'অনেক কবি-লেখক বলেছেন, বইটি প্রকাশ করো না'
অ+ অ-প্রিন্ট
অদিতি ফাল্গুনী
বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে অদিতি ফাল্গুনী একটি পরিচিত নাম। ২০১৫ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের ঈদ সংখ্যায় ব্লগার হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি উপন্যাসের অংশ বিশেষ লিখেছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল পরের বছর বই মেলায় পুরো উপন্যাসটি প্রকাশ করবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি সে উপন্যাস প্রকাশ করার সাহস করেননি।

"অনেক কবি, লেখক ও শুভানুধ্যায়ী - তারা প্রত্যেকে আমাকে সতর্ক করলো যে এটা তুমি লিখো না বা বের করোনা," বলছিলেন অদিতি ফাল্গুনী।

অন্য লেখকরা অদিতি ফাল্গুনীকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এ বই প্রকাশিত হলে তিনি বিপদে পড়তে পারেন। এরপর অদিতি ফাল্গুনী নিজেকে গুটিয়ে নেন। ২০১৫ সালে লেখক অভিজিৎ রায়কে বইমেলার বাইরে কুপিয়ে হত্যা করার পর থেকে ধর্মনিরপেক্ষ লেখকদের ভেতর ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এর পর বাংলাদেশে একের পর এক ব্লগার লেখক এবং প্রকাশকদের উপর হামলা হয়েছে। কিন্তু সেসব ঘটনায় প্রায় তিন বছর পরেও লেখকদের ভেতরে যে ভয় তৈরি হয়েছে সেটি এখনো কাটেনি।

অদিতি ফাল্গুনী বলেন, "আমাদের মনে হচ্ছে যে আপাত দৃষ্টিতে কোন রিস্ক বা শঙ্কা নেই, কিন্তু শঙ্কা যে একেবারেই তিরোহিত এটা বলা যাবে না।"

বাংলাদেশে 'অমর একুশে গ্রন্থ মেলার' চালচিত্র গত কয়েক বছর ধরে অনেকটাই বদলে গেছে। বইমেলায় কোন ধরনের বই আসছে সেটি নিয়ে গত দুই বছর ধরেই বেশ সজাগ মেলা কর্তৃপক্ষ। তাদের সতর্ক দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে মূলত ধর্মীয় বিষয় নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে।বাংলাদেশের আরেক নারী লেখক সাদিয়া নাসরিন-এর বই প্রতিবছর বইমেলায় প্রকাশিত হয়। গত বছর একটি বইতে অন্তর্ভুক্ত করার ইচ্ছে ছিল এমন কয়েকটি প্রবন্ধ তিনি নিজেই বাদ দিয়েছেন । গত কয়েক বছর যাবত ধর্মনিরপেক্ষ লেখকদের উপর কোন আক্রমণের ঘটনা না ঘটলেও লেখকদের মধ্যে ভয় বা অস্বস্তি এখনো কাটেনি।

"এর মধ্যে কাউকে মেরে ফেলেনি - এ হিসেবে ধরতে গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এটা আবার এ কারণেও হয়েছে লেখকরা নিজেরাই মনে করছেন যে আমি এমন কিছু লিখবো না যার জন্য আমি কোপ খাবো," বলছিলেন সাদিয়া নাসরিন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ প্রকাশক এবং লেখকদের নানা পরামর্শ দিচ্ছে। যার মূল বিষয় হচ্ছে, তাদের ভাষায় 'বিতর্কিত বই' যাতে প্রকাশ না করা হয়। উগ্র ইসলামপন্থীদের হাতে একের পর লেখক প্রকাশক হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে সরকারের দিক থেকে প্রকাশ্যে বলা হয়েছিল, মত প্রকাশের ক্ষেত্রে যাতে 'সীমা লঙ্ঘন' না করা হয়। লেখকরা বলছেন, লেখালেখির ক্ষেত্রে এখন বেশ আপোষ করতে হচ্ছে। এই আপোষ করতে গিয়ে লেখকরা তাদের স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলছে কি না সে প্রশ্ন তুলছেন তারা।

"গত তিন বছরে বই মেলায় আমরা কি এমন একটা বই দেখাতে পারবো যে বইটা ভাইব্রেশন ক্রিয়েট করেছে সোসাইটিতে? মানুষ প্রচুর গল্প-কবিতা লিখছে। কেন লিখছে, কার জন্য লিখছে?" বলছিলেন সাদিয়া নাসরিন।

তবে গত তিন বছর ধরেই বাংলা একাডেমি বলে আসছে যে তারা মতপ্রকাশের জায়গা কোনভাবেই সংকুচিত করছেন না। বরং কোন ইস্যুকে কেন্দ্র করে মেলা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেটিই তারা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে লেখকদের কেউ-কেউ আক্ষেপ করে বলছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নির্ভেজাল প্রেমের উপন্যাস বা কবিতা লেখাই শ্রেয়। -বিবিসি বাংলা

০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০৯:২৭:৩৭