তোতা কাহিনী
মৌসুমী প্রামাণিক
অ+ অ-প্রিন্ট
এক শিকারী একদিন খাঁচায় বন্দী এক তোতা’কে সঙ্গে নিয়ে ঘরে ফিরছে। রাস্তার ধারে ধুলো ময়লায় পড়ে থাকা এক পাগল সেই দেখে হেসে লুটোপুটি খায়।

“কি রে ব্যাটা! অ্যাঁ...তোতা বাজার থেকে কিনে আনছিস? শিকার কি ভুলে মেরে দিয়েছিস...?”

শিকারী ওর দিকে তির্যক তাকিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেল। যে কারণ টা সে নিজেই জানে না সেটা ঐ পাগলকে কি করে বোঝাবে? এতদিন সে বন, জঙ্গল থেকে পাখী শিকার করে দালালদের হাতে তুলে দিয়েছে। সেই দালালের কাছ থেকে পাখী হস্তান্তর হয়ে দোকানীর কাছে যায়। আজ সেখান থেকেই তারই শিকার করা লাল পট্টি বাঁধা ছোট্ট তোতাকে সে কিনে আনল।

কিন্তু কেন? এই তোতা তো লাল টিপ পরা কোন রমনীর কাছে কিংবা সাদা শাড়ি পরা বয়স্কার কাছে ভালই থাকত; কথা শিখত, গান শিখত, ভাল মন্দ খেয়ে ডাগর ডোগর হত। তবে কেন সে নিয়ে এল তাকে ঘরে? না এনেও তো উপায় ছিল না। পাখী যে ভাল করে কথা বলতে শেখেনি আর ওর চোখের ভাষা কে বুঝবে? দালাল,দোকানী? তাদের না আছে সময়, না আছে ক্ষমতা। ক’দিন বাদে হয়তো ওর ডানা দুটি কেটে দেওয়া হত। কিন্তু তাতে শিকারীর কি এসে যেত? তবে কি সে পাখীকে ভালবেসে ফেলেছে? না কি শুধুই মায়া?

যাইহোক, সে আগের থেকেই তার তোতার জন্যে সুন্দর ঘর রচনা করেছিল, যদিও সেটা লোহার খাঁচার মতই দেখতে, তবে অনেক বড়। ভেতরে লোহার বড় বড় গরাদ। বসার জন্যে লোহার ডাণ্ডা। খাওয়ার জন্যে রূপোর বাটি আর ছিল সোনার শিকল।

প্রথম ক’দিন তোতা উদাস হয়ে বসে থাকত নীল-সাদা আকাশের দিকে তাকিয়ে।

“পাখী...বসে আছিস কেন অমন করে?”

পাখী উত্তর দেয় না। তার চোখে শূন্যতা। “ কিরে কথা বল। তোর কি এখানে ভাল লাগছে না?”

পাখী এবারও চুপ। “ঐদিকে সারাক্ষন কি দেখিস বলতো?”

“আকাশ...নীল আকাশ...যদি ওখানে উড়তে পারতাম...”

“হুম। কিন্তু উড়তে পারবি?”

“না। উড়তে আমি ভুলে গেছি।”

“তবে...? ওখানে গেলে চিল শকুনে তোকে ছিঁড়ে খাবে।”

“তবে তুমিই বল কি করব?”

“আমি যা বলবো শুনবি?”

“শুনবো”

“যা বলবো করবি?”

“করবো। তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে? বলো?”

“পাখী, তুই মন খারাপ করিস না। আমি আছি। তুই যা চাইবি পাবি...শুধু উড়তে চাস না। কেমন?”

তারপর থেকে শিকারী সারাদিন পাখীকে নিয়েই পড়ে থাকে। তাকে ভাল ভাল খাবার খেতে দেয়। তাকে সাজায়, গোছায়। ভেলভেট কাপড় দিয়ে তার গা মুছিয়ে দেয়। তার নখের ময়লা পরিষ্কার করে দেয়। খাঁচায় তারের খোঁচা লেগে পাছে রক্ত ঝরে তাই সেগুলো গাছের লতা দিয়ে মুড়ে দিয়েছে। ঘরে থাকলে তার শিকলও খুলে দেয়। সবুজ পাখী লোহার গরাদে গিয়ে বসে। এ গরাদ থেকে ও গরাদে লাফ দিয়ে খেলা করে। লোহার গরাদ গুলিই তার যেন তার তাল বা নারকেল গাছের ডাল।

তবুও মাঝে মাঝে কেন যে তার উড়বার ইচ্ছা হয়? আশা নিরাশার মাঝে তার মনে মুক্ত জীবনের সাধ জাগে। কেঁদে কেটে একসা হয় সে। যা খেতে দেওয়া হয়েছিল সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে একাকার করে।

“আমাকে মুক্তি দাও...থাকব না...আমি বনে চলে যাব।”

শিকারী গেল বেজায় খেপে, জোরে এক ঝাপড় কষাল। পাখী যন্ত্রনায় ক্যাঁ..ক্যাঁ করে ওঠে।

“দেব তোর ডানা গুলো কেটে...উড়বার নেশা জম্মের মত ঘুচে যাবে...”

“না...দয়া করো...আমি কোথাও যাব না...তোমার কাছেই থাকব।”

 এরপর থেকে পাখী আর বায়না করে না; শিকারীর ভালবাসাকে অসম্মান করতে বাধে তার। অভিমানীনীর চোখের জল চোখেই শুকায়। শিকারী প্রশ্ন করে, “পাখী আর যাবি বাইরে?” দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে পাখী, “না!”

“কেন? নীল আকাশে উড়বি না?”

“না। আকাশ আর আমায় ডাকে না।”

“সবুজ গাছে বসবি না?”

“ও রং আর আমায় টানে না...”

“গাছ পাকা ফল খাবি না?”

“অরুচি হয়েছে...”

শিকারী তো বেজায় খুশী, এতদিনে বুঝি তার পাখী তার হৃদয় খাঁচায় বাঁধা পড়ল। শিকারীর ঘর আর সেই ঘরের খাঁচাটাই আজ পাখীর একমাত্র পৃথিবী। সেও মানিয়ে নিয়েছে সেখানে। স্বীকার করে নিয়েছে তার প্রভুর বশ্যতা। কোন কিছুতেই আজ আর তার না নেই। শিকারীকে সে আর অকারণে জ্বালাতে চায় না। এমনকি রাতে বেড়াল আসে, ইঁদুর আসে পাখীকে ভয় দেখাতে। পাখী ডানা ঝাপটাতে থাকে ভয়ে,  তবুও সহ্য করতে থাকে মুখ বুজে । একদিন শিকারীর নজরে আসে ব্যাপারখানা।

তোতার করুন অবস্থা দেখে তার নিজের চোখে জল চলে আসে।

“আগে বলিসনি কেন পাখী? তোর এত কষ্ট?”

শিকারী ওকে খাঁচা থেকে বের করে নিয়ে যায় নিজের ঘরে। মখমলের চাদরের ওপর তাকে শুইয়ে দেয়।

“আমার কষ্ট হলে তোমার কি হয়?”

“তুই বুঝিস না?”

এরপর থেকে শিকারী রোজ রাতে ওকে নিজের কাছে নিয়ে শোয়। গান গেয়ে ওকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। ঘুম না এলে পাখী যখন ছটফট করতে থাকে, তাকে অনেক আদর করে। বলে,

“ঘুমোচ্ছিস না যে!”

“ঘুম আসছে না...মায়ের কথা মনে পড়ছে খুব।”

পাখী ককিয়ে কেঁদে ওঠে। সেটা আর্তনাদ হয়ে শিকারীর বুকে গিয়ে ধাক্কা খায়। তোতাকে জড়িয়ে ধরে সেও কাঁদে। “অমন করিস কেন, পাখী? আমি কি তোকে ভালবাসতে পারি নি? কিছুই কি দিতে পারি নি?”

দিন যায়, রাত যায়, মাস চলে গিয়ে বছর ঘুরে যায়। পাখীর বয়স বাড়তে থাকে। এখন সে আর ছোট্টটি নেই। বেশ ডাগর ডোগর হয়েছে। তার মন আরো চঞ্চল, নতুন জীবনের সাধ পেতে চায় সে; নতুন সঙ্গীর সঙ্গ পেতে চায় তার শরীর।

“আমায় একটা বন্ধু এনে দেবে? দাও না গো?”

“কেন? আমাতে কি আর তোর মন ভরে না?”

“তা নয়। তুমি সারাদিন ঘরে থাক না..আমার বড্ডো একা লাগে যে!”

 শিকারী এতটাই  ভালবেসেছিল যে পাখীর  কথা ফেলতে পারে না। সে আর একটি সবুজ তোতা এনে দেয়। পাখীর মনে লাগল বসন্তের লাল রঙের ছোঁয়া। জীবন যৌবনে এল সবুজ আবিরের স্পর্শ।  পাখীর চোখেমুখে উপছে পড়া উল্লাস দেখে শিকারীর মন ভরে গেল।  ভালবাসায় অন্ধ শিকারী বুঝতেও পারল না তার প্রিয় পাখী তার থেকে একটু একটু করে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে ।

তবে, যখন বুঝল, অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। তবুও সে পাখীকে কিছুতেই হারাতে চায় না। তাই সবার আগে ছুরি দিয়ে বন্ধু তোতার মাথাটা ধড় থেকে আলাদা করে দেয়। রাগে, অপমানে পাখীর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে আর্তনাদ করে বলল,

“একি করলে তুমি...? ওর ভালবাসার ধন যে আমার গর্ভে...?”

রাগে অন্ধ শিকারীর  মাথায় কিছু ঢুকল কিনা কে জানে। তবে সে এই ভেবে আত্মতৃপ্ত হল যে পাখী তার একার সম্পত্তি। কিন্তু পাখী? তার কি অবস্থা? তার খাওয়া নেই, ঘুম নেই। সেদিন থেকে একভাবে বসে আছে সে। ডানা ঝাপটাতে ভুলে গেছে, ডাকতে ভুলে গেছে, গান গাইতে ভুলে গেছে। উড়বার ইচ্ছা তো দূরে থাক, বাঁচার সাধই আর তার নেই। শিকারীও হাজার চেষ্টা করে তাকে খাওয়াতে পারে নি, ঘুম পাড়াতে পারে নি।

একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে শিকারী দেখল যে তার প্রিয় পাখী খাঁচার ভিতর মরে পড়ে আছে। শিকারী পাগলের মত হয়ে গেল। চিৎকার করে উঠল। ওকে খাবার এনে দিতে থাকল। জল দিতে থাকল। ওকে আদর করতে থাকল। পাখী সাড়া দিল না। শিকারী পাগলের মত কাঁদতে থাকে। “ পাখী...ফিরে আয়...ফিরে আয় তুই...যা চাস দেব...এই দেখ...তোর শিকল খুলে দিলাম...চল যাবি...বনে যাবি...? উড়বি? কথা বল...কথা বল তুই...একবার আমায় নাম ধরে ডাক...তোকে ছাড়া আমি বাঁচব না যে...” কিন্তু পাখী তেমনই নেতিয়ে পড়ে থাকল। আর অকারণে শিকারীর কান্না আর্তনাদ হয়ে শূন্য খাঁচায়, শূন্য ঘরে ঘুরে ঘুরে ফিরে আসতে থাকল।

২৮ অক্টোবর, ২০১৬ ২১:৫৫:৫৫