এক প্রতারকের আত্মকাহিনী
ছবি ব্যানার্জী
অ+ অ-প্রিন্ট
এবার নতুন রোজগারের রাস্তা মিথ্যে বিয়ের পেশা। এই পেশার জন্য আমাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেতে হত। বিয়ের কথা পাকা হলেই মোটা অঙ্কের টাকা বিয়ের আগেই হাতিয়ে নিয়েই চম্পট দিতাম। বিয়েটা যদিও আমার কাছে খেলনা মাত্র তবু বিয়েতে ঝুঁকি আছে। ছবি তুলে রাখলেই চিত্তির। ধরা পড়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। তখন কত নামেই আমার পরিচয় দিতে হত। কোম্পানির চাকরী এই পরিচয় সবাই বিশ্বাস করত। সোজা বাড়ি ফিরলে মা বলত——হ্যাঁরে এ তোর কেমন চাকরী?বাড়ি থেকে একবারে দু তিনমাসের জন্য বেড়িয়ে যাস?এত ঘুরে ঘুরে শরীরের কি হাল করেছিস খোকা?——মা ঐতো কোম্পানির ট্যুরের চাকরী। এত ঝকঝকে চেহারেতেও তুমি শরীর খারাপ দেখলে মা?ওজন কমাতে হবে। ——একবার কাছে এসে দুদন্ড বোস খোকা। কতদিন আমার কোলে মাথা রাখিসনি। কিছুক্ষন আমার পবিত্র আমার ভালোমানুষ মায়ের কোলে মাথা রাখলে আমার ভিতরের পাক্কা শয়তানটা ভয়ে গুটিয়ে থাকতো। আমার মায়ের কোলে যে বড্ড মা মা গন্ধ। মা আমার চুল নাড়াচাড়া করতে করতে বলত ———এবার বিয়ে কর খোকা। কোল থেকে মাথা তুলতেই শয়তানটা গা ঝারা দিয়ে বসত। বললাম——মা আর কিছুদিন অপেক্ষা করো। এই বাড়িটা দোতলা করব। একটা গাড়ি কিনবো। ঐ গাড়িতে চেপে তুমি ঘুরে বেড়াবে।মা একমুখ হেসে বলল ———তুই অনেক টাকা রোজগার করিস বাবা?বেশ বেশ আমাকে গাড়ি করে একবার দক্ষিনেশ্বর নিয়ে যাবি খোকা?তোর মঙ্গলের জন্য পূজো দেব। তোর বাবা বেঁচে থাকলে কত খুশি হত। ——মা এবার আমাকে কয়েকদিনের জন্য বর্ধমান যেতে হবে।

বর্ধমানে একটা নতুন শিকারের সন্ধান পেয়েছে। ওখানে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানলো মেয়েটি গরীব বিধবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। একবার গিয়েই দেখা যাক মনে করে সেই বাড়িতে হাজির হল। মেয়েটা স্নিগ্ধ শ্যামবর্না লাবন্যময়ী। নাম শ্রীময়ী। জোতির্ময় ভাবল কষ্ট করে আসাই সার হল। ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করে লাভ নেই। উঠেই আসছিলো হঠাৎ মেয়ের মা তার হাতদুটো চেপে ধরলো। বলল———বাবা তোমার তো রাজপুত্রের মত চেহারা। আমার মেয়েকে পছন্দ হলনা?——না তা ঠিক নয়। আসলে আমার টাকার খুব দরকার। ———বাবা টাকা আমি দেব। দুবিঘে ভালো জমি আছে। বিক্রী করে দেব। ———কত দাম হবে?———খরিদ্দার খুব ঘুরছে। দাম ছলাখ হওয়ার কথা। পাঁচলাখে দিলে এক্ষুনি নিয়ে নেবে। একটু অপেক্ষা করবে বাবা?——ঐ পাঁচলাখেই বেচে দিন। পুরো টাকাটাই আমার চাই। ———তাই হবে বাবা। আমার কিছু ভারী গয়না আছে সব মেয়েকেই দেব। ———ঠিক আছে বিয়েটা সাতদিনের মধ্যে ব্যবস্থা করুন।

এবারে বিয়ের আগে টাকাটা হাতানো গেলনা। বিয়েটা সব নিয়ম মেনে সাতপাক অগ্নীসাক্ষী করে যথারীতি সিঁদুর দান করেই হল। গ্রামের লোকে সহায়তা করল। ফুলশয্যার রাতে কোনো একটা ফচকে ছেলে ওদের একটা ছবি তুলে নিল। জোতির্ময় রেগে গিয়ে বলল———ছবি তুলতে নিষেধ করেছি না?ছেলেটি বলল———জামাইবাবু গো তোমাদের দুটিকে মানিয়েছে বেশ বলেই দৌড় মারলো। শ্রীময়ী বলল——আপনার নামটা জানা হয়নি। ———সত্যিকথাটা ফস করে মুখ থেকে বেড়িয়ে এল বলল——~জোতির্ময় মূখার্জী। ——কলকাতায় কোথায় থাকেন?——এবারেও সত্যিটা বেরিয়ে এল। ——~নাগের বাজার চৌরাস্তার কাছে। ——বাবার নাম?——কেন এত ঠিকুজি কুষ্টিতে কি দরকার?বাবা অনেকদিন আগে মারা গেছেন। নাম হিরন্ময় মূখার্জি। তোমার মাকে আগেই বলেছিলাম। শ্রীময়ী আর কথা বাড়াতে চাইলো না। ভারী গয়নাগুলো টেবিলে খুলে রেখে শুয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে পড়তেই লম্পট তার কাজ হাসিল করল। গয়নার পুঁটুলি আর টাকা নিয়ে মধ্যরাতে চম্পট দিল। বাড়ি এসেই দোতলার কাজে হাত দিল। তিনমাসের কন্ট্রাক্টে দোতলা আর সংগে গোটা বাড়ি রঙ হল। দালালকে তার প্রাপ্য টাকা দিয়ে বলল———এরকম সন্ধান আর দিসনা। বড়লোক দেখলে খবর দিস। কিছুদিন পর জোতির্ময় আবার বেড়িয়ে গেল নতুন শিকারের খোঁজ পেয়ে। মাকে বলল——মা এবারে দেরী হবেনা। এসে গাড়িটা কিনবো।

ছমাস পর জোতির্ময়ের অনুপস্থিতিতে শ্রীময়ী মা আর গ্রামের দুটো লোক সংগে করে ফটো দেখিয়ে দেখিয়ে ঠিকানা বের করে হাজির হল। বিয়ের সব প্রমান মাকে দেখিয়ে বলল——— বিয়ের রাতে আপনার প্রতারক ছেলে নগদ পাঁচলাখ টাকা আর আমার মায়ের দেওয়া গয়না নিয়ে চলে এসেছে। আমি ওগুলো ফেরত চাই। ——মা তোমরা দুদিন অপেক্ষা করো। ওগুলো তো দেবই সংগে এই বাড়ি আর মোটা অংকের টাকা তোমাকে দিয়ে আমার ছেলের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। শ্রীময়ী বলল——~আমরা আমাদের প্রাপ্যের বাইরে একটাকাও নেবনা মা। ওটাকা পাপ আর বহু মেয়ের সর্বনাস করা টাকা। আমি কোন অধিকার দাবী করতে আসিনি মা। ——জোতির্ময়ের মায়ের সামনে গোটা পৃথিবীটা মুহুর্তে অন্ধকার হয়ে গেল। শ্রীময়ী বলল——আপনার কি শরীর খারাপ করছে?ভয় পাবেন না আমরা আপনার ছেলেকে থানায় দেবনা। ———তোমার মতো যদি আমার একটা মেয়ে থাকতো মা?শ্রীময়ী বলল——~আপনি আমার সংগে যেতে চান? তিনটে পেট আমি ঠিক চালিয়ে নেব। শুধু বিয়ের প্রহসন এই সিঁদুরটা মুছে ফেলতে চেয়েছিলাম মায়ের জন্য পারলাম না। আমি তো আপনার মেয়ে। কখনও যদি মনে হয় আপনি আমার কাছে যাবেন নিঃসঙ্কোচে চলে যাবেন। এই ঠিকানাটা রাখুন মা।

জোতির্ময় বাড়ি ফিরে দেখলো মা নেই। একটা চিঠি রাখা আছে তার নামে। তাতে লেখা———খোকা আমাকে খুঁজলেও আর পাবিনা। এতখানি গরল পেটে ধরেছিলাম বলে আমিও মহাপাপী। তোর মুখ আর বেঁচে থেকে দেখতে চাইনা। শ্রীময়ী এসেছিল সে শুধু তার প্রাপ্যটুকুর বাইরে একপয়সাও নেয়নি। জোতির্ময়ের সাজানো তাসের ঘর একমুহুর্তে ভেঙে গেল। তার কাছে সব অর্থহীন হয়ে গেল।গোটা পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে গেল।

তার যে মা ছাড়া কেউ নেই। শিশুর মতো হাউমাউ করে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে লাগলো। আজও পাগলের মতো সে খুঁজে চলেছে তার পবিত্র ভালো মানুষ মাকে। এই খুঁজে চলাতেই তার আত্মশুদ্ধি আর আত্মোপলব্ধি। যদি কোনো দেবস্থান তীর্থ স্থাম বা কোনো মন্দিরের আশেপাশে কোন উলোঝুলো চুলের সুদর্শন ছেলেকে তার মার ছবি বুকে করে ঘুরতে দ্যাখো জানবে সেটা আর কেউ নয় জোতির্ময়। মার পা ধরে ক্ষমা না চাইলে তার মুক্তি নেই।

 

 

 

 

০৬ জুলাই, ২০১৭ ১০:২৯:২৯