স্ত্রী
ছবি ব্যানার্জী
অ+ অ-প্রিন্ট
মাঝরাতে ঘুম চোখে নারান ভটচায মহাবিরক্ত হয়ে বলল———কে বাবা ভুত পেত্নি এলি আমাকে ভয় দেখাতে?ঘাটের দিকে একপা বাড়িয়েই তো বসে আছি। আর কি ভয় পাওয়ার বয়স আছেরে বাপসকল?সবে খান্ডার বুড়িটার শ্রাদ্ধশান্তি করে উঠলাম। বেঁচে থাকতে তো আমার হাড়মাস ভাজা ভাজা করে দিয়েছিল। এখন মনের আনন্দে কিছুদিন অন্তত ভালোমন্দ খেতে দে বাপ। ———চোখের মাথা খেলে নাকি কিপটে বুড়ো?আমি আবার তোমার বাপ হলাম কবে থেকে?

নারান ভটচায বলল———সে তুই যেই হোস না কেন। আমি কাউকে ভয় পাইনা। ভয় একসময় পেতাম বটে। যাকে বলে যমের মতো ভয়। সে হল আমার খান্ডার গিন্নি। তার মুখ তো নয় যেন পচা নর্দমার জলের তোড়। ঐ মুখের ভয়েই চিরকাল ভিজে বেড়াল সেজে থেকেছি। এককালে রূপসী ছিল সেটা সত্যি কথা। তাই যৌবনে তাকে কখন মন প্রাণ সঁপে দিয়েছিলাম। সেটাই কাল হয়েছিল। বৌকে কখনও নিজের দুর্বলতা দেখাতে নেই। আহাম্মকের মতো আমি সেটাই করেছিলাম। তাই চিরকাল আমি তার কাছে চাকরই থেকে গিয়েছিলাম। চাকরির পুরো টাকাকড়িতে আমার অধিকার ছিলনা। তার ইচ্ছাতেই খাওয়া বেড়ানো এমনকি ঘুমটাও নিজের ইচ্ছাতে ছিলনা। ছুটির দিনে তার জ্বালায় একটু শান্তিতে যে ঘুমাবো সেটাও কি পেরেছি?বয়স বাড়ার সংগে সংগে তার গলার মধুর আওয়াজ যেন ফাটা কাঁসরের আওয়াজের মতো শোনাতো। সেই আওয়াজে পিলে চমকিয়ে যেত। সেই তো মরলি বাবা । পাঁচবছর আগে মরলে কি এমন ক্ষতি হত? অন্তত আরও কিছুদিন স্বাধীনতাটা উপভোগ করতে পারতাম। ———আহারে!!কি কষ্ট গো।

———নাঃ আর তুই তোকারি করাটা ঠিক হচ্ছেনা। তুমি ভুত না পেত্নি আমি জানিনা। বুঝলাম তুমি আমার সমব্যথি। দুটো সুখ দুঃখের কথা বলে বাঁচলাম। বুঝলে তার জ্বালায় বন্ধু আড্ডা সব কিছু ছাড়তে হয়েছিল। তার নিয়মে খেতে হবে ,তার নিয়মে ঘরে ফিরতে হবে এমনকি তার নিয়মে ঘুমাতেও হবে। এটা কি একটা জীবন হল?সে একাধারে ডাক্তার উকিল মাষ্টার মা বাবা সব কিছু। মেরেকেটে আর পাঁচটা বছর তো বাঁচবো। শরীরে রোগ নেই কিন্তু সেভাবে জীবনটা ভোগ করতেও পেলাম না। একটা সার সত্যি কথা বলছি মশাই যারা স্ত্রী স্বাধীনতার জন্য লম্বা চওড়া কথা বলে তারা কিন্তু ডাঁহা মিথ্যে বলে। বিয়ের পর প্রায় প্রতিটি পুরুষ যাকে বলে চরম পরাধীন। ———বটে?——একশোভাগ সত্যি কিনা তুমিই বলো?অবশ্য তুমি যদি পুরুষ ভুত হও। এ যেন দিল্লীকা লাড্ডু। যে খায় সে পস্তায় যে না খায় সেও পস্তায়। এবার তুমি যাও ভাই। ঘুমটা একবারেই চটকে গেল।খাসির মাংসটা লোভে লোভে একটু বেশীই খেয়ে ফেলেছি।

মাথার কাছে শাড়ির খসখস শব্দ শুনে নারান বলল———বলছি তো এবার তুমি যাও বাছা। ———এই যে মিনসে বলি মরতে না মরতে কি হাতীর পাঁচ পা দেখলে?কত ডাকই তো শুনলাম। মা বাবা মশাই বাছা। কুকুরের পেটে কি ঘি সহ্য হয় গো?খেলে তো হোটেলের কষানো খাসি না কি পাঁঠির মাংসটা? ভিজে বেড়াল সেজে এতকাল কি অভিনয় করেছিলে?আমি দেশের লোককে ধরে ধরে আমার স্বামীর নামে মন খুলে কত না প্রশংসা করতাম গো। তার এই প্রতিদান? সেবা দিয়ে যত্ন দিয়ে আঁচলে মুড়ে রেখেছিলাম। নেমকহারাম !বেইমান বুড়ো। যত্নে ছিলে বলেই আরো পাঁচবছর বাঁচার কথা ভাবতে পারছো। মেঘে মেঘে বেলা তো কম হলনা। পঁচাশি বছর বয়স হল। আমার কোনো দুঃখ নেই। শুধু তোমাকে আমার মতো করে কে দেখবে ভেবে একবার দেখতে এসেছিলাম। সাবধানে থাকার কথা বলতে এসেছিলাম। নারান থতমত খেয়ে বলল———ও গিন্নি ক্ষমা করে দাও। তুমি এসেছিলে আগে বলবে তো?———বললে খুব সুবিধে হত বুঝি?———মাংসটা লোভে পড়ে খেয়ে খুব ভুল করেছি গো। মনে হচ্ছে এবার কাপড়ে চোপরে হয়ে যাবে। গিন্নি অট্টহাসি হেসে উঠল। বলল——ভয় নেই তুমি বাঁচবে আরও কয়েকবছর। এই বাঁচাটা আমি ছাড়া কেমন হবে সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাবে তুমি। নারান ভট্ট ঘরের বড় লাইটটা জ্বেলে দিয়ে মনে মনে বলল——যাহা বলিয়াছি মিথ্যে বলিয়াছি। আমার স্ত্রী ছিল অগতির গতি। আমার মতো স্ত্রী যার আছে সে বড় সৌভাগ্যবান পুরুষ। ক্ষমিও মোরে দেবী দশভূজে নারী। আমার শক্তি আমার মুক্তি আমার শান্তি। ————ঘুমের মধ্যে বকার অভ্যেসটা আর গেলনা দেখছি। এই শুনছ?ওঠো একটু জল খাও দেখি। ———গলাটা বড্ড শুকিয়ে গেছে গিন্নি। ———জল খেয়ে পাশ ফিরে শোওতো। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।

 

০৫ মার্চ, ২০১৯ ১০:১২:১১