আত্মোপলব্ধি
মৌসান
অ+ অ-প্রিন্ট
কয়েক দিন ধরে তথাকথিত কবি/লেখকদের লেখা পড়ে মনে কিছু প্রশ্নের উদয় হয়েছে। কবি/লেখক সত্তা কারে কয়? কবি/লেখক সত্তা সাধারন মানবিক সত্তার তুলনায় কিসে আলাদা? কবি/লেখকের কর্মসাধন কি কেবলমাত্র লেখনীতেই সীমাবদ্ধ থাকবে? নামী দামী লেখক/কবি হতে গেলে কি বিনয়ের মুখোশ পরতেই হবে?

এই সকল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করলাম। না, বাইরে নয়। নিজের অন্তরের অন্দরেই খুঁজতে থাকলাম এবং অবশ্যই পুনরায় রবি ঠাকুর, বঙ্কিমবাবু ও শরৎবাবু আমাকে সাহায্য করলেন।

আমাদের পূর্বসূরী সাহিত্যকরা যথেষ্ট বিনয়ী ছিলেন বলেই জেনেছি, কিন্তু দ্বিচারী ছিলেন না বোধকরি। প্রতিবাদ করার সময় তাঁরা যথেষ্ট চাঁছাছোলা ভাষার’ই ব্যবহার করেছিলেন। রূপক ধর্মী হোক অথবা ব্যাঙ্গাত্মক, তা দোষীর মননে তিরের মত গিয়ে বিঁধত। এছাড়া যতখানি লেখনীর দ্বারা প্রতিবাদ হত; সামনাসামনি না হলেও পত্রের মাধ্যমেও হত। রবিঠাকুর ও শরৎবাবুর মধ্যে শীতল যুদ্ধ ছিল বটে, কিন্তু কেউ যেমন কাউকেই অশ্রদ্ধা করতেন না তেমনি হিংসা অথবা অসম প্রতিযোগিতার অবকাশও তাঁরা রাখেন নি। ওনারা নিজ নিজ জনারে নিজেদের মত করেই অনন্য কারণ তাঁরা যা ভাবতেন, তা বলতেও সাহস করতেন।

কিন্তু আজকের দিনে একটি বড় অংশের লেখক/কবি সত্যকথা স্বীকার করতেই ভয় পান। নিরাপত্তা, আত্মবিশ্বাসের অভাব ও চটজলদী উপরে উঠবার লালসায় তারা ভাল মন্দ বিচার করতে ভুলে যান। কত সংখ্যক কবিতা গল্প লিখলাম তা মূল কথা নয়; কত সংখ্যক গল্প কবিতা আলোড়ন ফেলে দিয়েছে, সমাজকে উজ্জীবিত করতে পেরেছে কিংবা সামাজিক অবনমন রুখতে সাহায্য করেছে তাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। তা বুঝি আমরা ভুলেই গিয়েছি। অক্ষরের রঙ তখনও কালো ছিল, আজকেও কালো। কলমের পরিবর্তে কি বোর্ড এসেছে, খাতার বদলে নেট দুনিয়া, কিন্তু অনুভূতি, উপলব্ধি, আবেগের অনুরণন তো পরিবর্তিত হবার কথা নয়। হৃদয়ের রক্তক্ষরণ যদি অক্ষর হয়েই ঝরে পড়ে, কলমের কলির রঙ যদি আদপে লাল হয়ে থাকে, তাহলে তো বিপ্লবের রঙও লাল। রোমান্সের রঙও লাল। তবুও স্রোতের বিপক্ষে কেন আমরা চলতে পারছি না? দৃষ্টান্ত স্থাপন করার দিকে নজর না দিয়ে ঝাঁকের কই হতেই বেশি ভালবাসছি কেন? কেন ভালবাসার নামে ছলনাকে আশ্রয় করছি। লেখনীর উত্তোরণের আবডালে ভালবাসি মনগুলোকে ভেঙে তছনছ করে দিচ্ছি? মাংসের স্বাদ পাওয়া নেকড়ে হতেও কেন দ্বিধা বোধ করছি না? সাধারন মানুষের সমাজে এসব হামেশাই হয়ে থাকে, কিন্তু সাহিত্য জগতেও কেন হবে? তবে আমরা সাধারনের থেকে কিসে আলাদা?

জানি, প্রেম বাংলা সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সেই প্রেম আজ সওদাগরের হাত ধরে বিক্রয়যোগ্য হয়ে উঠছে কেন? আবেগ যদি বাংলা সাহিত্যে চরিত্র গঠনে মূল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে যুগ যুগান্ত ধরে তাহলে সোজা-সাপটা, আবেগপ্রবণ মানুষ ‘পাগল’ উপাধিতে ভূষিত হচ্ছে কেন? কেন সাহিত্যের মধ্যে রাজনীতি ঢুকছে? কূটনীতির দ্বারা পরিচালিত হয়ে তথাকথিত কবি সাহিত্যকদের আবেগকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা চলছে?

সাধারণ মানুষের কাছে প্রমাণ করতে ব্যস্ত যে আমরা আলাদা। অন্তত্য আমাদের অহমিকা বোধ তাই দেখায়। কিন্তু কিসে আলাদা? তারা মনের কথা লিখতে পারে না, আমরা পারি কারণ আমরা সরস্বতী দেবীর বরপ্রাপ্ত। অনেকের ইচ্ছা থাকলেও মনের ভাব প্রকাশ করতে সাহস করেন না। তারা প্রত্যেকে আদ্যপন্ত সংসারী মানুষ। কিন্তু আমরা? আমাদের সংসার ছাড়াও তো একটা বিশাল জগৎ আছে যেখানে স্কাই ইজ দ্য লিমিট!

আমরা জানি যে কলম তরবারির চাইতে ধারালো, তাই তো কলম ধরি। তবে আমরা সাহসী লেখা লিখতে এত ভয় পাচ্ছি কেন? কেন সরাসরি সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে দ্বিধাবোধ করছি? উপরওয়ালার ভয়ে? প্রত্যেকটি লেখক/কবি সত্তা তো স্বাধীন, তবে আমরা কেন দিনকে দিন কারোর না কারোর গোলাম হয়ে পড়ছি?

সাহিত্য সমাজের দর্পন। তাই সমাজে জঘন্য অপরাধ ঘটলে আমাদের কলম শব্দের আকারে বৃষ্টি ঝরায়। অথচ সেই সমাজের প্রতি কর্তব্যকেই ব্রাত্য করে রাখছি দীর্ঘদিন ধরে।

উদাহরণ:- সীমানায় একটি অকাল মৃত্যুতে আমাদের প্রাণ কাঁদে। কলমে, কি বোর্ডে, কবিতায়, প্রবন্ধে অশ্রু ঝরে; বলতেই পারি রক্ত ঝরে। অথচ যাতায়াতের পথে একটি দূর্ঘটনাগ্রস্থ লোককে আড়চোখে দেখে পলায়ন করতে আমাদের বাধে না। মন কষাকষি বা ঝগড়ার ঘটনা ঘটলে থামাতে তো যাই না বরঞ্চ নারদ নারদ খেলা খেলি। পাশের বাড়িতে আগুন লাগলে আমার ঘরটাও যে কোন না কোনদিন পুড়বে, ভুলে গেছি যে!

ধর্ষন বা শ্লীলতাহানির খবর চাউর হলেই আমাদের হৃদয় বিগলিত হয়। কবিতা/গল্পে প্রতিবাদ শুরু হয়ে যায়। উচিতও। কিন্তু আমাদের মাঝে আমাদের বন্ধু, ভাইয়েদের দ্বারা এমন কোন জঘন্য কার্য্য সম্পাদন হয়েছে জেনেও আমরা মুখে কুলুপ আঁটি। যদিবা কোন মহিলা প্রতিবাদে মুখর হয়, তাহাকে পাগল, চরিত্রহীন প্রমাণ করার প্রয়াস চলতে থাকে নিরন্তর। কিংবা তাকে এই বলে উপদেশ দেওয়া হয় যে থুতু উপর দিকে ছুঁড়লে নিজের গায়েই পড়ে। আসলে অন্যায় সহ্য করতে করতে, নিজেকে ভাল দেখাতে দেখাতে ভুলে গেছি যে নর্দমার পাঁকে মাখামাখি হয়ে বসে আছি তো থুতু কোন ছাড়! আমরা কিভাবে দিনের পর দিন পলিটিকালি বায়াসড হয়ে পড়ছি, তার কথা নাহয় অন্যদিন তুলবো।

কখনো কাউকে সিঁড়ি বানাচ্ছি, কখনো উপঢৌকন নিচ্ছি অথবা নিজেকে উপঢৌকন করে ক্ষুদ্র স্বার্থ চরিতার্থ করে চলেছি। কি লাভ হচ্ছে? নিশ্চয় প্রাথমিক ভাবে লাভ হয় বৈকি? কিন্তু যদি আমার লেখার মধ্যে গভীরতাই না থাকলো, পাঠকের হৃদয় যে তা স্পর্শ করবে না, বলাই বাহুল্য। বই বিক্রি হবে কি? নাকি শুধু কবি, লেখক তকমাটাই বেশি জরুরী। বাকীটা যদি ফাঁকা কলসীর মত বাজে তো বাজুক না।

এমন কবিতা আজ পর্য্যন্ত লিখতে পেরেছি কি যা যুগ যুগ ধরে মানুষের মুখে মুখে ঘুরবে? এমন গল্প এখনও লিখেই ওঠা হয় নি যা মাইলস্টোন হিসাবে পাঠ্য পুস্তকে জায়গা করে নেবে। এমন কবি/ লেখক সত্তার কিইবা প্রয়োজন যার অস্তিত্ব শুধুমাত্র আমার জন্মকাল অবধি। লিখে আমরা কেউ লাখ লাখ টাকা রোজগার করতে পারবো না, বিদেশের মত এ বাংলায় তার চল নেই। তবে? “কি সুখের লাগি এ রক্ত ঝরাইতেছি?”

আর এই দুঃখ, কষ্ট, কান্না সবটাই কি কল্পনা প্রসূত নাকি বাস্তবেও তার অস্তিত্ব আছে? শুধুমাত্র বই পড়ে কি ভালবাসা যায় নাকি বিরহ যন্ত্রনায় কষ্ট পাওয়া যায়? বাস্তব উপলব্ধি ছাড়া কি আগুন ঝরানো প্রতিবাদী গল্প/কবিতা লেখা যায়? জীবনকে আপন না করলে কি জীবন দর্শনের সন্ধান পাওয়া যায়? বন্ধুরা আমাকে বলেছেন আমার প্রতিবাদী লেখাগুলো বড্ডো হার্শ। যদি না কুঠারাঘাতই করতে পারলাম, তাহলে প্রতিবাদ আর কিসের? জানি ব্যাঙ্গ করে, রূপক ধর্মী লেখার মাধ্যমেও প্রতিবাদ করা যায়। তাতে মানুষ হাসে, বোধবুদ্ধিওয়ালা মানুষের বোধগম্যও হয়। কিন্তু যে মনুষ্য জাতি ঘুমিয়ে পড়েছে, জীবন্ত মমিতে রূপান্তরিত হয়েছে, জীবন্ত লাশ হয়ে ঘুরছে, যাদের বিবেক বোধ কুলুঙ্গিতে তোলা আছে, তাদের জাগাতে গেলে শব্দ করতেই হইবে, তাও আস্তে নয়, বজ্রাঘাত সম শব্দ না হলে 'না তাহাদের কানের ভিতর পশিবে, না হৃদয়ে ঝড় তুলিবে’।

মোদ্দা কথা হলো যে আমরা এমন এক কঠিন সময়ে উপস্থিত হয়েছি যখন আমাদের মুখ আর মন আলাদা হলে চলবে না। ছদ্মনামে লেখার দিন শেষ। পথে এবার নামতেই হবে। ভদ্রতার মুখোশ পরে যে কুৎসিত লোকগুলি সমাজ তথা সাহিত্যসমাজের ধ্বজাধারীরূপে নিজের ঢাক নিজেরাই পেটাচ্ছে, তাদের মুখোশ টেনে খুলে দেবার সময় এসেছে।

প্রতিবাদ আমরা অনেকেই করছি, পথেও নামতে গররাজী নই, কিন্তু সংঘবদ্ধ নই যে! আড়ালে আবডালে সমালোচনার নামে গসিপিং অবধিই সীমাবদ্ধ থাকছি। এগজিকিউট করার জন্যে সাহসে কুলাচ্ছে না। কিংবা হয়তো সমালোচনাই বাঙালীর চরিত্রের একটা দিক। কারা যেন বলে আমরা অলস জাতি। তাই হয়তো শ্রম দিতে চাইছি না। বুদ্ধির তো অভাব নেই আমাদের। ‘কিন্তু কাঠবেড়ালীর ন্যায় ধূর্ত হইয়া ফিরিতেছি। চালাক হইয়া গা বাঁচাইয়া চলিতে পণ করিয়াছি। ভুলিয়া গিয়াছি যে চালাকির দ্বারা কোন মহৎ কর্ম সিদ্ধ হয় না। তবে লাখ টাকার প্রশ্ন হইলো যে সাহিত্যের মাধ্যমে আমরা কি কোন মহৎ কর্ম করিতে আসিয়াছি আদৌ? নাকি কেবলই টাইম পাশ! তাহা হইলে উত্তর একটাই। আমরাও চোখে আঙ্গুল দাদা হইয়া রহিয়া যাব।’ এক্ষনে সিদ্ধান্ত আমার এবং অবশ্যই আপনার।

 

২৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ২৩:৩৯:৪০