বালুচরি শাড়িতে পুরাণকথা
সুব্রত কুমার দাস
অ+ অ-প্রিন্ট
রামায়ণের গল্প
কিছু কিছু ব্যাপারে আমার বেশ সুনাম আছে। সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যেটিকে আমার স্ত্রী নীলিমা বিশেষভাবে চিহ্নিত করেন সেটি হলো আমি শাড়ি চিনি না। চব্বিশ বছরের বিবাহিত জীবনে এটি আমার শ্রেষ্ঠ পুরস্কার, কেননা তাতে শাড়ি কেনার দায় কমে যায়। সেই ১৯৯২ সাল থেকেই শাড়ির দোকানে ঢুকলে আমার নিজেকে অনেকটা আন্ধা আন্ধা লাগে। যদিও ইদানীং অন্ধত্ব খানিকটা হলেও কমছে। টরেন্টাতে ঐতিহ্যবাহী দোকান শাড়ি হাউস ড্যানফোর্থে শো-রুম খোলার পর থেকেই নীলিমা ওখানে কাজ করার ফলে আমারও মাঝে মধ্যেই ওখানে যাওয়া হয়। দোকানের মালিক দম্পতি রঞ্জনদা আর রিঙ্কি বৌদি আমাদের বন্ধুস্থানীয় হওয়াতে শাড়ি বিষয়ক প্রশ্ন করে উত্তর পেতে অসুবিধা হয় না। আর এভাবেই ওই অন্ধত্বের অভিশাপ থেকে ক্রমে ক্রমে মুক্তি পেতে চলেছি। 

শাড়ি হাউসে বিচিত্র সব শাড়ি আছে। প্রবাসের একটি দোকানে বাঙালি ঐতিহ্যের এমন সমাহার দেখলে কোনো বাঙালির ভালো না লেগে পারে? অনেকগুলো শাড়ির নাম আমি কিছুদিন আগেও শুনিনি। এমনও হতে পারে শুনেছি কিন্তু মনে থাকেনি। যেমন ধরা যাক  কাঞ্জিভরম, সিল্ক গাদোয়াল, পৈথানী, বোমকাই, ইক্কত, পঞ্চম পল্লী, মঙ্গলগিরি, পাটোলা সিল্ক, জারদৌসি বেনারসির কথা। ব্যাপারটা কি এমন যে সবাই জানেন, আমিই জানি না?

দিন কয়েক আগে টরন্টোর বাঙালি সমাজের বিশিষ্ট মুক্তচিন্তক পরম শ্রদ্ধেয় আকবর হোসেন জানালেন তিনি একটি বিশেষ শাড়ি দেখতে শাড়ি হাউসে যাচ্ছেন। নাম কী? জানলাম ‘বালুচরি’। দৌঁড়ালাম আমিও। গিয়ে তো মাথা খারাপ অবস্থা। শাড়িজুড়ে রামায়ণ, মহাভারত আর রাধা-কৃষ্ণ। শাড়িতে পুরাণের এমন চিত্রণ কখনও স্বপ্নেও ভাবিনি। 

গভীর আগ্রহ নিয়ে আকবরভাই শাড়ির ছবি তুললেন। ভাবীর জন্যে কিনলেন। রাতে তাঁর ফেসবুকে দেখি ওই শাড়ি নিয়ে পোস্ট।  শিরোনাম দিলেন ‘শাড়িতে সংস্কৃতি’। লিখলেন, “আমাদের টরন্টোর ড্যানফোর্থ এলাকায় যে শাড়ির দোকানটি এখানকার বাঙ্গালি মেয়েদের খুব পছন্দ তার নাম “শাড়ি হাউস।” আর তার যে মালিক তিনি আমাদের সদা হাস্যময় রঞ্জন। খুবই সদালাপী মানুষ তিনি। আর তাঁর সাথে দেখা হলে বোঝা ভার যে তিনি শাড়ি বিক্রি করেন নাকি সৌজন্য বিক্রি করেন।” শঙ্খ নিয়ে আকবর ভাইয়ের খুব আগ্রহ। সেদিন দোকানে গিয়ে তিনি নীলিমার কাছে শঙ্খ বাজানোর চিত্রকর্ম দিয়ে বানানো শাড়ি খুঁজছিলেন। ফেসবুকের পোস্ট দেখে বুঝলাম তেমন শাড়ি তিনি পেয়েছিলেন। লিখেছেন, “আমার ছেলেবেলা থেকেই শঙ্খের প্রতি বড় আকর্ষণ। শঙ্খনাদ আমাকে বরাভয় দেয় আর আমার মন-প্রাণ ভরে ওঠে।” শাড়ির বর্ণনায় লিছেন, “অতি অদ্ভুত কারুকার্যময় সে শাড়ি। সেখানে একটি মেয়ে শঙ্খ বাজাচ্ছে, আঁচলে মহাভারতের নিয়ে অপরূপ কাজ। পাড়েও তেমনি। আমি অবাক হয়ে দেখলাম আর দেখলাম। একটি শাড়ির মাঝে আমাদের আবহমানকালের সংস্কৃতি এমন ভাবে ফুটে উঠতে পারে এ ধারণাও আমার ছিল না।”

বালুচরি শাড়িকে নাকি বলা হয় ‘শাড়ি সম্রাজ্ঞী’। গুগল বলছে এর আদি নিবাস পশ্চিমবাংলায়। কারো কারো মতে, মুর্শিদাবাদের বালুচরে। আবার কারো মতে জিয়াগঞ্জে (পূর্বনাম বালুচর)। পরবর্তীকালে বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরে এর নবজন্ম বলা যেতে পারে। তবে বালুচরি শাড়ি এখন বাংলাদেশের তাঁতেও বোনা হচ্ছে। মাঝখানে একদিন ফাঁকা সময়ে শাড়ি হাউসে গেলাম। অনেকগুলো শাড়ি ভালো করে দেখলাম। অনেক ছবি তুললাম। সেসব ছবি দেখতে দেখতেই আজকের এই লেখা তৈরি হলো। 

বাসাতে ফিরে গুগলও করলাম খানিকক্ষণ। ‘দেশ’ পত্রিকায় দেখছি লিখছে ‘বালুচরি আসলে মুর্শিদাবাদ গঙ্গাপাড়ের বিস্তৃত এক বালির চর থেকে তার নাম পেয়েছিল’। একথা বলেছেন কথাসাহত্যিক রমাপদ চৌধুরী তাঁর ‘হারানো খাতা’য়। অন্যত্র লিখছে: “এখন অনেকের ধারণা ‘বালুচরি’ বাঁকুড়ার একটি বুনন শিল্প। এ ধারণা ভ্রান্ত। ‘বালুচরি’ শাড়ি দুবরাজদাস চামার প্রমুখ তাঁতিদের বংশধরেরা যাঁরা বুনতেন, তাঁরা ইংরেজদের নীলচাষ সংক্রান্ত অত্যাচার এবং ক্রমাগত তাঁদের আর্থিক বিপন্নতার কারণে অন্যান্য স্থানে, বিশেষত বাঁকুড়া অঞ্চলে চলে যান। পরে বালুচরি শিল্প বিস্তার লাভ করে বাঁকুড়া প্রভৃতি স্থানে। সেই কারণে বালুচরি আদপেই বাঁকুড়ার বুনন শিল্প নয়। অসওয়ালি জৈন মারোয়ারিরা সুদূর রাজস্থান বিকানের প্রভৃতি জায়গা থেকে বাণিজ্যসূত্রে এসেছিলেন বালুচর অববাহিকায়। ব্যবসাটাই ছিল তাঁদের মূল বিষয়। রেশমজাত মসলিন, সিল্ক ও মশলার ব্যবসায় ছিল তাঁদের রমরমা। বালুচরের তাঁতিরা তাঁদের কাছে দাদন পেতেন। জিয়াগঞ্জের সেকালের একটি বিখ্যাত জৈন মন্দির গাত্রে ‘বালুচর’ কথাটির আজও উল্লেখ আছে। ‘বালুচরি’র বুননশিল্পী যেসব অঞ্চলে মূলত বসবাস করতেন, সেগুলি হল বালিগ্রাম, বাহাদুরপুর, সন্ন্যাসীতলা, বাগডহড়া প্রভৃতি।”

জিয়াগঞ্জ লাগোয়া বাহাদুরপুর গ্রামের বালুচরি শাড়ির ভুবনখ্যাত শিল্পী দুবরাজ দাসের সম্পর্কে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক বিনয় ঘোষ তাঁর ‘পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি’র গ্রন্থের তৃতীয় খ-ে বর্ণনা করেছেন। জানা যায়, ১৯০০ সালে ৭৮ বছরের বৃদ্ধ দুবরাজের বোনা বালুচরি শাড়ি, স্কার্ফ, টেবিল ক্লথ ও নামাবলি প্যারিসের বিশ্বমেলায় ‘ডিপ্লোমা অব অনার’ ও স্বর্ণপদক লাভ করে। পরে ১৯০৬ সালে ৮৪ বছরের বৃদ্ধ বালুচরি শিল্পী দুবরাজ লন্ডনের বিশ্বমেলায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। দেওয়া হয় স্বর্ণপদক ও ‘সার্টিফিকেট অব অনার’। 

বালুচরি সিল্ক এক প্রকার রেশমের বয়ন, যার মধ্যে কারিগররা ভারতীয় পুরাণের কাহিনী বয়নের মাধ্যমে লিখেছেন। এই শিল্প সাম্প্রতিককালে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং কিছু ফরাসি জ্যাকার্ড ধরনের তাঁতের সাহায্যে পুনর্জাগরিত করা হয়েছে। বালুচরি, ব্যাঙ্গালোর ও পশ্চিমবঙ্গের দুই ধরনের রেশমের সুতো দিয়ে বোনা হয়। এক বিশেষ তাঁত যন্ত্রে রেশম বুননটি উল্লম্বভাবে নির্ধারণ করা হয় এবং অন্যটি অনুভূমিকভাবে নির্ধারণ হয়। একটি শাড়ি তৈরি করতে কারুশিল্পীদের অনেক প্রচেষ্টা লাগে। এই রেশমের সুতোগুলিকে বোনার আগে ফুটন্ত জলে ধুয়ে নেওয়া হয়। পরের দিন, গরম রঙের মধ্যে ডুবিয়ে এগুলোকে রঙ্গীন করা হয়। তারপর এই সুতোগুলোকে ঘূর্ণমান চাকায় ঘোরান হয়। প্রায় পাঁচ থেকে ছয় মাসের সংবদ্ধ প্রয়াস ও প্রতিভার সমন্বয়ে কঠোর পরিশ্রমের পর তৈরি হয় সুন্দর বালুচরি শাড়ি।

২০১৩ সালের দীপাবলির রাতে বালুচরি শাড়িতে সেজে পোর্ট অব স্পেনে প্রেসিডেন্টের বাসভবনের বারান্দায় এক-একটি করে দীপ জ্বালিয়েছেন ত্রিনিদাদের ফার্স্ট লেডি ভারতীয় বংশোদ্ভূত ৪২ বছরের প্রেসিডেন্ট-পতœী রিমা হরিসিংহ কারমোনা। বিশ্ব মিডিয়াতে ফার্স্ট লেডির সে ছবির কারণে বালুচরি যেন নতুন করে জনপ্রিয়তা পেতে মুরু করে। 

প্রসঙ্গত বলে রাখি, বালুচরির আরেক নাম স্বর্ণচরি। রঙিন সিল্ক সুতোর পরিবর্তে স্বর্ণচরিতে সোনালি সিল্ক সুতো দিয়ে কাজ তোলা হয় বলেই এই নাম। আগে বালুচরিতে পুরো শাড়ি জুড়ে রামায়ণ/মহাভারতের গল্প থাকতো। আর পুরোটাই যেহেতু হাতে বোনা এর দাম হতো অনেক বেশি। দাম সাধ্যের মধ্যে রাখতেই এখন শুধু আাঁচলে কাজ থাকে। টরন্টোতে বালুচরি বা স্বর্ণচরি দেখতে শাড়ি হাউস যে শ্রেষ্ঠ আশ্রয় সে কথা প্রবাসী বাঙালি মাত্রই ভালো করে জানেন।  বালুচরি শাড়িতে পুরাণকথা
বালুচরি শাড়িতে পুরাণকথা

 

১৫ জুলাই, ২০১৬ ০৯:২০:৪৪