জুঁই মহল
জয়া গুহ (তিস্তা)
অ+ অ-প্রিন্ট
প্রতি বছর এই দিনেই বেলা তিনটের বনগা লোকালে চাপে জুঁই।সংসারের কাজ সামলে,হাজব্যন্ডের ছুটির দিন উপেক্ষা করেই আজ প্রায় দশ -বারো বছর তার এই অদৃশ্য হওয়া বেশ কিছু সময়ের জন্য।

জিজ্ঞাসা করলে গম্ভীর হয়ে বলে, "আমার কাজ ছিল,বিশ্বাস করতে পারো, নিজেকে ছাড়া কাউকে ঠকাবো না কোনোদিন।"

এত বছর ধরে এই এক গোঁ চালিয়ে যাচ্ছে।

রাশভারী স্বভাবের মিত্র মশাই রাইটার্সের উঁচু তলার চাকুরে।নিজের ইমেজ নষ্ট করার মানুষ তিনি নন।

তাই অগত্যা চুপকথাদের আড়ালে মনমালিন্যের ঠান্ডা স্রোত।

"উফফ কি গরম,"বলতে বলতে হেড সেট কানে গুঁজে ওরা দুজনেই উঠে বসে বনগা লোকালে।

ঠাকুরনগরের এক প্রান্তিক স্টেষনে থিয়েটার দেখতে রওনা দিয়েছিল সেদিন, এই দুজন।

তখন জুঁই ওরফে সুকন্যা বছর আঠাশের, আর মিত্র বাবু  চল্লিশের জিনস গেঞ্জি পরা সুঠাম পুরুষ।

সেই সন্ধ্যায় এক অজানা ঝড়ে ছারখার হল মন,শরীর, সম্পর্ক দাঁড়ালো আসামীর কাঠগড়ায়।

মঞ্চে অল্পচেনা মুখ,খুব চেনা গলার আওয়াজে চোখ ঝাপসা হল জুঁই এর।

প্রদীপ বাবুর চোখ এড়ায় নি তার স্ত্রী এর ঘন ঘন রুমাল ব্যবহার।নিজ স্বভাবে চুপ তিনি,বুঝছিলেন কিছু একটা ঘটছে তার আড়ালেই।ভীষণ কিছু একটা ষড়যন্ত্রের আভাস যেন!

নায়ক চরিত্রে অভিনয় করছে বনি।

বিনীত সেন! গত এক বছর ধরে ফেবুতে আলাপ,অজস্র বার ফোন, কত আবেগ, ইমোশন শেয়ার করা....।

শো শেষ হল

"তুমি একটু এগিয়ে যাও, আমি গ্রীন রুমে পাঁচ মিনিট দেখা করেই আসছি, বলেই প্রায় ওড়ার গতিতে এগিয়ে গেল মিসেস জুঁই  মিত্র।"

গ্রিন রুমে ঢুকতেই মিষ্টি হাসি ভরা চোখ স্বাগত জানাল তাকে,যেন কতকালের চেনা।

আমি ই জুঁ ই

আমি বনি

হাত মেলাতেই দু পাশের হাত শক্ত হয়ে এল,কাছে এল।

চোখের সম্মতিতে দুজন ই বুঝল হয়ত এটাই প্রথম আর এটাই শেষ দেখা।

তাই দ্বিধা না করেই কাছাকাছি এল ঠোঁট, অনুভব।

মুখের উপর উড়তে থাকা চুল,ঘন নিঃশ্বাস।লাল থেকে কালচে হল ঠোঁট।

সম্বিত ফিরতেই বনির বুকে মুখ রেখে মুহুর্তের আশ্রয় খুঁজেনিল জুঁ ই।

বোঝাতে চেয়েও বোঝাতে পারেনি, সে ছিল তার মনের আজন্মলালিত পুরুষ চরিত্রের ছায়া।

সেই পুরুষ কেবল রক্ত মাংসের কামনায় আটকে নেই,জুঁই তাকে বইতে দিয়েছে শিরায়, ধমনীতে।

জুঁই একটা সিগনেচার করার পেন দিয়েছিল,স্লিপ লেশ, সালোয়ারের পিঠে সেদিন তার স্বপ্নের পুরুষ একলাইন কবিতা লিখেছিল।

আর দেখা হয় নি তাদের।

সেদিন রাতে, ঠোঁটের কালশিটে, আর পিঠের এক-লাইন লেখা নষ্ট চরিত্রের মেয়ে অনায়াসেই প্রমাণ করেছিল জুঁই কে।

কপাল জোরে সংসার ভাঙেনি,কারণ কোলে তখন চার মাসের  সন্তান।তাই সন্দেহ ততটা দানা বাঁধে নি।

তার পর থেকেই এই দিনে জুঁই বনগা লোকালে চড়ে যাবেই ওই ষ্টেশন এ।গিয়ে বসে থাকে বেশ কিছুক্ষণ।

খোলা হাওয়ায় প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেয়,যেন এখনো তার গায়ের গন্ধ ভেসে বেড়ায় ওখানে।

মনে মনে বিড়বিড় করে,"যাকে ঠোঁটে স্থান দিলাম,মনে নিলাম,সেই তো স্বামী,স্মৃতিতে থাক তুই,সিঁথিতে থাক।

"সীমন্ত জুড়ে তোমার চলার পথ আমার মৃত্যু-অধিরথ"।

০৩ নভেম্বর, ২০১৬ ০৮:২৭:০৫