রমেনবাবুর সংসার
জয়া গুহ
অ+ অ-প্রিন্ট
অভ্যাসবশত রমেনবাবু ৩০০ মৌরলা মাছ কিনেই ফেললেন। চকিতে খেয়াল পড়ল কে রাঁধবে? রান্নার মাসি নিয়ে গেলেই একঝুড়ি কথা শোনাবে। বউমা চাকরি করে, আর না করলেও বেগুন দিয়ে মৌরলা মাছের যে স্বর্গীয় ঝাল রান্না করা যায় তার কৌশল সে জানে না। সুপর্ণা মানে তাঁর স্ত্রী গত হয়েছেন, একমাস হল। সে বেঁচে থাকলে এত দুশ্চিন্তা তাকে করতে হত না। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ঝোলাটি নিয়ে, বাড়ির দিকে রওনা হলেন তিনি। দুই সাইকেল ওয়ালা ঘাড়ের পাশ দিয়ে যাবার সময় বলে গেল, দাদু ধার দিয়ে হাঁটুন।

গ্রিলের দরজাটা ঠেলে ভিতরে ঢুকলেন রমেন বাবু। বউমা আর ছেলে খাবার টেবিলে, দুজনেই একসাথে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায়। বউমাকে পার্কস্ট্রীটে নামিয়ে ছেলে চলে যায় সেক্টর ফাইভ। নাতিকে স্কুলের গাড়ি নিয়ে যায় সকালে ৭টায়। 

-বাবা, রান্নার দিদি আজ আসবে না।তুমি বাজার সব ফ্রিজে রেখে দাও। মাছ ডিপ ফ্রিজে রেখে দাও।

-বাবু, কাটাপোনা তো ফ্রিজেই রাখব,কিন্তু অল্প মৌরলা মাছ আছে তো, মানে...

কিন্তু কিন্তু করতে থাকেন রমেন বাবু।

-বাবা আপনি ওই কুচো মাছগুলো কেন যে আনেন? আপনার ছেলে, নাতি কেউ খায় না। রান্নার দিদি মুখভার করে। আপনাকে কতবার বারণ করেছি।

এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে যায় সৌমি, মানে রমেনবাবুর পুত্রবধূ।

আর কিছু বলার সাহস হয় না, রমেন বাবুর। নিজের ঘরে গিয়ে পাখাটা ফুল স্পীডে চালিয়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েন। সামনের ডেস্কে বাংলা দৈনিকের পাতা উড়ছে। এখুনি খুলে গিয়ে ঘরময় ছড়িয়ে যাবে। আর উঠতে ইচ্ছা করল না তার। এই বাংলা কাগজ, কুচো মাছ, টিভির সিরিয়াল , এমনকি এই বাড়ি টাও শুধু টিকে আছে তার মতই অপ্রয়োজনীয় হয়ে। বউমা তো আসতেই চায় না এত ভেতরে। অফিস থেকে ফিরে ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়িতেই থাকে, ওখান থেকেই স্কুটি করে ছেলে কে পড়াতে দিয়ে আসে। ছেলে রাত দশটায় বউ আর নাতিকে নিয়ে ফেরে। অর্থাৎ এ বাড়ির যা কিছু সবই অতিরিক্ত আর অপ্রয়োজনীয়। এভাবেই কেটে যাচ্ছে রমেন বাবুর। এ বাড়িটা অনেক কষ্টে একটু একটু করে করেছিলেন, লোন শোধ করেছেন পুরো চাকুরী জীবন ধরে। বেসরকারি অফিসে সাধারণ মাইনের চাকুরীজীবী, ছেলেকে মোটামুটি নামী ইংরাজি মাধ্যম স্কুলে পড়িয়েছেন। নিজের সাধ তাই সাধ্যের বাইরেই থেকে গেছে চিরকাল। মাসের প্রথম রবিবার মাংসের অপূর্ব গন্ধে ছেয়ে যেত বাড়ি, বাকি রবিবার গুলো মাছ বলতে চুনো মাছ, ল্যইটা মাছ, আয়লা মাছ, ফেঁসা বা খয়রা। শুধু ছেলের জন্য বরাদ্দ ছিল একপো দুধ। এতেই খুব খুশি ছিলেন তিনি আর সুন্দরী গিন্নি সুপর্ণা। গরীব বাড়ির বউ রা অন্নপূর্ণা, অল্প উপাদানে কি সব অপূর্ব রান্না যে সুপর্ণা করত আজও লেগে আছে জিভে। লাউ এর খোসা ভাজা, বড়া ভাজা,বকফুল ভাজা, হিংচের চপ... আহা।

ঠং করে একটা আওয়াজে চটকা ভাঙে রমেন বাবুর। ডাইনিং স্পেসে এসে দেখলেন, মৌরলা মাছ টুকু তৃপ্তি করে খেয়ে চলে গেল বেড়াল, কাটাপোনা গুলো ছড়ান, কেউ কোত্থাও নেই বাড়িতে, অর্থাৎ ছেলে বউ বেরিয়ে গেছে। একটু আলতো তন্দ্রার মত এসেছিল হয়ত গাড়ির আওয়াজ শুনতে পান নি।

ব্যাপারটা বেশ খারাপ লাগছে সৌমির, সৌমেন ও জানে কিন্তু কিছু বলছে না। এই নিয়ে তিনদিন হল। প্রথম দুদিন সৌমেনের ব্যাগ থেকে আর কাল তার ব্যাগ মানি ব্যাগ থেকে। তার পরিষ্কার মনে আছে পরশু ছেলে কে পড়িয়ে নিয়ে আসার পথে আইসক্রিম খাইয়ে মানিব্যাগ ছেলের ব্যাগে রেখে দিয়েছিল। বাড়ি এসে আলমারি তে রেখে দেয়। সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে সৌমেন ২০০০ টাকার খুচরো চাইল ওকে খুচরো দিয়ে ব্যাগ টা টেবিলেই রেখেছিল। একে সেদিন রান্নার দিদি আসে নি তার মধ্যে শ্বশুর মশাই একগাদা কুচো মাছ কিনে আনলেন, মাথাটা গরম হয়ে ছিল, মানিব্যাগ ফেলেই অফিসে চলে যায়,রাতে মানিব্যাগ লকারে ঢোকাতে গিয়ে দেখে একটা পাঁচশ টাকার নোট নেই। এর আগেও সৌমেন এর ব্যাগ থেকে দু ক্ষেপে ১০০ আর ২০০ টাকা চুরি যায়। আজ বাড়ি গিয়ে এটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে। সৌমেন চক্ষুলজ্জার খাতিরে বলতে না পারলেও সে বলবেই। একটু ঘুরিয়েই বলবে না হয়।

-বাবা, কাল আমার ব্যাগে একটা পাঁচশ টাকার নোট ছিল পাচ্ছি না,ঘরেই কোথাও আছে, পেলে দেবেন তো। আসলে অফিসের স্টাফ ফান্ডের কিছু টাকা ছিল, কাল তো ব্যাগ নিয়ে যাই নি বাড়িতেই ছিল। তাই হারালেও বাড়িতেই পরে আছে হয়ত কোথাও।

ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন রমেন বাবু।

-বৌমা তোমার ইঙ্গিত আমি বুঝতে পারছি, এম আই এস এর সামান্য কিছু টাকা আমি মাস গেলে পাই, ওখান থেকে তোমায় দিয়ে দেব।

সৌমেন এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। এবার বেশ ঝাঁঝের সাথেই বলে উঠল, বাবা তোমাকে কিছু বলা হয় নি। আর শোনো, আমার ব্যাগ থেকেও টাকা সরেছে, আমি কিচ্ছু বলি নি, কিন্তু এবার তো সত্যিই এটা খারাপ হচ্ছে বল! তোমার জন্যই কিন্তু

এই ধ্যড়ধ্যাড়ে গোবিন্দপুরে পরে আছি।

প্রায় বাক শক্তি রহিত হয়ে গেলেন রমেন বাবু। ধীরে ধীরে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লেন।

প্রায় ঝড়ের বেগে গাড়ি চালিয়ে পার্কস্ট্রীট ঢুকল সৌমেন, সৌমি কে গাড়িতে তুলে ছুটল ডিপিএস, রুবি পার্ক।

-আপনি সৌম্যদীপ্তর বাবা সৌমেন বসু, তাই তো?জানেন কি, আপনার ছেলে তার থেকে এক ক্লাস উঁচুতে পড়ে, বাজি ধরে ক্লাস নাইনের একটি মেয়েকে ক্লাসেই চুমু খেয়েছে?আপনারা তো দুজনেই চাকরী করেন, প্রোফাইল তাই বলছে, ছেলে কি ভাবে বড় হচ্ছে, কি করছে, কি দেখছে, কি শুনছে,কিছুর উপরে কি কোন নিয়ন্ত্রণ আছে, আপনাদের? ছেলেকে বাড়ি নিয়ে যান। আমাদের গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত ওকে এক মাসের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছে।

সৌমির মুখ থমথম করছে, কোনোমতে চোখের জল চেপে রেখেছে।

বাড়িতে ঢুকেই ছেলের ওপর অকারণে ফেটে পড়ল সৌমি। সৌমেন ঠাস করে চড় বসিয়ে দিল। সৌম্য শুধু চোয়াল শক্ত করে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। রমেনবাবু সব দেখছিলেন, কিছুই বুঝতে পারছিলেন না।আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করলেন, কি হয়েছে? তোমরা এমন অশান্তি করছ কেন? 

- কি আর হবে, তোমার নাতিকে স্কুল থেকে সাসপেন্ড করেছে। আমার ছেলে কি ভাবে এমন হল, ভাবতেই অবাক লাগছে, ছি ছি।উঁচু ক্লাসের মেয়েকে বাজী ধরে চুমু খাচ্ছে। ছি ছি। বলেই ছেলের গালে আর একটা চড় বসাল সপাটে সৌমেন।

রমেনবাবু এগিয়ে এসে নাতির হাত ধরে বললেন-- আয়, আমার ঘরে আয়।

ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন।একটা টুলে নাতিকে বসিয়ে উলটো দিকে তিনি বসলেন।

-বলতো, দাদুভাই তুই কি মেয়েটিকে ভালোবাসিস, না ঝোঁকের বশে..

সৌম্য এতক্ষন বাদে একটা সহানুভূতির স্পর্শ পেয়ে ঝড় ঝড় করে কেঁদে ফেলল।

-কাঁদিস নি ভাই।তোর দিদুন চলে গিয়ে তোর কি খুব একলা লাগে?

মাথা নাড়ল সৌম্য।

-এই একমাস তুই স্কুলে যাবি না, তো আমার কাছে থাক। আমি তোকে পড়াব, দুজনে মিলে মাঠে খেলতে যাব। লুকিয়ে চা খাব তুই আর আমি। তোর কি একটা ফেসবুক না কি আছে, তাতে আমাদের সেল্ফি আপলোড করব।সব কিচ্ছু আগের মতন হয়ে যাবে দেখবি। তোর বাবা মা তুই আর আমি পিকনিকে যাব, খুব আনন্দ করব রে।

-দাদুভাই, দিদুনকে খুব মনে পড়ে, আমায় স্কুল যাবার আগে টাই বেঁধে দিত, খাইয়ে দিত, জুতো পরিয়ে দিত, খুব মিস করি দিন গুলো। তুমি জানো, সারাদিন আমি কি করি, আমি কেমন আছি, কেউ জিজ্ঞাসা করে না। তুমি কোলে বসিয়ে অঙ্ক করাতে, রাতে দিদুন গান শোনাত, কত গল্প বলত, কবিতা বলত। কি সুন্দর ছিল গো দিনগুলো, সব হারিয়ে গেল, আমার আর কিচ্ছু ভাল্লাগে না দাদুভাই। দিদুন কেন মরে গেল, কেন?

-আয় দাদুভাই, কোলে আয়।

-বাবা আর মা এর টাকা গুলো আমিই নিয়েছি পৃথাকে গিফট দেবার জন্য। তুমি আমায় ক্ষমা করে দাও দাদুভাই।

-তুই, চিন্তা করিস না দাদুভাই, আমি তোর বাবাকে টাকাগুলো শোধ করে দিয়েছি।রমেন বাবুর আবার বাঁচতে ইচ্ছা করে, নিজেকে তত বেশি অপ্রয়োজনীয় আর মনে হয় না। সেদিন তো বউমাকে বলেই দিলেন, তোমরা আমার নাতির উপর বেশি অভিভাবকত্ব আর ফলিও না, এবার আমায় ছেলেটাকে মানুষ করতে দাও। 

এখন খুব ভাল আছেন রমেন বাবু।

০২ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১৪:১৭:০৯