তিনি আর নাটক লিখবেন না
শামীম ফেরদৌস
অ+ অ-প্রিন্ট
বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল। আজিজ মার্কেটের সবগুলো বই-এর দোকান খোলা হয়েছে নির্দিষ্ট সময়ে। কিন্তু বনলতা প্রকাশনী এখনো বন্ধ রয়েছে। একজন একজন করে বিশ-পঁচিশজন লোক এরই মধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে জটলা করে। সবার মুখে একই প্রশ্ন বনলতা প্রকাশনীর দোকানটি খুলছে না কেন? আশপাশের বইয়ের দোকানিরাও বলতে পারছে না এর কারণ। সবার চোখে-মুখেই হতাশার ছাপ। এরই মধ্যে বনলতা প্রকাশনীর স্বত্ত্বাধিকারী এফরান সাহেব তার দোকানের সামনে এত লোকের ভিড় দেখে থমকে দাঁড়ান। জিজ্ঞেস করেন, কি ব্যাপার। আপনারা সবাই কি চান? 

- আমরা এই বনলতা প্রকাশনীর কাউকে খুঁজছিলাম। একজন বললেন। 

এফরান সাহেব দোকানের সাটার খুললেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, কেন? কি প্রয়োজনে? 

-আমরা নাট্যকার জজ মিয়া সাহেবের সাথে দেখা করতে চাই। আরেকজন বললেন। 

-জজ মিয়া সাহেবকে কেন দরকার? 

-আমরা উনার লেখা নাটকের পান্ডুলিপির জন্য এসেছি। এফরান সাহেব কথার কোন উত্তর না দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। লাইট ও ফ্যানের সুইচ অন করে আবার দোকানের দরজায় এসে দাঁড়ালেন। বললেন, আপনারা যেতে পারেন। তার সাথে আর দেখা হবে না। 

-কেন? একজন বললেন। 

-কারণ, তিনি আর নাটক লিখবেন না। 

-না, না। লিখতেই হবে। উনার মতো এত ভাল একজন লেখক নাটক লিখবেন না। তা কি করে হয়? 

-প্রয়োজনে এডভান্স টাকা দেবো। একজন বললেন। 

-হ্যাঁ। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমাদের পোডাকশন্স হাউস থেকে দশটি নাটকের টাকা এডভান্স দিয়ে রাখব। আরেকজন বললেন। 

- আমাদের প্রযোজনা সংস্থা প্রয়োজনে উনাকে ব্ল্যাংক চেক দিয়ে দেবে। যখন যা খুশি ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিবেন তিনি। অন্য আরেকজন বললেন। এফরান সাহেব এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে সবার কথাগুলো শুনলেন। তারপর বিরক্ত হয়ে ধমকের সুরে বললেন, আপনাদের আবারও বলছি আপনারা চলে যান। আমি তো বললাম, জজ মিয়ার সঙ্গে আপনাদের দেখা করার প্রয়োজন নেই। তিনি আর নাটক লিখবেন না। 

নাট্যকার জজ মিয়া রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলেন। মাত্র একটি নাটক প্রচার হওয়াতেই সবাই বুঝে গেছেন তিনি যে কত উঁচু মাপের নাট্যকার। অথচ নাটকের পান্ডুলিপি নিয়ে কত প্রযোজক আর পরিচালকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। কেউ তার লেখা নাটকের পান্ডুলিপি পড়েই দেখেনি। কেউ উপহাস করেছেন। কেউ তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছেন। একজন তার নাম নিয়েও তিরস্কার করলেন। বলেছিলেন, আপনার যে নাম এই নামের কারণেই আপনার নাটক কেউ নিবে না। আপনার নামটা পাল্টানো যায় না?  

জজ মিয়া বলেছিলেন, আপনি নাম দিয়ে একজন মানুষকে বিচার করছেন কেন? মানুষকে বিচার করবেন তার গুণ দিয়ে। 

-আজকাল গুণের কোন কদর নেই। আপনার নামটা কেমন সেকেলে। এই নামের কোন নাট্যকারের নাটক দর্শক পছন্দ করবে না। কে রেখেছিল আপনার এই নাম? 

-নাম রেখে যদি কোন অপরাধ করে থাকেন তিনি হলেন আমার বাবা। তিনি বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে জিজ্ঞেস করতাম তিনি কেন এমন নাম রেখেছিলেন? জজ মিয়া আর বসলেন না। এক বুক বিরক্ত আর হতাশা নিয়ে ওঠে আসলেন সেখান থেকে। তারপরও জজ মিয়া আশা ছাড়েননি। তার বিশ্বাস ছিল নাট্যকার হিসেবে একদিন না একদিন তিনি বিখ্যাত হবেনই। মানুষ একদিন লাইন ধরবে তার লেখা নাটকের পান্ডুলিপির জন্য। এই আশা নিয়ে বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থা ও পরিচালকের কাছে ধর্না দিয়েছেন। একবার এক পরিচালকের কাছে একটি পান্ডুলিপি দিয়েছিলেন পড়তে। বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করেছেন তার সঙ্গে। তারপর সেই পরিচালক বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, আপনার এই পান্ডুলিপি দিয়ে নাটক বানানো যাবে না। জজ মিয়া ভয়ে ভয়ে জানতে চেয়েছিলেন, কেন? 

-কারণ, আপনার নাটকের নায়িকা ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। এ ধরনের ঘটনা নিয়ে অনেক নাটক হয়েছে। 

-না ভাইজান। আমার এই পান্ডুলিপিতে এ ধরনের কোন দৃশ্য নেই। কোন আত্মহত্যার ঘটনা নেই। 

- সেজন্যই তো বলছি। আপনার এই পান্ডুলিপি দিয়ে নাটক বানানো যাবে না। ইদানিং দেখছেন না কি হারে নারী নির্যাতন হচ্ছে। নির্যাতিত নারীরা ট্রেনের নিচে পড়ে, গায়ে আগুন লাগিয়ে কিভাবে আত্মহত্যা করছে। ও ধরনের কোন ঘটনা নিয়ে নাটক লিখুন। জজ মিয়া নাটকের পান্ডুলিপিটি রেখে ওঠে দাঁড়ায়। পরিচালক বললেন, আরে ওঠছেন কেন? বসেন। এত হতাশ হলে কি হয়। জজ মিয়া আবার বসেন। তাকিয়ে থাকে পরিচালকের দিকে। পরিচালক বললেন, আপনার কাছে কি লাখ দেড়েক টাকা হবে। তাহলে আপনার এই পান্ডুলিপিটা কাজে লাগিয়ে দিতে পারি। জজ মিয়া ওঠে দাঁড়ায়। 

পরিচালক বললেন, শুনুন। পান্ডুলিপিটা নিয়ে যান। আমার ময়লা ফেলার ঝুড়িটা এমনিতেই ওয়েস্টেজ কাগজে বোঝাই হয়ে আছে। 

জজ মিয়া পান্ডুলিপিটা হাতে নেয়। তারপর বেরিয়ে আসে। পরিচালকের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে। জজ মিয়া দেড় লাখ টাকা পাবে কোথায়? সরকারি অফিসের কেরানি। দুই সন্তাানের লেখাপড়া, সংসারের খরচ সব মিলিয়ে এমনিতেই নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। বাংলায় মাস্টার্স করেছে বলে লেখালেখির একটা নেশা ছিল ছাত্রজীবন থেকেই। সেই নেশা থেকেই তার নাট্যকার হওয়ার স্বপ্ন। এ নিয়ে স্ত্রীও তাকে কম উপহাস করেনি। তারপরেও দমে যাওয়ার পাত্র নন জজ মিয়া। 

নাটক লিখছেন আর এই নাটক নিয়ে পরিচালক প্রযোজকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং সবার কাছেই তার বন্ধু এফরানের আজিজ সুপার মার্কেটের বনলতা প্রকাশনীর ঠিকানা দিয়ে আসে। কোন প্রয়োজন হলে যেন সেখানে যোগাযোগ করে। বন্ধু এফরানও তাকে কম টিটকারি করেনি। এফরান তাকে প্রায়ই বলতো, এভাবে তোমার পান্ডুলিপি বিক্রি হবে না। তুমি ব্যাগে পান্ডুলিপি ভরে ফেরি করে বেড়াও। অলিতে গলিতে যেভাবে নাটকের প্রোডাকশন হাউস গড়ে ওঠেছে, নাটকের পান্ডুলিপি এখন ফেরি করেও বিক্রি করা যাবে। 

বন্ধুর কথা শুনে জজ মিয়া হাসতেন। বলতেন, কথাটা অবশ্য মন্দ বলোনি। এ রকম অনেক অবহেলা আর তুচ্ছ তাচ্ছিল্য কোন কিছুই জজ মিয়ার আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরাতে পারেনি। একবার বিখ্যাত পরিচালক মিরাজ চৌধুরীকে একটি পান্ডুলিপি দিয়েছেন জজ মিয়া। মিরাজ চৌধুরীর সহকারী পান্ডুলিপিটি পড়ে বলেছিল, বস অসাধারণ একটা পান্ডুলিপি। খুবই ফাটাফাটি নাটক হবে। এই পান্ডুলিপি দিয়ে নাটক বানালে এবার ঈদের সেরা নাটক হবে এটি। উত্তরে মিরাজ চৌধুরী বলেছিল, তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে। হিমালয় পাঠানের মত বিখ্যাত নাট্যকারের পান্ডুলিপি যেখানে আছে সেখানে জজ মিয়া ফজ মিয়ার কথা ভাবছো কেন? 

-বস, হিমালয় পাঠানের নাটক এই পান্ডুলিপির কাছে কিছুই না। 

- কিছুই না হোক। হিমালয় পাঠানের নামেই নাটক চলে যাবে। লক্ষ লক্ষ টাকার স্পন্সরও পেয়ে যাবে চ্যানেল ওয়ালারা। নাটকের ভিতরে কি আছে চ্যানেলগুলোও সেটা দেখবে না। এটা হিমালয় পাঠানের নাটক এটাই হচ্ছে আসল কথা। 

-ঠিক আছে বস। পান্ডুলিপিটি আপনার টেবিলে থাক। অবসর সময়ে এটি পড়ে দেখুন। মিরাজ চৌধুরীর সহকারী আর কথা না বাড়িয়ে তার কক্ষ থেকে চলে আসে। জজ মিয়া বেশ কয়েকবার মিরাজ চৌধুরীর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানে গিয়েও তার সাথে দেখা করতে পারেননি। যদিও একবার দেখা করতে পেরেছিলেন মিরাজ চৌধুরী তাকে বলে দিয়েছিলেন, আপনাকে আর এভাবে আসতে হবে না। সময় পেলে পান্ডুলিপিটি পড়ে আমরাই আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবো। জজ মিয়া মিরাজ চৌধুরীর সঙ্গে আর যোগাযোগের চেষ্টা করেননি। এভাবে অনেকদিন কেটে গেল। হঠাৎ করেই মিরাজ চৌধুরী একদিন অবসর মুহূর্তে অনেকটা উদাসীনভাবেই জজ মিয়ার পান্ডুলিপিটি পড়ে দেখেন। পান্ডুলিপিটি পড়ে তো তার দু'চোখ ছানাবড়া। অসাধারণ পান্ডুলিপি। এই পান্ডুলিপি দিয়ে তিনি অবশ্যই নাটক বানাবেন। এই নাটক প্রচারের পর এ সময়ের অনেক বড় বড় নাট্যকাররাও লজ্জিত হবেন। এমন নাটক দেখে দর্শকদের মাঝেও আলোচনার ঝড় উঠবে। মিরাজ চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে ডাকলেন তার সহকারীকে। বললেন, জজ মিয়া সাহেবকি আর এসেছিলেন? 

-না বস। তিনি তো অনেকদিন যাবত আসেন না। 

-কোন টেলিফোন নাম্বার? জানতে চাইলেন মিরাজ চৌধুরী। 

-একটা ভিজিটিং কার্ড আপনাকে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটাও আপনি ঝুড়িতে ফেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু কেন বস? 

-জজ মিয়া সাহেবের এই পান্ডুলিপিটি তো অসাধারণ। এই পান্ডুলিপি দিয়ে আমি নাটক বানাবো। তুমি জজ মিয়া সাহেবের খোঁজ করে দেখো তাকে পাও কিনা। তাকে অবশ্যই উপযুক্ত সম্মানি আমরা দেবো। তাছাড়া না পেলেও অসুবিধা নেই। নাটকটি প্রচার হলে তিনি অবশ্যই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আমরা দেরি না করে নাটকটি বানিয়ে ফেলি। 

এই নাটকটি প্রচারের পরপরই রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলেন জজ মিয়া। বড় বড় জনপ্রিয় নাট্যকাররাও নিজেদের তুচ্ছ ভাবতে শুরু করলেন জজ মিয়ার কাছে। প্রযোজক আর নির্মাতারা খুঁজতে শুরু করলেন তাকে। 

আজিজ মার্কেটের বনলতা প্রকাশনীর সামনে ভিড় আরো বাড়তে লাগলো। এফরান সাহেব বিরক্ত হয়ে আবারো গেটের কাছে এলেন। বললেন, আপনারা অযথা এখানে ভিড় করছেন কেন? আমি ত বলেছি, জজ মিয়া আর নাটক লিখবেন না। একজন বললেন, কেন লিখবেন না। ইফরান সাহেব বললেন, তিনি অভিমান করেছেন। অনেক অনেক অভিমান। তার এই অভিমান কেউ আর তার মন থেকে মুছে দিতে পারবেন না। 

-কেন অভিমান? কিসের অভিমান? অন্য আরেকজন প্রশ্ন করলেন। 

-সবার অবহেলা আর তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের কারণেই তিনি এতটা অভিমান করেছেন। 

-না, জজ মিয়া সাহেবকে লিখতেই হবে। গতকাল জজ মিয়া সাহেবের লিখা যে নাটক প্রচার হয়েছে তাতেই আমরা বুঝতে পেরেছি তিনি কত বড় মাপের লেখক। তাকে লিখতেই হবে। একজন বললেন। 

আরেকজন বললেন, কেবল তিনিই পারেন আমাদের নাট্যজগতকে সমৃদ্ধ করতে। 

এফরান সাহেব বললেন, আপনারা যদি এই বিষয়টি আরো আগে বুঝতে পারতেন তাহলে বোধহয় জজ মিয়া এতটা অভিমান করতো না। 

বনলতা প্রকাশনীর সামনে দাঁড়ানো লোকগুলো পরস্পর তাকায় পরস্পরের দিকে। এফরান সাহেবের কথার কোন অর্থই যেন বুঝতে পারছে না কেউ। একজন বললেন, আমরা জানি আপনার এখানে জজ মিয়া সাহেবের অনেক পান্ডুলিপি আছে। সেগুলো থেকে আমাদেরকে দিন। 

এফরান সাহেব বললেন, সেগুলো নেই। তিনি গতকাল সবগুলো নিয়ে গেছেন এবং বিকেলে আগুনে পুড়িয়ে ফেলেছেন সব পান্ডুলিপি। 

-তাহলে আমাদেরকে নতুন পান্ডুলিপি লিখে দিতে বলুন। একজন বললেন। 

-আমি ত বলেছি তিনি আর নাটক লিখবেন না। 

-কেন? 

-কারণ, তিনি আর বেঁচে নেই। গতকাল সন্ধ্যায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তিনি জানতেনও না কিছুক্ষণ পরেই তার নাটক প্রচার হবে। 

-বলেন কি? আশ্চর্য হয়ে একজন প্রশ্ন করলেন। 

-হ্যাঁ। আপনারা কেউ জানতেও পারলেন না অসাধারণ একটি প্রতিভা বুকভরা অভিমান নিয়ে নীরবে নিঃশব্দে পৃথিবী থেকে চলে গেলেন। যান, আপনারা যান। ধমকের সুরে এফরান সাহেব বললেন। 

বনলতা প্রকাশনীর সামনে দাঁড়ানো লোকগুলো একে একে চলে যেতে থাকে। এক সময় সামনের জায়গাটা সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে যায়। এফরান সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভেতরে প্রবেশ করেন।

 

 

 

 

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০৬:৩০:৫৩