কয়েকটি কানাডীয় কবিতা
অনুবাদ: সুরজিৎ রায় মজুমদার
অ+ অ-প্রিন্ট
সুরজিৎ রায় মজুমদার

              মাছরাঙার কান্না


               ফ্রাঙ্ক অলিভার কল

[ফ্রাঙ্ক অলিভার কল  (১৮৭৮-১৯৫৬)। জন্ম কুইবেক। পড়াশোনা বিশপস কলেজ এবং ম্যাকগিল। পেশায় শিক্ষক। লুইস মোরে বউমান, রাল্ফ গুস্তাফসনদের সাথে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। সেকালে অমিত্রাক্ষর ছন্দের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক। কানাডিয়ান মডার্নিজম এর অন্যতম অগ্রদূত।]


তাঁবুর বাইরে


আঁধার আর দৈত্যাকৃতি গাছেরা বাতাসে দোল খায়।


ভয়ার্ত স্বপ্নের মাঝে গুমরে কাঁদে হ্রদ।


আর উদাস উর্মিমালা পারে বেশ দূরে,


বাতাসের গুনগুন সুর ছাপিয়ে,


থেকে থেকে বুনো এক মাছরাঙা কাঁদে ,


 আঁধার জলের ওপর যেন ক্লান্ত একাকী এক পাখি।


 


তাঁবুর ভেতরে


তোমার আয়েশি নিশ্বাস,


বাতাসের সুরেলা আলাপ কিংবা মাছরাঙার বিলাপ যাকে করেনি ব্যাঘাত ;


মুখ তোমার কয়লার আগুনের লালিমায় লাল।


 


দূরান্তে মৃদুমন্দ মাছরাঙার কান্না প্রতিধ্বনি ,


যা এখন কেবলি এক নির্জনতার গান


আমাকে শুনিয়ে ফেরে বিদায় বারতা,


রাতের আঁধারে দূরে মিলে যেতে যেতে।


 


ঘুমের মধ্যে তোমার আলতো নড়া-চড়া


পরক্ষণে মুখ তোমার আমার মুখোমুখি -


মাছরাঙা তখন আর কোথাও কাঁদে না।

 

 


সাগর বালুকা


লুইস মোরে বউমান

[লুইস মোরে বউমান (১৮৮২-১৯৪৪)।  জন্ম শেরব্রোক, কুইবেক। স্বশিক্ষিত, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাননি। বন্ধুতালিকায় ছিলেন ফ্রাঙ্ক অলিভার কল, ফ্লোরেন্স রান্ডাল লিভসে। বিখ্যাত 'পোয়েট্রি' তে তাঁর কবিতা ছাপা হয় এবং সম্পদক হ্যারিয়েট মনরোর মনোযোগ পান। এ জে এম স্মিথ ১৯৪৩ এ   তাঁর  'বুক অফ কানাডিয়ান পোয়েট্রি' তে বউমান এর কবিতা ছাপলেও দ্বিতীয় সংস্করণে তা বাদ দেওয়া হয়। কানাডিয়ান মডার্নিজম এর অন্যতম অগ্রদূত।]


 


ছন্দময় অতলান্ত সাগর


আর মৃত্তিকার ঋদ্ধ, উষ্ণ উর্বরতার মাঝামাঝি


জায়গায় থাকে সাগর বালুকা ,


বেলা আর বালিয়াড়ির অস্থায়ী বালুকা,


বিশুদ্ধ, অলৌকিক, সমুদ্র-কণিকা, সবুজ পৃথিবীর সাথে যার বিস্তর আড়ি,


কৃষকের লাঙ্গলে খোঁড়া বাদামি কর্ষিত উর্বর মৃত্তিকা সারি


সতত উন্মুখ যারা বীজ আর জিয়নকাঠির  অপেক্ষায়।


 


এই বালুর উপরে


আমি শুয়ে থাকি আর দেখি বুনো সাগর-ঘাস হামাগুড়ি দিয়ে


অভিযাত্রীর মতো বালিয়াড়ি বেয়ে ওঠে,


সাথে বুনো মটরশুঁটির লতাও দাপটের সাথে খামচে ধরে মাটি


নাছোড়বান্দা শেকড়ের জট গেড়েছে এই বন্ধ্যা ভূমিতে ...


ফুলফোটা বৃথাই হলো উপহাস।


 


হাতে নিয়ে একমুঠো বালু


একটু একটু করে আঙুলের ফাঁক গলে পড়ে যেতে দেই, চেয়ে দেখি


অগণিত ক্ষুদ্র সূক্ষ্ম কণা - বিচূর্ণ ঝিনুক আর পাথরের দানা


সুদূর অতীতে যারা ক্রমাগত ঢেউয়ের আঘাতে বিচূর্ণ


বালুকার তারারাজি হয়ে যেন শুয়ে আছে শিলা শয্যায়।


 


সূর্যাস্তের সিক্ত বেলাভূমি, জোয়ারের ফেলেযাওয়া


বালুরাশি ঝিকিমিকি জ্বলে, অপরূপ বর্ণিল চ্ছটা,


যেন বালুকার প্রেমডোরে বাঁধাপড়ে ভুলে গেছে সময়ের তাড়া।


কেউ কি ভেবেছে এই মধ্যাহ্নের জোয়ার এভাবে


রংধনু হয়ে যেতে পারে : গোলাপি আভার সাথে নীলাভ সবুজ ;


বেগুনির সাথে মিলে স্বর্ণালী শোভা, কিংবা ক্ষণিকের তরে


যেন রক্তাভ লালিমার ছোপ, বর্ণিল রংধনু মিলে যেতে যেতে...


 


অতঃপর একাকী রজত আভায় ভাসে শশীকলা, জোছনারা


ঢলে পড়ে বালুকা বেলায় - বিশুদ্ধ, অলৌকিক, সময়ের সমুদ্র-কণিকা।


 


                                             রূপান্তর

                                             রেমন্ড নিস্টার

[রেমন্ড নিস্টার (১৮৯৯-১৯৩২)। জন্ম রাসকম, অন্টারিও। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন কিন্তু অসুস্থতার কারণে ছেড়ে দেন। ট্রাজেডি ভরা জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত। একাধারে ছিলেন ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, সম্পাদক ও সমালোচক। 'পোয়েট্রি' এবং 'দিস কোয়ার্টার' এর মতো সাময়িকীতে তাঁর কবিতা ছাপা হতো। অনেক অঘটন পেরিয়ে ১৯৪৯ এ তাঁর 'কলেক্টেড পোয়েমস' বের হয় রায়েরসন প্রেস থেকে ডরোথি লিভসের সম্পাদনায়। ]


 


আমি আর কিছুতে অবাক হবো না


শুধু সবকিছু জানব সঠিক।


 


পাতারা বদলে যায়, পাখিরা, ফুলেরাও,


তবু বছর ঘুরে তারা রয়ে যায় অবিকল আগের মতোই।


 


সাগরের দীর্ঘশ্বাসে স্ফিত স্তন বাহুডোরে পেতে চায় আকাশের চাঁদ,


তবু তারা চিরকাল রয়ে যায় চাঁদ আর সাগর হয়েই।


 


যেভাবে বৈরী সময়ে গাছেরা দাঁড়িয়ে রয় একাকী টান টান হয়ে,


আর অকালিক সময়ের বিফল আর্তনাদ বাতাসে ভাসায় ।


 


তুমি শুধু রয়ে যাবে কেবলই তুমি,


আমি পাবো শুধু তোমাকে আরো বেশি,


নিস্ফলা মওসুমের একমাত্র উৎকৃষ্ট আঙুরের ফসলের মতো।


 


সাগরও তো বুকভরে শ্বাস নেয়, ভাবে অথবা গর্জন করে,


চোখ ধাঁধাঁ রোদে ভাসা কিংবা প্রলয় দিনের মতো কুহেলিকাময়;


তবু সাগর থেকে যায় একইরকম অবিকল।


 


আমি আর কিছুতে অবাক হবো না


শুধু সবকিছু জানব সঠিক।

 

 

                                           একটি স্থানীয় ইতিহাস

                                           জেমস আর্থার

 [আর্থারের আদি নিবাস টরন্টো, কানাডায়। জন্ম উনিশশো চুয়াত্তর, আমেরিকার কানেক্টিকাটে। বর্তমানে আবারো তিনি মার্কিন মুলুকে অভিবাসী। পরিবার নিয়ে থাকছেন বাল্টিমোর। প্রথম কবিতার বই 'চার্মস এগেইনস্ট লাইটনিং' কপার ক্যানিয়ন প্রেস থেকে বের হয়েছে ২০১২ সালে। ইতিমধ্যেই কবিতার জন্যে নিদেনপক্ষে পাঁচ-সাত টা স্কলারশিপ/ফেলোশিপ তার থলিতে জমা হয়ে গেছে। পেশা হিসেবে জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখালেখি বিষয়ক সেমিনারগুলোতে নিয়মিত শিক্ষকতা করছেন।]

 


ঠাকু'মার্ বাড়ি ছিল পুরো মাছির আড্ডাখানা


জানালার কাঁচে ওরা একে অন্যের গায়ের ওপর হাঁটে


অথবা ভন ভন ঘুরে ঘুরে মরে থাকবে সবখানে -


 


এতো এতো গাদা গাদা যে তুমি সারাক্ষণ


ঝাড়ু দিয়েও মরা মাছি মুক্ত মেঝে পাবে না কখনো।


পাহাড়ের ঢালে কাঁটা-ওয়ালা খাগড়ার ডোবা,


 


শুকনো জলবিছুটি পট পট ফোটে, বাতাসে


ওড়ায় বিচি অনাদিকাল যেভাবে বংশ বিস্তারের


আদি ও অকৃত্রিম কায়দা চলে এসেছে।


 


সুদূর অতীতে, পেশল হাতের এক


ধার্মিক পুরুষ লাঙ্গল-ভাঙা বড় বড় পাথরের চাঁই


কোনোমতে ঠেলে ঠুলে ঘাম ঝরা শ্রমে


 


একদা রেখেছিলো গাদা করে গাছালির ফাঁকে,


যেগুলো আমার শৈশবে একই রকম দেখেছি , অচলায়তন,


পড়ে থাকা, যেরকম থাকতো অতীতের মৃত


 


কোনো স্যাক্সন পুরুষের দেহাবশেষ ঢেকে


যাদের কবরের অবশেষ জুড়ে আছে বেশ খানি বাল্যস্মৃতির পট।


পিতামহী আজ মৃত। আগেই গিয়েছে চলে


 


বাচন ক্ষমতা তাঁর, ঘর-বর-নাম-ধাম স্মৃতির পসার


যদিও আমার স্মরণে তিনি এখনো বহাল পিতামহী


যে প্রত্যুষে পাহাড়ের ঢালে হেঁটে নামে, অবিশ্রান্ত দীর্ঘ শরতে,


 


আগাছায় ভরে থাকা হিম হিম জলের ডোবায়।


ঝাউ ঝাড়ে শাসানো বাতাস, একফালি শহুরে তুষার প্রাচীর -


পিতৃপুরুষের দেহভস্ম মাখা দক্ষিণ অন্টারিওর


 


এই মায়াবী মৃত্তিকা।  কলেজ জীবনে পড়া


সেই এক ইতিহাস যেন আজও মনে আছে


সেই স্যাক্সন রাজাদের কথা, পূর্বতন পুরুষের সভ্যতার


 


অবশেষ দেখে বিমোহিত শুধু যেন তারা, অক্ষম


পুণঃনির্মানে - স্থাপত্য, জনপথ রোমক


রাজাদের ফেলেযাওয়া কৃতি - সেই স্যাক্সনেরা


 


যারা এসেছিলো পরে, তাদের ও আগে যারা


গড়েছিল এক জনপদ এবং কালের নিয়মে বিলীন


ইতিহাস। কোথা সে অশ্ব, অশ্বারোহী - বিলাপের সুরে


 


যেভাবে বিস্মৃত এক স্যাক্সন কবি লিখেছেন বেদনা-এলিজি


শত শত বর্ষ আগে হত, পরাভূত অথবা


সমুদ্রে বিতাড়িত সেইসব পূর্বতন মানবের শোকে।


 


 


স্মৃতির ভূগোল


ডরোথি ফিল্ড

[ডরোথি ফিল্ড জন্মসূত্রে মার্কিন হলেও ১৯৭১ সালে কানাডায় চলে আসেন। ভিক্টোরিয়ার বনানী ঘেরা এক এলাকায় স্থায়ী নিবাস গড়েছেন। পেশা মূলত ভিজ্যুয়াল আর্ট হলেও তিনি কবি ও শিশু সাহিত্যিক। 'দি ব্ল্যাক বার্ড মাস্ট বি' নামে সর্বশেষ টি নিয়ে তাঁর তিনটি কবিতার বই রয়েছে। এশিয়ান মিস্টিসিজম এর প্রতি তাঁর ঝোঁক রয়েছে।]


মা আমার ভোলে না কিছুই  সেই কোন কবে


এক বন্ধুর সাথে ভেজেছি বিস্কুট ‘মজার রান্না’ বই দেখে


কিভাবে ময়দাগোলা ছিটে আঁকি-বুকি হয়ে যায় কিচেন দেয়াল।


ষাটটি বছর গেলো। আজ এসেছি তার পঁচান্নব্বইতম জন্মদিনে।


মা যদিও  ভুলে গেছে সেই আমার বন্ধুর নাম, আমি ভুলিনি, কেননা


মা-ই তো কতবার করে বলেছে আমায় সেই নাম কত অছিলায় ;


মা আমার কখনো বিস্কুট ভাজেনি, ছিটায়নি ময়দা দেয়ালে। মোছেনি


রান্নাঘর কাজ শেষ হলে। বুয়াই করতো ধোয়া-মোছা।


 


বারো বছর ধরে যখনি দেখা হয় মা আমার কেবলই জানতে চায়


ছেড়ে যাওয়া স্বামী কখনো চিঠি দে কি-না। না।…


বারোবছর ধরে একই উত্তর।  মা আমার এখন আর চায় না


জানতে আমার সেই স্বামীর বোনের বাচ্চারা তাদের কালো বাবাকে


দেখতে যায় কি-না। উত্তর তো সর্বদাই ছিল ‘না’। আমার পুরোনো বন্ধুর


জুটেছে কি মেয়েসঙ্গী –মা সুধায়। ‘হ্যাঁ’ আমি বলি তারে দশ বছর ধরে -


 


এমন কেমনে হয় মা মনে রাখে শুধু বিস্কুট ভাজি, নয় কোনো মধু-যামিনী ?


ভুল তাকে বোঝাতাম যদি মিথ্যে আশ্বাসে, বুঝে কি ফেলতো  সে চালাকি আমার?


মা কেবলই কিছু খোঁজে, ব্যাথার দাঁতে যেমন অজানিতে চলে যায় জিব সেরকম,


আমার পাপ-অনিয়ম-অপ্রাপ্তিগুলোতে, বন্ধুদের সাথে আমার উড়নচন্ডী


গড্ডালিকাপনায়। এভাবেই কি জোড়ে তার সম্পর্কের সুতো ?


 


নির্ঘাত মৃত্যুর সেই বিভীষিকা মাখা দুধকোশী, কালীগণ্ডকী


পাহাড়ি গহীন নদী অনেক উঁচুতে যার নাজুক দড়িতে ঝোলা


মৃত্যুর ফাঁদ পাতা ফাঁকা ফাঁকা নড়বড়ে মাঝে মাঝে খসে পড়া


কাঠের সেতু টেনে ধরা কংক্রিট থামের গায়ে


লোহার বিমের মতো ? নিচে যার অতলান্ত কুহকিনী খাদ।


চোখ আটকে রাখো দূরের কিনারে। নিচে তাকিয়ো না।


নিঃশ্বাস বন্ধ রাখো। রুদ্ধশ্বাসে নিরন্তর সামনেই হাঁটো।


 


০১ জুলাই, ২০১৮ ১২:২৪:৪৫