আনা বাহিব্বিক
বাদল আহমেদ
অ+ অ-প্রিন্ট
মার্কেটের বাইরে এক চিলতে সবুজ ঘাসের বুকে একটা কাঠের বেঞ্চ, আর সেই বেঞ্চ এ বসে আছে বাঙালী যুবক রেজা। তার সামনে কয়েকটা জালালি কবুতর। রেজা একটা প্যাকেট থেকে রুটি বের করে ছিঁড়ে ছিঁড়ে সামনে ছুড়ে মারছে আর কবুতরগুলো সিরিয়াস ভাবে সেগুলো খুটে খাচ্ছে আর মাঝে বাকুম বাকুম আওয়াজ দিচ্ছে।

সুইডিশ কবুতরগুলো কি বাঙালী কবুতরের মতো একই ভাষায় কথা বলে, নাকি এদের আলাদা ভাষা আছে?

এরকম এটা সেটা ভেবে রেজার দিন কেটে যায়।

রেজা কিন্তু বেকার নয়, বরং বেশ টাকা কড়ির মালিক।

সফটওয়ার নিয়ে কাজ করে, কামাই ভালোই।

আগে সরকারী কাজ করতো, এখন সে কাজ ছেড়ে দিয়ে নিজে কনসালটেন্সি করে। অফিসে যেতে হয় না। যখন খুশী করলেই হয়।

আরও একটু রুটি ছিঁড়ে ছুড়ে মারল রেজা।

যান্ত্রিক গতানুগতিক জীবনের বাইরে এটাই তার একমাত্র প্যাশন।

পাখীগুলো তাকে চেনে, প্রতিদিন ঠিক একই সময়ে এসে তার জন্য অপেক্ষা করে।

একটা মেয়ে এসে বেঞ্চের আরেক মাথায় বসে মন্তব্য করলো,

- পাখীদের খাওয়াচ্ছ, কি মজা!

রেজা মেয়েটার দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল, ক্যামন যেন ঘোরের মধ্যে আছে। বেশ সুন্দরী হলেও চেহারার লাবন্য ক্যামন যেন ছুটি নিয়েছে।

হয়তো ড্রাগ এডিক্ট।

মেয়েটি তার সাথে ভাঙা ইংরেজিতে কথা বলছে।

রেজা ভদ্রতা করে দুই টুকরা রুটি মেয়েটার দিকে এগিয়ে দিল,

- নাও, তুমিও খাওয়াও।

খুব উৎসাহের সাথে ওর হাত থেকে রুটির টুকরো দুটো নিয়ে মেয়েটি একটু একটু করে ছুড়ে দিতে লাগলো।

একটু পরেই সে রুটির একটা টুকরা নিজের মুখে পুরে দিল,

- বাহ! বেশ মজাতো?

- হু, আমি এটাই খাই। বেশী করে কিনি আর যা বাচে তা এদের জন্য নিয়ে আসি।

- হুম তাই তো দেখছি।

মেয়েটা আরেকটু রুটি ছিঁড়ে অর্ধেক নিজের মুখে দিয়ে বাকী অর্ধেক কবুতরের দিকে ছুড়ে দিলো।

নিমিষেই রেজা বুঝে ফেললো যে মেয়েটা খুব ক্ষুধার্ত।

সে টুক টাক আলাপ শুরু করে দিয়ে জানতে পারলো যে ও একজন রিফিউজি, মাস ছয়েক ধরে সুইডেনে আছে। ওরিজিনাল বাড়ী ইরাকে, তবে ওর জন্ম সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে।

- জানো জন্ম থেকে জেনেছি যে আমার কোন দেশ নেই। যে দেশে আমার পূর্ব পুরুষরা ছিলেন সে দেশ আমাদেরকে নাগরিক বলে স্বীকার করে না। আর যে দেশে আমরা থাকি, সেই সিরিয়ার কোন কাগজ পত্রে আমাদের নাম নাই। স্কুল, কলেজে পড়েছি কিন্তু কোন সার্টিফিকেট নেই।

- তা সুইডেন ক্যামন লাগছে?

- এই সুইডেনেও আমি একটা দ্বীপ, চারিদিকে পানি। কোন সহায় নেই।

রেজা কথা বাড়াল না।

- তুমি পাখীদের খওয়াও, আমি এক মিনিটের মধ্যে আসছি।

মেয়েটা ঘাড় নাড়িয়ে হ্যাঁ বল্লে রেজা উঠে মার্কেটের ভেতরে একটা দোকানে ঢুকল।

দোকানের মালিক ওকে দেখে বলে উঠলো,

- কি ফাক হাবিবি?

- শুকরান হাবিবি, হামদুল্লাহ!

- তা তোমার জন্য কি করতে পারি।

দোকানদার খুব পরিচিত, তার সাথে সবসময় ই টুকটাক আলাপ করে।

দুটো আইসক্রিমের কাপ দাও, তিনটা করে কোন দিয়ে সুন্দর করে বানায়ে দাও আর একটায় বেশী করে মধু দিয়ে দিও।

- বাহ! মধু খাওয়ানোর মানুষ জুটেছে দেখছি।

- সে রকম কিছু নয় হাবিবি। একটা রিফিউজি মেয়েকে খাওয়াবো। দেখে মনে হচ্ছে যে সে অনেক ক্ষুধার্ত। হয়তো কয়েকদিন ধরেই কিছু খায়নি।

দোকানদার অনেক যত্ন করে দুই কাপ আইসক্রিম বানিয়ে দিয়ে ওর মধ্যে একটা করে টুইক্স ঢুকিয়ে দিল।

মানি ব্যাগ বের করে টাকা দিতে গেলে সে টাকা নিতে অস্বীকার করে বসলো।

- হাবিবি, আমি তো টাকা নিতে পারবো না।

রেজা কথা না বাড়িয়ে একটা একশ ক্রনরের নোট বের করে সেভ দা চিলড্রেন এর টাকা সংগ্রহের বক্স এ ঢুকিয়ে দিয়ে বের হয়ে আসলো।

মেয়েটা ঠিক সে ভাবেই বেঞ্চের উপরে বসে আছে। রুটিগুলো সব শেষ।

রেজা পাশে বসে একটা আইসক্রিমের কাপ ওর দিকে এগিয়ে দিল,

- নাও, খেয়ে নাও।

- আমি তো এটা নিতে পারি না, আমার কাছে কোন টাকা নেই।

- টাকা লাগবে না, এটা মাগনা দিয়েছে।

- মাগনা? মাগনা কেন দিলো?

- টেস্ট করে স্বাদ জানাতে,

- ওহ তাই? মাগনা হলে খেতে পারি।

উৎসাহের সাথে আইসক্রিমটা নিয়ে আস্তে আস্তে খেতে লাগলো।

এই পৃথিবীতে ক্ষুধার্ত মানুষ ই খাবার উপভোগ করে, কিন্তু খাবার জোটে ভরপেট মানুষের।

জিভ দিয়ে চারিদিক থেকে খেতে খেতে আইসক্রিমটা শেষ করে এনে টুইক্স টা আস্তে আস্তে কামড়িয়ে খেল সে।

খাবার শেষে কাগজের ন্যাপকিনে মুখ ও হাত মুছে নিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল,

- আমার নাম লাইলা

- আমি রেজা, বাড়ী বাংলাদেশে।

আমার দেশের নাম আগে শুন নাই?

- নাহ, মনে পড়ছে না।

- পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দেশ, আর তুমি কিনা নাম ও শুন নাই?

টুকটাক কথা বলতে বলতে কিছুটা সময় কেটে গেল, মেয়েটার চেহারার রঙ ফিরে এসেছে, দেখতে বেশ সুন্দরী সে।

- চল, একটু হাটি।

- কোথায় যাবে?

- দেখা যাক

প্রায় এক কিলোমিটার দূরে বড় একটা মল আছে, খুবই নামকরা।

রেজা লাইলাকে নিয়ে সেখানে ঢুকল।

অনেকক্ষণ এদিক সেদিক, এ দোকান সে দোকান ঘুরে দেখল।

আই ফোনের দোকানে ঢুকে লাইলা আনন্দে একদম উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠলো।

লেটেস্ট একটা ফোন তুলে নিয়ে অনেকক্ষণ খুটিয়ে খুটিয়ে দেখল, কানে লাগিয়ে আনন্দে চোখ মুদলো।

এর পরে রেজা লাইলাকে নিয়ে একটা বড় সুপার মার্কেটে ঢুকল।

একটা বাজার করার ভ্যান নিয়ে সেটাতে পেঁয়াজ পাতা, গাজর, শসা কয়েক রকমের সালাদ তুলে নিয়ে মাংসের এলাকায় গিয়ে দাঁড়ালো।

একটা বিরাট মেশিনে অনেক মুরগী গ্রিল হচ্ছে।

বেশ ব্রাউন হওয়া একটা মুরগী দেখিয়ে দিলে সামনে দাঁড়ানো মেয়েটা মুরগিটা বের করে দিলো, রেজা সেটাকে টুকরো করে দিতে বল্লে সে টুকরো করে একটা অ্যালুমিনিয়ামের ব্যাগে ভরে দিলো।

এর পরের মেশিনে অনেকগুলো ভেড়ার টুকরা গ্রিল হচ্ছিল, সেখান থেকে একটা টুকরা বের করিয়ে কাটিয়ে নিল।

কিছু ফল ও ড্রিংকস নিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে এসে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে দাম দিয়ে দুটো ব্যাগে সব ভরে নিয়ে মার্কেট ও মল থেকে বেড়িয়ে এসে বাড়ীর রাস্তা ধরল। মিনিট দশেক হাঁটার পরে ওর বাড়ীর সামনে এসে দরজা খুলে লাইলাকে নিয়ে ঢুকল।

- বাহ, বেশ বাড়ী তো?

- আছে মোটামুটি।

সব বাজার বের করে টেবিলে সাজিয়ে রেখে সে লাইলাকে বলল,

- যাও গোসল করে আসো।

- আমার কি কোন কাপড় আছে?

- তা ওতো একটা কথা,

সে উপরে গিয়ে ওর এক সেট স্লিপিং ড্রেস এনে দিয়ে বলল

- সাইজ একটু বড়, তবে কেউ তো আর দেখছে না।

তর্ক না করে লাইলা উপরের বাথরুমে গিয়ে ঢুকল।

প্রায় আধা ঘণ্টা পরে নেমে আসলো।

মেয়েটা আমুল বদলে গেছে।

রেজা টেবিলে সব খাবার সাজিয়ে রেখেছিল।

দুজনে মিলে খাওয়া শুরু করে দিলো।

লাইলা আস্তে আস্তে খেলেও প্রচুর খেল, আর রেজা ওকে সঙ্গ দিতে গিয়ে অনেক খেয়ে ফেল্লল।

লাইলা বলে উঠলো

- আমার কাপড়গুলো ধুয়ে দিয়েছি,

- ঠিক আছে, শুকিয়ে যাবে।

খাবার শেষে দুজনে চা নিয়ে ড্রইংরুমে গিয়ে বসলো।

চা খেতে খেতে লাইলা ওর কাহিনী শুরু করলো।

আগেই বলেছি যে আমার নাম লাইলা।

আমাদের আদি বাস ইরাকের কারবালা এলাকায়।

যদিও আরব, আমরা শিয়া সম্প্রদায় ভুক্ত মুসলিম। তবে অন্য আরবদের সাথে আমাদের কোন সমস্যা ছিল না। সাদ্দাম হোসেন যখন ইরাকের প্রেসিডেন্ট তখন তিনি শিয়াদের মেরে ফেলার সিধান্ত নেন আর এই সিধান্তের জের ব্যাপকভাবে এসে পড়ে আমাদের উপরে। কারবালা শিয়াদের ধার্মিক কেন্দ্রস্থল বলে এখানে হত্যা ও নিপীড়নের ঝড় বয়ে যেতে শুরু করে। হাজার হাজার মানুষকে গুম করা হয়, এখানে ওখানে মানুষের লাস পড়ে থাকতে দেখা যায়। মানুষ দেশ ত্যাগ করতে থাকে। আমার বাবা সীমান্ত পাড় হয়ে সিরিয়ায় আশ্রয় নেন। সেখানে এক ইরানী মেয়ের সাথে তার পরিচয় হয় ও তারা বিয়ে করে সংসার শুরু করেন। তাদের দুই ছেলের পরে আমার জন্ম হয়। বাবা তার পরিবার নিয়ে দামেস্ক শহর ত্যাগ করে দক্ষিন সিরিয়ায় খামুশ্লি নামে একটা এলাকায় ব্যাবস্যা শুরু করেন। তার সোনার দোকানে সবসময় ভিড় লেগে থাকতো। ভালো ডিজাইনের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল তার দোকান। সব বিয়ে শাদিতেই তার বানানো গয়নার দারুণ চাহিদা ছিল। আমারা ও স্থানীয়দের সাথে মিশে গেলাম। ভাই দুটি বিয়ে করলো।

এর মধ্যে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো। ইরাক আর সিরিয়ার এই এলাকাটায় আইসিস এর প্রাধান্য দেখা যেতে লাগলো। আস্তে আস্তে আইসিস শরিয়া আইন প্রবর্তন করতে লাগলো। মেয়েদের লম্বা বোরখা বাধ্যতামূলক করা হল। স্কুলগুলো বন্ধ করে দেয়া হল।

সমাজে অসস্থি দেখা গেল, কিন্তু কি করা?

এমনই একদিন সন্ধ্যার সময় আমরা খাওয়া দাওয়া সেরে বসে আড্ডা মারছি, বাবা আর মা সীসা টানছেন। বাড়ীর দরজার কড়া নেড়ে উঠলো।

বড় ভাই দরজা খোলা মাত্রই এক ঝাক গুলি এসে তার বুকে বিদ্ধ হল। কিছু বুঝে উঠার আগেই কালো পোশাক পরিহিত একদল লোক বাড়ীতে এসে ঢুকল।

এরা কেউ ই আমাদের অপরিচিত নন। সবাই আশেপাশের লোক।

তারা আমার বাবা ও আরেক ভাইকেও হত্যা করলো। এর পরে আমার মা ও ভাইয়ের বউদের ধর্ষণ করলো। একের পরে এক ধর্ষণ করার পরে তারা যখন অসুস্থ হয়ে পড়লো তখন তাদের ও হত্যা করা হল।

বাকী রইলাম আমি, আমাকে কেউ কিছুই বলল না।

এসব বিভীষিকা যখন শেষ হল তখন ওদের মধ্যে বয়স্ক একজন লোক আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে চললেন। যাওয়ার সময় আমি টেবিলের উপর থেকে একটা ছুরি নিয়ে কাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে রাখলাম।

লোকটা আমার বাবার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বাবার সাথে সাথে তার ও কোলে পিঠে আমি বড় হয়েছি, কিন্তু সব হিসাব ক্যামন যেন বদলে গেল।

আমাকে সে তার বাড়ীতে নিয়ে একটা রুমে তালা বন্ধ করে রেখে বেড়িয়ে গেল।

সারা রাত গুলীর আওয়াজ শুনতে পেলাম।

এক সময় রাত ভোর হয়ে এলো। সেই লোক বাড়ী ফিরে আসলো। দরজা খুলে বিছানায় উঠে আমার দিকে হাত বাড়াল।

আলগোছে চুরিটা বের করে চালিয়ে দিলাম। ঠিক ওর কানের নিচে দিয়ে এক পোঁচ দিলাম। শ্বাসনালীটা দুই ভাগ হয়ে গেল। খুব একটা রক্ত বের হল না তবে প্রচুর ফেনা বেরোতে লাগলো।

ওকে ধাক্কা দিয়ে বিছানা থেকে ফেলে দিলাম।

কতক্ষণ ফোঁস ফোঁস করে সে নিস্তেজ হয়ে গেল।

আমি স্তব্ধ হয়ে বসে সেই মৃত লোকটার দিকে তাকিয়ে থেকে চিন্তায় বাস্তবতা আনার চেষ্টা করলাম।

আমি আইসিস এর কম্যান্ডার কে হত্যা করেছি, আমার শাস্তি খুবই গুরতর কিছু হবে।

হটাত উঠে দাঁড়ালাম।

আমাকে এখান থেকে পালাতে হবে।

রুমটা ভালো করে খুঁজে একটা ড্রয়ারে কিছু ডলার খুঁজে পেলাম।

জামা কাপড় বদলে প্যান্ট ও সার্ট পড়ে নিলাম। ছোট্ট একটা ব্যাগে কিছু জিনিস উঠিয়ে নিলাম।

বেড়িয়ে পড়লাম।

আমার লক্ষ টার্কির সীমান্ত।

এলাকার মধ্যে একমাত্র সেই জায়গাটাই যুদ্ধ মুক্ত।

চারিদিকে গোলাগুলি চলছে, আইসিস ও কুর্দি পেসমারগা গেরিলা বাহিনীর মধ্যে।

কোন ভয় পেলাম না, এগিয়ে চললাম। হাটতে হাটতে এক সময় পেসমারগা এলাকায় ঢুকে গেলাম। ওদের জিজ্ঞাসা করলে ওরা টার্কির দিকে পথ দেখিয়ে দিচ্ছিল। মাঝে মাঝে এক টুকরা রুটি বা একটু পানি খেয়ে এগিয়ে চলতে চলতে টার্কিতে ঢুকে গেলাম। সীমান্ত পার হয়ে কিছুটা এগুয়ে গিয়ে একটা শরণার্থী শিবির পেয়ে সেখানে আশ্রয় নিলাম।

সেখানে আশ্রয় পেলাম, এক সাপ্তাহ পরে গোসল করলাম। একটু খাবার খেয়ে ঘুম দিলাম।

এমন গভীর ঘুম যে তা যেন আমাকে আমার বিভীষিকা থেকে মুক্তি দেয়।

কিন্তু তা দিল না। দুদিন ঘুমানোর পরে উঠে ক্যাম্প এর চারিদিক ঘুরে দেখলাম।

সেই ক্যাম্প এ প্রায় তিন লক্ষ শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে।

এর পরে কি হবে তা কেউ জানে না।

কিছু মানুষের কাছে জানতে পারলাম যে ওরা ইয়োরোপে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নেবে।

- ইয়োরোপে গিয়ে কি লাভ হবে?

আমি প্রশ্ন রাখলাম।

- স্বাধীনতা পাবো

উত্তর দিলো একজন।

- স্বাধীনতা কি?

আমি প্রশ্ন রাখলাম।

কেউ উত্তর দিতে পারছিল না।

এর মধ্যে একজন আমাকে আকাশের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, এক ঝাক পাখী উড়ে বেড়াচ্ছে।

- এই হচ্ছে স্বাধীনতা।

- আমি এমন করে উড়ে বেড়াতে পারবো?

- হ্যাঁ

- ঠিক আছে, আমিও যাবো তোমাদের সাথে।

প্রস্তুতি নিয়ে দিন দুয়েক পরে আমরা স্বাধীনতার দিকে রওয়ানা দিলাম।

হেঁটে হেঁটে।

এক, দুই, তিন

হাজার, হাজার

দশ, বিশ, পঞ্চাশ হাজার।

আস্তে আস্তে সেই কাফেলায় মানুষের সংখ্যা লক্ষ ছাড়িয়ে গেল।

আমরা হাঁটছি তো হাঁটছি।

মাইলের পরে মাইল।

এক, দশ, একশ মাইল

রাস্তা আর শেষ হয় না, কেবল শুরু হয়।

হাটছি আর মনে মনে বলছি,

স্বাধীনতা, আমি আসছি। 

লাইলা একটু থামল।

রেজা গিয়ে দুই কাপ চা বানিয়ে এনে এক কাপ ওকে দিল আর আরেক কাপে নিজে চুমুক দিল।

লাইলার চেহারায় অনুভূতির কোন প্রলেপ নেই তবে সে যেন অনেক দূরে, ক্যামন একটা ঘোরের মধ্যে। দুঃস্বপ্নের স্মৃতিগুলো হয়তো তার মাঝে ফিরে এসেছে। আলাপটার মোড় ঘুরিয়ে দেবে কিনা এই ভাবনা রেজার মাথায় আসলেও লাইলা আবার গল্প বলা শুরু করে দিল।

হয়তো কারু সাথে কথা বলে সে ভারমুক্ত হতে চাচ্ছে।

- হাঁটছি তো হাঁটছি, হাঁটার কোন শেষ নেই। টার্কি একটা মুসলিম দেশ। সেখানকার মানুষ রাস্তার পাশে আমাদের জন্য টেবিল পেতে খাবার, পানি সাজিয়ে রাখতো। যার যা সম্ভব।

আমরা কিছু খাবার ও পানি উঠিয়ে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করে দিতাম।

কাফেলার আয়তন কয়েক কিলোমিটার লম্বা হয়ে দাঁড়ালো। একটা পর্যায়ে প্রায় দশ লক্ষ মানুষ আমাদের কাফেলায় যুক্ত হল।

টার্কি পার হয়ে বুলগেরিয়া সীমান্তে পৌছতে আমাদের প্রায় দুই মাস লেগে গেল। এর মধ্যে সুদুর বাংলাদেশ থেকে আফ্রিকা, সব এলাকার মানুষ এসে জড় হল এই কাফেলায়।

বুলগেরিয়া কোন সমস্যা না করে আমাদের ঢুকতে দিলো।

আমরা ইয়োরোপে ঢুকে গেলাম।

বুলগেরিয়ায় আমাদের কোন ঝামেলা হল না।

এক মাস লাগলো বুলগেরিয়া পার হতে।

সেখানকার কিছু মানুষ আমাদের সাহাজ্য করলো। তবে বেশীরভাগ ই চুপ থাকলো।

এর পরে আমরা সার্বিয়ার সীমান্তে এসে পৌঁছলাম।

সমস্যার শুরু হল।

ইয়োরোপের ভেতরে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যেতে কোন পাসপোর্ট ভিসা লাগে না, কিন্তু সার্বিয়া আমাদের আটকে দিল।

বুলগেরিয়া সার্বিয়া সীমান্তে খুব পুরু করে কাঁটাতারের বেড়া বানিয়ে আমাদের কাফেলাকে রুখতে চাইলো। তবে দশ লক্ষ মানুষকে আটকানো তো আর সহজ কোন ব্যাপার না।

এর মধ্যে শয়ে শয়ে সাংবাদিক ক্যামেরা নিয়ে লাইভ নিউজ দিচ্ছে। CNN, BBC, AlJajjera, ABC থেকে শুরু করে সব টিভির লোকের সামনে সার্বিয়ান পুলিশ তেমন কিছু করতে পারলো না।

প্রতিদিন কিছু কিছু মানুষ কে ছাড়তে শুরু করলো।

রাস্তার মধ্যে গড়ে উঠলো কাফেলা নগর।

কিছু মানুষ, সংগঠন আমাদের সহায়তায় এগিয়ে আসলো।

এভাবে এক পর্যায়ে আমিও সার্বিয়ায় ঢুকে পড়লাম।

আবার পথ চলা শুরু হল।

সার্বিয়ার মানুষ খুব ইসলাম বিরোধী, বর্ণবাদী ও খারাপ লোক।

রাস্তা ঘাটে হেনেস্তা শুরু করলো।

মাতাল মানুষ চাইতো মেয়েদের ধরে উঠিয়ে নিয়ে যেতে। মাঝে মাঝে নিয়েও যেত।

একদিন আমার উপরে হাত দিয়ে বসলো একজন।

ঝট করে ছুরি বের করে হাতের উপরে বসিয়ে দিলাম এক ঘাই, ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হল আর সে চিৎকার করে অন্যদের ডাকার চেষ্টা করলেও কাজ হল না।

কয়েক হাজার লোক আমাকে ঘিরে ধরে একটা বুহ্য বানিয়ে নিল ও আমরা এগিয়ে গেলাম।

সার্বিয়ার দুঃস্বপ্ন কে পিছনে ফেলে বসনিয়ায় গিয়ে ঢুকলাম।

বসনিয়া একটা মুসলিম দেশ, তেমন কোন সমস্যা হল না।

এর মধ্যে শীত পড়েছে। ঠাণ্ডায় সবকিছু জমে গেছে।

খাবারের কষ্ট, পানির কষ্ট, শীতের কষ্ট। শুধু কষ্ট কষ্ট আর কষ্ট।

বাবা মায়ের আদরের মেয়ে আমি, এতো কষ্ট সহ্য করে অভ্যস্ত নই।

এই তিন মাসে সেই আদরের দুলালী আমি একদম বদলে গেছি। ওজন কমে অর্ধেক হয়ে গেছে। পা ফেটে কেটে সবসময় রক্ত ঝরছে।

গোসল করতে পারছি না, কোন রকমে রাস্তার পাশে বাথরুম সেরে নিচ্ছি।

বসনিয়া পার হতে প্রায় তিন সাপ্তাহ লাগলো।

এসে গেলাম হাংগেরি।

এখানেও সেই একই অবস্থা।

এমনভাবে তাড়কাটার বেড়া দিয়েছে যে এটা পার হওয়াও মুস্কিল।

আমরা বেড়ার এই পারে আশ্রয় নিলাম।

প্রতিদিন আমাদের সাথে হাংগেরির পুলিশের মারামারি হয়।

কেউ কেউ পার হয়ে যায়।

এখানে প্রায় এক মাস আটকে গেলাম।

কোন রকমের সুবিধা করতে পারছিলাম না।

একদিন কপাল খুলে গেল।

এই এক মাসে একটা টিভি চ্যানেলের লোকজনের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল।

তারা যাবার সময় আমাকে অস্টিয়া পর্যন্ত পৌঁছে দেবার প্রস্তাব দিলো।

তাদের পক্ষে এটা কোন বিরাট কিছু না।

ওরা দশ পনের জনের একটা দল। আমি সেখানে লুকিয়ে থাকতে পারবো।

রাজী হয়ে তাদের সাথে রওয়ানা দিলাম। ওদের গাড়ীগুলো অন্য রাস্তা দিয়ে অষ্ট্রিয়ায় গিয়ে ঢুকল।

ভিয়েনায় ওরা একটা হোটেলে গিয়ে রুম ভাড়া নিল, আমিও ওদের সাথে।

রুমে গিয়ে কয়েক ঘন্টা লাগিয়ে একটা সাওয়ার নিলাম। ভরপেট খেয়ে একটা ঘুম দিলাম।

সন্ধ্যার সময় ওরা আমাকে ঘুম থেকে তুলল।

- আমাদের যাবার সময় হয়ে এসেছে, তোমার ও।

- আমি এখন কোথায় যাব?

- জার্মানিতে প্রায় দশ লক্ষ মানুষ ঢুকে গেছে, ওরা পাগল হয়ে যাচ্ছে। তুমি সুইডেন গেলে ভালো হবে।

- তাহলে তাই করবো।

ওদের একটা মেয়ে আমাকে ভিয়েনা রেল স্টেশানে নিয়ে সুইডেনের মালমো শহরের একটা টিকিট কেটে ট্রেনে তুলে দিল।

পরের দিন আমি মালমো শহরে এসে পৌঁছলাম।

ট্রেনের সিঁড়িতে পা রাখলাম।

তিন কদম নিচেই স্বাধীনতা। 

রেজা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখে বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে।

- চলো কিছু খেয়ে নেই।

লাইলা কিছু না বলে ওর পেছন পেছন রান্না ঘরে এলো।

দুজনে মিলে দুপুরের খাবারের কিছু প্লেটে তুলে মাইক্রোতে গরম করে নিল।

তখনো অনেক খাবার বাকী থাকায় রেজা সেগুলো ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখল।

ডাইনিং টেবিলে না বসে রেজা ড্রইং রুমে এসে টিভি ছেড়ে দিয়ে খাবার খাওয়া শুরু করলো।

লাইলা ও তাই করলো।

খবরে সিরিয়ায় বোমা বর্ষণ দেখানো শুরু করলে লাইলার চোখ থেকে পানি পড়া শুরু করলে রেজা চ্যানেলটা বদলে দিয়ে একটা সিনেমা দেখা শুরু করলো।

খাবার শেষে লাইলা রেজার প্লেট উঠাতে গেলে রেজা দিলো না।

- যার যার প্লেট তার ই ধোয়া উচিত।

- একটাইতো প্লেট, আমাকে দাও।

- নাহ, আমি নিজের প্লেট নিজে ধুই।

লাইলা আর কথা বাড়াল না।

খেতে আর গল্প করতে করতে রাত নয়টা বেজে গেল।

লাইলা রেজাকে বলল,

- তোমার সাথে দিনটা ভালোই কাটল, অনেক খেলাম আর গল্প করলাম। এখন উঠতে হবে।

- তোমার বাসা কোথায়?

- এখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে এক বাসায় থাকি। বাসা বললেও সেই বাসার করিডোরের মেঝেতে ঘুমাই। লেপ তোশক নাই, মেঝেতে একটা বালিশ পেতে ঘুমাই। ঠাণ্ডায় শরীর জমে আসে, কিন্তু কি করবো? উপায় যে নাই।

- আমার বাসার দোতালায় তিনটা রুম, দুইটা খালী। তুমি ইচ্ছে করলে একটাতে থাকতে পারো।

- সেটা তো খুবই ভালো হত, তবে এক রুমের ভাড়া দেয়ার মত টাকা আমার কাছে নেই।

- সেটা দেখা যাবে। আজ রাত এখানে ঘুমাও, কাল আলাপ করে নেব নে।

রেজা লাইলাকে উপরে নিয়ে একটা রুম পছন্দ করতে বলল।

লাইলা একটা রুম পছন্দ করলে ওর জন্য ফ্রেশ বিছানার চাদর, বালিশ ও কম্বলের ব্যাবস্থা করে দিল, রেজা।

- এখন লক্ষ্মী মেয়ের মতো ঘুমিয়ে থাক। কোন ঝামেলা করিও না।

- ঝামেলা করলে সমস্যা কি?

লাইলা প্রশ্ন রাখল।

- এই বাড়ীতে জিন আছে, ওরা ঝামেলা পছন্দ করে না।

- জিন কি?

রেজা জিন কি সেটা বুঝাতে চেষ্টা করলো।

হটাত লাইলা লাফ দিয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে কি একটা যেন সূরা বলতে শুরু করে দিল।

- কি হয়েছে?

- আমি জিন কে খুব ভয় পাই।

- কোনদিন দেখা হয়েছে?

- নাহ তবে সিরিয়ায় অনেক জিন আছে, মাঝে মাঝে মানুষের উপরে আছর করে বসে।

আরে না, আমি জোক করেছিলাম। এখানে ওসব কিছু নাই।

- থাক বা না থাক, আমি ঘুমাতে পারবো না। ঘুম আসবে না।

রেজা ওকে অনেক সাহস দিয়ে শুইয়ে দিয়ে নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লো।

ঘুম ও আসলো বেশ তাড়াতাড়ি।

অনেক রাতে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যাবার সময় দেখল যে লাইলা ওর মেঝের কার্পেটে ঘুমিয়ে আছে।

রেজা ওকে উঠিয়ে বিছানার আরেক দিকে শুইয়ে দিয়ে বাথরুম সেরে এসে আবার ঘুমিয়ে পড়লো।

শেষ রাতের দিকে লাইলার স্পর্শে ওর ঘুম ভেঙে গেল।

ঘুমের ঘোরে মেয়েটা ওকে জড়িয়ে ধরেছে।

রেজা আস্তে করে পাশ ফিরে শুল।

সকালে ঘুম থেকে উঠে রেজা বিছানা থেকে নামলো না, লাইলা তখনো ওকে জড়িয়ে ধরে আছে।

একটু পরে লাইলা ঘুম থেকে উঠে থতমত খেয়ে বিছানা থেকে নেমে গেল।

রেজা নিচে নেমে ডিম সেদ্ধ করে রুটি গরম করে সকালের নাস্তা বানিয়ে লাইলাকে এক প্লেট দিল আর নিজে এক প্লেট নিয়ে বসল।

- কাল রাতের জন্য আমি দুঃখিত, জীনের ভয়ে ঘুম আসছিল না বলে তোমার রুমে এসে মেঝেতে ঘুমিয়েছিলাম, বিছানায় কখন উঠলাম জানিনা।

- ঠিক আছে, কোন অসুবিধা হয় নাই। তবে সারারাত তোমার ঠ্যাং এর নিচে ঘুমাতে হয়েছে, এই আর কি?

লজ্জায় লাল হয়ে গেল মেয়েটি।

নাশতা শেষে ড্রইংরুমে এসে চা নিয়ে বসলো দুজনে।

শুরু হল লাইলার গল্প বলা।

- মালমো স্টেশানে একটা টেবিল নিয়ে একজন মহিলা পুলিশ ও একজন ইমিগ্রেশান অফিসার বসা ছিলেন। আমি তাদের কাছে গিয়ে পরিচয় দিলে ওরা আমাকে বসতে দিয়ে কফি আর কিছু খাবার দিলেন।

এর পরে আমার নাম ঠিকানা লিখে নিয়ে কোন পরিচয় পত্র বা পাসপোর্ট আছে নাকি জিজ্ঞেস করলেন।

- নাহ, আমার কাছে কোন কাগজ নেই।

- ঠিক আছে, আমরা একটা রিফিউজি আইডি বানিয়ে দিচ্ছি।

ওরা আমার ফটো তুলে একটা আইডি বানিয়ে দিয়ে জিগ্যেস করলো,

- তুমি কি ক্যাম্প এ থাকতে চাও নাকি নিজে নিজের ব্যবস্থা করতে চাও।

- আমি নিজের ব্যাবস্থা করে থাকবো।

- তুমি কি এখানে থাকবে নাকি অন্য কোন শহরে থাকবে?

- আমি রাজধানী শহরে থাকতে চাই।

- ঠিক আছে, তোমাকে আমরা কিছু টাকা দিচ্ছি। তুমি সেখানে গিয়ে নিজের ব্যাবস্থা করে নিও।

- আচ্ছা, ঠিক আছে। ধন্যবাদ।

আমি পরের ট্রেনে স্টকহোম চলে আসলাম।

এখানেও অমন একটা টেবিল দেখতে পেলাম, এদের সাথে একজন আরবি অনুবাদক ও ছিল।

থাকার ব্যাবস্থা করার জন্য তার সাহাজ্য কামনা করলাম।

সে একটা ফোন নাম্বার দিল। এবং বলে দিল যে আমার ঠিকানা ইমিগ্রেশানের কাছে রেজিস্ট্রি করিয়ে নিতে হবে।

সেই নাম্বারে ফোন করলে সেই লোক বলল যে আমি তার ঠিকানায় রেজিস্ট্রি করাতে পারবো, তবে সেখানে থাকার জায়গা নেই। তবে তার পরিচিত একজনের বাসায় থাকতে পারবো, তবে সেই বাসার ঠিকানা ইমিগ্রাশান কে দেয়া যাবে না।

ঠিকানা দেখানোর জন্য দু হাজার আর থাকার জন্য আড়াই হাজার ক্রনর দিতে হবে।

আমার মাসিক ভাতা পাঁচ হাজার ক্রনর। ওরা নেবে সাড়ে চার হাজার ক্রনর,

আমাকে মাত্র পাঁচশ ক্রনর দিয়ে মাস চলতে হবে।

এই ভাবেই চলছি গত চার মাস।

বলতো পাঁচশ ক্রনরে কি একজন মানুষ চলতে পারে?

কোন রকমে শুধু রুটি খেয়ে চলি, রাতে ঘুমাই করিডোরে।

কঠিন জীবন, তারপরেও স্বাধীনতো আছি।

রেজা মেয়েটিকে ভালো করে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখল।

জানালার মধ্যে দিয়ে আসা রৌদ্র তার গায়ে পড়েছে। রোদের আলো তার শরীরে এসে ক্যামন যেন গলে গলে প্রতিচ্ছবিত হয়ে একটা সোনালী আভায় বিচ্ছুরিত হচ্ছে।

তার খুব মায়া লাগলো মেয়েটার জন্য।

এই অল্প বয়েসেই যদিও সবাইকে হারিয়েছে তবুও সাহস হারায় নি।

- তুমি ইচ্ছে করলে আমার বাসায় থাকতে পারো।

- তোমাকে ভাড়া দেবার টাকা আমার কাছে নেই, আমি মাগনা থাকবো না।

- ইচ্ছে করলে আমার হাউস কিপার হিসেবে কাজ করতে পারো, তখন তো আর মাগনা থাকা হবে না।

- হাউস কিপারের কাজ কি?

- বাসার সব কিছু দেখে শুনে রাখবে, রান্না বান্নায় সাহাজ্য করবে।

- সেটা হলে তো ভালো হয়।

- তবে তাই হোক, তোমার জিনিস পত্র নিয়ে আসো।

লাইলা হেসে দিলো,

- আমার কোন জিনিস পত্র নাই, দুই একটা ছেঁড়া কাপড় আছে।

- ঠিক আছে, যোগার করে নেয়া যাবে নে।

বেলা দশটার দিকে লাইলাকে নিয়ে বের হয়ে প্রথমে ট্যাক্স অফিসে গিয়ে সোশ্যাল সিকিউরিটি নাম্বার এর জন্য আবেদন করাল। ওরা সাথে সাথেই নেতিবাচক উত্তর দিলে রেজা বলল

- এই মহিলা একটা চাকরী পেয়েছেন, নাম্বার ছাড়া ট্যাক্স দেবেন কিভাবে?

- ওহ! তাই, সেটা ও একটা কথা বটে। দাড়াও একটা নাম্বার দিচ্ছি।

লাইলার রিফিউজি কার্ড নিয়ে ওরা একটা রেজিস্ট্রেশান করে একটা নাম্বার তৈরি করে একটা প্রিন্ট করে দিলো।

লাইলা কিছুই না বলে কাগজ নিয়ে ওর সাথে অফিস থেকে বের হয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,

- এটা কি করে সম্ভব হল?

- এই পৃথিবীতে সব কিছুই সম্ভব, শুধু স্মার্ট হতে হয়।

এবার মল এ গিয়ে লাইলা কে নিয়ে একটা ব্যাংক এ ঢুকল রেজা।

ব্যাংকার মেয়েটা ওকে ভালো করে চিনে।

- এই মহিলার একটা একাউন্ট করে দাও তো

ট্যাক্স অফিসের কাগজটা এগিয়ে দেয়ায় কোন সমস্যা হল না। একাউন্ট হয়ে গেল।

রেজা সেই একাউন্ট এ কিছু টাকা জমা দিয়ে দিল।

- এনার একটা আইডি কার্ড দরকার।

- করে দিচ্ছি।

ব্যাংকার মেয়েটা লাইলাকে একটা ছোট ফটো স্টুডিওতে ঢুকিয়ে একটা ফটো তুলে নিয়ে বলল যে  - সাপ্তাহ খানেক এর মধ্যে বাসায় আইডি কার্ড চলে যাবে।

দুজনে ব্যাংক থেকে বেরিয়ে একটা কফি বার এ গিয়ে কিছু খাবার ও কফি তুলে নিয়ে একটা টেবিলে গিয়ে বসলো।

- তুমি খুব স্মার্ট, কি সুন্দর ভাবে কাজ দুটো করে নিলে, অথচ দুটোই খুব কঠিন কাজ।

- পৃথিবীটা চলে লজিকের উপরে, সঠিক লজিক জানতে হয়।

- তোমার মোবাইল ফোন আছে না?

লাইলা অনেক পুরনো একটা ফোন বের করে ওর হাতে দিল।

রেজা সেটা থেকে ওর ফোনে একটা কল দিয়ে টেস্ট করে দেখল যে ফোনটা কাজ করে।

তারপরেও পাশের একটা ফোনের দোকানে গিয়ে একটা ন্যানো সিম কার্ড সংগ্রহ করে নিল।

এরপরে এ দোকান সে দোকান ঘুরে লাইলার জন্য কিছু কাপড় চোপড়, জুতা, প্রয়োজনীয় মেয়েলী  জিনিসপত্র কিনে নিয়ে কতক্ষণ ঘুরাঘুরি করে ওরা বাসায় ফিরে এসে ড্রইং রুমে বসলো।

- তুমি উপরে গিয়ে তোমার জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখে গোসল করে নাও, আমি কিছু কাজ সামলে নেই।

লাইলা জিনিসপত্র নিয়ে উপরে চলে গেল, একটু পরে শাওয়ারের শব্দ পাওয়া গেল।

রেজা কম্পিউটারে ঢুকে ইমেইল গুলো চেক করে দেখল।

স্টকহোম পুলিশ তাকে দিয়ে একটা বড় কাজ করাতে চায়।

রোজগার ভালোই হবে, খুশী হল রেজা।

আগের করা একটা কাজের সুত্র ধরে এই কাজটা পেতে যাচ্ছে। সে একটা ইতিবাচক উত্তর দিয়ে কাজটা গ্রহন করার ইংগিত দিল।

একটা হাসপাতাল তাদের ডাটাবেইজ এর সম্প্রসারণ করাতে চায়, সেটার ও একটা ইতিবাচক উত্তর দিয়ে দিল।

বাহ, দিনটা বেশ ভালোই গেল। দুটো কাজেই ভালো টাকা আমদানি হবে। আর পুরনো কাজ সম্প্রসারণে ঝামেলা কম। প্রায় সব কিছু করাই আছে।

লাইলা উপর থেকে নেমে আসলো, ওকে দেখতে অপূর্ব লাগছিল। ওর মুগ্ধ দৃষ্টি দেখে লজ্জা পেল মেয়েটা।

- এ ভাবে কি দেখছ?

- নুতন কাপড়, ফিট হয়েছে কিনা চেক করছি

আরও লাল হয়ে গেল মেয়েটা, কাপড় তার শরীরে খুব আঁটসাঁট হয়ে বসেছে।

- কাপড়টা বেশ টাইট, বদলে এক সাইজ বড় আনা যাবে?

- তা যাবে, তবে একবার ধোয়া পড়লে আরও ঢিলে হয়ে আসতে পারে।

- আচ্ছা থাক তাহলে।

রেজা উপর থেকে ওর একটা পুরনো আইফোন এনে সেটাতে লাইলার জন্য আনা ন্যানো সিম কার্ড টা ফিট করে সেটিং করে দিল। ব্যাংক এর ওয়েব সাইট এ ঢুকে ওর ফোনটায় মোবাইল ব্যাংকিং সেট করে নিয়ে ওকে বুঝিয়ে দিল।

- তুমি যদি রাজী হও তবে এবার একটা চান্স নেব।

- কিসের চান্স?

- গত চার মাসে ঠিকানা আর থাকা বাবদ ওই দুইজনকে তুমি যে টাকা দিয়েছ সেটা ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করতে পারি।

- সেটা কি ভাবে করবে?

- তুমি রাজী হলে করতে পারব বলে আমার বিশ্বাস।

লাইলার ইতস্তত ভাব দেখে সে বল্লল,

- ভয়ের কিছু নেই, আমার উপরে বিশ্বাস রাখতে পারো।

- ঠিক আছে, ঝামেলা না করে চেষ্টা করা যায়।

- তোমার অধিকার তোমাকে আদায় করে নিতে হবে। তারা তোমাকে ঠকিয়েছে। সে কারনেই আমি এটা করতে চাচ্ছি।

- ওকে, তবে তাই হোক।

রেজা একটু ভেবে নিয়ে ব্যাপারটা লাইলাকে বুঝিয়ে বলল,

- প্রথম জন তোমাকে ঠিকানা ব্যাবহারের জন্য অনুমতি দিয়ে টাকা নিচ্ছে, এটা সুইডিশ আইনে বেয়াইনি। এই সুযোগটা নেব।

আর দ্বিতীয়জন তোমাকে কোন রুম না দিয়ে করিডোরে থাকতে দিয়ে ভাড়া নিচ্ছে, এটাও বেয়াইনি।

- এসব প্রমান করবে কিভাবে?

- প্রমান করার দরকার মনে হয় হবে না। ওরা আরও লোক কে এভাবে শোষণ করছে নিশ্চয়ই, সেটা রক্ষা করার জন্য সারেন্ডার করবে।

- আমার মতো অনেক লোক ই সেখানে নাম লিখিয়েছে।

- শুন, আমি ফোন করে কথা বলার পরে ওরা তোমাকে ফোন করবে। পুলিশের সাথে কথা না বলতে অনুরোধ করবে। তুমি বলবে যে তোমার দেয়া আট হাজার টাকা ফেরত দিলে তুমি চুপ থাকবে, না হয় সব বলতে বাধ্য হবে।

- আচ্ছা, পরে কোন ঝামেলা হবে না তো?

- মনে হয় না। ওরা ওদের এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য ই চুপ থাকবে।

রেজা লাইলার কাছ থেকে প্রথম জনের নাম আর  ফোন নাম্বার নিয়ে একটা কাগজে লিখে নিল।

- ওই লোক আমাকে কিভাবে টাকা ফেরত দেবে?

- তুমি ওকে বলবে যে তোমার ফোন নাম্বারে টাকা পাঠিয়ে দিতে।

- ফোন নাম্বারে টাকা রাখা যায় নাকি?

- তোমার ফোন নাম্বারটা ব্যাংক একাউন্টের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে।

- ওকে।

রেজা লোকটাকে ফোন করলো, দুই রিঙের পরেই একজন ফোন তুলে উত্তর দিল,

- মোহাম্মদ আলী বলছি।

- গুড মর্নিং, আমি সোলনা পুলিশ স্টেশান থেকে বলছি। লাইলা নামে একজন মহিলা সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন ছিল।

- আমি এই নামে কাউকে চিনি না।

- তাই? তাহলে তো তোমার বাসায় এসে খোঁজ নিতে হবে।

- তুমি আসতে পারো তবে কাউকে পাবে না, আমি আজ বিকেলেই ডেনমার্ক বেড়াতে যাচ্ছি। ফিরতে মাস খানেক দেরী হবে।

- ওকে ফিরে আসলে কথা হবে, রাখি।

লাইলা সুইডিশ না বুঝায় রেজার দিকে তাকিয়ে ছিল।

- ও কি বলেছে?

- তোমাকে চিনেনা বলেছে।

- তাই, এখন?

- এটাই ইতিবাচক, দেখা যাক।

একটু পরে লাইলার ফোনের রিং বেজে উঠল, আর লাইলা উত্তর দিল।

মিনিট কয়েক কথা বার্তা চলল, শেষের দিকে লাইলা একটু উত্তপ্ত হয়ে উঠলো।

আলাপ শেষে রেজা কোন প্রশ্ন করলো না।

মিনিট দুয়েক পরে লাইলা ওকে আলাপ এর ব্যাপারটা খুলে বলল।

- ব্যাটা ভীষণ শক্ত, আমাকে পুলিশের সাথে কথা না বলতে বলেছে।

- তুমি কি বলেছ?

- আমি বলেছি যে পুলিশের জেরার সামনে আমি টিকতে পারবো না, সত্য বলে দিতে হবে।

- ভালো করেছ, টাকার কথা কি বলেছ?

- ও বলেছে যে ওর কাছে এই মুহূর্তে কোন টাকা নেই, তবে যোগাড় করতে পারলে দেবে।

- দেখা যাক!

ঘন্টা খানেক পরে লাইলার ফোনে টিং করে একটা রিং বেজে উঠলে রেজা হেসে দিল।

- হাসছ কেন?

- তোমার ফোনে একটা মেসেজ এসেছে, পড়ে দ্যাখ।

- আমি তো সুইডিশ বুঝি না, তুমি দ্যাখ।

রেজা ফোনটা হাতে নিয়ে মেসেজটা দেখল।

- তোমার একাউন্ট এ আট হাজার ক্রোনর জমা হয়েছে।

- হা হা হা, দারুন তো! ব্যাটা দেখি ভয় পেয়েছে।

- ঠিক ভয় না, সে তার ব্যাবসা রক্ষা করার চেষ্টা করছে।

কতক্ষণ পরে ওই আরেকজনকে ফোন করবো, দেখা যাক কি হয়।

রেজাকে ফোন করতে হল না। ঘণ্টা খানেক পরে ওই লোক ই ফোন করে লাইলাকে ওর নাম পুলিশকে না বলতে অনুরোধ করল, আর ওর একাউন্ট এ আট হাজার টাকা দিয়ে দেবে বলে কথা দিল।

লাঞ্চের আগেই আরও আট হাজার টাকা এসে লাইলার একাউন্টে জমা হল।

 লাইলা এখন ষোল হাজার ক্রোনরের মালিক, এটা ওর জন্য অনেক টাকা।

ও সোফায় রেজার পাশে বসে ওকে জড়িয়ে ধরে ধন্যবাদ দিল।

- তোমার সাথে পরিচয় হওয়ায় আমার জীবনের সব কুয়াশা কেটে যাচ্ছে। মানসিক অবসন্যতা কেটে যাচ্ছে, সব কিছু ভালো লাগা শুরু হয়েছে।

- সময়ের সাথে বাকী জিনিষগুলো ও ঠিক হয়ে যাবে। আমি দুটো বড় কাজ পেয়েছি, অনেক টাকার ব্যাপার। তোমাকে নিজের সাথে সময় কাটাতে শিখতে হবে। দিনে অন্তত আট ঘন্টা আমাকে কাজে মনোযোগ দিতে হবে এবং প্রায়ই পুলিশ হেড কোয়ার্টারে আর হাসপাতালের অফিসে যেতে হবে, ঠিক আছে?

- ঠিক আছে, তবে আমি কি ভাবে সময় কাটাবো সেটার একটা প্ল্যান করে দিও।

- প্রতিদিন বাইরে বেড়াতে যাবে, এক এক দিন এক এক দিকে হেঁটে আসবে, সুইডেন একটা সুন্দর দেশ। হাটতে তোমার ভালো লাগবে।

এর পরে ইউটিউব এ একটা একাউন্ট করে দেব, ফোনে আরবী গান শুনতে পারবে।

রেজা লাইলার ফোনটা নিয়ে ইউটিউব এ পপুলার আরবী গান সার্চ করে লাইলার হাতে ফোনটা দিল, লাইলা একটা প্রিয় গান শুনতে শুরু করলো।

একটু পরে উঠে গানের সাথে কোমর দুলিয়ে নাচা শুরু করলো।

মুগ্ধ চোখে রেজা তাকিয়ে থাকল।

- কি দেখছ অমন করে?

- আরবী সংস্কৃতির প্রতি আমার অনুরাগ প্রচুর।

- হুম, অনুরাগ কেবল সংস্কৃতিতেই সীমাবদ্ধ রেখ।

- আপাতত সেটাই ইচ্ছা, তবে ভবিষ্যৎ এর কথা জানি না।

লাইলার ভ্রুকুটির সামনে রেজা কাজে মনোযোগ দিল।

খুব অল্প সময়েই লাইলা নিজেকে গুছিয়ে নিল।

অনেকটা নিজে নিজেই, তবে প্রয়োজনে রেজাকে এটা সেটা জিগ্যেস করতে দ্বিধা করে না।

এক সাথে দুটো কাজ হাতে পাওয়ায় রেজার ব্যাস্ততা একদম তুঙ্গে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তার পরেও সে একটা রুটিন করে কিছুটা সময় নিজের জন্য রেখেছে।

বাসায় বসে কাজ করার একটা বিরাট সুবিধা আছে, রেজা সেটাই কাজে লাগিয়েছে।

কাক ডাকা সকালে ঘুম থেকে উঠেই হালকা নাশতা করে চা খেতে খেতে দিনের কাজের প্ল্যান করে নেয়, এর পরে দুপুর পর্যন্ত কাজ করে।

এদিকে লাইলা নাশতা করেই রেজার উপদেশ মতো হাটতে বের হয়।

সুইডেন দেশটা দারুণ, একা একা হলেও হাটতে লাইলার খুব ভালো লাগে।

হারিয়ে যাবার কোন ভয় নেই, রেজা ফোনের GPS এর ম্যাপ এ বাসাটা সেট করে দিয়েছে। কোন অসুবিধা হলে সেখানে ক্লিক করলেই ফোন তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসে।

দুপুরে দুজনে এক সাথে লাঞ্চ করে, এর পরে রেজা আবার কাজ নিয়ে বসে আর লাইলা উপরে গিয়ে কিচ্ছুক্ষন রেস্ট করে বা গান শুনে, গানের সাথে ইউটিউব ফলো করে নাচা নাচি করে। 

আবার বিকেলে হাঁটতে বেরোয়। বিকেল পাঁচটার পরে রেজা কাজ বন্ধ করে ফেলে।

এর পরে লাইলার সাথে গল্প করে। মেয়েটা গল্প করতে খুব পছন্দ করে। এটা সেটা কতকিছু!

ওর মুখ বন্ধ হয় না।

আস্তে আস্তে লাইলাকে সুইডিশ শেখানো শুরু করে সে। মেয়েটা এদিক দিয়ে খুব আইলশা, একদম শিখতে চায় না। উল্টা সুইডিশ এর জায়গায় ওর ইংলিশের উন্নতি অনেক তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল।

ওর মনে কতো জিজ্ঞাসা এসে দাড়ায়,

- আচ্ছা, বাইরে দেখি মেয়েরা ঘাসের উপরে প্রায় উদোম হয়ে রোদ পোহায়, ওদের লজ্জা লাগে না?

- নাহ, লজ্জার কি আছে? ওরা যখন রোদ পোহায় তখন আশে পাশে কেউ থাকে কি?

- না, কেউ ওদিকে তাকায় ও না। অবাক করা কাণ্ড!

- এটাই এখানকার আসল সংস্কৃতি, সবাই নিজেকে নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। অন্যরা কি করছে তা নিয়ে মাথা ঘামায় না।

- আমাদের পাশের বাসার লোকটা আর তার বউ একদম উদোম হয়ে রোদ পোহায়।

- তুমি কি করে দেখলে?

- কাঠের বেড়ার ফাক দিয়ে।

- এরকম দেখতে যেও না, এটা খুবই অভদ্রতা।

- আচ্ছা।

- সামার এলে পুরা দেশের মানুষ ই রোদ পোহায়। শীতের সময়ে পুরা দেশটা বরফের নিচে থাকে, মানুষ অনেক কাপড় পড়ে জবুস্তবু হয়ে থাকে। সে কারনেই সামার এলে সূর্যের তাপকে শরীর দিয়ে স্বাগত জানায়।

তোমার ইচ্ছে হলে তুমিও পেছনের লন এ রোদ পোহাতে পারো।

- যাহ, আমার কি লজ্জা শরম নাই নাকি?

- সেটা তোমার ইচ্ছে, রোদ না পোহালে শরীরের চামড়া নষ্ট হয়ে যাবে।

রেজা ঠাট্টা করছে কিনা দেখল।

পরের দিন থেকে লাইলা ও রোদ পোহানো শুরু করে দিল, তবে প্রায় সংযত কাপড় পড়ে।

হাত, পা ও রেজা আশেপাশে না থাকলে একটু বেশী করে খুলে দেয়।  

রোদ পোহাতে ওর ভালোই লাগে।

রাতের বেলায় ও রেজার বিছানায় ই ঘুমায়। শোয়ার সময় একদম আরেক পাশে গিয়ে জবুস্তবু হয়ে শুলেও ঘুম আসলেই সে বিছানা দখল করে নেয়। একদম মাঝখানে এসে রেজার উপরে পা তুলে দিয়ে বা জড়িয়ে ধরে ঘুম দেয়।

মাঝ রাতে উঠে গেলে আবার অপরদিকে চলে যায়।

ভালোই দিন কাল কেটে যাচ্ছিল।

এর মধ্যে একদিন ইমিগ্রেশান থেকে লাইলার একটা চিঠি এলো।

ওদের সাথে তার ইন্টার্ভিউর তারিখ পড়েছে।

তিনমাস পরে ওদের অফিসে গিয়ে দেখা করতে হবে।

ওকে সুইডেনে থাকার অনুমতি দেবে কিনা এ নিয়ে সিধান্ত নেয়া হবে।

ভয়ে লাইলার অবস্থা কাহিল হয়ে গেল।

- ওদের আমি কি বলবো?

- তোমার সাথে যা হয়েছে তাই বলবে।

- ওরা বিশ্বাস করবে?

- যাতে বিশ্বাস করে সেভাবে বলবে।

- ওহ আল্লাহ,  এ নিয়ে তোমার সাথে আলাপ করতেই আমার হাত পা কাঁপছে, ওদের সাথে আমি কথা বলতে গিয়ে বেহুঁশ হয়ে যাব।

- হলে হবে, তবে তোমাকে তো যেতেই হবে। তবে ওরা তোমাকে একজন উকিল দেবে, সে তোমার পক্ষ নিয়ে সেখানে থাকবে।

ওর সারাদিন কাটল বিভিন্য আয়াত পড়ে ও বুকে ফু দিয়ে।

মেয়েটা কিছুতেই সামলাতে পারছে না। একটু পরে পরেই চোখের পানি ছাড়ছে।

একটু পরে পরেই ওর দিকে তীর্য দৃষ্টিতে তাকায় আর প্রশ্ন করে,

- আমার এই বিপদের দিনে তুমি দেখি একদম শান্ত শিষ্ট হয়ে বসে আছো

- এখানে আমার কিছু করার নাই, তুমি ওদের সাথে কথা বলে বুঝাতে হবে।

- ওরা যদি আমার কথা বিশ্বাস না করে?

- বিশ্বাস না করলে তোমাকে ওরা সিরিয়ায় ফেরত পাঠিয়ে দেবে।

লাইলা শব্দ করে কেঁদে উঠল,

রেজা ওকে কাছে টেনে নিল,

- এতো নার্ভাস হলে ক্যামনে হবে? এখনো তিন মাস বাকী আছে।

- আমি এই তিনমাস বাঁচব না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।

- ভয়ের কিছু নেই, আমি আছি না?

- তুমি তো কিছুই বলছ না!

- এটা কি বল্লা? আমি ভাবছি না?

- তুমি ভাবলে একটা কিছু হয়ে যাবে, আমি জানি তুমি খুব স্মার্ট!

- তাই? ক্যামনে বুঝলে?

- মেয়েরা বুঝতে পারে।

- হয়েছে, এখন গিয়ে রোধ পোহাও। আমি একটু ভাবি।

লাইলা বাড়ীর পেছনে গিয়ে একটা চাদর বিছিয়ে সেটার উপরে শুয়ে পড়লো, শোয়ার আগে জামাটা খুলে নিল।

রেজা মৃদু হেসে ওর কাজ নিয়ে বসলো।

দিন কয়েক ধরে লাইলা খুব অস্থির, কোন দিকেই মনোযোগ নেই। রেজার উপরে ক্যামন যেন রাগ আর অভিমানের মিশ্রণ।

- তোমার কি হয়েছে? মন মানসিকতার এই অবস্থা কেন?

- কিচ্ছুই ভালো লাগছে না। দেশের কথা, যুদ্ধের কথা বারে বারে ঘুরে ঘুরে মনে পরে যাচ্ছে। অথচ বসে আছি। কিচ্ছুই করছি না।

- ইন্টার্ভিউর তো দেরী আছে, সেটা নিয়ে এক সাপ্তাহ আগে বসলেই হবে।

- আমার মাথা গুলিয়ে যায়।

- আচ্ছা একটা কাজ করি, তোমার প্রিপারেশন নিয়ে কাজ শুরু করে দেই।

- সেটাই ভালো হবে।

রেজা তার এক্সট্রা ল্যাপটপটা বের করে লাইলাকে ওর ঘটনাগুলো লিখে ফেলতে বলল।

- আমি তো ইংরেজিতে লিখতে পারব না।

- তুমি গুগল ট্রান্সলেটরে গিয়ে আরবিতে লিখ, সেটা ইংরেজি হয়ে সেভ হবে।

রেজা লাইলাকে আরবি তে লিখা শিখিয়ে দিল। কতক্ষন পরে লাইলার একটু হাত আসলে রেজা তাকে বলল,

- তুমি আগে একটা প্রাথমিক লিখে ফেল, পরে আমরা দুজনে মিলে সেটাকে একটা ফাইনাল রুপ দেব।

- কি কি লিখবো?

- সব কিছু সঠিকভাবে লিখে ফেল, পরে এডিট করে নেব।

লাইলা লেখা শুরু করে দিল। লিখতে বসে ওর মুড বদলে বেশ ইতিবাচক হয়ে আসলো।

রেজা সারাদিন ওর কাজ করে আর লাইলা ভাবে আর ভাবনাগুলো লিখে ফেলে। বিকেল বেলায় দুজনে গিয়ে বেঞ্চে গয়ে বসে আর কবুতর কে রুটি খাওয়ায়।

এর পরে কয়েক মাইল হেঁটে বাসায় ফিরে এসে রাতের খাবার খেয়ে নিয়ে টিভির সামনে বসে আড্ডা মারে আর লাইলার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যায়।

মেয়েটার মনে হাজারো প্রশ্ন।

রেজা বুঝতে পারে যে রক্ষণশীল পরিবার ও দেশ থেকে আসায় ওর হিসাবগুলো আর মিলাছে না। সুইডেনের অতিরিক্ত স্বাধীনতা ওকে ভ্যাবাচেকা খাইয়ে দেয়।

- আচ্ছা, এখানে যে ছেলে মেয়েরা অবাধে মেলামেশা করে ওদের বাবা মা'রা কিছু বলে না?

- ১৬ বছরের আগে পর্যন্ত কিছুটা বাধা নিষেধ থাকে, তবে ১৬'র পরে উদার হয়ে যায়। ১৮'র পরে একদম স্বাধীন।

- শুনেছি ১৬'র আগেও ছেলে মেয়ে মেলামেশা করে।

- কেউ কেউ করে। তবে স্কুলের টিচার বা নার্স ওদের গাইড করে যাতে কোন ঝামেলায় না পড়ে যায়। ওরা সম্পূর্ণ প্রয়োজনীয় সাপোর্ট পায়।

- বিয়ে না করা অবস্থায় বাচ্চা হয়ে গেলে সে বাচ্চা কি সামাজিক ভাবে গৃহীত হয়?

- এখানে সেই সমস্যা নেই, প্রায় অর্ধেক সুইডিশ এর বাবা আর মা পরস্পরের সাথে বিবাহিত নন। তাদের বাবা মায়ের ও একই অবস্থা, এভাবেই চলছে জনম জনম। সুতরাং সামাজিক ভাবে হেয় হবার কিছু নেই।

- এখানের সম্পর্ক তো নাকি বেশীদিন টেকে না, তখন বাচ্চাদের কি হয়?

- বাচ্চারা কার কাছে থাকবে সেটা আদালত ঠিক করে দেয়। তবে সাধারনর অর্ধেক ভাগাভাগি করে নেয়। এক সাপ্তাহ বাবার কাছে আর এক সাপ্তাহ মায়ের কাছে। তবে ব্যাতিক্রম ও হয়। বাবাকে প্রতিমাসে একটা নির্দিষ্ট পরিমান টাকা দিতে হয়।

- এর নিশ্চয়ই অনেক কুফল আছে।

- সেটা তো আছে নিশ্চয়ই। দুটো পরিবারে থাকতে গিয়ে বাচ্চাকে বলতে গেলে চারজন অভিবাবকের হাতে পড়তে হয়। এটায় কিছুটা মানসিক যন্ত্রণায় পড়তে পারে। সবাই তো আর সমান না। সমস্যা বড় আকারে ধারন করলে রাষ্ট্র এগিয়ে এসে সেই বাচ্চাকে সাপোর্ট দেয়। দরকার হলে তাদের আশ্রয় কেন্দ্রে থাকার ব্যাবস্থা করে দেয়। তবে এসব সমস্যা সব দেশেই হতে পারে। আমাদের দেশেও হয়, তবে সব দেশের সমস্যাই ভিন্য রকমের। সেটা সমাজ, সংসার ও ধর্মের উপরে নির্ভর করে।

লাইলা ঘনিস্ট হয়ে রেজার পাশে বসে।

- আমার এসব পছন্দ হয় না। সংসার হবে ভালবাসার বন্ধনে মজবুত হয়ে গড়া। বাচ্চারা বাবা মায়ের আদরে মানুষ হবে, এটাই হওয়া উচিত।

- তোমার সাথে আমি একশ পারসেন্ট এক মত। তবে সমস্যা হয়ে যেতেই পারে।

- সমস্যা হলে মিটিয়ে নেয়া উচিত, তাইনা?

- হ্যাঁ, কিন্তু মেটানো সম্ভব হয়ে না উঠলে আর কি করা যায়? এখানকার মানুষ সম্পদশালী ও স্বাধীন চেতা। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আছে বলেই কোন ছার দেয় না।

- আমার যখন সংসার হবে তখন আমি চাকরী করবো না, জামাইর রোজগারের উপরে বসে বসে খাব আর বাচ্চা কাচ্চা মানুষ করবো, এতে সংসার টিকবে।

- জামাই ধরে মাইর দিলে?

- বাথরুমে গিয়ে কাঁদবো আর এর পরে বেরিয়ে এসে জামাইকে জড়িয়ে ধরে বেশী করে  ভালোবাসা দেব।

তাকে ক্ষমা করে দেব। আমারি তো জামাই, তাইনা?

- হুম।

হাসতে হাসতে রেজাকে জড়িয়ে ধরে লাইলা।

লাইলার লেখা এগিয়ে চলে, গুগল ট্রান্সলেট করার পরে রেজা লেখার অসঙ্গতি ঠিক করে দেয়। ট্রান্সলেসন থেকে সে বুঝতে পারে যে লাইলা কি বলতে চাচ্ছে।

একটা জিনিস রেজার কাছে পরিষ্কার হয়ে ধরা পড়ে যে অতিরিক্ত ইমোশন লাইলার কাহিনীটা নষ্ট করে ফেলছে। সে কিছু বলে না। অপেক্ষা করে কাহিনীর শেষের অপেক্ষায়।

একদিন কাহিনী শেষ হয়ে আসে ও রেজা এটা সেটা খুঁটিনাটি প্রশ্ন করে এডিটিং ও শেষ করে।

সে বুঝতে পারে যে লাইলা এই কাহিনী দিয়ে সুইডেনে থাকার জন্য অনুমতি হয়ত পাবে না।

যাই হোক, সে এবার আরেকটা প্ল্যান করে।

লাইলার গল্পটা প্রিন্ট করে ও আবার লাইলাকে দেয় ও বার বার পড়তে বলে।

- আমাকে কেন দিচ্ছ, আমি তো এটা জানি।

- আমি জানি যে তুমি যান, কিন্তু ইমিগ্রেশান বার বার তোমাকে প্যাঁচায়ে প্রশ্ন করে আউলায়ে দেবে। তাই প্রতিটি শব্দ তোমার মাথায় ঢুকায়ে রাখতে হবে।

রেজা বুঝতে পারলো যে লাইলা খুব অধৈর্য হয়ে আছে আর ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।

সে আর কিছু বলল না। তবে বুঝতে পারলো যে লাইলা নিজেই নিজের বিপদ টেনে আনছে।

ওদের দিন কেটে যায় আর ওরা দুজনে দুজনের আরও কাছাকাছি এগিয়ে আসে।

এর মধ্যে একদিন লাইলা ইমিগ্রেশানের সাথে ইন্টার্ভিউ দিয়ে আসে।

লাইলার হাসি মুখ দেখে রেজা ওকে প্রশ্ন করে সব জেনে নিয়ে বুঝতে পারে যে ইন্টার্ভিউটা আসলে ভাল হয় নি।

লাইলা সব কিছু পেঁচিয়ে ফেলেছিল।

কিন্তু লাইলা সেই আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচ বুঝে উঠতে পারে নি।

সে ভেবেছে যে সবকিছু ঠিক ঠাক ই হয়েছে।

রেজা কোন কিছু বলে ওর মন খারাপ না করার সিধান্ত নেয়।

ওর কাজ দুটো পুরো দমে চলছে, তাই লাইলার দিকে নজর দেয়ার খুব একটা সময় ও তার নেই।

ঘর সংসারের বেশীরভাগ ই লাইলা দেখাশুনা করে। তবে সব কিছুই রেজার সাথে আলাপ করে নেয়।

রেজা লাইলার সাথে বেশীরভাগ কথাবার্তা ই সুইডিশে বলা শুরু করে, যদিও তার সুইডিশ জ্ঞান খুবই কম।

আস্তে আস্তে ব্যাবহারিক শব্দগুলো দিয়ে কথাবার্তা বলতে শিখে নেয় লাইলা। যদিও প্রচুর ভুল হয়ে যায়। রেজা সেগুলো শুদ্ধ করে দেয়।

একদিন লাইলার কাছে ইমিগ্রেশান থেকে একটা মোটা খাম আসে।

লাইলা সেটা খুলে এনে রেজাকে দেয়।

রেজা পড়ে দেখে যে লাইলার আবেদনকে নাকচ করে দেয়া হয়েছে। কারন হিসেবে বিশ্বাস যোগ্যতার অভাব দেখানো হয়েছে।

সে লাইলাকে পুরো চিঠিটা বুঝিয়ে বলল।

লাইলা একদম ভেঙে পড়লো।

- তোমাকে এপিল করার সময় ও সুযোগ দেয়া হয়েছে।

- এপিলে কোন লাভ হবে কি?

- তোমাকে নুতন কিছু নিয়ে এসে তোমার ব্যাপারটা সিরিয়াস করে তুলতে হবে।

- নুতন কিছু আমি কোথায় পাব?

- আমি জানি না, তবে তুমি ভেবে দ্যাখ।

লাইলা উপরে চলে গেল আর রেজা তার কাজ নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো।

রাতের বেলায় লাইলা খেতে নামল না। উপরেই শুয়ে রইল, বেচারি একদম ভেঙে পড়েছে।

রেজা কিছু খাবার নিয়ে ওকে খাইয়ে দেবার চেষ্টা করলো, কিন্তু ও কিছুই খেল না।

রেজা বুঝতে পারলো যে মেয়েটা এই ধকল থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না।

যে মেয়ে আইসিস এর কম্যান্ডারের গলা কাটতে দ্বিধা করেনি, সে আজ আমলাতন্ত্রের কাছে অসহায়।

সে নিচে নেমে এসে কিছুক্ষণ চিন্তা করলো।

সুইডিশ ইমিগ্রাশান লাইলাকে সিরিয়ায় ফেরত পাঠাবে, সেখানে সে একদিন ও টিকতে পারবে না।

ওকে মেরে ফেলা হবে।

একটু রাত হলে সে উপরে গিয়ে শুয়ে পড়লো।

একটু পরে লাইলা এসে ওকে জড়িয়ে ধরল।

- আমি তোমাকে ছাড়া কি করে থাকব রেজা?

লাইলা নিজেকে না, রেজাকে নিয়ে চিন্তা করছে।

রেজা অবাক হল।

- সব সমস্যার একটা করে সমাধান আছে, তোমার ও একটা কিছু সমাধান হবে।

- সেটা ঠিক বলেছ, কিন্তু কোন সমাধানেই যে তোমার নাম নাই। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না,

আনা বাহিব্বিক রেজা, আনা বাহিব্বিক।

রেজা কথাটার মানে জানে, কিন্তু লাইলার মুখে শুনে অবাক হয়ে গেল।

লাইলা বার বার ফিস ফিস করে বলেই চলেছে

- আনা বাহিব্বিক, আনা বাহিব্বিক। আমি তোমাকে ভালোবাসি, রেজা।

লাইলার মুখে বাংলা শুনে অবাক হল রেজা। বুঝতে পারলো যে সে গুগল থেকে ট্রান্সলেট করে কথাটা হয়ত শিখেছে, তবে লজ্জায় হয়তো ওকে বলতে পারেনি।

রেজা ওকে কাছে টেনে নিল।

আদরে আদরে ভাসিয়ে দিল।

খুব সকালে রেজার ঘুম ভেঙে গেল।

বাথরুম সেরে ফিরে এসে দেখল যে চেহারায় খুব একটা প্রশান্তি নিয়ে লাইলা ঘুমাচ্ছে।

ও অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলো।

সকালে ঘুম থেকে উঠে এই মুখটা এমনভাবে আমি সারাজীবন ই দেখতে চাই, ভাবল সে।

এর পরে লাইলার ফোনটা নিয়ে নিচে চলে গেল।

লাইলার ফোনের পাসওয়ার্ড ওর জানা আছে, ফোনটার লক খুলে রেজা তার আইডি কার্ডের একটা ছবি তুলে লাইলার উকিলকে ছবি সহ একটা এস এম এস পাঠাল।

"কাল ইমিগ্রেশান থেকে আমার এপ্লিকেসন এর নেতিবাচক একটা উত্তর পেয়েছি। তোমাকে বলা হয়নি যে আমি বেশ কিছুদিন ধরে এক ভদ্রলোক এর সাথে লিভ টুগেদার করছি। এটা আমার ইমিগ্রাশান স্ট্যাটাস এর পরিবর্তন করবে বলে আশাকরি। আমার পার্টনার এর আইডি কার্ড এর একটা ছবি পাঠালাম, আর কোন কিছুর প্রয়োজন হলে জানিও"।

রেজা উপরে গিয়ে ফোনটা লাইলার বালিশের পাশে রেখে নিচে এসে সোফায় আবার ঘুম দিল।

কতক্ষণ পরে লাইলার স্পর্শে ওর ঘুম ভাঙল।

 -  রেজা দ্যাখ, আমার উকিল একটা মেসেজ দিয়েছে,

কি মেসেজ?

আমার কেস নাকি রিভিউ করা হবে আর আমার পারমিশান হয়ে যাবে,

তাই, শুনে খুশী হলাম।মার্কেটের বাইরে এক চিলতে সবুজ ঘাসের বুকে একটা কাঠের বেঞ্চ, আর সেই বেঞ্চ এ বসে আছে বাঙালী যুবক রেজা। তার সামনে কয়েকটা জালালি কবুতর। রেজা একটা প্যাকেট থেকে রুটি বের করে ছিঁড়ে ছিঁড়ে সামনে ছুড়ে মারছে আর কবুতরগুলো সিরিয়াস ভাবে সেগুলো খুটে খাচ্ছে আর মাঝে বাকুম বাকুম আওয়াজ দিচ্ছে।

সুইডিশ কবুতরগুলো কি বাঙালী কবুতরের মতো একই ভাষায় কথা বলে, নাকি এদের আলাদা ভাষা আছে?

এরকম এটা সেটা ভেবে রেজার দিন কেটে যায়।

রেজা কিন্তু বেকার নয়, বরং বেশ টাকা কড়ির মালিক।

সফটওয়ার নিয়ে কাজ করে, কামাই ভালোই।

আগে সরকারী কাজ করতো, এখন সে কাজ ছেড়ে দিয়ে নিজে কনসালটেন্সি করে। অফিসে যেতে হয় না। যখন খুশী করলেই হয়।

আরও একটু রুটি ছিঁড়ে ছুড়ে মারল রেজা।

যান্ত্রিক গতানুগতিক জীবনের বাইরে এটাই তার একমাত্র প্যাশন।

পাখীগুলো তাকে চেনে, প্রতিদিন ঠিক একই সময়ে এসে তার জন্য অপেক্ষা করে।

একটা মেয়ে এসে বেঞ্চের আরেক মাথায় বসে মন্তব্য করলো,

- পাখীদের খাওয়াচ্ছ, কি মজা!

রেজা মেয়েটার দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল, ক্যামন যেন ঘোরের মধ্যে আছে। বেশ সুন্দরী হলেও চেহারার লাবন্য ক্যামন যেন ছুটি নিয়েছে।

হয়তো ড্রাগ এডিক্ট।

মেয়েটি তার সাথে ভাঙা ইংরেজিতে কথা বলছে।

রেজা ভদ্রতা করে দুই টুকরা রুটি মেয়েটার দিকে এগিয়ে দিল,

- নাও, তুমিও খাওয়াও।

খুব উৎসাহের সাথে ওর হাত থেকে রুটির টুকরো দুটো নিয়ে মেয়েটি একটু একটু করে ছুড়ে দিতে লাগলো।

একটু পরেই সে রুটির একটা টুকরা নিজের মুখে পুরে দিল,

- বাহ! বেশ মজাতো?

- হু, আমি এটাই খাই। বেশী করে কিনি আর যা বাচে তা এদের জন্য নিয়ে আসি।

- হুম তাই তো দেখছি।

মেয়েটা আরেকটু রুটি ছিঁড়ে অর্ধেক নিজের মুখে দিয়ে বাকী অর্ধেক কবুতরের দিকে ছুড়ে দিলো।

নিমিষেই রেজা বুঝে ফেললো যে মেয়েটা খুব ক্ষুধার্ত।

সে টুক টাক আলাপ শুরু করে দিয়ে জানতে পারলো যে ও একজন রিফিউজি, মাস ছয়েক ধরে সুইডেনে আছে। ওরিজিনাল বাড়ী ইরাকে, তবে ওর জন্ম সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে।

- জানো জন্ম থেকে জেনেছি যে আমার কোন দেশ নেই। যে দেশে আমার পূর্ব পুরুষরা ছিলেন সে দেশ আমাদেরকে নাগরিক বলে স্বীকার করে না। আর যে দেশে আমরা থাকি, সেই সিরিয়ার কোন কাগজ পত্রে আমাদের নাম নাই। স্কুল, কলেজে পড়েছি কিন্তু কোন সার্টিফিকেট নেই।

- তা সুইডেন ক্যামন লাগছে?

- এই সুইডেনেও আমি একটা দ্বীপ, চারিদিকে পানি। কোন সহায় নেই।

রেজা কথা বাড়াল না।

- তুমি পাখীদের খওয়াও, আমি এক মিনিটের মধ্যে আসছি।

মেয়েটা ঘাড় নাড়িয়ে হ্যাঁ বল্লে রেজা উঠে মার্কেটের ভেতরে একটা দোকানে ঢুকল।

দোকানের মালিক ওকে দেখে বলে উঠলো,

- কি ফাক হাবিবি?

- শুকরান হাবিবি, হামদুল্লাহ!

- তা তোমার জন্য কি করতে পারি।

দোকানদার খুব পরিচিত, তার সাথে সবসময় ই টুকটাক আলাপ করে।

দুটো আইসক্রিমের কাপ দাও, তিনটা করে কোন দিয়ে সুন্দর করে বানায়ে দাও আর একটায় বেশী করে মধু দিয়ে দিও।

- বাহ! মধু খাওয়ানোর মানুষ জুটেছে দেখছি।

- সে রকম কিছু নয় হাবিবি। একটা রিফিউজি মেয়েকে খাওয়াবো। দেখে মনে হচ্ছে যে সে অনেক ক্ষুধার্ত। হয়তো কয়েকদিন ধরেই কিছু খায়নি।

দোকানদার অনেক যত্ন করে দুই কাপ আইসক্রিম বানিয়ে দিয়ে ওর মধ্যে একটা করে টুইক্স ঢুকিয়ে দিল।

মানি ব্যাগ বের করে টাকা দিতে গেলে সে টাকা নিতে অস্বীকার করে বসলো।

- হাবিবি, আমি তো টাকা নিতে পারবো না।

রেজা কথা না বাড়িয়ে একটা একশ ক্রনরের নোট বের করে সেভ দা চিলড্রেন এর টাকা সংগ্রহের বক্স এ ঢুকিয়ে দিয়ে বের হয়ে আসলো।

মেয়েটা ঠিক সে ভাবেই বেঞ্চের উপরে বসে আছে। রুটিগুলো সব শেষ।

রেজা পাশে বসে একটা আইসক্রিমের কাপ ওর দিকে এগিয়ে দিল,

- নাও, খেয়ে নাও।

- আমি তো এটা নিতে পারি না, আমার কাছে কোন টাকা নেই।

- টাকা লাগবে না, এটা মাগনা দিয়েছে।

- মাগনা? মাগনা কেন দিলো?

- টেস্ট করে স্বাদ জানাতে,

- ওহ তাই? মাগনা হলে খেতে পারি।

উৎসাহের সাথে আইসক্রিমটা নিয়ে আস্তে আস্তে খেতে লাগলো।

এই পৃথিবীতে ক্ষুধার্ত মানুষ ই খাবার উপভোগ করে, কিন্তু খাবার জোটে ভরপেট মানুষের।

জিভ দিয়ে চারিদিক থেকে খেতে খেতে আইসক্রিমটা শেষ করে এনে টুইক্স টা আস্তে আস্তে কামড়িয়ে খেল সে।

খাবার শেষে কাগজের ন্যাপকিনে মুখ ও হাত মুছে নিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল,

- আমার নাম লাইলা

- আমি রেজা, বাড়ী বাংলাদেশে।

আমার দেশের নাম আগে শুন নাই?

- নাহ, মনে পড়ছে না।

- পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দেশ, আর তুমি কিনা নাম ও শুন নাই?

টুকটাক কথা বলতে বলতে কিছুটা সময় কেটে গেল, মেয়েটার চেহারার রঙ ফিরে এসেছে, দেখতে বেশ সুন্দরী সে।

- চল, একটু হাটি।

- কোথায় যাবে?

- দেখা যাক

প্রায় এক কিলোমিটার দূরে বড় একটা মল আছে, খুবই নামকরা।

রেজা লাইলাকে নিয়ে সেখানে ঢুকল।

অনেকক্ষণ এদিক সেদিক, এ দোকান সে দোকান ঘুরে দেখল।

আই ফোনের দোকানে ঢুকে লাইলা আনন্দে একদম উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠলো।

লেটেস্ট একটা ফোন তুলে নিয়ে অনেকক্ষণ খুটিয়ে খুটিয়ে দেখল, কানে লাগিয়ে আনন্দে চোখ মুদলো।

এর পরে রেজা লাইলাকে নিয়ে একটা বড় সুপার মার্কেটে ঢুকল।

একটা বাজার করার ভ্যান নিয়ে সেটাতে পেঁয়াজ পাতা, গাজর, শসা কয়েক রকমের সালাদ তুলে নিয়ে মাংসের এলাকায় গিয়ে দাঁড়ালো।

একটা বিরাট মেশিনে অনেক মুরগী গ্রিল হচ্ছে।

বেশ ব্রাউন হওয়া একটা মুরগী দেখিয়ে দিলে সামনে দাঁড়ানো মেয়েটা মুরগিটা বের করে দিলো, রেজা সেটাকে টুকরো করে দিতে বল্লে সে টুকরো করে একটা অ্যালুমিনিয়ামের ব্যাগে ভরে দিলো।

এর পরের মেশিনে অনেকগুলো ভেড়ার টুকরা গ্রিল হচ্ছিল, সেখান থেকে একটা টুকরা বের করিয়ে কাটিয়ে নিল।

কিছু ফল ও ড্রিংকস নিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে এসে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে দাম দিয়ে দুটো ব্যাগে সব ভরে নিয়ে মার্কেট ও মল থেকে বেড়িয়ে এসে বাড়ীর রাস্তা ধরল। মিনিট দশেক হাঁটার পরে ওর বাড়ীর সামনে এসে দরজা খুলে লাইলাকে নিয়ে ঢুকল।

- বাহ, বেশ বাড়ী তো?

- আছে মোটামুটি।

সব বাজার বের করে টেবিলে সাজিয়ে রেখে সে লাইলাকে বলল,

- যাও গোসল করে আসো।

- আমার কি কোন কাপড় আছে?

- তা ওতো একটা কথা,

সে উপরে গিয়ে ওর এক সেট স্লিপিং ড্রেস এনে দিয়ে বলল

- সাইজ একটু বড়, তবে কেউ তো আর দেখছে না।

তর্ক না করে লাইলা উপরের বাথরুমে গিয়ে ঢুকল।

প্রায় আধা ঘণ্টা পরে নেমে আসলো।

মেয়েটা আমুল বদলে গেছে।

রেজা টেবিলে সব খাবার সাজিয়ে রেখেছিল।

দুজনে মিলে খাওয়া শুরু করে দিলো।

লাইলা আস্তে আস্তে খেলেও প্রচুর খেল, আর রেজা ওকে সঙ্গ দিতে গিয়ে অনেক খেয়ে ফেল্লল।

লাইলা বলে উঠলো

- আমার কাপড়গুলো ধুয়ে দিয়েছি,

- ঠিক আছে, শুকিয়ে যাবে।

খাবার শেষে দুজনে চা নিয়ে ড্রইংরুমে গিয়ে বসলো।

চা খেতে খেতে লাইলা ওর কাহিনী শুরু করলো।

আগেই বলেছি যে আমার নাম লাইলা।

আমাদের আদি বাস ইরাকের কারবালা এলাকায়।

যদিও আরব, আমরা শিয়া সম্প্রদায় ভুক্ত মুসলিম। তবে অন্য আরবদের সাথে আমাদের কোন সমস্যা ছিল না। সাদ্দাম হোসেন যখন ইরাকের প্রেসিডেন্ট তখন তিনি শিয়াদের মেরে ফেলার সিধান্ত নেন আর এই সিধান্তের জের ব্যাপকভাবে এসে পড়ে আমাদের উপরে। কারবালা শিয়াদের ধার্মিক কেন্দ্রস্থল বলে এখানে হত্যা ও নিপীড়নের ঝড় বয়ে যেতে শুরু করে। হাজার হাজার মানুষকে গুম করা হয়, এখানে ওখানে মানুষের লাস পড়ে থাকতে দেখা যায়। মানুষ দেশ ত্যাগ করতে থাকে। আমার বাবা সীমান্ত পাড় হয়ে সিরিয়ায় আশ্রয় নেন। সেখানে এক ইরানী মেয়ের সাথে তার পরিচয় হয় ও তারা বিয়ে করে সংসার শুরু করেন। তাদের দুই ছেলের পরে আমার জন্ম হয়। বাবা তার পরিবার নিয়ে দামেস্ক শহর ত্যাগ করে দক্ষিন সিরিয়ায় খামুশ্লি নামে একটা এলাকায় ব্যাবস্যা শুরু করেন। তার সোনার দোকানে সবসময় ভিড় লেগে থাকতো। ভালো ডিজাইনের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল তার দোকান। সব বিয়ে শাদিতেই তার বানানো গয়নার দারুণ চাহিদা ছিল। আমারা ও স্থানীয়দের সাথে মিশে গেলাম। ভাই দুটি বিয়ে করলো।

এর মধ্যে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো। ইরাক আর সিরিয়ার এই এলাকাটায় আইসিস এর প্রাধান্য দেখা যেতে লাগলো। আস্তে আস্তে আইসিস শরিয়া আইন প্রবর্তন করতে লাগলো। মেয়েদের লম্বা বোরখা বাধ্যতামূলক করা হল। স্কুলগুলো বন্ধ করে দেয়া হল।

সমাজে অসস্থি দেখা গেল, কিন্তু কি করা?

এমনই একদিন সন্ধ্যার সময় আমরা খাওয়া দাওয়া সেরে বসে আড্ডা মারছি, বাবা আর মা সীসা টানছেন। বাড়ীর দরজার কড়া নেড়ে উঠলো।

বড় ভাই দরজা খোলা মাত্রই এক ঝাক গুলি এসে তার বুকে বিদ্ধ হল। কিছু বুঝে উঠার আগেই কালো পোশাক পরিহিত একদল লোক বাড়ীতে এসে ঢুকল।

এরা কেউ ই আমাদের অপরিচিত নন। সবাই আশেপাশের লোক।

তারা আমার বাবা ও আরেক ভাইকেও হত্যা করলো। এর পরে আমার মা ও ভাইয়ের বউদের ধর্ষণ করলো। একের পরে এক ধর্ষণ করার পরে তারা যখন অসুস্থ হয়ে পড়লো তখন তাদের ও হত্যা করা হল।

বাকী রইলাম আমি, আমাকে কেউ কিছুই বলল না।

এসব বিভীষিকা যখন শেষ হল তখন ওদের মধ্যে বয়স্ক একজন লোক আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে চললেন। যাওয়ার সময় আমি টেবিলের উপর থেকে একটা ছুরি নিয়ে কাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে রাখলাম।

লোকটা আমার বাবার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বাবার সাথে সাথে তার ও কোলে পিঠে আমি বড় হয়েছি, কিন্তু সব হিসাব ক্যামন যেন বদলে গেল।

আমাকে সে তার বাড়ীতে নিয়ে একটা রুমে তালা বন্ধ করে রেখে বেড়িয়ে গেল।

সারা রাত গুলীর আওয়াজ শুনতে পেলাম।

এক সময় রাত ভোর হয়ে এলো। সেই লোক বাড়ী ফিরে আসলো। দরজা খুলে বিছানায় উঠে আমার দিকে হাত বাড়াল।

আলগোছে চুরিটা বের করে চালিয়ে দিলাম। ঠিক ওর কানের নিচে দিয়ে এক পোঁচ দিলাম। শ্বাসনালীটা দুই ভাগ হয়ে গেল। খুব একটা রক্ত বের হল না তবে প্রচুর ফেনা বেরোতে লাগলো।

ওকে ধাক্কা দিয়ে বিছানা থেকে ফেলে দিলাম।

কতক্ষণ ফোঁস ফোঁস করে সে নিস্তেজ হয়ে গেল।

আমি স্তব্ধ হয়ে বসে সেই মৃত লোকটার দিকে তাকিয়ে থেকে চিন্তায় বাস্তবতা আনার চেষ্টা করলাম।

আমি আইসিস এর কম্যান্ডার কে হত্যা করেছি, আমার শাস্তি খুবই গুরতর কিছু হবে।

হটাত উঠে দাঁড়ালাম।

আমাকে এখান থেকে পালাতে হবে।

রুমটা ভালো করে খুঁজে একটা ড্রয়ারে কিছু ডলার খুঁজে পেলাম।

জামা কাপড় বদলে প্যান্ট ও সার্ট পড়ে নিলাম। ছোট্ট একটা ব্যাগে কিছু জিনিস উঠিয়ে নিলাম।

বেড়িয়ে পড়লাম।

আমার লক্ষ টার্কির সীমান্ত।

এলাকার মধ্যে একমাত্র সেই জায়গাটাই যুদ্ধ মুক্ত।

চারিদিকে গোলাগুলি চলছে, আইসিস ও কুর্দি পেসমারগা গেরিলা বাহিনীর মধ্যে।

কোন ভয় পেলাম না, এগিয়ে চললাম। হাটতে হাটতে এক সময় পেসমারগা এলাকায় ঢুকে গেলাম। ওদের জিজ্ঞাসা করলে ওরা টার্কির দিকে পথ দেখিয়ে দিচ্ছিল। মাঝে মাঝে এক টুকরা রুটি বা একটু পানি খেয়ে এগিয়ে চলতে চলতে টার্কিতে ঢুকে গেলাম। সীমান্ত পার হয়ে কিছুটা এগুয়ে গিয়ে একটা শরণার্থী শিবির পেয়ে সেখানে আশ্রয় নিলাম।

সেখানে আশ্রয় পেলাম, এক সাপ্তাহ পরে গোসল করলাম। একটু খাবার খেয়ে ঘুম দিলাম।

এমন গভীর ঘুম যে তা যেন আমাকে আমার বিভীষিকা থেকে মুক্তি দেয়।

কিন্তু তা দিল না। দুদিন ঘুমানোর পরে উঠে ক্যাম্প এর চারিদিক ঘুরে দেখলাম।

সেই ক্যাম্প এ প্রায় তিন লক্ষ শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে।

এর পরে কি হবে তা কেউ জানে না।

কিছু মানুষের কাছে জানতে পারলাম যে ওরা ইয়োরোপে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নেবে।

- ইয়োরোপে গিয়ে কি লাভ হবে?

আমি প্রশ্ন রাখলাম।

- স্বাধীনতা পাবো

উত্তর দিলো একজন।

- স্বাধীনতা কি?

আমি প্রশ্ন রাখলাম।

কেউ উত্তর দিতে পারছিল না।

এর মধ্যে একজন আমাকে আকাশের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, এক ঝাক পাখী উড়ে বেড়াচ্ছে।

- এই হচ্ছে স্বাধীনতা।

- আমি এমন করে উড়ে বেড়াতে পারবো?

- হ্যাঁ

- ঠিক আছে, আমিও যাবো তোমাদের সাথে।

প্রস্তুতি নিয়ে দিন দুয়েক পরে আমরা স্বাধীনতার দিকে রওয়ানা দিলাম।

হেঁটে হেঁটে।

এক, দুই, তিন

হাজার, হাজার

দশ, বিশ, পঞ্চাশ হাজার।

আস্তে আস্তে সেই কাফেলায় মানুষের সংখ্যা লক্ষ ছাড়িয়ে গেল।

আমরা হাঁটছি তো হাঁটছি।

মাইলের পরে মাইল।

এক, দশ, একশ মাইল

রাস্তা আর শেষ হয় না, কেবল শুরু হয়।

হাটছি আর মনে মনে বলছি,

স্বাধীনতা, আমি আসছি। 

লাইলা একটু থামল।

রেজা গিয়ে দুই কাপ চা বানিয়ে এনে এক কাপ ওকে দিল আর আরেক কাপে নিজে চুমুক দিল।

লাইলার চেহারায় অনুভূতির কোন প্রলেপ নেই তবে সে যেন অনেক দূরে, ক্যামন একটা ঘোরের মধ্যে। দুঃস্বপ্নের স্মৃতিগুলো হয়তো তার মাঝে ফিরে এসেছে। আলাপটার মোড় ঘুরিয়ে দেবে কিনা এই ভাবনা রেজার মাথায় আসলেও লাইলা আবার গল্প বলা শুরু করে দিল।

হয়তো কারু সাথে কথা বলে সে ভারমুক্ত হতে চাচ্ছে।

- হাঁটছি তো হাঁটছি, হাঁটার কোন শেষ নেই। টার্কি একটা মুসলিম দেশ। সেখানকার মানুষ রাস্তার পাশে আমাদের জন্য টেবিল পেতে খাবার, পানি সাজিয়ে রাখতো। যার যা সম্ভব।

আমরা কিছু খাবার ও পানি উঠিয়ে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করে দিতাম।

কাফেলার আয়তন কয়েক কিলোমিটার লম্বা হয়ে দাঁড়ালো। একটা পর্যায়ে প্রায় দশ লক্ষ মানুষ আমাদের কাফেলায় যুক্ত হল।

টার্কি পার হয়ে বুলগেরিয়া সীমান্তে পৌছতে আমাদের প্রায় দুই মাস লেগে গেল। এর মধ্যে সুদুর বাংলাদেশ থেকে আফ্রিকা, সব এলাকার মানুষ এসে জড় হল এই কাফেলায়।

বুলগেরিয়া কোন সমস্যা না করে আমাদের ঢুকতে দিলো।

আমরা ইয়োরোপে ঢুকে গেলাম।

বুলগেরিয়ায় আমাদের কোন ঝামেলা হল না।

এক মাস লাগলো বুলগেরিয়া পার হতে।

সেখানকার কিছু মানুষ আমাদের সাহাজ্য করলো। তবে বেশীরভাগ ই চুপ থাকলো।

এর পরে আমরা সার্বিয়ার সীমান্তে এসে পৌঁছলাম।

সমস্যার শুরু হল।

ইয়োরোপের ভেতরে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যেতে কোন পাসপোর্ট ভিসা লাগে না, কিন্তু সার্বিয়া আমাদের আটকে দিল।

বুলগেরিয়া সার্বিয়া সীমান্তে খুব পুরু করে কাঁটাতারের বেড়া বানিয়ে আমাদের কাফেলাকে রুখতে চাইলো। তবে দশ লক্ষ মানুষকে আটকানো তো আর সহজ কোন ব্যাপার না।

এর মধ্যে শয়ে শয়ে সাংবাদিক ক্যামেরা নিয়ে লাইভ নিউজ দিচ্ছে। CNN, BBC, AlJajjera, ABC থেকে শুরু করে সব টিভির লোকের সামনে সার্বিয়ান পুলিশ তেমন কিছু করতে পারলো না।

প্রতিদিন কিছু কিছু মানুষ কে ছাড়তে শুরু করলো।

রাস্তার মধ্যে গড়ে উঠলো কাফেলা নগর।

কিছু মানুষ, সংগঠন আমাদের সহায়তায় এগিয়ে আসলো।

এভাবে এক পর্যায়ে আমিও সার্বিয়ায় ঢুকে পড়লাম।

আবার পথ চলা শুরু হল।

সার্বিয়ার মানুষ খুব ইসলাম বিরোধী, বর্ণবাদী ও খারাপ লোক।

রাস্তা ঘাটে হেনেস্তা শুরু করলো।

মাতাল মানুষ চাইতো মেয়েদের ধরে উঠিয়ে নিয়ে যেতে। মাঝে মাঝে নিয়েও যেত।

একদিন আমার উপরে হাত দিয়ে বসলো একজন।

ঝট করে ছুরি বের করে হাতের উপরে বসিয়ে দিলাম এক ঘাই, ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হল আর সে চিৎকার করে অন্যদের ডাকার চেষ্টা করলেও কাজ হল না।

কয়েক হাজার লোক আমাকে ঘিরে ধরে একটা বুহ্য বানিয়ে নিল ও আমরা এগিয়ে গেলাম।

সার্বিয়ার দুঃস্বপ্ন কে পিছনে ফেলে বসনিয়ায় গিয়ে ঢুকলাম।

বসনিয়া একটা মুসলিম দেশ, তেমন কোন সমস্যা হল না।

এর মধ্যে শীত পড়েছে। ঠাণ্ডায় সবকিছু জমে গেছে।

খাবারের কষ্ট, পানির কষ্ট, শীতের কষ্ট। শুধু কষ্ট কষ্ট আর কষ্ট।

বাবা মায়ের আদরের মেয়ে আমি, এতো কষ্ট সহ্য করে অভ্যস্ত নই।

এই তিন মাসে সেই আদরের দুলালী আমি একদম বদলে গেছি। ওজন কমে অর্ধেক হয়ে গেছে। পা ফেটে কেটে সবসময় রক্ত ঝরছে।

গোসল করতে পারছি না, কোন রকমে রাস্তার পাশে বাথরুম সেরে নিচ্ছি।

বসনিয়া পার হতে প্রায় তিন সাপ্তাহ লাগলো।

এসে গেলাম হাংগেরি।

এখানেও সেই একই অবস্থা।

এমনভাবে তাড়কাটার বেড়া দিয়েছে যে এটা পার হওয়াও মুস্কিল।

আমরা বেড়ার এই পারে আশ্রয় নিলাম।

প্রতিদিন আমাদের সাথে হাংগেরির পুলিশের মারামারি হয়।

কেউ কেউ পার হয়ে যায়।

এখানে প্রায় এক মাস আটকে গেলাম।

কোন রকমের সুবিধা করতে পারছিলাম না।

একদিন কপাল খুলে গেল।

এই এক মাসে একটা টিভি চ্যানেলের লোকজনের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল।

তারা যাবার সময় আমাকে অস্টিয়া পর্যন্ত পৌঁছে দেবার প্রস্তাব দিলো।

তাদের পক্ষে এটা কোন বিরাট কিছু না।

ওরা দশ পনের জনের একটা দল। আমি সেখানে লুকিয়ে থাকতে পারবো।

রাজী হয়ে তাদের সাথে রওয়ানা দিলাম। ওদের গাড়ীগুলো অন্য রাস্তা দিয়ে অষ্ট্রিয়ায় গিয়ে ঢুকল।

ভিয়েনায় ওরা একটা হোটেলে গিয়ে রুম ভাড়া নিল, আমিও ওদের সাথে।

রুমে গিয়ে কয়েক ঘন্টা লাগিয়ে একটা সাওয়ার নিলাম। ভরপেট খেয়ে একটা ঘুম দিলাম।

সন্ধ্যার সময় ওরা আমাকে ঘুম থেকে তুলল।

- আমাদের যাবার সময় হয়ে এসেছে, তোমার ও।

- আমি এখন কোথায় যাব?

- জার্মানিতে প্রায় দশ লক্ষ মানুষ ঢুকে গেছে, ওরা পাগল হয়ে যাচ্ছে। তুমি সুইডেন গেলে ভালো হবে।

- তাহলে তাই করবো।

ওদের একটা মেয়ে আমাকে ভিয়েনা রেল স্টেশানে নিয়ে সুইডেনের মালমো শহরের একটা টিকিট কেটে ট্রেনে তুলে দিল।

পরের দিন আমি মালমো শহরে এসে পৌঁছলাম।

ট্রেনের সিঁড়িতে পা রাখলাম।

তিন কদম নিচেই স্বাধীনতা। 

রেজা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখে বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে।

- চলো কিছু খেয়ে নেই।

লাইলা কিছু না বলে ওর পেছন পেছন রান্না ঘরে এলো।

দুজনে মিলে দুপুরের খাবারের কিছু প্লেটে তুলে মাইক্রোতে গরম করে নিল।

তখনো অনেক খাবার বাকী থাকায় রেজা সেগুলো ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখল।

ডাইনিং টেবিলে না বসে রেজা ড্রইং রুমে এসে টিভি ছেড়ে দিয়ে খাবার খাওয়া শুরু করলো।

লাইলা ও তাই করলো।

খবরে সিরিয়ায় বোমা বর্ষণ দেখানো শুরু করলে লাইলার চোখ থেকে পানি পড়া শুরু করলে রেজা চ্যানেলটা বদলে দিয়ে একটা সিনেমা দেখা শুরু করলো।

খাবার শেষে লাইলা রেজার প্লেট উঠাতে গেলে রেজা দিলো না।

- যার যার প্লেট তার ই ধোয়া উচিত।

- একটাইতো প্লেট, আমাকে দাও।

- নাহ, আমি নিজের প্লেট নিজে ধুই।

লাইলা আর কথা বাড়াল না।

খেতে আর গল্প করতে করতে রাত নয়টা বেজে গেল।

লাইলা রেজাকে বলল,

- তোমার সাথে দিনটা ভালোই কাটল, অনেক খেলাম আর গল্প করলাম। এখন উঠতে হবে।

- তোমার বাসা কোথায়?

- এখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে এক বাসায় থাকি। বাসা বললেও সেই বাসার করিডোরের মেঝেতে ঘুমাই। লেপ তোশক নাই, মেঝেতে একটা বালিশ পেতে ঘুমাই। ঠাণ্ডায় শরীর জমে আসে, কিন্তু কি করবো? উপায় যে নাই।

- আমার বাসার দোতালায় তিনটা রুম, দুইটা খালী। তুমি ইচ্ছে করলে একটাতে থাকতে পারো।

- সেটা তো খুবই ভালো হত, তবে এক রুমের ভাড়া দেয়ার মত টাকা আমার কাছে নেই।

- সেটা দেখা যাবে। আজ রাত এখানে ঘুমাও, কাল আলাপ করে নেব নে।

রেজা লাইলাকে উপরে নিয়ে একটা রুম পছন্দ করতে বলল।

লাইলা একটা রুম পছন্দ করলে ওর জন্য ফ্রেশ বিছানার চাদর, বালিশ ও কম্বলের ব্যাবস্থা করে দিল, রেজা।

- এখন লক্ষ্মী মেয়ের মতো ঘুমিয়ে থাক। কোন ঝামেলা করিও না।

- ঝামেলা করলে সমস্যা কি?

লাইলা প্রশ্ন রাখল।

- এই বাড়ীতে জিন আছে, ওরা ঝামেলা পছন্দ করে না।

- জিন কি?

রেজা জিন কি সেটা বুঝাতে চেষ্টা করলো।

হটাত লাইলা লাফ দিয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে কি একটা যেন সূরা বলতে শুরু করে দিল।

- কি হয়েছে?

- আমি জিন কে খুব ভয় পাই।

- কোনদিন দেখা হয়েছে?

- নাহ তবে সিরিয়ায় অনেক জিন আছে, মাঝে মাঝে মানুষের উপরে আছর করে বসে।

আরে না, আমি জোক করেছিলাম। এখানে ওসব কিছু নাই।

- থাক বা না থাক, আমি ঘুমাতে পারবো না। ঘুম আসবে না।

রেজা ওকে অনেক সাহস দিয়ে শুইয়ে দিয়ে নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লো।

ঘুম ও আসলো বেশ তাড়াতাড়ি।

অনেক রাতে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যাবার সময় দেখল যে লাইলা ওর মেঝের কার্পেটে ঘুমিয়ে আছে।

রেজা ওকে উঠিয়ে বিছানার আরেক দিকে শুইয়ে দিয়ে বাথরুম সেরে এসে আবার ঘুমিয়ে পড়লো।

শেষ রাতের দিকে লাইলার স্পর্শে ওর ঘুম ভেঙে গেল।

ঘুমের ঘোরে মেয়েটা ওকে জড়িয়ে ধরেছে।

রেজা আস্তে করে পাশ ফিরে শুল।

সকালে ঘুম থেকে উঠে রেজা বিছানা থেকে নামলো না, লাইলা তখনো ওকে জড়িয়ে ধরে আছে।

একটু পরে লাইলা ঘুম থেকে উঠে থতমত খেয়ে বিছানা থেকে নেমে গেল।

রেজা নিচে নেমে ডিম সেদ্ধ করে রুটি গরম করে সকালের নাস্তা বানিয়ে লাইলাকে এক প্লেট দিল আর নিজে এক প্লেট নিয়ে বসল।

- কাল রাতের জন্য আমি দুঃখিত, জীনের ভয়ে ঘুম আসছিল না বলে তোমার রুমে এসে মেঝেতে ঘুমিয়েছিলাম, বিছানায় কখন উঠলাম জানিনা।

- ঠিক আছে, কোন অসুবিধা হয় নাই। তবে সারারাত তোমার ঠ্যাং এর নিচে ঘুমাতে হয়েছে, এই আর কি?

লজ্জায় লাল হয়ে গেল মেয়েটি।

নাশতা শেষে ড্রইংরুমে এসে চা নিয়ে বসলো দুজনে।

শুরু হল লাইলার গল্প বলা।

- মালমো স্টেশানে একটা টেবিল নিয়ে একজন মহিলা পুলিশ ও একজন ইমিগ্রেশান অফিসার বসা ছিলেন। আমি তাদের কাছে গিয়ে পরিচয় দিলে ওরা আমাকে বসতে দিয়ে কফি আর কিছু খাবার দিলেন।

এর পরে আমার নাম ঠিকানা লিখে নিয়ে কোন পরিচয় পত্র বা পাসপোর্ট আছে নাকি জিজ্ঞেস করলেন।

- নাহ, আমার কাছে কোন কাগজ নেই।

- ঠিক আছে, আমরা একটা রিফিউজি আইডি বানিয়ে দিচ্ছি।

ওরা আমার ফটো তুলে একটা আইডি বানিয়ে দিয়ে জিগ্যেস করলো,

- তুমি কি ক্যাম্প এ থাকতে চাও নাকি নিজে নিজের ব্যবস্থা করতে চাও।

- আমি নিজের ব্যাবস্থা করে থাকবো।

- তুমি কি এখানে থাকবে নাকি অন্য কোন শহরে থাকবে?

- আমি রাজধানী শহরে থাকতে চাই।

- ঠিক আছে, তোমাকে আমরা কিছু টাকা দিচ্ছি। তুমি সেখানে গিয়ে নিজের ব্যাবস্থা করে নিও।

- আচ্ছা, ঠিক আছে। ধন্যবাদ।

আমি পরের ট্রেনে স্টকহোম চলে আসলাম।

এখানেও অমন একটা টেবিল দেখতে পেলাম, এদের সাথে একজন আরবি অনুবাদক ও ছিল।

থাকার ব্যাবস্থা করার জন্য তার সাহাজ্য কামনা করলাম।

সে একটা ফোন নাম্বার দিল। এবং বলে দিল যে আমার ঠিকানা ইমিগ্রেশানের কাছে রেজিস্ট্রি করিয়ে নিতে হবে।

সেই নাম্বারে ফোন করলে সেই লোক বলল যে আমি তার ঠিকানায় রেজিস্ট্রি করাতে পারবো, তবে সেখানে থাকার জায়গা নেই। তবে তার পরিচিত একজনের বাসায় থাকতে পারবো, তবে সেই বাসার ঠিকানা ইমিগ্রাশান কে দেয়া যাবে না।

ঠিকানা দেখানোর জন্য দু হাজার আর থাকার জন্য আড়াই হাজার ক্রনর দিতে হবে।

আমার মাসিক ভাতা পাঁচ হাজার ক্রনর। ওরা নেবে সাড়ে চার হাজার ক্রনর,

আমাকে মাত্র পাঁচশ ক্রনর দিয়ে মাস চলতে হবে।

এই ভাবেই চলছি গত চার মাস।

বলতো পাঁচশ ক্রনরে কি একজন মানুষ চলতে পারে?

কোন রকমে শুধু রুটি খেয়ে চলি, রাতে ঘুমাই করিডোরে।

কঠিন জীবন, তারপরেও স্বাধীনতো আছি।

রেজা মেয়েটিকে ভালো করে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখল।

জানালার মধ্যে দিয়ে আসা রৌদ্র তার গায়ে পড়েছে। রোদের আলো তার শরীরে এসে ক্যামন যেন গলে গলে প্রতিচ্ছবিত হয়ে একটা সোনালী আভায় বিচ্ছুরিত হচ্ছে।

তার খুব মায়া লাগলো মেয়েটার জন্য।

এই অল্প বয়েসেই যদিও সবাইকে হারিয়েছে তবুও সাহস হারায় নি।

- তুমি ইচ্ছে করলে আমার বাসায় থাকতে পারো।

- তোমাকে ভাড়া দেবার টাকা আমার কাছে নেই, আমি মাগনা থাকবো না।

- ইচ্ছে করলে আমার হাউস কিপার হিসেবে কাজ করতে পারো, তখন তো আর মাগনা থাকা হবে না।

- হাউস কিপারের কাজ কি?

- বাসার সব কিছু দেখে শুনে রাখবে, রান্না বান্নায় সাহাজ্য করবে।

- সেটা হলে তো ভালো হয়।

- তবে তাই হোক, তোমার জিনিস পত্র নিয়ে আসো।

লাইলা হেসে দিলো,

- আমার কোন জিনিস পত্র নাই, দুই একটা ছেঁড়া কাপড় আছে।

- ঠিক আছে, যোগার করে নেয়া যাবে নে।

বেলা দশটার দিকে লাইলাকে নিয়ে বের হয়ে প্রথমে ট্যাক্স অফিসে গিয়ে সোশ্যাল সিকিউরিটি নাম্বার এর জন্য আবেদন করাল। ওরা সাথে সাথেই নেতিবাচক উত্তর দিলে রেজা বলল

- এই মহিলা একটা চাকরী পেয়েছেন, নাম্বার ছাড়া ট্যাক্স দেবেন কিভাবে?

- ওহ! তাই, সেটা ও একটা কথা বটে। দাড়াও একটা নাম্বার দিচ্ছি।

লাইলার রিফিউজি কার্ড নিয়ে ওরা একটা রেজিস্ট্রেশান করে একটা নাম্বার তৈরি করে একটা প্রিন্ট করে দিলো।

লাইলা কিছুই না বলে কাগজ নিয়ে ওর সাথে অফিস থেকে বের হয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,

- এটা কি করে সম্ভব হল?

- এই পৃথিবীতে সব কিছুই সম্ভব, শুধু স্মার্ট হতে হয়।

এবার মল এ গিয়ে লাইলা কে নিয়ে একটা ব্যাংক এ ঢুকল রেজা।

ব্যাংকার মেয়েটা ওকে ভালো করে চিনে।

- এই মহিলার একটা একাউন্ট করে দাও তো

ট্যাক্স অফিসের কাগজটা এগিয়ে দেয়ায় কোন সমস্যা হল না। একাউন্ট হয়ে গেল।

রেজা সেই একাউন্ট এ কিছু টাকা জমা দিয়ে দিল।

- এনার একটা আইডি কার্ড দরকার।

- করে দিচ্ছি।

ব্যাংকার মেয়েটা লাইলাকে একটা ছোট ফটো স্টুডিওতে ঢুকিয়ে একটা ফটো তুলে নিয়ে বলল যে  - সাপ্তাহ খানেক এর মধ্যে বাসায় আইডি কার্ড চলে যাবে।

দুজনে ব্যাংক থেকে বেরিয়ে একটা কফি বার এ গিয়ে কিছু খাবার ও কফি তুলে নিয়ে একটা টেবিলে গিয়ে বসলো।

- তুমি খুব স্মার্ট, কি সুন্দর ভাবে কাজ দুটো করে নিলে, অথচ দুটোই খুব কঠিন কাজ।

- পৃথিবীটা চলে লজিকের উপরে, সঠিক লজিক জানতে হয়।

- তোমার মোবাইল ফোন আছে না?

লাইলা অনেক পুরনো একটা ফোন বের করে ওর হাতে দিল।

রেজা সেটা থেকে ওর ফোনে একটা কল দিয়ে টেস্ট করে দেখল যে ফোনটা কাজ করে।

তারপরেও পাশের একটা ফোনের দোকানে গিয়ে একটা ন্যানো সিম কার্ড সংগ্রহ করে নিল।

এরপরে এ দোকান সে দোকান ঘুরে লাইলার জন্য কিছু কাপড় চোপড়, জুতা, প্রয়োজনীয় মেয়েলী  জিনিসপত্র কিনে নিয়ে কতক্ষণ ঘুরাঘুরি করে ওরা বাসায় ফিরে এসে ড্রইং রুমে বসলো।

- তুমি উপরে গিয়ে তোমার জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখে গোসল করে নাও, আমি কিছু কাজ সামলে নেই।

লাইলা জিনিসপত্র নিয়ে উপরে চলে গেল, একটু পরে শাওয়ারের শব্দ পাওয়া গেল।

রেজা কম্পিউটারে ঢুকে ইমেইল গুলো চেক করে দেখল।

স্টকহোম পুলিশ তাকে দিয়ে একটা বড় কাজ করাতে চায়।

রোজগার ভালোই হবে, খুশী হল রেজা।

আগের করা একটা কাজের সুত্র ধরে এই কাজটা পেতে যাচ্ছে। সে একটা ইতিবাচক উত্তর দিয়ে কাজটা গ্রহন করার ইংগিত দিল।

একটা হাসপাতাল তাদের ডাটাবেইজ এর সম্প্রসারণ করাতে চায়, সেটার ও একটা ইতিবাচক উত্তর দিয়ে দিল।

বাহ, দিনটা বেশ ভালোই গেল। দুটো কাজেই ভালো টাকা আমদানি হবে। আর পুরনো কাজ সম্প্রসারণে ঝামেলা কম। প্রায় সব কিছু করাই আছে।

লাইলা উপর থেকে নেমে আসলো, ওকে দেখতে অপূর্ব লাগছিল। ওর মুগ্ধ দৃষ্টি দেখে লজ্জা পেল মেয়েটা।

- এ ভাবে কি দেখছ?

- নুতন কাপড়, ফিট হয়েছে কিনা চেক করছি

আরও লাল হয়ে গেল মেয়েটা, কাপড় তার শরীরে খুব আঁটসাঁট হয়ে বসেছে।

- কাপড়টা বেশ টাইট, বদলে এক সাইজ বড় আনা যাবে?

- তা যাবে, তবে একবার ধোয়া পড়লে আরও ঢিলে হয়ে আসতে পারে।

- আচ্ছা থাক তাহলে।

রেজা উপর থেকে ওর একটা পুরনো আইফোন এনে সেটাতে লাইলার জন্য আনা ন্যানো সিম কার্ড টা ফিট করে সেটিং করে দিল। ব্যাংক এর ওয়েব সাইট এ ঢুকে ওর ফোনটায় মোবাইল ব্যাংকিং সেট করে নিয়ে ওকে বুঝিয়ে দিল।

- তুমি যদি রাজী হও তবে এবার একটা চান্স নেব।

- কিসের চান্স?

- গত চার মাসে ঠিকানা আর থাকা বাবদ ওই দুইজনকে তুমি যে টাকা দিয়েছ সেটা ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করতে পারি।

- সেটা কি ভাবে করবে?

- তুমি রাজী হলে করতে পারব বলে আমার বিশ্বাস।

লাইলার ইতস্তত ভাব দেখে সে বল্লল,

- ভয়ের কিছু নেই, আমার উপরে বিশ্বাস রাখতে পারো।

- ঠিক আছে, ঝামেলা না করে চেষ্টা করা যায়।

- তোমার অধিকার তোমাকে আদায় করে নিতে হবে। তারা তোমাকে ঠকিয়েছে। সে কারনেই আমি এটা করতে চাচ্ছি।

- ওকে, তবে তাই হোক।

রেজা একটু ভেবে নিয়ে ব্যাপারটা লাইলাকে বুঝিয়ে বলল,

- প্রথম জন তোমাকে ঠিকানা ব্যাবহারের জন্য অনুমতি দিয়ে টাকা নিচ্ছে, এটা সুইডিশ আইনে বেয়াইনি। এই সুযোগটা নেব।

আর দ্বিতীয়জন তোমাকে কোন রুম না দিয়ে করিডোরে থাকতে দিয়ে ভাড়া নিচ্ছে, এটাও বেয়াইনি।

- এসব প্রমান করবে কিভাবে?

- প্রমান করার দরকার মনে হয় হবে না। ওরা আরও লোক কে এভাবে শোষণ করছে নিশ্চয়ই, সেটা রক্ষা করার জন্য সারেন্ডার করবে।

- আমার মতো অনেক লোক ই সেখানে নাম লিখিয়েছে।

- শুন, আমি ফোন করে কথা বলার পরে ওরা তোমাকে ফোন করবে। পুলিশের সাথে কথা না বলতে অনুরোধ করবে। তুমি বলবে যে তোমার দেয়া আট হাজার টাকা ফেরত দিলে তুমি চুপ থাকবে, না হয় সব বলতে বাধ্য হবে।

- আচ্ছা, পরে কোন ঝামেলা হবে না তো?

- মনে হয় না। ওরা ওদের এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য ই চুপ থাকবে।

রেজা লাইলার কাছ থেকে প্রথম জনের নাম আর  ফোন নাম্বার নিয়ে একটা কাগজে লিখে নিল।

- ওই লোক আমাকে কিভাবে টাকা ফেরত দেবে?

- তুমি ওকে বলবে যে তোমার ফোন নাম্বারে টাকা পাঠিয়ে দিতে।

- ফোন নাম্বারে টাকা রাখা যায় নাকি?

- তোমার ফোন নাম্বারটা ব্যাংক একাউন্টের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে।

- ওকে।

রেজা লোকটাকে ফোন করলো, দুই রিঙের পরেই একজন ফোন তুলে উত্তর দিল,

- মোহাম্মদ আলী বলছি।

- গুড মর্নিং, আমি সোলনা পুলিশ স্টেশান থেকে বলছি। লাইলা নামে একজন মহিলা সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন ছিল।

- আমি এই নামে কাউকে চিনি না।

- তাই? তাহলে তো তোমার বাসায় এসে খোঁজ নিতে হবে।

- তুমি আসতে পারো তবে কাউকে পাবে না, আমি আজ বিকেলেই ডেনমার্ক বেড়াতে যাচ্ছি। ফিরতে মাস খানেক দেরী হবে।

- ওকে ফিরে আসলে কথা হবে, রাখি।

লাইলা সুইডিশ না বুঝায় রেজার দিকে তাকিয়ে ছিল।

- ও কি বলেছে?

- তোমাকে চিনেনা বলেছে।

- তাই, এখন?

- এটাই ইতিবাচক, দেখা যাক।

একটু পরে লাইলার ফোনের রিং বেজে উঠল, আর লাইলা উত্তর দিল।

মিনিট কয়েক কথা বার্তা চলল, শেষের দিকে লাইলা একটু উত্তপ্ত হয়ে উঠলো।

আলাপ শেষে রেজা কোন প্রশ্ন করলো না।

মিনিট দুয়েক পরে লাইলা ওকে আলাপ এর ব্যাপারটা খুলে বলল।

- ব্যাটা ভীষণ শক্ত, আমাকে পুলিশের সাথে কথা না বলতে বলেছে।

- তুমি কি বলেছ?

- আমি বলেছি যে পুলিশের জেরার সামনে আমি টিকতে পারবো না, সত্য বলে দিতে হবে।

- ভালো করেছ, টাকার কথা কি বলেছ?

- ও বলেছে যে ওর কাছে এই মুহূর্তে কোন টাকা নেই, তবে যোগাড় করতে পারলে দেবে।

- দেখা যাক!

ঘন্টা খানেক পরে লাইলার ফোনে টিং করে একটা রিং বেজে উঠলে রেজা হেসে দিল।

- হাসছ কেন?

- তোমার ফোনে একটা মেসেজ এসেছে, পড়ে দ্যাখ।

- আমি তো সুইডিশ বুঝি না, তুমি দ্যাখ।

রেজা ফোনটা হাতে নিয়ে মেসেজটা দেখল।

- তোমার একাউন্ট এ আট হাজার ক্রোনর জমা হয়েছে।

- হা হা হা, দারুন তো! ব্যাটা দেখি ভয় পেয়েছে।

- ঠিক ভয় না, সে তার ব্যাবসা রক্ষা করার চেষ্টা করছে।

কতক্ষণ পরে ওই আরেকজনকে ফোন করবো, দেখা যাক কি হয়।

রেজাকে ফোন করতে হল না। ঘণ্টা খানেক পরে ওই লোক ই ফোন করে লাইলাকে ওর নাম পুলিশকে না বলতে অনুরোধ করল, আর ওর একাউন্ট এ আট হাজার টাকা দিয়ে দেবে বলে কথা দিল।

লাঞ্চের আগেই আরও আট হাজার টাকা এসে লাইলার একাউন্টে জমা হল।

 লাইলা এখন ষোল হাজার ক্রোনরের মালিক, এটা ওর জন্য অনেক টাকা।

ও সোফায় রেজার পাশে বসে ওকে জড়িয়ে ধরে ধন্যবাদ দিল।

- তোমার সাথে পরিচয় হওয়ায় আমার জীবনের সব কুয়াশা কেটে যাচ্ছে। মানসিক অবসন্যতা কেটে যাচ্ছে, সব কিছু ভালো লাগা শুরু হয়েছে।

- সময়ের সাথে বাকী জিনিষগুলো ও ঠিক হয়ে যাবে। আমি দুটো বড় কাজ পেয়েছি, অনেক টাকার ব্যাপার। তোমাকে নিজের সাথে সময় কাটাতে শিখতে হবে। দিনে অন্তত আট ঘন্টা আমাকে কাজে মনোযোগ দিতে হবে এবং প্রায়ই পুলিশ হেড কোয়ার্টারে আর হাসপাতালের অফিসে যেতে হবে, ঠিক আছে?

- ঠিক আছে, তবে আমি কি ভাবে সময় কাটাবো সেটার একটা প্ল্যান করে দিও।

- প্রতিদিন বাইরে বেড়াতে যাবে, এক এক দিন এক এক দিকে হেঁটে আসবে, সুইডেন একটা সুন্দর দেশ। হাটতে তোমার ভালো লাগবে।

এর পরে ইউটিউব এ একটা একাউন্ট করে দেব, ফোনে আরবী গান শুনতে পারবে।

রেজা লাইলার ফোনটা নিয়ে ইউটিউব এ পপুলার আরবী গান সার্চ করে লাইলার হাতে ফোনটা দিল, লাইলা একটা প্রিয় গান শুনতে শুরু করলো।

একটু পরে উঠে গানের সাথে কোমর দুলিয়ে নাচা শুরু করলো।

মুগ্ধ চোখে রেজা তাকিয়ে থাকল।

- কি দেখছ অমন করে?

- আরবী সংস্কৃতির প্রতি আমার অনুরাগ প্রচুর।

- হুম, অনুরাগ কেবল সংস্কৃতিতেই সীমাবদ্ধ রেখ।

- আপাতত সেটাই ইচ্ছা, তবে ভবিষ্যৎ এর কথা জানি না।

লাইলার ভ্রুকুটির সামনে রেজা কাজে মনোযোগ দিল।

খুব অল্প সময়েই লাইলা নিজেকে গুছিয়ে নিল।

অনেকটা নিজে নিজেই, তবে প্রয়োজনে রেজাকে এটা সেটা জিগ্যেস করতে দ্বিধা করে না।

এক সাথে দুটো কাজ হাতে পাওয়ায় রেজার ব্যাস্ততা একদম তুঙ্গে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তার পরেও সে একটা রুটিন করে কিছুটা সময় নিজের জন্য রেখেছে।

বাসায় বসে কাজ করার একটা বিরাট সুবিধা আছে, রেজা সেটাই কাজে লাগিয়েছে।

কাক ডাকা সকালে ঘুম থেকে উঠেই হালকা নাশতা করে চা খেতে খেতে দিনের কাজের প্ল্যান করে নেয়, এর পরে দুপুর পর্যন্ত কাজ করে।

এদিকে লাইলা নাশতা করেই রেজার উপদেশ মতো হাটতে বের হয়।

সুইডেন দেশটা দারুণ, একা একা হলেও হাটতে লাইলার খুব ভালো লাগে।

হারিয়ে যাবার কোন ভয় নেই, রেজা ফোনের GPS এর ম্যাপ এ বাসাটা সেট করে দিয়েছে। কোন অসুবিধা হলে সেখানে ক্লিক করলেই ফোন তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসে।

দুপুরে দুজনে এক সাথে লাঞ্চ করে, এর পরে রেজা আবার কাজ নিয়ে বসে আর লাইলা উপরে গিয়ে কিচ্ছুক্ষন রেস্ট করে বা গান শুনে, গানের সাথে ইউটিউব ফলো করে নাচা নাচি করে। 

আবার বিকেলে হাঁটতে বেরোয়। বিকেল পাঁচটার পরে রেজা কাজ বন্ধ করে ফেলে।

এর পরে লাইলার সাথে গল্প করে। মেয়েটা গল্প করতে খুব পছন্দ করে। এটা সেটা কতকিছু!

ওর মুখ বন্ধ হয় না।

আস্তে আস্তে লাইলাকে সুইডিশ শেখানো শুরু করে সে। মেয়েটা এদিক দিয়ে খুব আইলশা, একদম শিখতে চায় না। উল্টা সুইডিশ এর জায়গায় ওর ইংলিশের উন্নতি অনেক তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল।

ওর মনে কতো জিজ্ঞাসা এসে দাড়ায়,

- আচ্ছা, বাইরে দেখি মেয়েরা ঘাসের উপরে প্রায় উদোম হয়ে রোদ পোহায়, ওদের লজ্জা লাগে না?

- নাহ, লজ্জার কি আছে? ওরা যখন রোদ পোহায় তখন আশে পাশে কেউ থাকে কি?

- না, কেউ ওদিকে তাকায় ও না। অবাক করা কাণ্ড!

- এটাই এখানকার আসল সংস্কৃতি, সবাই নিজেকে নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। অন্যরা কি করছে তা নিয়ে মাথা ঘামায় না।

- আমাদের পাশের বাসার লোকটা আর তার বউ একদম উদোম হয়ে রোদ পোহায়।

- তুমি কি করে দেখলে?

- কাঠের বেড়ার ফাক দিয়ে।

- এরকম দেখতে যেও না, এটা খুবই অভদ্রতা।

- আচ্ছা।

- সামার এলে পুরা দেশের মানুষ ই রোদ পোহায়। শীতের সময়ে পুরা দেশটা বরফের নিচে থাকে, মানুষ অনেক কাপড় পড়ে জবুস্তবু হয়ে থাকে। সে কারনেই সামার এলে সূর্যের তাপকে শরীর দিয়ে স্বাগত জানায়।

তোমার ইচ্ছে হলে তুমিও পেছনের লন এ রোদ পোহাতে পারো।

- যাহ, আমার কি লজ্জা শরম নাই নাকি?

- সেটা তোমার ইচ্ছে, রোদ না পোহালে শরীরের চামড়া নষ্ট হয়ে যাবে।

রেজা ঠাট্টা করছে কিনা দেখল।

পরের দিন থেকে লাইলা ও রোদ পোহানো শুরু করে দিল, তবে প্রায় সংযত কাপড় পড়ে।

হাত, পা ও রেজা আশেপাশে না থাকলে একটু বেশী করে খুলে দেয়।  

রোদ পোহাতে ওর ভালোই লাগে।

রাতের বেলায় ও রেজার বিছানায় ই ঘুমায়। শোয়ার সময় একদম আরেক পাশে গিয়ে জবুস্তবু হয়ে শুলেও ঘুম আসলেই সে বিছানা দখল করে নেয়। একদম মাঝখানে এসে রেজার উপরে পা তুলে দিয়ে বা জড়িয়ে ধরে ঘুম দেয়।

মাঝ রাতে উঠে গেলে আবার অপরদিকে চলে যায়।

ভালোই দিন কাল কেটে যাচ্ছিল।

এর মধ্যে একদিন ইমিগ্রেশান থেকে লাইলার একটা চিঠি এলো।

ওদের সাথে তার ইন্টার্ভিউর তারিখ পড়েছে।

তিনমাস পরে ওদের অফিসে গিয়ে দেখা করতে হবে।

ওকে সুইডেনে থাকার অনুমতি দেবে কিনা এ নিয়ে সিধান্ত নেয়া হবে।

ভয়ে লাইলার অবস্থা কাহিল হয়ে গেল।

- ওদের আমি কি বলবো?

- তোমার সাথে যা হয়েছে তাই বলবে।

- ওরা বিশ্বাস করবে?

- যাতে বিশ্বাস করে সেভাবে বলবে।

- ওহ আল্লাহ,  এ নিয়ে তোমার সাথে আলাপ করতেই আমার হাত পা কাঁপছে, ওদের সাথে আমি কথা বলতে গিয়ে বেহুঁশ হয়ে যাব।

- হলে হবে, তবে তোমাকে তো যেতেই হবে। তবে ওরা তোমাকে একজন উকিল দেবে, সে তোমার পক্ষ নিয়ে সেখানে থাকবে।

ওর সারাদিন কাটল বিভিন্য আয়াত পড়ে ও বুকে ফু দিয়ে।

মেয়েটা কিছুতেই সামলাতে পারছে না। একটু পরে পরেই চোখের পানি ছাড়ছে।

একটু পরে পরেই ওর দিকে তীর্য দৃষ্টিতে তাকায় আর প্রশ্ন করে,

- আমার এই বিপদের দিনে তুমি দেখি একদম শান্ত শিষ্ট হয়ে বসে আছো

- এখানে আমার কিছু করার নাই, তুমি ওদের সাথে কথা বলে বুঝাতে হবে।

- ওরা যদি আমার কথা বিশ্বাস না করে?

- বিশ্বাস না করলে তোমাকে ওরা সিরিয়ায় ফেরত পাঠিয়ে দেবে।

লাইলা শব্দ করে কেঁদে উঠল,

রেজা ওকে কাছে টেনে নিল,

- এতো নার্ভাস হলে ক্যামনে হবে? এখনো তিন মাস বাকী আছে।

- আমি এই তিনমাস বাঁচব না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।

- ভয়ের কিছু নেই, আমি আছি না?

- তুমি তো কিছুই বলছ না!

- এটা কি বল্লা? আমি ভাবছি না?

- তুমি ভাবলে একটা কিছু হয়ে যাবে, আমি জানি তুমি খুব স্মার্ট!

- তাই? ক্যামনে বুঝলে?

- মেয়েরা বুঝতে পারে।

- হয়েছে, এখন গিয়ে রোধ পোহাও। আমি একটু ভাবি।

লাইলা বাড়ীর পেছনে গিয়ে একটা চাদর বিছিয়ে সেটার উপরে শুয়ে পড়লো, শোয়ার আগে জামাটা খুলে নিল।

রেজা মৃদু হেসে ওর কাজ নিয়ে বসলো।

দিন কয়েক ধরে লাইলা খুব অস্থির, কোন দিকেই মনোযোগ নেই। রেজার উপরে ক্যামন যেন রাগ আর অভিমানের মিশ্রণ।

- তোমার কি হয়েছে? মন মানসিকতার এই অবস্থা কেন?

- কিচ্ছুই ভালো লাগছে না। দেশের কথা, যুদ্ধের কথা বারে বারে ঘুরে ঘুরে মনে পরে যাচ্ছে। অথচ বসে আছি। কিচ্ছুই করছি না।

- ইন্টার্ভিউর তো দেরী আছে, সেটা নিয়ে এক সাপ্তাহ আগে বসলেই হবে।

- আমার মাথা গুলিয়ে যায়।

- আচ্ছা একটা কাজ করি, তোমার প্রিপারেশন নিয়ে কাজ শুরু করে দেই।

- সেটাই ভালো হবে।

রেজা তার এক্সট্রা ল্যাপটপটা বের করে লাইলাকে ওর ঘটনাগুলো লিখে ফেলতে বলল।

- আমি তো ইংরেজিতে লিখতে পারব না।

- তুমি গুগল ট্রান্সলেটরে গিয়ে আরবিতে লিখ, সেটা ইংরেজি হয়ে সেভ হবে।

রেজা লাইলাকে আরবি তে লিখা শিখিয়ে দিল। কতক্ষন পরে লাইলার একটু হাত আসলে রেজা তাকে বলল,

- তুমি আগে একটা প্রাথমিক লিখে ফেল, পরে আমরা দুজনে মিলে সেটাকে একটা ফাইনাল রুপ দেব।

- কি কি লিখবো?

- সব কিছু সঠিকভাবে লিখে ফেল, পরে এডিট করে নেব।

লাইলা লেখা শুরু করে দিল। লিখতে বসে ওর মুড বদলে বেশ ইতিবাচক হয়ে আসলো।

রেজা সারাদিন ওর কাজ করে আর লাইলা ভাবে আর ভাবনাগুলো লিখে ফেলে। বিকেল বেলায় দুজনে গিয়ে বেঞ্চে গয়ে বসে আর কবুতর কে রুটি খাওয়ায়।

এর পরে কয়েক মাইল হেঁটে বাসায় ফিরে এসে রাতের খাবার খেয়ে নিয়ে টিভির সামনে বসে আড্ডা মারে আর লাইলার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যায়।

মেয়েটার মনে হাজারো প্রশ্ন।

রেজা বুঝতে পারে যে রক্ষণশীল পরিবার ও দেশ থেকে আসায় ওর হিসাবগুলো আর মিলাছে না। সুইডেনের অতিরিক্ত স্বাধীনতা ওকে ভ্যাবাচেকা খাইয়ে দেয়।

- আচ্ছা, এখানে যে ছেলে মেয়েরা অবাধে মেলামেশা করে ওদের বাবা মা'রা কিছু বলে না?

- ১৬ বছরের আগে পর্যন্ত কিছুটা বাধা নিষেধ থাকে, তবে ১৬'র পরে উদার হয়ে যায়। ১৮'র পরে একদম স্বাধীন।

- শুনেছি ১৬'র আগেও ছেলে মেয়ে মেলামেশা করে।

- কেউ কেউ করে। তবে স্কুলের টিচার বা নার্স ওদের গাইড করে যাতে কোন ঝামেলায় না পড়ে যায়। ওরা সম্পূর্ণ প্রয়োজনীয় সাপোর্ট পায়।

- বিয়ে না করা অবস্থায় বাচ্চা হয়ে গেলে সে বাচ্চা কি সামাজিক ভাবে গৃহীত হয়?

- এখানে সেই সমস্যা নেই, প্রায় অর্ধেক সুইডিশ এর বাবা আর মা পরস্পরের সাথে বিবাহিত নন। তাদের বাবা মায়ের ও একই অবস্থা, এভাবেই চলছে জনম জনম। সুতরাং সামাজিক ভাবে হেয় হবার কিছু নেই।

- এখানের সম্পর্ক তো নাকি বেশীদিন টেকে না, তখন বাচ্চাদের কি হয়?

- বাচ্চারা কার কাছে থাকবে সেটা আদালত ঠিক করে দেয়। তবে সাধারনর অর্ধেক ভাগাভাগি করে নেয়। এক সাপ্তাহ বাবার কাছে আর এক সাপ্তাহ মায়ের কাছে। তবে ব্যাতিক্রম ও হয়। বাবাকে প্রতিমাসে একটা নির্দিষ্ট পরিমান টাকা দিতে হয়।

- এর নিশ্চয়ই অনেক কুফল আছে।

- সেটা তো আছে নিশ্চয়ই। দুটো পরিবারে থাকতে গিয়ে বাচ্চাকে বলতে গেলে চারজন অভিবাবকের হাতে পড়তে হয়। এটায় কিছুটা মানসিক যন্ত্রণায় পড়তে পারে। সবাই তো আর সমান না। সমস্যা বড় আকারে ধারন করলে রাষ্ট্র এগিয়ে এসে সেই বাচ্চাকে সাপোর্ট দেয়। দরকার হলে তাদের আশ্রয় কেন্দ্রে থাকার ব্যাবস্থা করে দেয়। তবে এসব সমস্যা সব দেশেই হতে পারে। আমাদের দেশেও হয়, তবে সব দেশের সমস্যাই ভিন্য রকমের। সেটা সমাজ, সংসার ও ধর্মের উপরে নির্ভর করে।

লাইলা ঘনিস্ট হয়ে রেজার পাশে বসে।

- আমার এসব পছন্দ হয় না। সংসার হবে ভালবাসার বন্ধনে মজবুত হয়ে গড়া। বাচ্চারা বাবা মায়ের আদরে মানুষ হবে, এটাই হওয়া উচিত।

- তোমার সাথে আমি একশ পারসেন্ট এক মত। তবে সমস্যা হয়ে যেতেই পারে।

- সমস্যা হলে মিটিয়ে নেয়া উচিত, তাইনা?

- হ্যাঁ, কিন্তু মেটানো সম্ভব হয়ে না উঠলে আর কি করা যায়? এখানকার মানুষ সম্পদশালী ও স্বাধীন চেতা। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আছে বলেই কোন ছার দেয় না।

- আমার যখন সংসার হবে তখন আমি চাকরী করবো না, জামাইর রোজগারের উপরে বসে বসে খাব আর বাচ্চা কাচ্চা মানুষ করবো, এতে সংসার টিকবে।

- জামাই ধরে মাইর দিলে?

- বাথরুমে গিয়ে কাঁদবো আর এর পরে বেরিয়ে এসে জামাইকে জড়িয়ে ধরে বেশী করে  ভালোবাসা দেব।

তাকে ক্ষমা করে দেব। আমারি তো জামাই, তাইনা?

- হুম।

হাসতে হাসতে রেজাকে জড়িয়ে ধরে লাইলা।

লাইলার লেখা এগিয়ে চলে, গুগল ট্রান্সলেট করার পরে রেজা লেখার অসঙ্গতি ঠিক করে দেয়। ট্রান্সলেসন থেকে সে বুঝতে পারে যে লাইলা কি বলতে চাচ্ছে।

একটা জিনিস রেজার কাছে পরিষ্কার হয়ে ধরা পড়ে যে অতিরিক্ত ইমোশন লাইলার কাহিনীটা নষ্ট করে ফেলছে। সে কিছু বলে না। অপেক্ষা করে কাহিনীর শেষের অপেক্ষায়।

একদিন কাহিনী শেষ হয়ে আসে ও রেজা এটা সেটা খুঁটিনাটি প্রশ্ন করে এডিটিং ও শেষ করে।

সে বুঝতে পারে যে লাইলা এই কাহিনী দিয়ে সুইডেনে থাকার জন্য অনুমতি হয়ত পাবে না।

যাই হোক, সে এবার আরেকটা প্ল্যান করে।

লাইলার গল্পটা প্রিন্ট করে ও আবার লাইলাকে দেয় ও বার বার পড়তে বলে।

- আমাকে কেন দিচ্ছ, আমি তো এটা জানি।

- আমি জানি যে তুমি যান, কিন্তু ইমিগ্রেশান বার বার তোমাকে প্যাঁচায়ে প্রশ্ন করে আউলায়ে দেবে। তাই প্রতিটি শব্দ তোমার মাথায় ঢুকায়ে রাখতে হবে।

রেজা বুঝতে পারলো যে লাইলা খুব অধৈর্য হয়ে আছে আর ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।

সে আর কিছু বলল না। তবে বুঝতে পারলো যে লাইলা নিজেই নিজের বিপদ টেনে আনছে।

ওদের দিন কেটে যায় আর ওরা দুজনে দুজনের আরও কাছাকাছি এগিয়ে আসে।

এর মধ্যে একদিন লাইলা ইমিগ্রেশানের সাথে ইন্টার্ভিউ দিয়ে আসে।

লাইলার হাসি মুখ দেখে রেজা ওকে প্রশ্ন করে সব জেনে নিয়ে বুঝতে পারে যে ইন্টার্ভিউটা আসলে ভাল হয় নি।

লাইলা সব কিছু পেঁচিয়ে ফেলেছিল।

কিন্তু লাইলা সেই আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচ বুঝে উঠতে পারে নি।

সে ভেবেছে যে সবকিছু ঠিক ঠাক ই হয়েছে।

রেজা কোন কিছু বলে ওর মন খারাপ না করার সিধান্ত নেয়।

ওর কাজ দুটো পুরো দমে চলছে, তাই লাইলার দিকে নজর দেয়ার খুব একটা সময় ও তার নেই।

ঘর সংসারের বেশীরভাগ ই লাইলা দেখাশুনা করে। তবে সব কিছুই রেজার সাথে আলাপ করে নেয়।

রেজা লাইলার সাথে বেশীরভাগ কথাবার্তা ই সুইডিশে বলা শুরু করে, যদিও তার সুইডিশ জ্ঞান খুবই কম।

আস্তে আস্তে ব্যাবহারিক শব্দগুলো দিয়ে কথাবার্তা বলতে শিখে নেয় লাইলা। যদিও প্রচুর ভুল হয়ে যায়। রেজা সেগুলো শুদ্ধ করে দেয়।

একদিন লাইলার কাছে ইমিগ্রেশান থেকে একটা মোটা খাম আসে।

লাইলা সেটা খুলে এনে রেজাকে দেয়।

রেজা পড়ে দেখে যে লাইলার আবেদনকে নাকচ করে দেয়া হয়েছে। কারন হিসেবে বিশ্বাস যোগ্যতার অভাব দেখানো হয়েছে।

সে লাইলাকে পুরো চিঠিটা বুঝিয়ে বলল।

লাইলা একদম ভেঙে পড়লো।

- তোমাকে এপিল করার সময় ও সুযোগ দেয়া হয়েছে।

- এপিলে কোন লাভ হবে কি?

- তোমাকে নুতন কিছু নিয়ে এসে তোমার ব্যাপারটা সিরিয়াস করে তুলতে হবে।

- নুতন কিছু আমি কোথায় পাব?

- আমি জানি না, তবে তুমি ভেবে দ্যাখ।

লাইলা উপরে চলে গেল আর রেজা তার কাজ নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো।

রাতের বেলায় লাইলা খেতে নামল না। উপরেই শুয়ে রইল, বেচারি একদম ভেঙে পড়েছে।

রেজা কিছু খাবার নিয়ে ওকে খাইয়ে দেবার চেষ্টা করলো, কিন্তু ও কিছুই খেল না।

রেজা বুঝতে পারলো যে মেয়েটা এই ধকল থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না।

যে মেয়ে আইসিস এর কম্যান্ডারের গলা কাটতে দ্বিধা করেনি, সে আজ আমলাতন্ত্রের কাছে অসহায়।

সে নিচে নেমে এসে কিছুক্ষণ চিন্তা করলো।

সুইডিশ ইমিগ্রাশান লাইলাকে সিরিয়ায় ফেরত পাঠাবে, সেখানে সে একদিন ও টিকতে পারবে না।

ওকে মেরে ফেলা হবে।

একটু রাত হলে সে উপরে গিয়ে শুয়ে পড়লো।

একটু পরে লাইলা এসে ওকে জড়িয়ে ধরল।

- আমি তোমাকে ছাড়া কি করে থাকব রেজা?

লাইলা নিজেকে না, রেজাকে নিয়ে চিন্তা করছে।

রেজা অবাক হল।

- সব সমস্যার একটা করে সমাধান আছে, তোমার ও একটা কিছু সমাধান হবে।

- সেটা ঠিক বলেছ, কিন্তু কোন সমাধানেই যে তোমার নাম নাই। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না,

আনা বাহিব্বিক রেজা, আনা বাহিব্বিক।

রেজা কথাটার মানে জানে, কিন্তু লাইলার মুখে শুনে অবাক হয়ে গেল।

লাইলা বার বার ফিস ফিস করে বলেই চলেছে

- আনা বাহিব্বিক, আনা বাহিব্বিক। আমি তোমাকে ভালোবাসি, রেজা।

লাইলার মুখে বাংলা শুনে অবাক হল রেজা। বুঝতে পারলো যে সে গুগল থেকে ট্রান্সলেট করে কথাটা হয়ত শিখেছে, তবে লজ্জায় হয়তো ওকে বলতে পারেনি।

রেজা ওকে কাছে টেনে নিল।

আদরে আদরে ভাসিয়ে দিল।

খুব সকালে রেজার ঘুম ভেঙে গেল।

বাথরুম সেরে ফিরে এসে দেখল যে চেহারায় খুব একটা প্রশান্তি নিয়ে লাইলা ঘুমাচ্ছে।

ও অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলো।

সকালে ঘুম থেকে উঠে এই মুখটা এমনভাবে আমি সারাজীবন ই দেখতে চাই, ভাবল সে।

এর পরে লাইলার ফোনটা নিয়ে নিচে চলে গেল।

লাইলার ফোনের পাসওয়ার্ড ওর জানা আছে, ফোনটার লক খুলে রেজা তার আইডি কার্ডের একটা ছবি তুলে লাইলার উকিলকে ছবি সহ একটা এস এম এস পাঠাল।

"কাল ইমিগ্রেশান থেকে আমার এপ্লিকেসন এর নেতিবাচক একটা উত্তর পেয়েছি। তোমাকে বলা হয়নি যে আমি বেশ কিছুদিন ধরে এক ভদ্রলোক এর সাথে লিভ টুগেদার করছি। এটা আমার ইমিগ্রাশান স্ট্যাটাস এর পরিবর্তন করবে বলে আশাকরি। আমার পার্টনার এর আইডি কার্ড এর একটা ছবি পাঠালাম, আর কোন কিছুর প্রয়োজন হলে জানিও"।

রেজা উপরে গিয়ে ফোনটা লাইলার বালিশের পাশে রেখে নিচে এসে সোফায় আবার ঘুম দিল।

কতক্ষণ পরে লাইলার স্পর্শে ওর ঘুম ভাঙল।

 -  রেজা দ্যাখ, আমার উকিল একটা মেসেজ দিয়েছে,

কি মেসেজ?

আমার কেস নাকি রিভিউ করা হবে আর আমার পারমিশান হয়ে যাবে,

তাই, শুনে খুশী হলাম।

এটা কি করে সম্ভব হলো, রেজা! তুমি কি কিছু করেছ?

 রেজা সকালের পাঠানো মেসেজটা বের করে লাইলাকে দেখাল

লাইলা এসে ওকে জড়িয়ে ধরল,

আনা বাহিব্বিক রেজা, আই লাভ ইউ!

হ্যাপি ভেলেন্টাইন।

এটা কি করে সম্ভব হলো, রেজা! তুমি কি কিছু করেছ?

 রেজা সকালের পাঠানো মেসেজটা বের করে লাইলাকে দেখাল

লাইলা এসে ওকে জড়িয়ে ধরল,

আনা বাহিব্বিক রেজা, আই লাভ ইউ!

হ্যাপি ভেলেন্টাইন।

 

(স্টকহোম, সুইডেন থেকে)

 

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২৩:৩৪:৪২