বিএলআরসি সাহিত্য পত্রিকা
উদ্বোধনী সংখ্যা পর্যালোচনা
মানজু মান আরা
অ+ অ-প্রিন্ট
‘বিএলআরসি সাহিত্য পত্রিকা’র উদ্বোধনী সংখ্যার প্রকাশ এই ডিসেম্বরে। লেখক এবং লেখাপ্রেমী মানুষদের টরন্টোভিত্তিক সাহিত্য সংগঠন বেঙ্গলি লিটারারি রিসোর্স সেন্টার (বিএলআরসি) থেকে প্রকাশিত পত্রিকাটির এবারই যাত্রা শুরু। স্বভাবতঃই মনের কোনে একটা উষ্ণ ভালোবাসা থাকবেই -প্রথম বলে কথা! তারই রেশ ধরেই সাহিত্য পত্রিকাটি হাতে নিয়েই সেই উষ্ণতার ছোঁয়া পেয়েছি বৈকি! বুকের ভেতর বেজেছে নতুন একটা আমেজ আর উৎসবের ঘনঘটা।

সাহিত্য পত্রিকার সার্থকতা নির্ভর করে অনেক কিছুতে। যেমন, লেখার ভালো মান থেকে নির্ভুল মুদ্রণ, প্রচ্ছদ থেকে অলঙ্করণ, কাগজের মান থেকে বাঁধাই-কোনটাই বাদ দেয়া ঠিক হবে না। নতুন পত্রিকাটির অনেক কিছুই চোখে পড়ার মতো। একটু খোলা কথায় বলতে গেলে বলতে হয়-হৃদয়ে আঁটকে থাকার মতো। হৃদয়ের ভেতর বাঁশী বাজানোর মতো। 

লেখকদের লেখা আর সম্পাদকম-লীর নির্বাচন অর্থবহ এবং হৃদয়গ্রাহী বলতে হবে। সব লেখক কানাডার। শুধুমাত্র কানাডীয় বাঙালিদের লেখা নিয়েই ১৩৮ পৃষ্ঠার ম্যাগাজিন সাইজের বিশাল এই পত্রিকাটি। হ্যাঁ, কানাডীয় প্রেক্ষাপটে এই আয়তনকে বিশাল বলতে দ্বিধা নেই। বেশিরভাগ লেখক টরন্টোর হলেও আছেন মন্ট্রিয়ল, অটোয়া, ক্যালগেরির মতো দূরের শহরের লেখকও। সম্পাদকমন্ডলীকে ধন্যবাদ দিতেই হবে কানাডার মতো বিশাল একটি দেশের শহরগুলোতে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি লেখকদেরকে তাঁরা খুঁজে নিয়ে লেখা সংগ্রহ করেছেন। 

কী নেই পত্রিকাটিতে! তা-ই ভাববার বিষয়। গদ্যরাশি, গল্প, কাব্য-কথন এবং পাঠ-পর্যালোচনা রয়েছে এ উদ্বোধনী কলেবরে, যা প্রশংসার দাবী রাখে প্রশ্নাতীতভাবে। নব্য আর তুলনায় বেশি পরিচিত লেখকদের লেখার মিলন মেলায় ভরপুর এ সাহিত্য পত্রিকা। নির্ভুল বানান এ পত্রিকাকে আরো বেশি অলংকৃত করেছে। নানান ধারার এবং নানান ধরনের লেখা সংযোজিত হয়েছে এর পাতায় পাতায়, যা পাঠকদেরকে বিভিন্ন রকমের স্বাদ দিতে কৃপণতা করেনি। কিছুু ইংরেজি রচনার কারণে পত্রিকাটি প্রবাসের প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা নিয়েছে। 

পত্রিকাটির এক জায়গায় বলা হয়েছে- ‘বাংলা একটি মিষ্টি ভাষা’। মিষ্টি ভাষায় রচিত একটি সাহিত্য পত্রিকায় প্রতিটি শব্দ মিষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক এবং বোধকরি হয়েছেও তা-ই। মিষ্টি ভাষায় রচিত প্রতিটি লেখাই পাঠকদের মনে দাগ কাটবে বিশ^াস এবং আস্থা পুরোপুরি।

যেমন আছে গবেষণামূলক রচনা, তেমনি তুলনায় হালকা প্রবন্ধ-নিবন্ধও রয়েছে। আছে সাহিত্য নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা, প্রবাসজীবন নিয়ে সমস্যা আর সম্ভাবনার কথাও। মুক্তচিন্তা, মুক্তবুদ্ধি চর্চার পাশাপাশি থাকছে মুক্তিযুদ্ধ, একুশ এবং স্বাধীনতাভিত্তিক লেখা। ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রের ওপর বিস্তৃত পর্যালোচনাটি অনেক সুখপাঠ্য একটি রচনা। চলচ্চিত্র গবেষক মনিস রফিক অবশ্যই ধন্যবাদের যোগ্য। নোবেলবিজয়ী চীনা সাহিত্যিকের ওপর লেখাটিও বিশেষ মর্যাদাবান। সরাসরি চীনা ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন বাসুদেব দত্ত। মনে হয়েছে তাঁর কাছে আরও অনেক প্রত্যাশার রয়েছে। গুরুগম্ভীর, আবেগী, সমালোচনামূলক বিষয়গুলো সমান তালে ঢেউ তুলেছে এ পর্বের প্রকাশনায়। সুরজিৎ রায় মজুমদারের গবেষণা প্রবন্ধটি অনেক পরিশ্রমসাধ্য। ফরিদ আহমেদ এবং ভজন সরকারের প্রবন্ধ দুটি দৃষ্টি কাড়ে। পত্রিকাটিতে স্থান পেয়েছে কয়েকটি স্বাদু রচনা - ছোট কিন্তু সুখপাঠ্য। বিদ্যুৎ সরকার, মধুমিতা মুখোপাধ্যায় এবং অমিত কুমার মুখোপাধ্যায়ের রচনার কথা প্রথমেই মনে পড়ছে।  

ছোটগল্পগুলো পাঠক ধরে রাখার, আর মনে রাখার মতো। অপরাহ্ন সুসমিতোর ‘জোৎস্নার দিঘি’ একটি সত্যিকারের ভালো ছোটগল্পের উদাহরণ। রুবিনা চৌধুরীর গল্পে দর্শন মেলে ভিন্ন এক জীবনবোধের। ভিক্টর গোমেজের গল্পটিকে জাদুবাস্তব গল্প বললে কি ভুল হবে? শুজা রশীদের গল্পে আছে প্রবাসের বাস্তবজীবনে নির্মমতা। সুচন্দ্রিমার সিংহ চৌধুরীর গল্পটি চোখে জল আনে। 

কবিতাগুলোর ভিতর মন বাঁধা পড়ে আছে যেন আত্মার আত্মীয়ের মতন। মনে হচ্ছে আমারই মনের কথা লেখা আছে শব্দে শব্দে আর ছন্দে ছন্দে। মাসুদ খানের কবিতা ভিন্ন প্রকরণের। গঙ্গা ব্যানার্জীর গদ্য কবিতা অদ্ভুত এক অনুভবের ছায়া যেন। মেহবার রহমানের গুচ্ছ কবিতায় রয়েছে দীর্ঘ প্রচেষ্টার কাব্যিক সাফল্যেও ছাপ। অখিল সাহা এবং জাহানারা বুলার কবিতায় রয়েছে নান্দনিক বোধের শৈল্পিক প্রকাশ। 

পত্রিকায় বিএলআরসি নামের প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে তিনটি রচনা রচনা রয়েছে। রচনাগুলো নতুন এই প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে কমিউনিটির মানুষকে ধারণা দিতে সহায়ক হবে। বিএলআরসি প্রকাশিত চারটি গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা পাঠককে কানাডা থেকে প্রকাশিত বাংলা ভাষার এই বইগুলো সম্পর্কে স্পষ্টতা দেবে। চার গ্রন্থের তিন আলোচক সঙ্গীতা ইয়াসমীন, শিউলী জাহান এবং ড. সুজিত দত্ত গুরুত্বপূর্ণ এই কাজটি করায় তাঁদেরকে অভিনন্দন। 

ইংরেজি অংশে মোট ছ’টি রচনা রয়েছে - দুটি কবিতা ছাড়া বাকিগুলো গদ্য। সুজিত কুসুম পালের লেখাটি মার্গারেট অ্যাটউডকে নিয়ে। রয়েছে প্রবাসের যাপিত-জীবন নিয়ে দুটি গদ্য। পরবর্তী সংখ্যাতে ইংরেজি অংশটি আরও সমৃদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি।  

একটি বই বা সাহিত্য পত্রিকা হাতে নিলেই প্রথমেই যা চোখে পড়ে, তা হচ্ছে প্রচ্ছদ। বর্ণাঢ্য প্রচ্ছদ চোখে না পড়লেই যেন নয়। প্রচ্ছদটি ‘কিছু না বলেই অনেক কথা বলছে যেন’। চমৎকার প্রচ্ছদ করেছেন মোস্তাফিজ কারিগর। জেনেছি তিনি বাংলাদেশের মেধাবী শিল্পী। পত্রিকাজুড়ে অলঙ্করণ আর অঙ্গসজ্জা করেছেন টরন্টোর মোহাম্মদ হোসেন, শ্যামল বসাক এবং জয় দাশ। এজন্য তাঁরা বিশেষ ধন্যবাদ পাওয়ার দাবী রাখেন বলে আমি মনে করি।

পত্রিকাটির শেষের দিকে কিছু বিজ্ঞাপন সংযোজিত হয়েছে, যা না করলে ভালো হতো। কিন্তু আমরা সকলেই জানি, অর্থযোগান ছাড়া এতোবড় একটি কাজ সম্পন্ন করা সত্যিই দূরূহ। তাই বিজ্ঞাপনগুলোও সাদরে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে এ পত্রিকায়। তবে ঝক্ঝকে তক্তকে বিজ্ঞাপনগুলো দেখে ভালোই লাগছে। এছাড়া কিছু প্রয়োজনীয় তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। সুতরাং মন্দ কী, কয়েকটি বিজ্ঞাপন না হয় থাকলোই!

অদূর ভবিষ্যতে সাহিত্য পত্রিকাটি আরও সমাদৃত হবে তার উপস্থাপনার আঙ্গিকে, প্রচ্ছদ চয়নে এবং সর্বোপরি লেখক ও পাঠকদের ভালোবাসার স্রোতে স্নাত হবে- এ আশায় এর উত্তরোত্তর উন্নতি কামনা করছি মনে প্রাণে। টরন্টো নামের প্রবাস থেকে এমন একটি প্রয়াসের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

এককথায়, মনের খোরাক সমৃদ্ধ সাহিত্য পত্রিকাটি টইটম্বুর। কিছু ছড়া ছড়িয়ে থাকলে ভালো হতো। আর ছোট্ট নাটিকাও সংযোজন করা যেতে পারতো। হয়তো থাকবে পরবর্তী সংকলনে। সেই দিনের আশায় দিন গোনা।

 


 

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০৯:৪০:০৫