স্তব্ধতার সিগন্যাল পেরিয়ে কবিতারা জীবন্ত হয়ে ওঠে যেখানে
আলোচনা: বচ্চন গিরি
অ+ অ-প্রিন্ট
জীবনের কোনও ঘটনার মোড়ে কখনো একটা গোটা সমুদ্র ভাগ করে নেওয়া যায়? অথবা জীবনপথের সিঁড়ির ধাপে ধাপে উঠে একদিন আকাশকে ছুঁতে পারা যায়? প্রশ্নটা খুবই সহজ কিন্তু উত্তর মেলা দুষ্কর|  ভীরু ঠোঁট, ঘুম জড়িয়ে আসা ক্লান্ত চোখ খুঁজে ফেরে ঠিকানা| সেই আদি কাল থেকে অর্থাৎ যেদিন থেকে পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছে ঠিক সেদিন থেকে এটাই জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম| ঠিকানা হারিয়ে হন্যে হয়ে ফিরে ফিরেও যখন ঠিকানা মেলেনা তখন জীবন শূণ্য মনে হয়| ঠিক সেই সময় জীবনের না পাওয়ার যন্ত্রণাগুলোতে মলম প্রলেপ হয়ে উপশম জোগায় কবি সৌম্যদীপ রায়ের 'আকাশ দূরত্ব দূরে' কাব্যগ্রন্থটি| সম্প্রতি প্রকাশ হয়েছে শূণ্য শতাব্দীর তরুণ কবি সৌম্যদীপের বইটি| মোট ৫৩ টি কবিতা নিয়ে বেশ সাজানো গোছানো 'আকাশ দূরত্ব দূরে'| স্বকণ্ঠে কবি তাঁর কবিতাগুলিতে জীবন - মৃত্যুর রূপরেখা তৈরি করেছেন|  'অর্বাচীন' কবিতার একটি লাইনে স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে "ক্রমশ নিজেকে ভেঙে ভেঙে এতটাই অর্বাচীন তৈরি করতে পেরেছি যে এক্স -রে মেশিনের মুখোমুখি আলোচনায় বসলেও আমার বুকের হাড়গুলোর সাদা সাদা প্রতিচ্ছবি পরের দিন নিউজ পেপারে আসেনা|" সত্যিই এর পর জীবনের কাছে আর প্রশ্নের উত্তর চাওয়া মানেই বোকামি| সৌম্যদীপের পথ চলাটা শুরু হয়েছিল তাঁর মা কে ঘিরেই| মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে মায়ের আঙুল ধরে জীবনের পথে এক এক ধাপ এগিয়ে চলা সেদিনের সেই ছেলেটি তাই 'মা' কবিতায় তাঁর মায়ের হারিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে কবিতার আকারে লিখে ফেলেছেন মস্ত বড় এক চিঠি মায়ের উদ্দেশ্যে "কেউ ডাকলেই চলে যেতে হয় নাকি? এরকম করে হুট করে চলে গেলে,

একবার তো জানিয়ে যাবে...|" প্রথম সারির 'ট্রেন' কবিতায় আবার কবি ট্রেনকে নিজের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ওঠানামার সঙ্গে তুলনা করে লিখেছেন "আমি ট্রেন থেকে নিজে নিজেই নামি

নাকি

   ট্রেনটা

      আমাকে

          নামিয়ে

            দিয়ে

              চলে

                যায়,

                     বুঝি না |"

জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড যেন ফুরিয়ে ফুরিয়ে যাচ্ছে| শুধু প্রতিবিম্বের উপর ছাপ রেখেছে অবশিষ্ট আত্মা| তবু হারানো কিছু ফিরে পেলে সত্যিই আনন্দের সীমা থাকেনা| গভীরে প্রবেশ করে পড়তে পড়তে যখন হারিয়ে যায় মন ঠিক সেই সময় ক্রিং ক্রিং বেলের আওয়াজ দেয় 'মুখোশ' কবিতাটি| কবি এখানে স্বপ্ন আর তুলোর যৌন সম্পর্কের কলম নিপুণভাবে চালিয়ে সদ্য বাগানে মাথা উঁচু করে ওঠা আগাছাগুলোর শিকড় উপড়ে ফেলতে চেয়েছেন| সৌম্যদীপ তাঁর 'আকাশ দূরত্ব দূরে' কাব্যগ্রন্থে বিজ্ঞান মনস্কতার যথেষ্ট পরিচয় দিয়েছেন| কবিতাও যে অঙ্কের আকারে সূত্র মেনে হতে পারে তা কাব্যগ্রন্থটিতে স্পষ্ট| কল্পনার জগৎ থেকে সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে বাস্তবের বিজ্ঞান মনস্ক সমাজের জন্য কাব্যগ্রন্থটি এক অমূল্য সম্পদ| এর আগে বাংলার অন্য কোনও কবি সাহিত্য এবং বিজ্ঞানের  মিলনের এমন প্লাটফর্ম তৈরি করেছেন কিনা সেবিষয়ে সন্দেহ রয়েই যায়| 'কোণঠাসা' কবিতায় এক অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করেছেন কবি| এখানে শুরু থেকে ধীরে ধীরে কবিতা ৯০ ডিগ্রী কোণে গিয়ে শেষ হয়েছে| শেষের '(a+b)' হোলস্কয়্যার কবিতাটি বিশেষ চোখে পড়ার মতো চমকপ্রদ| কবিতাটিতে ইহজন্মের সঙ্গে পরজন্মের আত্মিক মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন কবি স্থান,কাল,পাত্র বিশেষে| অভিযান পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত 'আকাশ দূরত্ব দূরে' শুধু বাহ্যিক দিক থেকেই নয় বরং ভিতরের দিক থেকেই বেশি সুন্দর| প্রতিটি কবিতা মনে জায়গা করে নেওয়ার মতোই| পাঠকদের চোখে কবি যতই আকাশ ও নিজের মধ্যে দূরত্বের মায়াজাল সৃষ্টি করুন না কেন আদপে কবি কিন্তু আকাশকেই ছুঁয়ে ফেলেছেন তাঁর কবিতাগুচ্ছের দ্বারা|  পাঠকদের কাছে কাব্যগ্রন্থটি অবশ্যই অগ্রগণ্য হবে এবিষয়ে চোখ বন্ধ করে নিশ্চিতভাবে বলা যায়|

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০৮:৪৪:৩৪