শুভ দীপাবলী
মৌসুমী প্রামাণিক
অ+ অ-প্রিন্ট
নামী, দামী এক পাবলিশারের অনুরোধ এসেছে; উৎসব নিয়ে গল্প লিখতে হবে। আমার লেখক বন্ধু শুভমের সঙ্গে আলোচনায় বসলাম।

"কোন উৎসবটা নিয়ে লিখি বলতো?"

"বাঙালীর বারো মাসে তেরো পার্বন আর তুমি টপিক খুঁজে পাচ্ছো না?"

"ঠিক তা নয়। ইউনিক কিছু খুঁজছি।"

"অসুবিধা কোথায়? পুজোর সঙ্গে প্রেম পাঞ্চ করে দাও। প্রেমের গল্প তো তোমার ফেবারিট।"

"দূর! সেই থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়!"

"তাহলে?"

"আচ্ছা, ভূতেদের কোন উৎসব হয় না?"

"হয় তো। ভূত চতুর্দশীর দিন..."

"দেওয়ালির আগের দিন, তাই তো?"

''হ্যাঁ..."

ভূতের উৎসব কেমন হয়, তার আইডিয়া না আমার ছিল, না লেখকের। তাই ডিসাইড করলাম, আমরা ভূতের উৎসব দেখতে যাব। কিন্তু কোথায়? শহরে ও শহরতলীতে সেদিন আলোর বন্যা বয়ে যাবে। তেনারা তো আলোর কাছাকাছি আসেন না। লেখক আমায় একটা প্রত্যন্ত গ্রামে নিয়ে গেলেন। সেখানেও তো ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, তুলসী মঞ্চে প্রদীপ জ্বলছে! তাই আমরা বাধ্য হয়ে চলে এলাম নদীর ধারে, শ্মশান ঘাটে। গ্রাম, নদী, শ্মশান ঘাটের নাম উহ্য রাখলাম। তা না হলে বাঙালীরা সেটাকে টুরিস্ট স্পট বানিয়েই ছাড়বে নয়তো প্রোডিউসারেরা শ্যুটিং লোকেশান!

রাত একটা নাগাদ হাজির হলাম সেখানে। ঘন্টাখানেক নদী-ঘাটে বসলাম। ছলাৎ ছলাৎ নদীর ঢেউ আমাদের পা ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছিল। গৃহস্থ আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েছে; প্রদীপের আলোও নিভু নিভু। অমাবস্যার অন্ধকার, তবুও নিকষ কালো নয়। শ্মশানঘাটে তখন দুটো বেওয়ারিশ মড়ার চিতার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল। বেওয়ারিস বলছি কারণ যারা কাঁধে করে লাশ নিয়ে এসেছিল, তারা চিতায় তুলেই পয়-আকার দিয়েছেন। অতএব ডোমবাবু চিতাভস্মে জল ঢেলে পৈতে ধারণ করে এক কোমর জলে নেমে মন্ত্রোচ্চরণ করে অস্থি বিসর্জন দিলেন। আমি তো দেখে থ।

"লেখক, এমনটাও কি হয়?"

"লেখিকা মহাশয়া, রাজ্যে চাকরীর অবস্থা তো তোমার অজানা নয়। ব্রাহ্মণ বংশগত হলে কি ডোমের চাকরী করতে পারবে না? সরকারী চাকরী বলে কথা!"

"তা বটে।"

চোখ চলে গেল, বট গাছের আড়ালে ছোট, ভাঙা মন্দিরটার দিকে।

"ওটা কোন ঠাকুর লেখক? যদিও জিব বের করে আছেন, আর গলাতেও তো মুণ্ডমালা, তবে কি কালী? নাকি ভৈরবী? বিপত্তারিনী বা চণ্ডী মাতাও হতে পারেন!"

" লেখিকা, তুমিই না লেখো ঈশ্বর এক ও অবিনশ্বর! নামে কিইবা এসে যায়?"

"হুম, বুঝলাম। কিন্তু ভূতের দল কখনই বা আসবে আর কখনই বা উৎসব শুরু হবে?"

"আমি কি করে জানবো বলতো? তেনারা কি আমাকে ইনভিটেশান কার্ড পাঠিয়েছিল?"

"তা ঠিক।"

যাই হোক দুজনেই বোর হচ্ছিলাম, তাই মন্দিরের চাতালে গিয়ে বসলাম বট গাছের গুড়িতে ঠেস দিয়ে। কাছ থেকে মূর্তিটাকে ভাল করে দেখলাম। হঠাৎ করে দেখলে পিলে চমকে যায়। মন্দিরের ভেতরে মোমবাতি, প্রদীপ কিছুই জ্বলছে না। তবে কি তেনারা আসবেন জেনেই ইচ্ছে করেই আলো জ্বালানো হয়নি? কিন্তু ধুপের ছাই ডাঁই হয়ে পড়ে আছে। ডোম-পুরুতকেও তো দেখতে পাচ্ছি না। চাতাল থেকে নদীর পাড়, শ্মশান ঘাট, বেশ অনেকটা এরিয়াই দৃষ্টিগোচর হয়। তবুও তাকে তো দেখছি না! কর্পুরের মত উবে গেল নাকি?

হিম পড়ছে,তাই মশার উৎপাত নেই। হঠাৎ নদীর দিক থেকে জোরে বাতাস বইতে লাগল। ঝড় নয়, তবে একটা মিষ্টি গন্ধ বয়ে আনল; ধুপ তো অনেক আগেই ছাই হয়ে গিয়েছে, মড়ার খাটে যে ধুপ জ্বলছিল, তাও অনেক্ষন নিভে গেছে। তবে? আমার কেমন ঘুম ঘুম পেতে লাগল। লেখকের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তিনি বসে বসেই ঘুমোচ্ছেন, জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলছেন, দেখে আমারও চোখ বন্ধ হয়ে এল।

হঠাৎ খট খটাখট শব্দে আমাদের ঘুম ছুটে গেল। দেখি ভূত, পেত্নী, শাকচুন্নী, ব্রহ্মদত্যি সব হাজির! গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে নাচছে। ওদের কঙ্কালসার চেহারা, তাই পায়ের সঙ্গে মাটির সংঘর্ষে অমন আওয়াজ উঠছে। এছাড়াও আদিবাসী ভূতগুলো মাদল বাজাচ্ছে; মুসলিম ভূতও এসেছে সানাই, সারেঙ্গী এসব নিয়ে। সুর নেই, তাল নেই, ছন্দ নেই, পুরো কেওস! নাকি নাকি গলায় আবার কি একটা গান গাইছে! "ঘচাংফু খাঁবো তোকে, গুল গুল্লা গুল গুল গুল্লা... খাঁবো তোকে..."

"এটা তো চারমূর্তি সিনেমা'র গান গো!"

"প্লিজ কথা বলো না...আমাদের দেখতে পেলে আর রক্ষে থাকবে না।"

আমরা বট গাছের মোটা গুড়ির পিছনে নিজেদের আড়াল করে রেখে দেখতে থাকলাম। কিন্তু কাকে ঘিরে ওদের এই উৎসব? সাদা ধবধবে পোষাক পরা কে একজন যেন বসে আছে মধ্যিখানে! কাকে ধরে এনেছে ওরা? কার ঘাড় ওরা মটকাবে বলছে? কে ওখানে? ফাঁক ফোকর দিয়ে দেখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম। লেখক শুভম লম্বা মানুষ, তাই একটা মোটা ঝুরি যেটা সেতুর মতো অর্ধচন্দ্রাকৃত হয়ে মাটিতে ঢুকে গিয়েছে, তার ওপর দু পায়ে ব্যালান্স করে দাঁড়ালেন। তারপর আমার হাতে ধরে আমাকেও টেনে তুললেন উপরে। 

এবার পরিষ্কার দেখা গেল। 

"ওমাগো! এ কারে হেরিলাম! এ যে মন্ত্রীমোশাই!"

"ষড়যন্ত্রীমোশাই!!!"

লেখক ভুল কিছু বলেন নি। ওনার দুর্নীতির ঘড়া পূর্ণ হয়ে উছলে পড়ছে। রক্ত-মাংসের মানুষ যা করতে পারে নি, অশরীরির দল তাই করে দেখালো। কারণ ওদের তো আর ভয় ডর বলে কিছু নেই!

নেচে গেয়ে ক্লান্ত হয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল সকলে। ব্রহ্মদত্যি ওং বং চং করে কি সব আওড়ালো। তারপরেই সকলে মিলে ঝাঁপিয়ে পড়লো মন্ত্রীমোশাইয়ের ওপর।

প্রথমেই তাঁর ঘাড় মটকে দিল। বেচারা চিৎকার করারও সময় পেলেন না। হা হা হি হি করে হাসির রোল উঠল। তারপর হাত-পা গুলো ছিড়ে ফালা ফালা করে দিল। মাংস খুবলে খুবলে খেতে লাগল। মড়ার খুলিতে করে রক্ত পান করতে থাকল। দেখে আমাদের গা গুলিয়ে উঠল। তারপর তেনারা আকাশের দিকে তাকিয়ে, কঙ্কালসার বুকে ঘুষি মেরে, দুই হাত উপরে তুলে আনন্দ প্রকাশ করতে থাকল। যেন আফ্রিকার ফোক ড্যান্স হচ্ছে। দূর আকাশে একটা তারা খসে পড়তে দেখলাম। হঠাৎ দমকা হাওয়া বইতে শুরু করল। চিতার ছাইগুলো এদিক ওদিক উড়তে শুরু করল। কেমন যেন ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে গেল চতুর্দিক। আমরা অবসন্ন বোধ করছিলাম। হাঁটুর ওপর মুখ গুঁজে বসে পড়লাম।

কখন যে ভোর হল আর কখন যে তেনারা বিদায় নিলেন, বুঝতেই পারলাম না। পাখির কলরব শুনে মুখ তুললাম। ডোম পুরোহিত দু ভাঁড় চা হাতে উদয় হয়েছেন। দেঁতো হাসি হেসে বলল,

"নেন, খাইয়ে লেন দিকি...সারারাত আপনাদের যা ধকল গেল!"

ওর কালো কালো ছোপ পড়া দেঁতো হাসিটা কোন ভৌতিক গল্পের প্রচ্ছদ মনে হতে লাগল। কথা না বাড়িয়ে আমরা চায়ে চুমুক দিলাম। "ওয়াক! মড়া মড়া গন্ধ চায়ে!" লেখকের সঙ্গে চোখে চোখে ইশারা হল। আমরা সুকৌশলে চা'টা গাছের গোড়ায ঢেলে দিলাম। ডোমবাবু তার ঘর থেকে দুটো লাল রঙের পার্সেল নিয়ে এসে আমাদের দিল।

"কি এগুলো?"

"এজ্ঞে খুলেই দ্যাখেন কেনে...!"

খুলে দেখি জ্যাবদা খাতা, অনেকটা চিত্রগুপ্তের খাতার মত দেখতে! সঙ্গে অাবার কালো, নীল কালি র পেন, এক ডজন!"

আমরা তো দেখে হাঁ ! দুজন দুজনের দিকে বোকার মতো চাইলাম। তারপর ততোধিক অবাক চোখে ডোম-পুরুতের দিকে তাকালাম।

"এজ্ঞে প্রেসিডেন্ট ভূত দেছেন, আপোনারা নেকাপড়া করেন কিনা!"

ইলেকট্রিক শকের থেকেও বড় শক খেলাম!

"হ্যাঁ, কিন্তু..." লেখক বুঝি কিছু বলতে চাইছিলেন, আমি লেখকের হাতে চেপে ধরলাম। ফিসফিস করে বললাম,

"প্রশ্ন করে লাভ কি? এটাও তো কিম্ভূত কিমাকার!"

ডোম-পুরুত পিছন ফিরে চলে যাচ্ছিল, আমি ডাকলাম।

"ডোমবাবু!!!"

ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রচ্ছদের ভূতের ছবির মত হাসল সে।

"শুভ দীপাবলী!" আমি উইশ করলাম।

হাসি চওড়া হতেই মুলোর মতো দাঁতগুলো আরো প্রকট হল। মা শ্মশান কালী আপোনাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করুন..."

"ও! তবে ইনিই দেবী শ্মশান কালী!" লেখক বললেন। আমি মাটির প্রতিমার দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, "মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক! "

নদীর বুকে কমলা রঙের সূর্য তখন ছলছলিয়ে জলকেলি খেলছে।

'আমার গল্পটি ফুরোলো, নটে গাছটি মুড়োলো...'

 

 

 

১৯ অক্টোবর, ২০১৭ ২৩:৫৮:১০