিয়ে নেয়ার জন্যে। রান্নাঘরে টুকটাক কাজ চলছে। ড্রয়িং রুমে একা একাই চলছে টেলিভিশন। তাতে কোলকাতার একটি চ্যানেল ছাড়া। তবে সেটি মনোযোগ দিয়ে দেখছেন না তিনি। পারভিন আক্তার টেলিভিশনে খুব একটা খবর দেখেন না। বলছিলেন, পরিবারের অন্যদের মর্জির উপরই তা খানিকটা নির্ভর করে।

তিনি বলছেন, বাসায় তার স্বামী যখন খবর দেখেন তখন খানিকটা দেখা হয়। তানা হলে নয়।

ঢাকার মিরপুরে একটি জিমের মালিক মধ্যবয়স্ক পারভিন আক্তার। বিভিন্ন বুটিক হাউজে পোশাকও সরবরাহ করেন তিনি। তার কথায় মনে হলো খবর যেন পুরুষের জগতের কোনও এক বিষয়।

যাত্রাপথে ঢাকার কাঠালবাগানের এক গলিতে দেখা গেলো দোকানে রেডিওতে সন্ধের খবর চলছে।

ভিড় করে দোকানের সামনে দাড়িয়ে তা শুনছেন অনেকে। তবে তাদের সবাই পুরুষ।

মিজ আক্তারের কথাই যেন এই দৃশ্যে ফুটে উঠলো।

বিশ্বব্যাপী নারীরা ঠিক খবর দেখেন না বা খবরের কাগজ পড়েনও কম, এমনটাই বলছে গ্লোবাল মিডিয়া মনিটরিং প্রজেক্টের করা এক গবেষণা। বাংদেশেও সময় করে খবর পড়ার, দেখার বা শোনার কাজটি করতে দেখা যায় পুরুষদেরই। কিন্তু নারীরা তাতে কম আগ্রহী কেন?

ষাটোর্ধ ফাতেমা বেগম বলছিলেন, জগতের সকল নেতিবাচক খবর দেখতে দেখতে ক্লান্ত তিনি।

তাকে রীতিমতো পীড়া দেয় আজকের দিনের খবর। কিন্তু তাহলে দুনিয়ার খবরাখবর তার কাছে কিভাবে পৌছায়? তিনি বলছেন, মানুষের মুখে মুখে অনেক খবর সব শোনা যায়।

দু একটা খবর টিভি ব্রাউজ করতে গিয়ে এমনিই চোখে পড়ে। তবে তারপরও কিছু খবর না দেখলে হয়না যেমন হজ্বে মানুষ মারা যাওয়া বা পাইপে শিশু পড়ে মারা যাওয়া, এই খবরগুলো তিনি কিছুটা দেখেছেন।

খবরে নারীদের আগ্রহ কম তা মোটামুটি সব বয়সের জন্যেই প্রযোজ্য বলে গবেষণা বলছে।

ঢাকার আশুলিয়ার একটি গার্মেন্টসে মার্চেন্ডাইজার হিসেবে কর্মরত সানজিদা আক্তারের কথাই ধরুন।

২৮ বছর বয়সী সানজিদা অফিস থেকে ফিরে ঘরের কাজ সেরে সোজা চলে যান গানের চ্যানেল গুলোতে।

শুধু মাঝে মাঝে টিভির পর্দার নিচে খবরের স্ক্রলে চোখ বুলিয়ে নেন।

আর তাতেই তার চলে যায়। গ্লোবাল মিডিয়া মনিটরিং প্রজেক্টের করা গবেষণার বাংলাদেশ অংশে কাজ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন।

তিনি বলছেন নারী খবরে আগ্রহী নন কারণ নারী খবরে নেই।

'বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে সংবাদে নারীর উপস্থিতি মূলত বিনোদনমূলক আর অপরাধমূলক সংবাদে। অথচ পৃথিবীর সবকিছুর সাথেই নারী সম্পৃক্ত। কিন্তু তার যে দৃষ্টিভঙ্গি সংবাদে তা আসছে না। যদি প্রধানত পুরুষের কথা মাথায় রেখেই সংবাদ করা হয় তাতে নারীর আগ্রহ বোধ না করাই তো স্বাভাবিক'।

মিজ নাসরীন ২০১৪ সালে করা এক গবেষণায় দেখেছেন, বাংলাদেশে টেলিভিশনে নারী বিষয়ক সংবাদ আসে মোটে ১৪ শতাংশ। আর খবরের কাগজে তা ১৬ শতাংশ। তার মতে, 'পৃথিবীর বাস্তব চিত্র যাই হোক না কেন যারা সংবাদ নির্মাণ করছেন, যারা নিতি নির্ধারক হিসেবে আছেন, তারা পুরুষ। তাই তারা পুরুষ দর্শক ও পাঠকের কথা মাথায় রেখেই সংবাদ নির্মাণ করেন'।

তিনি বলছেন, এই মনোভাব থেকে বের হয়ে না এলে এখন যে সংবাদ নির্মাণ হচ্ছে তা পক্ষপাতমূলক নির্মাণ।

বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমগুলো খবরের টার্গেট অডিয়েন্স হিসেবে নারীর কথা আলাদা করে ভাবে না।

আর নারীও যে দুনিয়ায় ঘটে যাওয়া রাজনীতি বা অর্থনীতির খবরে তেমন আগ্রহী নয় সেটিও খুব একটা বিবেচনায় নেই মিডিয়া হাউজ গুলোর।  তবে দেশের যেকোনো টিভি চ্যানেলে খবর শুরু হলে দেখা দেখা যায় খবর পড়ছেন একজন নারী।

বাংলাদেশে ইদানীং খবর পড়ার কাজটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই করছেন নারীরাই।

আর নারী প্রতিবেদকের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। কয়েকটি মিডিয়া হাউজের সংবাদ বিভাগে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও এখন নারী। তবে তাতেও সংবাদ নির্মাণে নারীর গল্প উঠে আসে না।

বিশ্বের জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারী হলেও বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত খবরের দশ ভাগের মোটে একভাগ খবর নারীদের নিয়ে। গত ১৫ বছরে এই হিসেবে এক বিন্দুও পরিবর্তন হয়নি।

বেসরকারি টিভি চ্যানেল এনটিভির বার্তা বিভাগের প্রধান খায়রুল আনোয়ার বলছেন খবর নির্বাচনের সময় আলাদা করে নারীর কথা ভাবা হয়না।

তবে নারী দিবসের মতো বিশেষ দিনে তারা শুধু নারীদের কথা মাথায় রেখে খবর প্রচার করেন।

তিনি মেনে নিলেন এটি সঠিক চর্চা নয়। তবে তাতে সংবাদ পরিবেশনের বিষয়টি নতুন করে ভাববেন কিনা, সেটি পরিষ্কার নয়।

গবেষণা আরও বলছে সংবাদমাধ্যমে নারীদের দুর্বল চরিত্রে দেখানোর প্রবণতাই বেশি।

হত্যা বা ধর্ষণের শিকার হলে নারীরা খবরের কেন্দ্রে আসেন। অথবা আসেন বিনোদনের উৎস হয়ে।

বেসরকারি টিভি চ্যানেল বাংলাভিশনের বার্তা বিভাগের প্রধান মুস্তোফা ফিরোজ বলছেন, “দেশের মানুষের অপরাধ বিষয়ক খবর বেশ পছন্দ। আর তার সাথে যদি নারী যোগ হয় তাহলে তা অন্য এক মাত্রা পায়”

তবে এটিকে অসুস্থ এক মনোভাব বলে মন্তব্য করলেন তিনি। তিনি বলছেন, এসব খবরে নারীরা নিজেরা সম্পৃক্ত হতে পারেন না, খবরের সাথে একাত্মতা বোধ করেন না বলেই দেখেন না।

মি. ফিরোজ আরও বলছেন, এখন দেশে ৯০ ভাগ খবর উপস্থাপকই নারী। তারা ব্যাপক সাজগোজ করে খবর পড়তে আসেন। তাদের সাংবাদিক হিসেবে দেখা হয় না। দেখতে ভাল লাগে বলেই আনা হয়।

তার মতে “নারী নিজেকে খবরে পণ্য হিসেবে দেখে, নাটকেও পণ্য হিসেবে দেখে। তাই হয়ত নিজেকেও পণ্যই ভাবে। সেজন্যে রাজনীতি বা অর্থনীতির মতো খবরের সাথে তার সম্পর্ক নেই বলে মনে করে। আর মানুষজনও নারীদের শক্তিশালী কোন ভূমিকায় দেখতে অভ্যস্ত নয়”

রাজনীতির খবর, অর্থনীতির পতন, যুদ্ধ বা কোন দুর্ঘটনার খবর এসব কি তাহলে পুরুষের জগতের বিষয় হয়েই রইলো। আর কোনটা খবর, কোনটা খবর নয় সেটাই বা কে সিদ্ধান্ত নেয়?

ঢাকার মিরপুরের সেই পারভিন আক্তার অবশ্য বলছেন সারাদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর শরীর ও মনে আর কুলায় না। তাই একটু বিনোদনমূলক কিছু দেখতেই তার বেশি ভাল লাগে। ।বিবিসি বাংলা।

০৪ ডিসেম্বর, ২০১৫ ১২:১২:৩৮