ভূতেদের কেত্তন
ছবি ব্যানার্জী
অ+ অ-প্রিন্ট
গ্রামের এক প্রান্তেএকটা শ্মশান আছে। তার কিছুটা দুরেই একটা ঝাঁকড়া বিশাল বট গাছ। বিরাট বড় বড় তার ঝুড়ি নামানো। তার পাশেই ঘন জঙ্গল । আশে পাশে কোন বসতি নেই। চার পাঁচটা গ্রাম মিলিয়ে ওটাই একমাত্র শ্মশান । চারিদিকে শুধু ধূ ধূ জমির মাঠ।

এমন একটা জায়গায় সব ভূতেদের আস্তানা । যেমন মেছো ভূত গেঁয়োভূত মামদো ভূত নেতা ভূত শাঁখচুন্নী পেত্নী হব রকম ভূতেরা সারাদিন গাছে জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে থাকেগভীর রাতে তাদের মজলিস বসে। মাঝে মাঝে কেত্তনও হয়। কেত্তনে এই রকম গান হয়। 

এখন আমরা সবাই ,

বায়ুভূক বায়ুভূক বায়ুভূক

চেয়ে দ্যাখো তোমরা,

আমাদের নেই কোন দুখ। 

সব ভূতেরা মিলিত কন্ঠে ধুয়ো তোলে

বায়ুভূক বায়ুভূক বায়ুভূক,

নেই কোন দুখ

নেই কোন দুখ।

বয়স্ক ভূতেদের এখন,

নেই কোন টেনসান

রোদে পুড়ে ঘেমে নেয়ে, 

তুলতে হবেনা আর পেনসন।

মহিলা পেত্নীরা এখানে,

আছে মহাসুখে

বেঁচে লাথি ঝ্যাঁটা খেতো,

ভাত খেতো দুখে।

এই গান গেয়ে তারা নাকি সুরে সবাই মহানন্দে মাঝে মাঝে কেত্তন গাইতো। তো এই ভূত গোষ্টির একজন নেতা ছিল। বেঁচে থাকতে তার নাম ছিলো গদাধর মূখুজ্জে। সে মস্ত পালোয়ান ও কুস্তীগীর ছিলো। দেশ বিদেশ থেকে বহু টাকা রোজগার করতো। গরীবদের অকাতরে দানও করতো। হাসপাতালে রাত্রি জাগতে গদাইদা,শ্মশানে গরীবের মৃতদেহ দাহ করতে গদাইদা,বন্যার সময় জল কাদা ভেঙে সাহায্য নিয়ে হাজির গদাইদা। তো সেই গদাইদা সাত সমুদ্র নিরাপদে পেরিয়ে শেষকালে খালে অর্থাৎ বাড়ির কাছে বাস দূর্ঘটনায় বেঘোরে প্রাণটা দিল। তাই এমন পরোপকারী ছেলেটাকে ভূতেরা তাদের নেতা করলো।

কদিন থেকে একটা শুঁটকি পেত্নী বেঁচে থাকতে যার নাম ছিল দিয়া সে বড় বিরক্ত করছে গদাইকে। সব সময় কাছে কাছে ঘুর ঘুর করছে আর বলছে—————গদাইদা তুমি আমাকে এবার বিয়ে কর। কেন রে মুখপুড়ী তোকে বিয়ে করতে যাব কোন দুঃখে?বেঁচে থাকতে পাঁচ বছর ধরে তোর পিছনে ঘুরঘুর করেছিলাম। তখন তুই পাত্তা দিয়েছিলি?তোর বিধবা মা আমাকে কাজে অকাজে আমাকে ডেকে পাঠাতো। কতবার টাকা ধার চেয়েছে তোর পড়াশোনার জন্য। আমি সেটাকা কখনও ফেরত নিইনি। কোনরকমে তুই যখন বি এ পাশ করলি তখন তোর মা আমাকে ডেকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। আমি তখন এম এ পাশ করে চাকরীর জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরছি। তুই সোজাসুজি মুখের ওপর বলেছিলি বেকার ছেলেকে আমি বিয়ে করবোনা। আরে আমার অবস্থা তো ভালো ছিল। তিনকুলে কেউ ছিলনা এক বিধবা পিসি ছাড়া। আমাকে বিয়ে না করে তোর কি মোক্ষলাভটা হল শুনি। সেই তো একা থাকার সুযোগে কতগুলো লম্পট তোর মায়ের সামনেই তোর ইজ্জত নিল। তুই পরদিনই গলায় দড়ি দিয়ে মরলি। আমার মরনটাও তোর কারণেই হয়েছিলো। সব সময় তোর কারণে আনমনা থাকার জন্যই তো দূর্ঘটনাটা ঘটলো। ভূতেদের কখনও বিয়ে হয়না। অন্য ভূতরা সমস্বরে বলল————ও গদাইদা তবে তোমার পাশে একটু জায়গা দাও। দিয়া বলল———সেই ভালো যদি পরজন্ম বলে কিছু থাকে তাহলে আমি তোমাকেই বিয়ে করবো। আর ভালোবাসা চিনতে ভূল করবোনা

একদিন গভীর রাতে এরকম একটা মজলিসে গদা ভূত একজন ভূতকে আপ্যয়ন জানিয়ে ভাকলো—————আরে এসো এসো ভুঁড়িদাস থানার বড় দারোগা। বড়বাবু ভূত রেগে মেগে বলল—কি তোর এত বড় সাহস আমাকে তুমি বলিস?গলা নামিয়ে দারোগা। বেঁচে থাকতে তুমি আপামর জনতাকে তুই ডাকতে। জেনে রাখো আমি এখানকার নেতা। বেঁচে থেকে কত নির্দোষ লোককে যে তুমি থানায় ভরে পেঁদিয়েছো তার লেখাজোখা নেই। আর ঘুঁসের কথা তো কহতব্য নয়। শেষকালে কি হল?ঐ বিরাট ভুঁড়িতেই উদুরী রোগ ধরলো। ডাক্তাররা জল বের করে করে পুকুর বানিয়ে ফেলল। তাও তুমি বাঁচলেনা। আরে ধম্ম বলে তো একটা কথা আছে নাকি?

আর এই যে এমে এল এ নেতা। তুমি আবার কবে এলে?মুখ সামলে কথা বলবি গদা। আরো যাও যাও তুমি এখন বায়ুভূক একটা ভূত। বেঁচে থাকতে যে কত লোকের যেশর্বনাশ করেছো,মানুষকে তো মানুষ জ্ঞান করতেনা শুধূ ঝুরি ঝুরি মিথ্যে প্রতিশ্রূতি দিতে। টাকার গাদা বস্তায় ভরে রাখতে। তা সে 

টাকা সংগে আনতে পেরেছো?তোমারই দলে যে আরও একটা নেতা চারটে মানুষ খুন করে,দশটা লোকের ঘর জ্বালিয়ে মহা শক্তিধর নেতা তৈরী হচ্ছিলো তা তুমি টেরও পাওনি। শেষে সেই গোষ্টিদ্বন্ধেই বন্দুকের গুলিতেই প্রাণটা হারালে তো?কলি যুগেও ধম্মে সইলো না। আর এই যে ইঞ্জিনীয়ার ভূত———বেঁচে তোমাদের গুষ্টি কত টাকা খেয়েছিলে বাবা?একটা আস্ত ব্রীজ ধ্বংস করে কত নিরীহ লোকের প্রাণ কেড়ে নিলে। এখানে এসেছো তো ল্যাংটা হয়ে। সৎ পথে চলার কোন মার নেই গো। সেটা ভূত হয়ে বুঝেছো তো?এই হারামজাদা গদা তুইও তো ভূত। হ্যাঁ আমিও ভূত কিন্তু কোন পাপ করে আসিনি। দূর্ঘটনার ওপর তো কারো হাত নেই।

এখানে যত ভালো ভূত আছে তারা পরজন্মে ঠিক আবার ভালো মানুষ হয়েই জন্মাবে। আর তোমাদের মতো নেতা লম্পট বেঁচে থাকতে যারা ওপরওয়ালার পা চেটে বেঁচেছিলে তারা জন্মাবে রাস্তার কুকুর হয়ে। সেই দিনটার জন্যে তৈরী থেকো। গদা ভূত হাঁক মেরে বলল———ভাই সব আজকের মতো মজলিস শেষ।

 

 

০৫ নভেম্বর, ২০১৭ ১১:৩৩:৩৯