বঙ্গসাহিত্যে শ্রেষ্ঠ ট্রিলজির স্রষ্টাকে মৃত্যুদিবসে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি
সুবীর বণিক
অ+ অ-প্রিন্ট
আশাপূর্ণা দেবী
" মোদের গরব, মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা !

তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি-ভালোবাসা ।

বাজিয়ে রবি তোমার বীণে, আনল মালা জগৎ জিনে !

তোমার চরণ-তীর্থে আজি জগৎ করে যাওয়া-আসা ।

ওই ভাষাতেই প্রথম বোলে , ডাকনু মায়ে ' মা, মা ' বলে ;

ওই ভাষাতেই বলব হরি, সাঙ্গ হলে কাঁদা-হাসা ! "

বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ট্রিলজির রচিয়তা এবং বিংশ শতকের অন্যতম সেরা লেখিকা আশাপূর্ণা দেবী ছিলেন ঔপন্যাসিক , ছোটগল্পকার ও শিশু সাহিত্যিক।'' ট্রিলজি '' শব্দটির অর্থ হল তিনটি সাহিত্যের একত্রে সংযুক্তীকরণ। আশাপূর্ণা দেবী বাংলা ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষা জানতেন না , তার চেয়ে বলা ভালো তিনি বাংলা ব্যতীত অন্য কোন ভাষা শেখার চেষ্টাই করেন নি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি এই মহান লেখিকার কতখানি টান ও ভালোবাসা ছিল তার মূল্যায়ন করার জন্যই আমি অতুল প্রসাদ সেনের " বঙ্গভাষা " নামক কবিতার কয়েকটি লাইন উপরে উদ্ধৃত করেছি। এই মহান লেখিকা ১৯৯৫ সালে আজকের দিনে কলকাতা শহরের উপকন্ঠে অবস্থিত গড়িয়া অঞ্চলে কানুনগো পার্কের বাসভবনে প্রয়াত হন। আশাপূর্ণা দেবী ১৯০৯ সালে জানুয়ারি মাসের 8 তারিখে বর্তমান ভারতবর্ষের কলকাতা শহরের অন্তর্গত পটলডাঙ্গা অঞ্চলে মাতুলালয়ে এক রক্ষনশীল পরিবারে ভূমিষ্ঠ হন। আশাপূর্ণা দেবীর পিতার নাম ছিল হরেন্দ্রনাথ গুপ্ত , ইনি পেশায় ছিলেন একজন চিত্রকর এবং মাতার নাম ছিল সরলাসুন্দরী দেবী , ইনি ছিলেন একনিষ্ঠ সাহিত্য-পাঠিকা। হরেন্দ্রনাথ গুপ্তের তিন মেয়ে মধ্যে আশাপূর্ণা দেবী ছিলেন মেজো , বড়ো মেয়ের নাম হল রত্নমালা দেবী এবং ছোট মেয়ের নাম হল সম্পূর্ণা দেবী। আশাপূর্ণা দেবীর পৈতৃক নিবাস ছিল হুগলি জেলার বেগমপুরে কিন্তু বাস্তবে এই অঞ্চলের সাথে আশাপূর্ণা দেবীর কোন প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল না। এই মহান লেখিকার শৈশব কেটেছে ঠাকুমা নিস্তারিনী দেবীর পাঁচ পুত্রের একান্নবর্তী পরিবারে। পরবর্তী সময়ে আশাপূর্ণা দেবীর পিতা হরেন্দ্রনাথ যখন আপার সার্কুলার রোডে ( বর্তমানে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় রোড ) নিজের বাসভবনে উঠে আসেন তখন আশাপূর্ণা দেবীর বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। কিন্তু ঠাকুমার নিকটে থাকাকালীন শৈশবের কয়েকটি বছর এই বিখ্যাত লেখিকার জীবনে চিহ্ন রেখে যায়। আশাপূর্ণা দেবীর মাতা সরলাসুন্দরী সাহিত্য-পাঠিকা ছিলেন বলে বাংলা সাহিত্যপ্রীতি তার তিন কন্যা-সন্তানের মধ্যে সঞ্চারিত করতে খুবই চেষ্টা করেছিলেন। এই বিখ্যাত লেখিকার পরিবার রক্ষনশীল ছিল বলে তার কখনও স্কুল-কলেজের শিক্ষা লাভের সৌভাগ্য হয় নি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও সাহিত্যের আবহে বেড়ে উঠেছিলেন বলে তিনি মাত্র তেরো বছর বয়সে গল্প ও কবিতা রচনা করে বাংলা সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশ করেন। তার রচনা প্রথম " শিশুসাথী " পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পনেরো বছর বয়সে এই স্বণামধন্য লেখিকার সরকারী বড়ো অফিসার কালিদাস গুপ্তের সাথে বিবাহ হয় এবং স্বামীর উৎসাহে ও অনুপ্রেরনায় তিনি সাহিত্যচর্চা করতে থাকেন। এই স্বণামধন্য লেখিকা দায়িত্ব সহকারে সংসারও করেছেন এবং অবসর সময়ে পাঠককুলকে অনবদ্য সাহিত্য উপহার দিয়েছেন।এই প্রথিতযশা লেখিকা অন্তঃপুরে থেকেও মেয়েদের বহির্মুখী জীবন খুবই দক্ষতার সাথে নিজের সাহিত্যগুলিতে রূপায়িত করেছেন। তার রচিত সাহিত্যগুলির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল সমগ্র নারীপুরুষের চাওয়া-পাওয়া, মানসিক দ্বন্দ-সংঘাত, প্রেম-বিরহ এবং সমসাময়িক সামাজিক পটভুমি। এই খ্যাতনামা লেখিকা খুবই সহজ, স্বচ্ছ ও সাবলীল ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছিলেন বলে তিনি পাঠকসমাজে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। আশাপূর্ণা দেবী দীর্ঘ সত্তর বছরের সাহিত্যজীবনে উপন্যাস , ছোটগল্প ও শিশুসাহিত্য মিলিয়ে দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তার রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হল -- ছোট ঠাকুরদার কাশী যাত্রা, প্রেম ও প্রয়োজন, প্রথম প্রতিশ্রুতি, সুবর্ণলতা , বকুলকথা , নিলয়-নিবাস , দিব্যহাসিনীর দিনলিপি , সিড়ি ভাঙ্গা অঙ্ক, বালুচরী, দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে, এই তো সেদিন, লীলা চিরন্তন, অগ্নিপরীক্ষা, চশমা পাল্টে যায় প্রভৃতি। এই খ্যাতনামা লেখিকা " ছোট ঠাকুরদার কাশী যাত্রা " নামক গ্রন্থটি শিশুদের জন্য রচনা করেন। এই গ্রন্থটি তার প্রথম গ্রন্থ যা ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয়। আশাপূর্ণা দেবীর প্রাপ্তবয়স্কের রচিত প্রথম উপন্যাস " প্রেম ও প্রয়োজন " ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত হয় এবং এই উপন্যাসটি সর্বপ্রথম এই লেখিকাকে বিপুল জনপ্রিয়তা প্রদান করে। বাংলা ভাষায় শ্রেষ্ঠ ট্রিলজি রচনা করার জন্য বঙ্গসাহিত্যের শিলালিপিতে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এই ট্রিলজিতে আছে -- প্রথম প্রতিশ্রুতি , সুবর্ণলতা ও বকুলকথা নামক তিনটি কালজয়ী উপন্যাস। " প্রথম প্রতিশ্রুতি " উপন্যাস রচনা করার জন্য ১৯৭৮ সালে দেশের সর্বোচ্চ " জ্ঞানপীঠ " পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া এই প্রথিতযশা লেখিকার অনন্য সাহিত্যকীর্তির জন্য এই লেখিকাকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যের সর্বোচ্চ " রবীন্দ্র পুরস্কার ," ভারত সরকার " সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার " এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলি " ডি-লিট " উপাধিতে ভূষিত করে।

১৪ জুলাই, ২০১৬ ০৭:৪৪:১২