গল্প ০ প্রতীক্ষা
ছবি ব্যানার্জী
অ+ অ-প্রিন্ট
সেদিন সুমনা বাঁধানো গঙ্গার পাড়ে বসে অলস ভঙ্গীতে আকাশ পাতাল ভাবছিলো। বোলপুর থেকে বেড়িয়েছিল সে খুব ভোর বেলায়। আজ তার স্বামী দিবাকরের নিরুদ্দেশের বারো বছর হওয়ার শেষ দিন। নিয়ম মতো আজ তার সিঁদুর ধুয়ে বৈধব্যের বেশ ধারনের দিন। গঙ্গাস্নান না করেও এটা করা যেত। কিন্তু দীর্ঘ ত্রিশ বছর আগে ছেড়ে যাওয়া মাতৃভূমি বহরমপুরে কি এক অমোঘ আকর্ষনে সে চলে এসেছে। আজ তার দীর্ঘ প্রতীক্ষার তিলতিল করে অপেক্ষার গ্লানি মুক্ত করতে গঙ্গাস্নান করে শুচিস্নাতা হতে তার বড় মন চাইছিলো। একটা হাতব্যাগে একটা ধূসর তাঁতের শাড়ি যা স্নান করে পড়বে সংগে কৌটোতে সমান্য ফল সন্দেশ আর ছোট একটা টাকার পার্স।হটকারীতা করে চলে এসে ভাবলো ভুলই হল তার। এগুলো কার জিম্মায় রেখে সে স্নান করবে?উথাল পাতাল মন নিয়ে যখন সুমনা এসব ভেবে চলেছে ঠিক সেই সময় ঘাড়ে কারো কোমল হাতের স্পর্শ পেয়ে চমকে মুখ ফেরাতেই দেখলো তার একসময়ের ঘনিষ্ট বন্ধু দীপা। বলল——কিরে পরনে ঢাকাই সিঁথিতে সিঁদুর পড়ে অপরূপা সাজে এখানে কি করছিস? কেউ সংগে নেই?দিবাকর বাবু আর তোর ছেলের কি খবর?বারো বছর ধরে যোগাযোগ রাখিসনি কেন আগে বল?কিরে এখনও রাগ করে থাকবি?কথা বলবি না মণি?ভাগ্যিস এই রাস্তা দিয়ে শর্টকাটে স্কুলে যাচ্ছিলাম। তুই আগে আমার স্কুটিতে ওঠ। আজ স্কুলে যাবোনা। সুমনা বলল——ভাবছি তোর কোন প্রশ্ণের উত্তরটা আগে দেব। নারে দীপা আমিই এখন করুনার পাত্রী। কোনো রাগ নেই তোর ওপর। তুই কিন্তু আগের মতোই সুন্দরী আছিস। এখনও ঋজু টানটান ছিপছিপে চেহারা। উজ্জ্বল মসৃন ত্বক। বয়সটা একটা জায়গায় থমকে আছে। আমাদের বয়সটা বাহান্ন হল তাই না দীপা?ওকি তোর সিঁথিতে সিঁদুর?কবে বিয়েটা করলি?তোর ভাস্করের তপস্যা তাহলে সার্থক হয়েছে বল?শুনেছি তোর বোনদের ভালো বিয়ে দিয়েছিস। ভাইকেও সংসারী করেছিস। এদের জন্যই তুই বারবার ভাস্করকে ফিরিয়ে দিয়েছিলি। আমি এ নিয়ে কতো রাগ করতাম তোর ওপর। ভাই ভাইবৌ তোকে ভালোবাসেতো দীপা?——এবার থাম দীপা। প্রশ্ণের ঝড় তুলে দিলি। সব উত্তর বাড়ি গিয়ে দেব। ——নারে দীপা আজ আমাকে ফিরতেই হবে। ———তোকে ছাড়লে তো যাবি। আমার সংসার দেখবিনা?ভাস্করকে দেখবিনা?আমি তিন তিন জন ভাইবোনের বিয়ে দিয়ে সংসারী করেছি মণি শুধু ঐ বাউন্ডুলেটাকে অনেকবার অনুরোধ করে হাতে পায়ে ধরেও সংসারী করতে পারিনি। আমি হয়তো বিয়ে আর করতাম নারে। ভাই বৌ এর একটা কথা হঠাৎ আমার কানে এল। সে ভাইকে বলছে——আচ্ছা ঐ ভাস্কর নামে লোকটা এখানে আসে কেন?তোমার দিদি কি লোকটার রক্ষিতা?ভাই শুনে সেদিন বৌর গালে একটা থাপ্পড় মেরে বলেছিল।——ভাস্করদা আমাদের কাছে ভগবান। বাবা মার মৃত্যুর পর ভাস্করদা দিদিকে বিয়ে করতে চেয়ে এই পরিবারের দায়িত্ব নিতে চেয়েছিল। দিদি একা লড়াই করে আমাদের বড় করেছে। ভাস্করদা নিরলস ভাবে পাশে থেকেছে। আমাদের সুখের জন্য সে সারাজীবন সন্ন্যাসীর জীবন কাটিয়েছে। ঐ কথা কানে যেতেই আমি মন ঠিক করে ভাস্করকে ফোন করেছিলাম। আমি আলাদা ফ্ল্যাটে চলে এসেছি। একটা বাচ্চা আ্যডপ্ট করেছি। সব শুনে ভাস্কর বলেছিল——~দীপা তুমি কি বাধ্য হয়ে বিয়ে করতে চাইছো?আমি একটা জীবন তোমার প্রতীক্ষাতেই কাটিয়ে দিতে পারি সখি। ভেবে সিদ্ধান্ত নিও। ——না ভাস্কর আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমার অস্তিত্ব জুড়ে তুমিই ছিলে। এসো বাকী কটাদিন বিয়ে করে একসংগে থাকি। সুমনা বলল———কি কাকতালীয় ব্যাপার দ্যাখ দীপা আমি তার জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা করেও সে ফিরে এলোনা। তোর ভাস্করের প্রতীক্ষা দেরীতে হলেও সার্থকতা পেলো———তুই এসব কি বলছিস মণি? কার ফেরার কথা বলছিস?———দিবাকর আজ বারো বছর নিরুদ্দেশ। আমাদের একমাত্র ছেলে সৌম্যর মাধ্যমিক পরীক্ষার শেষ দিনে গভীর রাতে একটা চিরকুটে বাড়ি ছাড়ার কথা লিখে বাড়ি ছেড়েছিল।ওর চলে যাওয়া আজও আমার কাছে রহস্য। আমিও একটা স্কুলে পড়াই। ——চল মণি আমার ফ্ল্যাটে চল। ——একটু অপেক্ষা কর স্নানটা করে নিই।

ফ্ল্যাটে ঢুকেই দীপা হৈচৈ করে বলল———এই ভাস্কর দ্যাখো কে এসেছে। ভাস্কর বেড়িয়ে মণির মুখোমুখি হতে মণি ভূত দ্যাখার মতো চমকে উঠলো। ভাস্কর কেমন কেঁপে উঠলো। মণি একবার ভাবলো দেব নাকি ভন্ডটার মুখোস একটানে ছিঁড়ে?দীপা বলল——কিরে ওকে দেখে এতো চমকে গেলি কেন?———আসলে তোর ভাস্করকে দাড়ি গোঁফের জঙ্গলে ঠিক একজন তপস্বীর মতো লাগছে রে। নমস্কার ভাস্কর আমি সুমনা। চলুন বসা যাক। ভাস্কর ম্রিয়মান হয়ে বলল——আপনারা গল্প করুন আমি আসি। ———কোথায় যাবেন মশাই?একযুগ পরে আমাদের দেখা হল কতো কথা জমে আছে। দীপা বলল——কি বলছিস মণি?———একযুগ পরেই তো আমাদের তিনজনের দেখা হল দীপা। তোর ভাস্করের গল্প শুনে শুনে তো আমি ভাস্করকে চিনেছিলাম। শুধু চোখেই দেখিনি। ও তোর কাছে তোর পরিবারের কাছে ভগবান। আমার গল্প তোরা শুনবিনা দীপা?——আচ্ছা মণি তুই দিবাকরকে খুঁজিস নি?——দিবাকরের সংগে আমার ভালোবাসা আমার ক্লাস টেন থেকে। দিবাকর আমার দাদার বন্ধু। ওর এক দুর সম্পর্কের মামা মামি ওকে মানুষ করেছিল। বোলপুরে ওর বাবার কেনা একটা পৈত্রিক বাড়ি আর রেখে যাওয়া বেশ কিছু টাকা ছিল। মামা মামির সংসারে অনাদরে লেখাপড়া শিখছিলো। আমাদের বাড়িতে আমার মা প্রায় ভালোমন্দ রান্না হলে ওকে খাওয়াতো। নিয়মিত আসা যাওয়া ছিল। তখন থেকেই আমি মরেছিলাম ওর প্রেমে। তারপর ও ভালো চাকরী পেলো। নামী কোম্পানির অফিসার পদে। এ বিয়েতে বাবা মা মত দেবেনা জানতাম। আমার বাংলা অনার্স পরীক্ষার শেষদিনে আমি এক কাপড়ে ওর সংগে ঘর ছেড়ে বোলপুর এলাম। ও দশদিনের বিয়ের ছুটি নিয়েই এসেছিল। আমরা একটা কালীমন্দিরে বিয়ে করলাম। এক বৃদ্ধ পুরোহিত সব নিয়ম মেনে আমাদের বিয়ে দিয়েছিলেন। সেও মারা গেছেন। মা কালী ছাড়া আর কেউ বিয়ের সাক্ষী নেই। তিনি তো মূক বধির। তাকে কি করে কোর্টে ডাকবো রে।আসলে আমি আমার সবটুকু দিয়ে ওকে ভালোবেসেছিলাম দীপা।আজ ত্রিশ বছর বাপের বাড়ির মুখ দেখিনি।ওর হাত ধরে আমি আর সবাইকে ত্যাগ করেছিলাম।বাবা মা মারা গেছে।দাদাটাও বুড়ো হয়ে গেল।তাই তাকে আর খুঁজিনি। যে স্বেচ্ছায় স্ত্রী পুত্রকে বিনা দোষে ত্যাগ করতে পারে তাকে খুঁজে কি লাভ হত দীপা?——তাকে শাস্তি তো দিতে পারতিস মণি?তোদের প্রতিবেশীরা সাক্ষী দিত। আমি দাঁড়াতাম তোর পাশে। ——— দীপা ফ্যানটা বাড়িয়ে দে ভাস্কর খুব ঘামছে। ভয় পাবেন না ভাস্কর।আমি জ্ঞানত কারো ক্ষতি করিনি।আর ভবিষ্যতেও করবনা।শাস্তি হয়তো সে পাচ্ছে দীপা। আমি তার ছেলেকে অনেক লড়াই করে মানুষ করেছি। সে বোলপুর বিশ্ববিদ্যায়ের প্রফেসার। ওর নামটা মনে আছে ভাস্কর?——ও কি করে জানবে মণি?——ভাবলাম তুই বলেছিস। ওর নাম সৌম্য বৌমার নাম নন্দিনী। সেও স্কুলে চাকরী করে। আমার ছেলে তার বাবাকে ঘেন্না করে। অনেক আগেই সিঁদুর মোছার কথা বলেছিল। আমিই কোন আশাতে যে মুছিনি কে জানে। ওর দেওয়া আলমারি ভর্তি শাড়ি আমি বিলিয়ে দিয়েছি। বাড়িটা আর ওর দেওয়া গয়নাগুলো সোমু অনাথ আশ্রমকে দান করে দেবে ঠিক করেছে। আমার স্বামীর নাম আর আপনার নামের মানে মানে সূর্য। আমার সূর্য কালো অন্ধকার মেঘে লুকিয়ে থাকলো। দীপার সূর্য ঝলমল করে চির ভাস্বর হয়ে রইলো। ভগবান সবদিক থেকে আমাকে বঞ্চিত করেন নি।আমার ছেলে বৌমা আমাকে মাথায় করে রেখেছে।ওর দেওয়া হীরের আংটিটা আমি আজও বহন করে চলেছি। এটা তোদের বিয়ের উপহার হিসাবে তোকে দিলাম দীপা। আংটিতে ডি নামটা খোদাই করা। ভাস্কর আমার অনুরোধ এটা আপনি দীপাকে নিজের হাতে পরিয়ে দেবেন। প্লীজ না বলবেন না। দীপার জীবনে আপনি উজ্জল সূর্য হয়ে থাকুন। আমি আজ আসিরে দীপা। ———তুই খাবিনা মণি?——আজ আমাকে খেতে নেই দীপা।

 

২৪ আগস্ট, ২০১৭ ২৩:৩১:২৮