পাগলি
সায়ন্তনী বসু চৌধুরী
অ+ অ-প্রিন্ট
‘ফুল ও ফুল কতা কইচিস নি কেন? ঝগড়া করে এইচিস নাকি?’

‘ফুলমণির মুখটা ধরে বারকতক ঝাঁকুনি দিয়েছিলুম জানিস।’ এইটুকু বলেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠত রাঙাদিদা। আমরা জলের গেলাস টা মুখের কাছে তুলে ধরতাম। রাঙাদিদা মায়ের বড় মাসী। বয়স প্রায় নব্বই ছুঁই ছুঁই। আমাদের মা শৈশবেই নিজের মা বাবাকে হারিয়েছিল। তাই মামারবাড়ী, দিদিমার আদর আবদার বলতে আমাদের কাছে ছিল রাঙা দিদা।

আমাদের এই রাঙা দিদার ছেলেবেলাতে তার সই ছিল ফুলমণি। স্বচক্ষে অবশ্য কোনওদিন দেখিনি তাকে; তবে গল্প শুনেছি অনেক। তাই আমাদের মনের মধ্যে ফুলমণি নামের একটি সরল সুন্দরী মেয়ের ছবি সযত্নে রাখা ছিল। উৎসব, অনুষ্ঠানের দিনে আমরা যখন দিদার বাড়ী যেতাম; তখন আপনা থেকেই গ্রামের সেই কিশোরী মেয়েটি আড়মোড়া ভেঙে স্মৃতির বিছানা ছেড়ে নেমে আসত।

কেউ কেউ নামে চেনা হয়, কেউ কেউ কাজে। তেমনই কাউকে চোখে না দেখেও বড্ড আপন মনে হয়। আমাদের কাছে ফুলমণি ছিল ঠিক সেইরকম। পুজোআচ্ছার দিনে দালানে আলতা পরতে বসে দিদা তার সইয়ের কথা বলত। ফুলমণির দুধে আলতা পায়ে নাকি আলতা মানাত দারুণ। ডাগর ডাগর চোখে কাজলের টান এঁকে আলতা মাখা পায়ে ছমছম মল বাজিয়ে দুই সই যেত পুজো মাঠের মেলায়। সেকি আজকের কথা? কতযুগ যে পেরিয়ে গেছে, তার আর হিসেব রাখেনি কেউ। আইবুড়ো বেলায় সে ছিল দিদাদের আনন্দের সময়। লেখাপড়া ছিল না। স্কুল, কলেজও ছিল না। তবে হেঁশেলের ছ্যাঁক ছোঁক, শিল নোড়ার আওয়াজ এসবের ত্রাস ছিল বৈকি। 

‘কতই বা বয়স তখন?’ রাঙা দিদার মুখ ভরে উঠত পানের পিকে। খুব সন্তর্পণে পিকদানে থুতুটুকু ফেলে দিদা আঁচলের খুঁট দিয়ে মুখ মুছত। মনে মনে ভাবতাম, এত পরিপাটি হতে তো আধুনিকারা পারেন না। তবে কি শুরু থেকেই সমাজ বেঁধে দিয়েছে এদের?

বছর আষ্টেক পেরিয়ে গেলেই মেয়েরা তখন গলগ্রহ। বাপ মা জানেন এবার প্রতিমা ভাসান দিতেই হবে। খোঁজ খোঁজ, চারদিকে কুলিন কায়েতের জন্য চিরুণী তল্লাশি চালাতেন সকলে। শেষমেশ দোজবরেই মেয়ে দিতেন বেশীরভাগ। বামুন কায়েতের ছেলে; সে যে সোনার আংটি; বাঁকা হলেও তার দোষ দেখবেনা কেউ।

রাঙা দিদা আর তার সই ছিল জমিদারদের মেয়ে। তাই বাড়ী বয়েই এসেছিল বড় ঘরের সম্বন্ধ। কদিনের আড়াআড়িতে দুজনেরই বিয়ে। তাই দেখা সাক্ষাৎ বন্ধ হয়েছিল। বিয়ের পর নিজেদের খেলনা বাটির সংসার, আমলকী, আচার, মোরব্বা পেছনে ফেলে রেখে নাবালিকা দুই কন্যা চলে গেল শ্বশুরবাড়ি। ঠিকানা জানা নেই। না আছে চিঠির আদান প্রদান। না আছে অক্ষরজ্ঞান। সকলের অলক্ষ্যে দুটি কচি মন খোলা আকাশের দিকে চেয়ে কী যে বলে যেত কে জানে। সেখানে যে কত চোখের জল জমা হত, লেখা হত কত মুক্তির আর্তি তা কেবল বিধাতাই জানেন।

‘বছর পাঁচেকে আমি বাপের বাড়ী যেতে পেতুম মোটে দুবার। তা ব্যাগ পত্তর নামিয়ে রেকেই ছুটতুম সইয়ের বাড়ী। যুতসই কোনও খবর পেতুম না জানিস। তারওপর আমাদের দুবাড়ীর বনাবনি কম। গেরামে দুঘর জমিদার থাকলে যা হয়। ফুলের বৌদিরা সব টেরা চোকে তাকাত। আমি লজ্জায় আর কতা কইতে পারতুম না।

এমনি করেই দিন কাটে। তা আমার বয়স যখন তেইশ কি চব্বিশ, তখন বোনের বিয়ের নেমতন্ন পেয়ে আমি ছেলেপুলে নিয়ে বাড়ী গেচি। গিয়েই শুনলুম ফুলকে তার শ্বশুরেরা বাড়ী তুলে দিয়ে গেচেন। তার নাকি ভারী মাথার অসুক। শহরের বদ্যিরাও নাকি জবাব দিয়ে গেচে। সোয়ামী তাকে আর ঘরে নিতে চায় না। আমার বুকের মদ্দিখানটা ছ্যাঁত করে উঠল। সে কি করে সম্ভব? নিচ্চই কোনও ভুল আছে। এমন মিথ্যেও রটে; মা গো মা। আমি কাপড় চোপড় না ছেড়েই ছুটলুম সইয়ের বাড়ী। ফুলের কাকিমা বলল সে তেতলার ঘরে রয়েচে। আমি পড়ি কি মরি করে ছুটেচি তখন।’

মিনিট খানেক বিশ্রাম নিত রাঙা দিদা।

জানতে চাইতাম, ‘ কষ্ট হচ্ছে?’ 

আলতা মাখা আঙুল গামছায় মুছে বলত, ‘বলতে দে আমায়, বলতে দে। এ গল্প সব মেয়েদের শোনা দরকার।’ আমরা বাধা দিতাম না।

‘জানলার ধারে একটা লম্বা চওড়া মেয়ে দাঁড়িয়ে আচে। গরাদ দুটোকে এমন করে ধরে রয়েচে যেন জেলখানাতে বন্দী। কিন্তু ওকি; ওর পরনে অমন পোশাক কেন? ও যে বেটাছেলের জামা গো। আমার খোকার যেমন র‍য়েচে।

ফুল, ও ফুল; ও মুখপুড়ি, দেখ তো আমায় চিনতে পারিস কিনা?

যেমনি পিঠে হাত দিয়েচি মেয়েটা যেন শিউরে উঠল। আমার দিকে ফিরে দুদণ্ড বেকুবের মতন চেয়ে থেকেই ডুকরে কেঁদে উঠল আমার সই।

আমার চোকের সামনে আমি ছেলেবেলার ফুলমণিকে স্পষ্ট দেখলুম রে দিদু, তার সে দুধেআলতা রং আর নেই, চুলগুলো খামচে খামচে কাটা; অদ্ধেক নেড়াই বলা চলে। গত্তে ঢোকা ঢোকা চোক, কপালে গালে পোড়া ঘা...... আর হাতে পায়ে লোহার শেকল বাঁধা।’ রাঙা দিদা ঘন ঘন শ্বাস নিত। বারবার চোখ মুছত। আমি নিজের চোখের সামনে দেখতে পেতাম ফুলমণিকে।

সেবার যতদিন বাপের বাড়ীতে ছিল, দিদা রোজ গেছে ফুলের কাছে। আচার, মোরব্বা, ভাজা পিঠে কোঁচড়ে বেঁধে নিয়ে সইকে খাইয়ে এসেছে। কিন্তু রাঙা দিদা ফুলমণির কোনও গল্প জানতে পারেনি। মুখ খোলেনি মেয়েটা। শুধু অবাক চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকেছে। যেন বোধ নেই, জ্ঞান নেই, যেন কথা বলতেই শেখেনি সে। অথবা কথা বললেই যদি কেউ শূলে চড়ায়; সেই ভয়ে সে নিজে নিজেই ভুলে গেছে কথা বলা। রাঙা দিদা আবার বলতে শুরু করে।

‘মেয়েটার জামা ফাঁক করে আমি দেখেছিলুম। তার গায়ে চাবুকের দাগ, খুন্তির ছেঁকা খাওয়া ঘা, আরও কত রকমের দাগ। যে পায়ে সে আলতা পরত; সে পা দুটো হাজায় পচে গেছিল।

তারপর আমারও ফেরার দিন এসে গেল। আমি ফিরে এলুম বটে, তবে ফুলের জন্য আমার মন কাঁদত দুবেলা। রোজ রাত্তিরে বালিশে মুখ গুঁজে চোকের জল ফেলতুম আর রাধামাধবকে ডাকতুম, ‘ও অভাগীকে তুমি মরণ দাও প্রভু, ও যেন মরে শান্তি পায়। মুখপুড়ির সঙ্গে যেন আমার আর দেকা না হয়।’

ওদিকে কী ভাবত ফুলমণি? সে কি কিচ্ছু বুঝতনা? আর কটা দিন যদি সই কে কাছে পেত, জড়তা কাটিয়ে ফুল কি শোনাত না নিজের গল্প? কত রাত তার শরীরটা ছিঁড়ে খেয়েছে নরকের কুকুর, কিভাবে পচাধসা চালে ডালে চোরা কুঠুরিতে রাত কাটিয়েছে সে, সে কথাও হয়ত জানতে পারতাম আমরা। যেমন আমরা জানতে পারিনা হাজার হাজার ফুলমণির কথা। নির্বাক জীবন তাদের এমনি করেই ঝরে যায় ওলিতে গলিতে, কেউ টেরও পায়না।

কান্নায় দিদার গলা বুজে আসত। জড়িয়ে জড়িয়ে বলত দিদা, ‘ফুল আর বেশীদিন বাঁচেনি তারপর। পরের বছর তোর মা জন্মাল। বোন তখন বাপের বাড়ী। আমি গেলুম বোনঝিকে দেকতে। মনের ভেতরে খুব ইচ্ছে আমার ফুলের সঙ্গে দেকা হবে। কিন্তু কে জানত সকলের আড়ালে বসে আমার আর্জি তিনি মঞ্জুর করে দিয়েচেন।

আমি গেছিলুম জানিস। সেই তেতলার ঘরটায় আবারও গেছিলুম।

কিন্তু কোত্থাও কিচ্ছু নেই; শুধু দেখলাম পাগলি বাঁধার শেকল টা মেঝেতে পড়ে আছে।’ 

২৫ মার্চ, ২০১৭ ২২:১৬:০৮