ছন্দ ও ছবির মেলবন্ধন যেখানে জন্ম দেয় নতুন সকালের
মুন সিনহা
অ+ অ-প্রিন্ট
যুগ বদলায়, রং বদলায়, বদল হয় সামাজিক প্রেক্ষাপটও। তবু এগিয়ে চলার নামই জীবন| নিদ্রাহীন মন নতুন ভোরের অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকে। উদিত রবির কিরণ গায়ে মেখে শুরু হয় দিন। প্রবাহমান সময়ের হাত ধরে বদলে যাচ্ছে পৃথিবীর বুকে বসবাসকারী মানুষ। খুনোখুনি, রক্ত, গুলি বারুদের গন্ধে ভরে উঠছে পৃথিবীর বাতাস। তবু কোনও একদিন পৃথিবী আবার শান্ত হবে সেই আশায় বুক বাঁধেন সকলেই। ঠিক সেখানেই জন্ম সাহিত্যের। মননশীল কিছু ভাবনা, বাউল ভাটিয়ালী আজানের গান এসব যেন অতীত। বারাসাত শহরের এক দামাল ছেলে উদ্লা বাউল ছদ্মনামে নিজ হাতে সমাজকে সুন্দরভাবে সাজানোর দায়িত্ব নিয়েছেন। সেজন্যই জন্ম দিয়েছেন একদিন তাঁর স্বপ্নে দেখা আজকের বাস্তব পরিবার। একটি সাহিত্য পত্রিকা, একজন মাত্র সম্পাদক, কিছু ভাবনা হঠাৎ করেই খোদ শহরতলীতে জন্ম নিল এক সদ্যোজাত। না, হসপিটাল বা নার্সিংহোমে নয়, একেবারে মননে। "সৃষ্টি সুখের সন্ধানে" যার মূল মন্ত্র সেই 'সোনালী সকাল' সাহিত্য পত্রিকার সম্পর্কে কলম ধরতে গিয়ে ক্ষণিক স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলাম। পত্রিকার মোড়ক বিশেষ আকর্ষণীয়।একটি পত্রিকা প্রচ্ছদে রূপসী হয়| চন্দ্রানী বসুর প্রচ্ছদ দেখে মনে হল শিল্পীর তুলি কথা বলে। সম্পাদকীয়তে উদ্লা বাউল তথা মনোজ আচার্য অকপটে 'সোনালী সকাল' পত্রিকার জন্মের ইতিহাস বাখ্যা করেছেন, তুলে ধরেছেন তাঁর উদ্লা ছদ্মনাম ধারণ করার কারণও। পত্রিকাটিতে মোট সতেরোটি কবিতা, তিনটি গল্প, তিনটি ছোটগল্প, দুটি বড় গল্প, ছয়টি একটি বাক্যে গল্প,একটি প্রবন্ধ, চৌদ্দটি অণু কবিতা, ছয়টি চিঠি, এবং বড় ও ছোটদের ছবি সহ একটি ভ্রমণ সংক্রান্ত লেখনী নিয়ে বেশ সমৃদ্ধ পত্রিকাটি। তবে সূচীপত্রের সঙ্গে লেখার কোনও মিল পেলাম না। পত্রিকাটির বিশেষ একটি দিক বিভন্ন বিভাগ। যা সাধারণত খুব নামী কয়েকটি পত্রিকা ছাড়া অন্য  কোথাও দেখা যায়না। 'মর্ডান' কবিতায় কবি রয় রৌপ্য নারীদের ধীরে ধীরে আধুনিকা হয়ে ওঠা খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। নীলাদ্রি দেবের 'নষ্ট দেহ' কবিতায় শবদেহ এবং নিজের শরীরকে তুলনা করেছেন কবি। চঞ্চল রায়ের 'সভ্যতা' বিশেষ ভালো লাগলো। বাসব মন্ডলের 'অঙ্ক' জীবনের কথা বলে। অরুণজীব রায় বাবুর 'পুতুল' কবিতায় একজন নারীর বিবাহপরবর্তী জীবনের চিত্র সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। কবি লিখেছেন "ভালোবাসা! সে এক অসুখ।ক্লান্ত যে মেয়েটি ঘরে ফেরে... পায় কি সে সেবা পুরুষের মতো করে?" অরুণজীব বাবুকে বলবো সত্যিই ভালোবাসা এক মারণ অসুখ। ডাকবাক্সে জমা শব্দ বিভাগে মনোজ আচার্যের বৃদ্ধাশ্রম জীবনের চিঠি বাবাইকে লেখা তার বাবার পাঠকদের চোখে জল এনে দেবেই। পবিত্র নাথের বন্ধুকে চিঠি সম্পর্কে সংশয় থেকেই যায়, স্বস্তিকের কাছে আদৌ চিঠিটি পৌঁছেছিল? নবনীতা চক্রবর্তীর বৃষ্টির জন্য চিঠি পুরোটাই কাল্পনিক মনে হল। অঙ্গনা নাথ শাড়িকে চিঠি লিখেছেন। সত্যিই এমনটা হয়তো কেউ কখনো ভাবেননি। শাড়ী নারীর লজ্জা ঢাকে কিন্তু কখনো কেউ অঙ্গনার মতো করে শাড়ির যন্ত্রনার খবর রেখেছেন কিনা সে বিষয়ে যথেস্ট সন্দেহ আছে। তবে অঙ্গনাকে বলবো সাহিত্যে লেখার মাঝে ইংরেজি বেশি ব্যবহার না করাই শ্রেয়। জুঁই মুখাজ্জীর টিভিকে লেখা চিঠি মনে রাখার মতো। চন্দ্রানী বসুর বন্ধুকে লেখা চিঠিটি মনে করিয়ে দিল প্রিয় বালিশের কথা। একটি বাক্যে গল্প বিভাগে গল্পগুলো ভালো তবে গল্পকারদের বলবো প্রত্যেক লেখার ধারা বজায় থাকে শিরোনামে। কিন্তু এই বিভাগে একটিও গল্পে শিরোনাম নেই। মুকুট ছাড়া রাজা যেমন রাজ্যে শোভা পায়না শিরোনামহীন যেকোনও লেখা তেমনই বেমানান। 'পরীদের গল্প' ছোটগল্প লিখেছেন নীলকন্ঠ অঞ্জন। গল্পকার তাঁর গল্পে একজন নারীর পতিতা হয়ে ওঠার বৃত্তান্ত এবং তাঁর জীবনধারা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। বলাকা সেন 'সেই দিনের অপেক্ষা' ছোটগল্পে সাংসারিক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন সুন্দরভাবে এবং শাশুড়ি ও বৌমার সম্পর্ক যে আরো গভীর হতে পারে তা এই গল্পের মাধ্যমে স্পষ্ট। কল্পনা বিশ্বাসের 'গজা যখন শিরোনামে' ছোটগল্পে এক দরিদ্র অথচ প্রাণবন্ত কাগজ বিক্রেতার জীবনের কথা, তাঁর ভালো লাগা, ভালো থাকা এবং অবশেষে একদিন রাজনৈতিক সংঘর্ষে গজার প্রাণ যায়। গজাকে নিয়ে রাজনৈতিক দলের ভাগবাঁটোয়ারা তুলে ধরেছেন গল্পকার। ছবি যেখানে কথা বলে বিভাগে প্রতিটি ছবি চমৎকার। চন্দ্রানী বসুর প্রবন্ধ 'অনুকবিতা' ভালোলাগেনি বিশেষ। প্রবন্ধের মূল স্তম্ভ মাঝখানে ভেঙে পড়েছে বলেই মনে হল। প্রবন্ধটি অন্যভাবেও দাঁড় করানো সম্ভব ছিল| কথোপকথন বিভাগে নিবেদিতা মজুমদারের 'কল্পিত সংলাপ' মোটের উপর ভালো। শ্রাবণী বসুর 'ইচ্ছে করে' কবিতাটি বেশ ইচ্ছে জাগাবে পাঠকদের মনে। মনোজ কুমার দে লিখেছেন 'দেশদ্রোহী' কবিতা। মনোজ বাবুর কবিতাটি বারবার পড়লাম। কবিতাটি গায়ে কাঁটা দিল বারবার। সুমনা পাল ভট্টাচার্যের 'আমার 'তুমি' কবিতা ভালোই।তবে সৌম্যদীপ রায়ের কবিতা পড়ে মনে হল কবি খুব গভীর থেকে ভেবেছেন এবং রাজপথে হেঁটেছেন খুবই সতর্কে। সৈকত দে লিখেছেন 'ক্যানিং সাহেবের ভূত' নামক বড়গল্প। সবটাই কাল্পনিক বাস্তবতার ছোঁয়া নেই একেবারেই এই গল্পে।চন্দ্রানী বসুর 'হসপিটাল' বেশ সুন্দর। তবে আরো বেশি দীর্ঘ বর্ণনা পাঠকদের সামনে তুলে ধরলে ভালো লাগতো চন্দ্রানী দেবীর গল্পটি।  ছোটদের ছবি বিভাগটি খুবই সুন্দর। কচি হাতগুলো আগামীদিনের নামী শিল্পীদের হাত হয়ে উঠবে এইটুকুই আশা রাখবো। পত্রিকাটিতে একটি ভ্রমণ সংক্রান্ত লেখা লিখেছেন প্রসাদ বিশ্বাস।কাঁকুরে মাটির জেলা পুরুলিয়ার আনাচকানাচে প্রসাদবাবু অবাধ বিচরণ তা স্পষ্ট। শরীরের কতকথা লিখেছেন ডাঃ প্রলয় শর্মা। পত্রিকার সবকিছুই ভালো তবে বানানের দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। কবিতা বিভাগটি আরও সতর্ক নির্বাচনের দাবী রাখে। সব মিলিয়ে 'সোনালী সকাল' বেশ সাজানো গোছানো। একটি সাহিত্য পত্রিকা বলতে যা বোঝায় তা 'সোনালী সকাল' পত্রিকায় রয়েছে এবং পত্রিকাটি বাংলা সাহিত্য জগতের অনন্য এক নিদর্শন। যা আগামী দিনে নতুন সকালের বার্তা বাহক হয়ে উঠবে প্রতিটি সাহিত্য মনস্ক মানুষের কাছে।

 

১৬ জুলাই, ২০১৬ ১৪:০৩:৫৩