‘ওড ফর ক্ল্যারা থমাস’
সুজিত কুসুম পাল
অ+ অ-প্রিন্ট
অন্যের বাড়ির মেঝে পরিষ্কার করে বাচ্চা দেখাশোনার কাজ করে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালিয়েছেন। প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েই ভেতরের আবহাওয়া বুঝে ওঠার আগেই ভালোবেসে ফেললেন এক মেধাবী ছাত্রকে, যে ছাত্রটি ভালোবাসার অনুকূল আবহাওয়ায় চলতে চলতে একদিন নিজেই হয়ে গেলেন একজন আবহাওয়া বিজ্ঞানী। মেয়ে হওয়ার অপরাধে সর্বনিম্ন বেতনে চাকরিতে ঢুকে অবসর নিয়েছেন পুরুষের আগলে রাখা সর্বোচ্চ বেতনের সর্বোচ্চ পদ থেকে। তিনি কে?

বাবার মুদিখানার দোকান। মা দর্জির দোকানের কর্মচারী। ছোট ভাই কসাই। তাতে কী? তাঁর দাদুর(পিতামহ)শখ ছিল, নাতনি একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। দাদুর স্বপ্ন পূরণ হলো। মুদিখানা পার হয়ে কাপড়ের দোকানকে ছাড়িয়ে আবহাওয়া বিজ্ঞানীকে ভালোবেসে দাদুর নাতনি নিজেকে আবির্ভূত করলেন ইংরেজি সাহিত্যের তারকা হিসেবে; দখল করলেন ক্যানলিট(ক্যানাডিয়ান লিটারেচার)চ্যাম্পিয়নের মসনদ। অবসরে গেলেন প্রফেসর এমেরিটাস হিসেবে। তিনি কে? তিনি হচ্ছেন আধুনিক ক্যানাডীয় সাহিত্যের অগ্রসৈনিক নারী প্রগতির প্রবক্তা শিক্ষাবিদ গ্রন্থকার ড. ক্ল্যারা থমাস (১৯১৯-২০১৩)।

জন্মের আগেই জন্ম। ক্ল্যারার জীবনটা শুরু হয় অনেকটা গল্পের মতো, নোবেল বিজয়ী গল্পকার এলিস মুনরোর (জন্ম-১৯৩১) কোনো এক কাহিনির চরিত্রের মতো। ক্ল্যারা ম্যাকক্যান্ডলেসের জন্ম হয় ২২ মে ১৯১৯ তাঁর মা-বাবার বিয়ের মাত্র দু’মাস পরেই পশ্চিম অন্টারিওর ছোট্ট স্ত্র্যাথরয় শহরে। বেড়ে ওঠেন স্থানীয় একটি কাপড়ের দোকানের  ম্যানেজার মা ম্যাবেল সুলিভান ম্যাকক্যান্ডলেসের আদর্শ ও তত্বাবধানে। বাবা ব্যাসিল ম্যাকক্যান্ডলেসের ছিল মুদিখানার দোকান। ছোট ভাই কসাই হিসেবে কাজ করতো বাবার দোকানেই। বাবার দোকানের আশেপাশে বন্ধুদের সাথে খেলতে খেলতে একদিন মেয়েটি ১৯৩৭ সালে ১৮ বছর বয়সে ঢুকে পড়েন ওয়েস্টার্ন অন্টারিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানায়। ক্লাসে পা রেখেই হাত রাখেন মেধাবী ছাত্র মোরলে থমাসের হাতে। হাতে হাত, তারপর দৃষ্টিপাত। এই সময় চলছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যেনো প্রাণ হননের খেলা। ১৯৪১ সালে গ্রাজুয়েশন শেষ হয়ে গেল জমে ওঠে দুজনের প্রাণের মেলা। মোরলের চাকরি হলো ম্যানিটোবার ডউফিন শহরে স্থাপিত যুদ্ধকালীন পাইলট প্রশিক্ষণ স্কুলের আবহাওয়া অফিসার হিসেবে। ক্ল্যারাও এই প্রতিষ্ঠানে একটি কাজ পেয়ে গেলেন। সেনাবাহিনীর লোকদের জন্যে নির্ধারিত বিশ্ববিদ্যালয় কোর্সের ওপর শিক্ষাদানের মধ্য দিয়েই শুরু হলো ক্ল্যারার শিক্ষকতার জীবন। ১৯৪২ সালের ২২ মে জন্মদিনের কেক কেটে পরের দিন ২৩ মে দুজন মিলে কাটলেন বন্ধনের কেক। দুজনের কাজের মধ্য দিয়ে কেটে যায় মধুচন্দ্রিমার দিন মাস বছর। পরের বছর উচ্চশিক্ষার মোহে ক্ল্যারা চলে আসেন লন্ডনে। প্রথমে কাজ নেন ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারে। এর পর পাশাপাশি শুরু করেন ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স। থিসিস পর্বে এসে আমেরিকান উপন্যাসিক ক্ষণজন্মা থমাস ক্ল্যাটন ওলফ রচিত উপন্যাস ‘ইউ কান’ট গো হোম অ্যাগেইন’ নিয়ে কাজ শুরু করেই তিনি উদ্ভাসিত হতে থাকেন ক্যানাডীয় জাতীয়তাবাদের চেতনায়। তিনি ভাবতে থাকেন ক্যানাডীয় লেখকদের ওপর কোনো গবেষণামূলক কাজ করা যায় কী না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ওলফের ওপর কাজ বন্ধ করে তিনি ক্যানাডীয় নারী লেখকদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে এগুতে থাকেন। শুরুতেই তাকে হোঁচট খেতে হয়।

গবেষণার কাজে ক্যানাডীয় লেখকদের সাথে যোগাযোগ করা হলে অনেকেই ক্ল্যারার সাথে সহযোগিতা করেন নি। কারণ, এই সব লেখকদের লেখার অভিজ্ঞতা থাকলেও মৌলিক বিষয় নিয়ে গবেষণা সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিলো না। তাঁদের সন্দেহ হলো, ক্ল্যারা হয়তো তাঁদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়ি করছেন। এই ধরনের একটি প্রতিকূল সময়ে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হলেন ‘দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল’ পত্রিকার তখনকার গ্রন্থ সম্পাদক উইলিয়াম আর্থার ডীকন (১৮৯০-১৯৭৭)। সম্ভবত ডীকনই ক্যানাডার প্রথম ফুলটাইম গ্রন্থ সমালোচক। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত ‘চ্যাপ্টারস ইন অ্যা লাকি লাইফ’ নামক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে প্রফেসর ক্ল্যারা থমাস স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, “লেখকদের মানসিকতা সম্পর্কে জানার পর ডীকন আমাকে ডাকলেন গ্লোব অ্যান্ড মেইলের ডেস্কে। তারপর, একদিন তাঁর পত্রিকা অফিসের কাছের এক ক্যাফেটেরিয়ায় বসে রোস্ট পর্ক আর স্ম্যাসড পটেটো খেতে খেতে তিনি আমাকে অনেক অনুপ্রাণের যোগান দিলেন। ডীকনের ভাষায় আমি অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান কাজ করছিলাম। তিনি আমাকে সম্ভব সব রকম সাহায্যের আশ্বাস দিলেন। কারণ, আমি তখন এমন একটি কাজে হাত দিয়েছিলাম, যে ধরনের কাজ ক্যানাডায় আগে কখনো হয় নি।” উল্লেখ্য, ক্যানলিটের উন্নয়নে ডীকনের অবদানকে স্মরণ করে তাঁর মৃত্যুর পাঁচ বছর পর ১৯৮২ সালে প্রকাশিত ‘উইলিয়াম আর্থার ডীকন: অ্যা লিটারারী লাইফ’ বইটি যৌথভাবে গ্রন্থনার দায়িত্ব পালন করেন ক্ল্যারার ছাত্র এবং পরবর্তীতে সহকর্মী ইয়র্কের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক জন লেনক্স ও তিনি নিজে।

শেষ পর্যন্ত ক্ল্যারা থিসিস পর্ব শেষ করলেন। পরে তাঁর এই মাস্টার্সের গবেষণামূলক কাজটিই গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়েছিলো ‘ক্যানাডিয়ান নভেলিস্টস ১৯২৫-১৯৪৫’ নামে। এই গ্রন্থে যাঁদের কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলো, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আন্না ব্রাউনেল জ্যামিসন (১৭৯৪-১৮৬০), সুসানা মুডি (১৮০৩-১৮৮৫), ক্যাথারিন পার ট্রেইল (১৮০২-১৮৯৯), ইজাবেলা ভ্যালেন্সি ক্র্যাফোর্ড (১৮৪৬-৮৭) এবং মার্গারেট লরেন্স (১৯২৬-১৯৮৭)।

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধশেষে বিশ্বময় শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করলে তার কিছুটা ছোঁয়া ক্ল্যারার জীবনেও এসেছিলো। এই সময় স্বামী মোরলে স্থায়ীভাবে বদলী হয়ে আসেন টরন্টো আবহাওয়া অফিসে। ক্ল্যারাও চলে আসেন স্বামীর কাছে এবং এই একই বছরেই প্রথম ছেলে স্টিফেনের জন্ম হয়। কিন্তু ক্ল্যারার কাজ থেমে থাকেনি। ছুটে বেরিয়েছেন টরন্টো-লন্ডন-টরন্টো। কখনো লাইব্রেরিতে, কখনো ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধীনে টিচার্স ট্রেনিং প্রজেক্টে শিক্ষকতা কিংবা অন্যের বাড়িতে ক্লিনিং এর কাজ। সামারের সময় টরন্টোতে স্বামীর কাছে আসলে তখন বিভিন্ন সামার স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। ইংরেজ সাহিত্যিক ভার্জিনিয়া উলফের (১৮৮২-১৯৪১)মতো, ব্যক্তিগতভাবে, নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর তিনি অসাধারণ গুরুত্ব দিতেন। তাই তিনি পড়াশোনার ফাঁকে সময় ও সুযোগ পেলেই কাজ করেছেন – যে কোনো কাজ। ১৯৫০ সালে ছেলে স্টিফেন কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি হলে তিনি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন ক্যানাডীয় সাহিত্যে পিএইচডি কোর্সে ভর্তির জন্যে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, বিবাহিতা হওয়ার কারণে তাঁর আবেদন পত্র বাতিল করা হয় এবং লিখিতভাবে একজন মেয়ে হয়ে এই ধরনের কাজে এগিয়ে আসার জন্যে তাঁকে লজ্জ্বা দেয়া হয়। কিন্তু তিনি কখনো থেমে থাকেননি। মার্গারেট অ্যাটউডের (জন্ম. ১৯৩৯) মতো জেদি না হলেও ঠাণ্ডা মাথায় ক্যারিয়ারের পরিকল্পনা নিয়ে তিনি এগিয়ে যান। ১৯৫১ সালে দ্বিতীয় সন্তান জন ডেবিডের জন্ম হয়। জন স্কুলে ভর্তি হলে দীর্ঘ সাত বছর পর ১৯৫৭ সালে ক্ল্যারা আবার পিএইচডি কোর্সে আবেদন করেন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। এইবার তিনি অনুমতি পান এবং আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত তাত্ত্বিক ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল নরথ্রপ ফ্রাই (১৯১২-১৯৯১)সুপারভাইজার হিসেবে তাঁকে সর্বতোভাবে সহায়তা করেন। তিনি গবেষণা করেন আন্না ব্রাউনেল জ্যামিসনকে নিয়ে। আন্না জন্মগতভাবে আইরিশ হলেও প্রতিষ্ঠিত ইংল্যান্ডে। স্বামীর চাকরির সুবাদে ভ্রমন করেন ক্যানাডা। পর্যটকের জীবনকালে দেখা ক্যানাডাকে নিয়ে আন্নার দর্শন প্রকাশিত হয়েছে তার ভ্রমন কাহিনিতে। ফ্রাইয়ের তত্বাবধানে ক্ল্যারা থমাস পিএইচডি সম্পন্ন করেন ১৯৬২ সালে। ফ্রাইয়ের পরামর্শ অনুযায়ী আন্নার জীবন কাহিনি হিসেবে ক্ল্যারার ‘লাভ অ্যান্ড ওয়ার্ক এনাফ: দ্য লাইফ অব আন্না জ্যামিসন’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। এই গ্রন্থটিই তাঁকে ক্যানাডিয়ান লিটারেচার তথা ক্যানলিটের একজন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে খ্যাতি এনে দেয়।

এই দিকে ক্ল্যারা থমাসের পিএইচডি শেষ হবার আগেই ১৯৬১ সালে তিনি ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে প্রথম ফ্যাকাল্টি পদে নিয়োগ পান। এখানেও তিনি বৈষম্যের শিকার হন। নারী হওয়ার অপরাধে তাঁর বার্ষিক বেতন নির্ধারিত হয় মাত্র পাঁচ হাজার ডলার (সর্বনিম্ন)। কাজে যোগ দেয়ার পর তিনি তাঁর বিভাগীয় প্রধানের কাছে জানতে চান, পুরুষ ফ্যাকাল্টির তুলনায় তাঁর বেতন কম কেনো। জবাবদাতা ক্ল্যারাকে কর্তৃপক্ষের একটি চিঠি দেখান, যেখানে লেখা ছিলো, “বিওয়্যার অব হাইয়ারিং ওম্যান।” নারীর ক্ষেত্রে বৈষম্যের শেষ নেই জগতের কোথাও। একজন ফ্যাকাল্টি মেম্বার হয়ে তিনি বহু বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কমিটির সভায় অংশগ্রহন করার অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। তারপরও ঠাণ্ডা মাথার এই মানুষটি ধীর পায়ে এগিয়ে গেছেন। মনে মনে তিনি হয়তো হাসছিলেন। প্রি-কনফেডারেশন কালের ক্যানাডাকে আন্না জ্যামিসন ঠিক মতো চিনতে পেরেই তো রচনা করেছিলেন ‘উইন্টার স্টাডিজ অ্যান্ড সামার র‍্যাম্বলস ইন ক্যানাডা’ গ্রন্থটি। তাই, ক্ল্যারা থমাসকে কোনো বৈষম্যই থামাতে পারেনি তাঁর পথ চলা থেকে। গ্লোব অ্যান্ড মেইল পত্রিকার কলামিস্ট নরীন শানাহান তাঁর এক নিবন্ধে লিখেছেন, “ঊনবিংশ শতাব্দীতেও কিছু নারী লেখক ছিলেন যাঁরা ফুলটাইম লেখালেখি করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। এই সব নারী লেখকদের জীবন ইতিহাস ক্ল্যারা থমাসকে থামতে দেয়নি।”

ষাটের দশকের প্রারম্ভে মাত্র তিন জন ছাত্র নিয়ে ক্ল্যারা শুরু করেন ক্যানলিটের গ্র্যাজুয়েট কোর্স। ২০১৩ সালে ক্ল্যারার প্রয়াণে তদানীন্তন ইয়র্কের প্রেসিডেন্ট ড. ম্যামদাউ শোকরি তাঁর শোকভাষণে বলেন, “সত্তরের দশকে এসে ইয়র্কে ক্যানলিটের শিক্ষাদান ও গবেষণার ক্ষেত্রে যে নীরব বিপ্লব সংসাধিত হয়েছে, তা সময়ের চাইতেও দ্রুত, যুগান্তকারী এবং ক্যানাডার কোথাও তা হয় নি। ক্যানলিট বিপ্লবের এই মাত্রা অর্জন ক্ল্যারার কর্মনিষ্ঠারই প্রতিদান। তিনি যদি ক্যানলিটের একজন চ্যাম্পিয়ন হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি সামগ্রিকভাবে ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিরও একজন চ্যাম্পিয়ন। তাঁর এই অবদানের জন্যেই ২৪ মে ২০০৫ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভের নাম পরিবর্তন করে ‘দ্য ক্ল্যারা থমাস আর্কাইভস অ্যান্ড স্পেশাল কালেকশন্স’ নামে নতুনভাবে নামকরণ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তাঁকে সন্মানজনক ডিগ্রি প্রদান করা হয়েছে ইয়র্ক, ব্রক ও ট্রেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।”

ইয়র্ক থেকে অবসর নেয়ার এক বছর আগেই ১৯৮৩ সালে ক্ল্যারাকে সন্মান জানানো হয় দ্য রয়্যাল সোসাইটি অব ক্যানাডার ফেলোশীপ প্রদান করে। নারীর অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অগ্রসেনা এই শিক্ষাবিদ ৩০ বছর ধরে গ্রন্থ সমালোচনায় নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। অন্যতম সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন ‘জার্নাল অব ক্যানাডিয়ান স্টাডিজ’, জার্নাল অব ক্যানাডিয়ান ফিকশন’ এবং ‘লিটারারী জার্নাল অব ক্যানাডা’র মতো একাডেমিক পত্রিকায়। লেখালেখি করেছেন বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায়। সাহিত্যের ইতিহাস ও সমালোচনাসহ শত শত প্রবন্ধ তাঁর জন্যে কুড়িয়ে এনেছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি। তাঁর গ্রন্থনায় প্রকাশিত হয়েছে জ্যামিসন, ই রায়ারসন ও মার্গারেট লরেন্সের জীবনী। ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘দ্য ম্যানাওয়াকা ওয়ার্ল্ড অব মার্গারেট লরেন্স’ গ্রন্থটি লরেন্সের বিভিন্ন উপন্যাস নিয়ে একটি অনন্য এবং যুগান্তকারী সৃষ্টি। এইসব উপন্যাসের নানান চরিত্র প্রাণিত করেছে যুদ্ধ প্রজন্মের বুদ্ধিজীবী প্রফেসর ক্ল্যারা থমাসকে, শিখিয়েছে অধিকার আদায় করতে হলে কীভাবে ডিঙ্গিয়ে যেতে হয় বাধার পর বাধা।

ফরাসি ভাষায় রচিত গ্রন্থের সাথে ইংরেজি ভাষার ছাত্র ও পাঠকদের সেতুবন্ধনের জন্যে তিনি কুইবেকের ফরাসি ভাষায় রচিত সেরা গল্প ও উপন্যাসগুলো ইংরেজিতে অনুবাদের ব্যবস্থা করে সেগুলিকে আবার ইংরেজি বিভাগের অধীনে ক্যানলিটের সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ফরাসি ও ইংরেজি বিভাগের সীমানা এইভাবে উন্মুক্ত করে তিনি জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করার প্রয়াস চালিয়েছেন। নিজের উদ্যোগে তিনি ইংরেজি বিভাগে চালু করেছিলেন জীবনী লেখার ওপর বিশেষ কোর্স। ছাত্রদের পরিচালিত করেছেন নিজের সন্তানের মতো করে। নিজের ছাত্র মার্গট নর্দের পিএইচডি কোর্সে তিনি নিজেই সুপারভাইজার হয়েছিলেন। তাঁর ১৫জন ছাত্র পিএইচডি করে এখন দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাকাল্টি হিসেবে কর্মরত আছেন।

সদা হাস্যময়ী সাদা মনের মানুষ ক্ল্যারার শিক্ষকতা জীবনের একটি শ্রেষ্ঠ ঘটনা হচ্ছে ক্যানলিটে পিএইচডি করতে আসা ইস্ট ইয়র্ক শহরের প্রাক্তন মেয়র ৭৮ বছর বয়স্কা  ট্রু ডেভিডসনকে (১৯০১-১৯৭৮) তাঁর গ্র্যাজুয়েট ক্লাসে ছাত্র হিসেবে পাওয়া। তাঁর একাগ্রতা ও শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে পরে তাঁকে মৃত্যুর আগেই সম্মানজনক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হয়। ডেভিডসনের চিকিৎসার জন্যে ক্যানাডীয় লোকশিল্পী এডিথ ফকের (১৯১৩-১৯৯৬) নেতৃত্বে ক্ল্যারা গড়ে তুলেছিলেন একটি তহবিল সংগ্রহ প্রকল্প। ডেভিডসনের মৃত্যুর পর অবশিষ্ট হাজার হাজার ডলার দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের জন্যে তিনি প্রচুর বই কিনেছিলেন। শিক্ষার প্রসারে এইভাবে তিনি সাদা মনে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।

প্রফেসর ক্ল্যারা থমাসের কাজের প্রতি সম্মান জানাতে তাঁর অবসরের দিন ৩১ মে ১৯৮৪ আয়োজন করা হয়েছিলো এক অভূতপূর্ব রিটায়ারমেনট ডিনার, যেখানে সমবেত হয়েছিলেন মার্গারেট লরেন্সসহ অনেক সাহিত্য তারকা। অনুষ্ঠানে মার্গারেট লরেন্স পাঠ করেন ৩২ লাইনের একটি কবিতা ‘ওড ফর ক্ল্যারা থমাস অন হার রিটায়ারমেন্ট ডিনার’, যেখানে তিনি বলতে চেয়েছিলেনঃ

She’s is a writer, a fighter, a teacher, a friend,

Retirement’s a start again, never an end.

অবসরের পরও অবসর আছে। সব শেষেরও শেষ আছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে কী ছিলো আমরা জানি না। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩ আবহাওয়াবিদ মোরলে থমাসের ৭১ বছরের ধরে রাখা হাতটি আর ধরে রাখা গেলো না।

 

 

 

 


 


০১ জুলাই, ২০১৮ ১২:৪১:০৭