আত্মোপলব্ধি
মৌসুমী প্রামাণিক (মৌসান)
অ+ অ-প্রিন্ট
ক'দিন ধরে একটি বিশেষ শব্দ আমাকে বিরক্ত করছে। “ভুলবোঝাবুঝি”। এটা একটি মারাত্মক বিষ স্লো পয়জিননিং করে করে সম্পর্ককে মেরে ফেলে। কারণ আমাদের ইগো সত্যিটাকে অনুসন্ধান করতেও চায় না, জানলেও কখনো মানতেই চায় না। কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমি সম্পর্ক গুলোকে কয়েকটিভাগে ভাগ করেছি। 

১) ভালচুয়াল সম্পর্ক:- কিছু মানুষ আছেন যারা কাজের চাপে সোসাল মিডিয়ায় আসার সময় পান না; শুধুমাত্র তিনবেলা উইশ করে এবং পোস্টে চোখ বুলিয়ে, দু একটা লাইক দিয়ে তারা সোসাল মিডিয়াকে টাটা বাই বাই করে ঘুমোতে যান। আমি তাদের কথা বলছি না। আমি তাদের সম্বন্ধে আলোচনা করছি যারা সোসাল মিডিয়ায় বেশ অ্যাক্টিভ থাকেন ও বিতর্কে অংশগ্রহণ করেন, পরকীয়া করেন, ভারচুয়াল প্রেম করেন এবং যারা কবি ও লেখক। আমি আজকাল ফেসবুক বা গ্রুপ গুলোতে আমার সাহসী লেখাগুলো দিতে ভয়ানক ভয় পাই। স্বতঃস্ফুর্ততা আমি মানুষটার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং আমার লেখাতেও তাই থাকে। আমি প্ল্যানিং করে ভেবে চিন্তে একবর্ণও লিখি নি আর পারবোও না। অনেক পাঠক আছেন তারা স্বতঃস্ফুর্ত ভবেই সেগুলো গ্রহণ করেন, তাদের মতামত জানান, আবার কিছু মানুষ আছেন সরসারি আক্রমণ করেন। এই জায়গাটাই আমি ধরতে চাইছি। নাটক করতে গিয়ে শিখেছিলাম, “আমি তোমাকে ভালবাসি না” কথাটা দশরকমভাবে বলা যায়। নির্ভর করে আমার গলার স্বর, অভিব্যক্তি, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ইত্যাদির ওপর। ভারচুয়াল সম্পর্কে অভিব্যক্তি, গলার স্বর কিংবা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ জানার কোন সুযোগ নেই। তাই একটি কথা আমরা আমাদের মত করেই পড়ে নিই। আমরা একটি লেখাকে কিভাবে নেব সেটা আমার সেইসময়ের মানসিক স্থিতির ওপর নির্ভর করে যেমন ধরুন “নো কমেন্টস” কথাটা আমি জেনারেলি বিতর্ক এড়ানোর জন্যে ব্যবহার করি। এবার কোন মানুষ কাউকে অবজ্ঞা করার জন্যেও ব্যবহার করতে পারে। এমনও তো হতে পারে, সত্যিই আমার সেই বিষয়ে কিছু বলার নেই ঐ মুহূর্তে! কেউ হয়তো ভাবলো আমি তার প্রস্তাবিত কথাকে অপমান করছি, তাই ঐ শব্দ ব্যবহার করছি। ব্যাস! ভুলবোঝাবুঝির শুরু। তর্ক শুরু। আর এর শেষ সম্ভবতঃ সম্পর্কের সমাপ্তিতে। 

আমাদের প্রত্যেকের জীবনের একাকীত্ব আমাদের ভারচুয়াল সম্পর্কের দিকে এগিয়ে দিয়েছে। তা সে বিয়েবাড়ির ছবি পোস্ট করা হোক কিংবা সকালবেলায় নিজের সেলফি তুলে পোস্ট করা কিংবা বেড়াতে যাবার বা ডিনারটেবিলে খাবারের ছবি সবটাই শুধুমাত্র নিজের গুরুত্বকে যাচাই করার একটি মানসিক অবস্থান। এর পজিটিভ, নেগেটিভ দুদিক’ই আছে। কিছু মানুষ যাদের কাছে তেমন স্কোপ নেই কিংবা তিনি নিজে কোন কারণে মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত, তার রোজ রোজ ঐসব ছবি দেখতে মোটেই ভাল লাগে না। আবার কোন মহিলা তিনি যেমনই দেখতে হোন না কেন ছবিতে ৫০০ লাইক পড়ে যাওয়াটা কোন ব্যাপারই না। কিন্তু সেই পুরুষের হয়তো ১০০ পেরোলো না; তিনি গেলেন ক্ষেপে। ভাই অকারণে রাগ না করে পোস্টগুলো ইগনোর করে গেলেই হয়। আপনার পছন্দের পোস্ট খুঁজে নিন। কত গ্রুপ, কত পেজ, কত ই-ম্যাগাজীন। অভাব তো নেই। ওনাকে ওনার মতো ছেড়ে দিন কারণ ঐ একটি ছবি তাকে পজিটিভলি বুস্ট আপ করে। আমি নিজে যখন অবসন্নতার মধ্যে থাকি, মুড অফ থাকে, নিজের ছবি নিজেই এডিট করে পোস্ট করি। আমি দেখেছি যে সত্য হোক, মিথ্যে হোক, নাইস, বিউটিফুল, সুইট ইত্যাদি কমেন্টস আমার আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনে। যখন ছবিগুলো তুলবেন মনটা সাদা রাখবেন, আপনার হাসি, আপনার তাকানোর মধ্যে যেন সরলতা থাকে; তাহলেই দেখবেন লাইকের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। কারণ একমাত্র সরলতাই মানুষের হৃদয় স্পর্শ করতে পারে।

আজকের দিনে সোসাল মিডিয়া আমাদের বন্ধু, সাথী যাই বলুন না কেন আমাদের জীবনের অঙ্গ হয়ে গিয়েছে। লেখকের সঙ্গে পাঠকের সম্পর্ক থেকে শুরু করে, ওয়েল উইশার, দাদা- বোন, প্রেমিক প্রেমিকা ইত্যাদি কত সম্পর্ক গড়ে উঠছে প্রতিদিন। আমরা সমাজ থেকে, শহর থেকে দূরে গিয়ে জঙ্গলে বাস করতে পারি, কিন্তু ফেসবুককে ছেড়ে বাস করার কথা ভাবতে পারি না। এই সম্পর্কের দরুন করুন পরিণতিও কিছু কম ঘটছে না। বিশেষ করে প্রেমের ক্ষেত্রে। শুধুমাত্র কথার ওপর নির্ভর করে কি সত্যি একজন মানুষকে ভরসা করা যায়? ভালবাসা যায়? যেহেতু চিটেড হলে বড় কিছু ক্ষয় হবার, হারিয়ে যাবার আশঙ্কা নেই, তাই এই সম্পর্কের মধ্যেই মানুষ নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে। আমি নিজেই তো কদিন কোন লেখা না দিলে কেমন যেন হাঁপিয়ে উঠি। আবার সকলের সঙ্গে ইনবক্সে কথা বলতেও ভয় পাই। কে কখন সেক্স চ্যাট করার অফার দিয়ে দেবে আর আমি রণচণ্ডীর রূপ ধারণ করবো। সেদিক থেকে দেখতে গেলে সেক্স চ্যাট করাটা তো অপরাধ নয়। যাদের বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহসটা নেই কিংবা সুযোগ নেই, তারা কি আর করতে পারে?

অন্যান্য ক্রিয়েটিভ মানুষের মতোই আমিও মুডি। যদি দুদিন কারোর কথার উত্তর না দিই, তিনি সঙ্গে সঙ্গে আমার লেখিকা সত্ত্বাকে আক্রমণ করবেন। আমাকে অহংকারী হিসাবে পাবেন। আসলে ভরসা, প্রত্যয় এসব না থাকলে সম্পর্কের ভিত মজবুত হয় না। আর এগুলো শুধু শব্দের মধ্যে খোঁজা বৃথা। তাহলে যারা হাজার হাজার মাইল দূরে থাকেন, তাদের সঙ্গে সম্পর্কের কি হবে? আ্যাট লিস্ট কখনো কখনো ফোনে বা ভিডিও চ্যাটে কথা বলাই যায়। কিছুটা অভিব্যক্তি চোখে মুখে ধরা পড়লে সংশয় দূর হবে। সম্পর্কের ভিত কিছুটা শক্ত হবে। সোসাল মিডিয়া যে আমাদের বড় বন্ধু সে কথা অস্বীকার করার জায়গায় তো আমরা নেই। আবার তার ওপর এমন ভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়াটাও কোন কাজের কথা নয় যে তাকে ছাড়া বাঁচবোই না। হতেই পারে একটি সুন্দর সম্পর্ক তৈরী হল সোসাল মিডিয়ায়। তাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য সাহস করে ফোনে কথা বলতে হবে, মিট করতে হবে, ভিডিও চ্যাট করতে হবে। শব্দের বান তো রোজ ছোটে নিমেষে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। একঘন্টায় হাজার হাজার শব্দ লেখা হয়ে যায়। তাই ভিডিও তে না হয় কিছুক্ষন চুপ করে দুজন দুজনকে দেখলাম; চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করলাম। চোখের এক্সপ্রেসান কিন্তু সরাসরি হৃদয়ে প্রবেশ করে। চোখের দৃষ্টি নিয়ে কত প্রেমের গান গাওয়া হয়েছে, সে তো আর এমনিই এমনিই নয়। চোখই যে মনের আয়না।

বাধ্যবাধকতা থাকলে না হয় বন্ধুত্বেই সীমাবদ্ধ থাকলো সম্পর্কটা। কিন্তু কেউ তো একজন পাশে থাকলো; সুখে দুখে যার সঙ্গে মানসিক টানাপোড়েনগুলো, না পাওয়ার যন্ত্রনা গুলো শেয়ার করা যায়। তবে হ্যাঁ, অন্য সম্পর্কগুলোর মতোই এখানেও দুজনকে কমিটেড থাকতে হবে। কমিটমেন্ট ছাড়া কোন সম্পর্ক হতে পারে না। তাহলে সেটা শুধুমাত্র ফান ছাড়া আর কিছু নয়। হ্যাঁ ভুলবোঝাবুঝি হবে, হতে বাধ্য কারণ দুজন সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ, আলাদা তাদের বড় হওয়া, আলাদা তাদের পছন্দ, আলাদা তাদের মানসিকতা। কিন্তু দ্রুত নিজেদের মধ্যে শান্ত ভাবে কথা বলে সেই মিস আণ্ডারস্ট্যান্ডিং কে খতম করে সমাধান সূত্র খুঁজে নিয়ে এগোতে হবে। “সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে” কবির এই কথাটিই এক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

রইলো বাকী পোস্টের বিরূপ মন্তব্য থেকে ঝগড়া ভুলবোঝাবুঝির কথা? সে হবেই। তর্ক বিতর্ক হচ্ছে মানেই পোস্টটি কাজে লেগেছে। শুধু লাইকের তো কোন প্রাণ নেই। তবে ঝগড়া গালাগালি যাই করে থাকি না কেন। পরের দিন, নতুন সকালে ইনবক্সে গিয়ে সরি বলে সম্পর্কটাকে আবার একটা চান্স দিলেই কিন্তু সব মিটে যায়। একই মনের লোকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বোর হয়ে যাবো না? কিছু অন্য মত বা উৎপটাং মন্তব্য করার লোক না থাকলে কি আর সোসাল মিডিয়াটাও ইন্টারেস্টিং থাকবে? তবে “বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনী” টাইপের অ্যাটিটিউড কুরুক্ষেত্রই বাধাবে, রক্তক্ষরণ ঘটাবে মনের। তাই নতুন সূর্যের ভোরে সাদা নিশান দেখিয়ে সন্ধি করে নেওয়াটাই সোসাল সম্পর্ককে উন্নত করবে বলেই আমার ধারণা।

লেখক পাঠকের মধ্যেকার সম্পর্কটা টক-ঝাল-মিষ্টি; দুজনের মধ্যে পাবলিকলি ঝগড়া না করে ইনবক্সে গিয়ে করলেই মনে হয় বেটার হয়। সকলের ইন্টেলেকচুয়াল এবিলিটি সমান হয় না। ছোটবেলায় পড়েছি, বিদ্যা দান করলে বাড়ে আর বিদ্যা নিয়ে অহংকার পরিতাজ্য। পাঠকের জন্যেই তো লেখা। ভাল না লাগলে নিশ্চয় বলুন এবং দাবী করুন কি ধরনের লেখা আপনি আশা করেন লেখকের কাছ থেকে। দুজনের মধ্যে সম্পর্কটা যতো গঠনমূলক হবে ততই সাহিত্যের উন্নতি। আমরা লেখকরাও সবসময় সমালোচনা শান্ত মনে নিতে পারছি না। সেটাও বিপদের লক্ষন। আমরাও অহঙ্কারী হয়ে উঠি। আমি ক্রিয়েট করতে পারছি, আর ক’জন সেটা পারে? ভুল, এই অ্যাটিটিউড ভীষনরকম ভুল আমাদের। আমাদের হাতে কিছুই থাকে না। ডেসটিনি সব স্থির করে দেয়। আজ আমি ক্রিয়েট করতে পারছি, কাল যদি আমার চোখ না থাকে কিংবা হাতটা চলে যায়, তখন? আমি কি আর লিখতে পারবো? ডেসটিনি চাইলে আমি ফুরিয়েও যেতে পারি। ঋষি অরবিন্দকেই উদাহরণ হিসাবে দেখি না কেন? এসেছিলেন স্বাধীনতার যুদ্ধে বিপ্লব ঘটাতে, হয়ে গেলে সন্ন্যাসী। কেউ কি ভেবেছিল ঐরকম টগবগ করে ফুটতে থাকা চির যুবক মানুষটি ষড় রিপুকে ত্যাগ করে সংসার ত্যাগ করে বিবাগী হবেন? তিনি নিজেও বোধহয় সেটা জানতেন না। সুতরাং আমাদের যথাসম্ভব বিনয়ী হতে হবে। কেউ কেউ আমাদের প্রসঙ্গে “ঘরের খেয়ে বোনের মোষ তাড়ানো” ধরনের কথা বলেন ঠিকই; কিন্তু বোনের মোষগুলোকে না তাড়ালেও নয়; আপনাদেরই সুখনিদ্রা ব্যাহত হবে যে! সামাজিক অবনমনের কথা তো আমাদেরই লিখতে হবে; বাস্তবচিত্রটা লেখনীর মাধ্যমে আমাদেরই দর্পনের মতো তুলে ধরতে হবে। সেখানে মুখ আর মুখোশের কোন স্থান নেই। এখনও মানুষ যে বই পড়তে ভাল বাসছেন এটা সমাজের পক্ষে খুব ভাল একটা সাইন। কারণ বইয়ের থেকে ভাল সাইক্রিয়াটিস্ট আর নেই, লেখার থেকে ভাল সাইকোথেরাপি আর হয় না। আর যেহেতু কলম তরবারির চেয়ে শক্তিশালী, তাই আমার আত্মোপলব্ধি প্রত্যেকের হৃদয়ে ভিন্ন রূপে স্পর্শ করবে, এই আশা রেখে সমাপ্তি টানলাম। অন্য সম্পর্ক নিয়ে আর একদিন লিখব।

 

২৭ মার্চ, ২০১৮ ২৩:২১:৫৩