'কলম' যখন মনের কথা বলে
মুন সিনহা • বোলপুর (ভারত)
অ+ অ-প্রিন্ট
কলকাতা শহরের বুকে মাত্র কয়েকমাস আগে জন্ম নেওয়া একটি সাহিত্য পত্রিকা। প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা সবে প্রকাশ পেয়েছে। টলমল পায়ে হেঁটে চলা একটি ছোট্ট শিশুর মতোই কলম পত্রিকা। এক সাংবাদিক বন্ধুর সহযোগিতায় হাতে পেলাম পত্রিকাটি। এতবড় একটি পত্রিকা মাত্র কয়েকদিনে পড়ে সমালোচনা করা একলার পক্ষে অসম্ভব ছিল তাই অপর এক সাংবাদিক বন্ধু আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক ও সমালোচক কুশল চক্রবর্তীকে আহ্বান জানিয়েছিলাম। দু'জনে মিলে পড়ে ফেললাম পত্রিকাটি। প্রথমে পত্রিকাটি হাতে পেয়েই চমকে উঠেছিলাম। মাত্র কয়েকমাস আগে জন্ম তাতেই কভার পেজ এত চমৎকার। উৎসাহিত হয়ে ক্রমশ গভীরে যেতে থাকলাম। আহ্বায়ক  মহাশয় তাঁর কথায় স্পষ্ট ভাবে সকলকে এক ছাতার তলায় আসতে অনুরোধ করেছেন। তবে সম্পাদকীয় অনবদ্য। একটা খটকা রয়েই গেল পত্রিকাটিতে কোনও সূচীপত্র নেই। পত্রিকা মানেই সূচীপত্র আবশ্যিক। যাইহোক প্রথমেই চোখে পড়ল জয়ীতা ব্যানাজ্জী গোস্বামীর লেখা। লেখাটিতে অনবদ্য এক স্তর বিন্যাস সৃষ্টি করেছেন জয়ীতা। সুদেষ্না বন্ধ্যোপাধ্যায়ের লেখা ভাল। তবে বেশ লাগলো সুব্রত মন্ডলের 'সময়ের আর্তনাদ'। কবিতার মাঝের একটা লাইন বিশেষ কৃতিত্বের দাবী রাখে "তবুও স্বপ্ন বাসা বাঁধে সিকি, আধুলির শরীরে"। অঞ্জন দাসের লেখা কোনও ছাপ ফেলতে পারেনি। 'রবীন্দ্রনাথের প্রতি কাদম্বরী' লিখেছেন পৃথিবী কন্যা। লেখাটা চমৎকার এক ভাব সৃষ্টি করেছে| তবে পৃথিবী কন্যা নামেই স্পষ্ট যে এটা ছদ্মনাম| বেশ লাগলো নামটা| বৈশাখী রায়চৌধুরী বেশ লিখেছেন তাঁর কবিতায়। তিনি বলেছেন "মাঠে মাঠে ফসল ফলার গান, কবির কবিতায় যখন বেঁচে থাকে জীবনের কলতান"। অদিতি চক্রবর্তী লিখেছেন "ডুবকি দিলাম গহীন জলে, তোমার বুকে ছলাৎছলে"। সুন্দর ছন্দের অপরূপ কারুকার্য সৃষ্টি করেছেন অদিতি। স্বাতী বেরা প্রামানিকের 'ঠাকুরবাড়ির কবিগুরু বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ' বেশ লাগলো আমার। সত্যিই স্বাতী দেবী অন্তর থেকে কবিগুরুকে ভালোবেসেছেন ও খুব কাছ থেকে বিশ্বকবিকে দেখেছেন। সোমাদ্রী সাহার কবিতা কৃতিত্বের দাবী রাখে। বর্না অধিকারীর 'প্রেমের রবীন্দ্রনাথ' আলোকচিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। 'আশ্চর্য নৌকা ও কবি' নামক ছোট গল্পে লেখিকা এক মেয়ের অপরূপ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে মনিময় দত্তের 'লগ্নভ্রষ্টা' কিছুই মাথায় ঢুকলো না। 'রূপসী বাংলা' নামক কবিতায় কবি বেশ প্রতিফলন সৃষ্টি করেছেন। কুন্তলা চক্রবর্তীর কবিতা সুন্দর। ভাল লাগলো কথামালা পালের 'গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা'। কথামালা সত্যিই কথার মাধ্যমে মালা গেঁথেছেন তাঁর কবিতায়। আমার বিশেষ ভাল লাগলো ডাঃ অনুকূল চক্রবর্তীর লেখা 'বিচারসভা' নামক লেখাটি। একজন পত্রিকা সমালোচক এরকমই লেখা আশা করেন বলেই আমার মনে হয়। আমিও আশানুরূপ ভাবে অনুকূল বাবুর কবিতা পেয়েছি। স্নিগ্ধা চক্রবর্তী ও শিল্পী দত্তের লেখা বেশ মুগ্ধ করলো। 'অন্য বসন্ত ' বিশেষ আকারে সৃষ্টি করেছেন কবি পল্লব গোস্বামী। সুপম রায়ের 'আমি কে?' সত্যি মুগ্ধ করলো। "শরীরের সূচীপত্র থেকে শুরু......."। সুপম বেশ লিখেছেন। বিদিশা মন্ডলের 'মম রবি' সম্পর্কে একটু আলোচনা করা যাক| বিদিশা দেবী তাঁর লেখায় বলেছেন "আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা বলে জাগালে কি চেতনা, তুমি শেখালে মোরে ভালবাসা যে সুখেরই যাতনা"। বিদিশা দেবীর লেখাটাই এখনো পর্যন্ত কুশলদার আর আমার ভালো লেগেছে বেশি। পৃষ্ঠা উল্টেই নজর পড়ল অর্কায়ন বসুর 'দহনকাল' কবিতায়। "গাছেদের গা থেকে সবুজ সিম্ফনি কুড়িয়ে ফিরে যাচ্ছে ক্লোরোফিল -সালোকসংশ্লেষে....."। বেশ লাগল কবির কবিতাটি। সুপ্রতিম সিংহরায়ের 'রবির প্রতি' কুশলদার মনে বেশ ছাপ ফেলেছে। আহেলী দে 'অচেনা রবীন্দ্রজয়ন্তী'তে বিশ্বকবির মন ছুঁয়ে নিয়েছেন এটা চোখ বন্ধ করে বলা যায়। 'না বলা কথা' লিখেছেন অয়ন দাস।এমন কিছু কথা বলার ছিল আমারও। অয়ন বাবুকে একটাই কথা বলবো কিছু কথা ডায়েরীতেও রাখতে হয়। তাই এবিষয়ে হয়তো না ভাবাই ভাল| কাজরী বসু লিখেছেন 'ওরা তিনজন এবং রবীন্দ্রনাথ'। কাজরী  দেবী এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন লেখার মধ্যে। কাজরী দেবীর লেখা পড়ে ইতালিয়ান লেখক জেব্রি দি পাম্পের কথা মনে পড়ে গেল। জয়া গুহ 'পরকীয়া' নামক ছোট্ট গল্প বেশ সুন্দর লিখেছেন। 'আমার প্রেম ' গল্পে গল্পকার আদপে কি বোঝাতে চেয়েছেন তা পরিস্কার নয়| সুধাংশু চক্রবর্তীর 'জয়িতার জীবনের শেষ দিনগুলো' মনে দাগ কাটলো। নিবেদিতা বিশ্বাসের লেখা বেশ। 'শেষ ইচ্ছে' নামক গল্পে সৌম্যদীপ রায় বাবু এক ভাব বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছেন। মন্দিরা মিশ্র তাঁর লেখায় কবি ও নারী কে এক সারিতে বসিয়ে চমৎকার এক সৃষ্টি তুলে ধরেছেন। চন্দ্রানী বসুর 'মুঠো ফোনের ওপারে ' বেশ প্রভাব ফেলেছে কুশল দার মনে। তাহমিনা ছাত্তারের লেখা পড়ে মনে হল উনি জন্ম নিয়েছেন লেখার জন্যই। সৌমলেন্দু ঘোষের লেখা ভাল লাগল বেশি। 'রবির কাগজ ' লিখেছেন সিলভিয়া ঘোষ। সিলভিয়া দেবীর লেখায় মাঝখানে ছেড়ে আসা লেখাগুলোর যেন প্রাণ খুঁজে পেলাম। সুমনা পাল ভট্টাচার্য 'আত্মকথনে' অপরূপ এক সুপ্ত প্রেম জাগরিত করেছেন বলেই মনে হল। মধুপর্না নন্দীর 'কিশোরীর বেনীমাধব' সবচাইতে সেরা লেখা এই পত্রিকার এই সংখ্যায়। লেখিকা তাঁর লেখাটি সত্যিই মন থেকে লিখেছেন। পড়তে পড়তে যেন কোথায় হারিয়ে গেছিলাম। যখন হুঁশ ফিরল দেখলাম 'কিশোরীর বেনীমাধব' আর আমি এক পথে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পথ ভাগ করে নিচ্ছি। অনুভা ব্যানাজ্জীর 'তোর জন্য' লেখাটি বেশ। তবে পত্রিকার সম্পাদককে একটাই কথা বলবো কোনও বড় লেখার নিচে কখনো ছোট্ট লেখা দেওয়া উচিৎ নয়, তাতে তা পাঠকের নজর এড়িয়ে যায়। 'আমার রবি ঠাকুর' লিখেছেন রিমি দে। সুন্দর বললে হয়তো ভুল হবে রিমি দেবীর লেখা মনে ছাপ রেখে গেল। তবে লেখার শেষে বিঃদ্রঃ না দিলেই ভাল। পাঠক যখন লেখা পড়বেন তখন তা তার নিজের বিচার অনুযায়ী হয়| তাই বিঃদ্রঃ দেওয়াটা ঠিকমতো গ্রহণীয় নয়। বনবীথির লেখা বেশ একটা কুণ্ডুলী আকার নিল মনে। 'আগুনে রং ' লিখেছেন অতীন্দ্রিয়া সেন| আলোচনা করলাম কুশল দার সঙ্গে অতীন্দ্রিয়ার লেখা নিয়ে। আমাদের বেশ লাগলো। অতীন্দ্রিয়া সেন কে বলবো আরো একটু নজর দিতে হবে লেখায়। স্নেহাশিস চক্রবর্তীর লেখা চিকচিকে বেশ। পিয়ালী বসু ঘোষের লেখা মনে ছাপ রাখলো। তবে বিশ্বরূপ ঘোষের লেখা ভাল লাগেনি আমাদের। তিনি আজকালকার চিত্র তুলে ধরেছেন ঠিকই কিন্তু সেটা অন্য ভাবেও তুলে ধরা যেতো বলেই আমার মনে হয়। "আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মঞ্চ থেকে আমি প্রথমা বলছি, প্লীজ আপনারা কেউ উঠে যাবেন না"- একবার নয় বারবার পড়লাম স্বপন সিনহাবাবুর কবিতাটি। পত্রিকার হয়তো এটাই সেরা প্রাপ্তি। বাকি লেখাগুলো তেমন ভাল লাগেনি। মিহির ঘোষের একই লেখা দুবার ছাপা হয়েছে। এটা অবশ্যই পত্রিকার সম্পাদকদের নজর রাখতে হবে। অতনু টিকাইৎ এর লেখা মনে ছাপ রাখলো। পত্রিকাটির প্রচ্ছদ অপরূপ। তবে পত্রিকাটির বানানের দিকে নজর দিতে হবে আরও। আশা রাখবো 'কলম' এগিয়ে যাবে অনেক অনেক পথ। কোনও বাধা কলমকে স্পর্শ করতে পারবে না বলেই মনে হয়। পত্রিকাটি সকলের কাছে সমাদৃত হবে এটা দৃঢ় বিশ্বাস একজন পত্রিকা সমালোচক হিসেবে।

 

০৯ জুন, ২০১৬ ২২:০৬:৩৬