'কলম' যেখানে থাকে না থেমে
বচ্চন গিরি • কলকাতা
অ+ অ-প্রিন্ট
রবিবারের উত্তর কলকাতা ছিল বেশ সরগরম। মেঘলা আকাশ| মাঝে মাঝে দু এক ফোঁটা বৃষ্টি| টানটান উত্তেজনা। গরমে ঘামছেন সবাই। সকলের মনেই প্রশ্ন কেমন হবে 'কলম' সাহিত্য পত্রিকার অনুষ্ঠান। সময় ক্রমশ এগিয়ে আসছে। ঘনঘন সিগারেটে টান দিচ্ছেন লাল পাঞ্জাবি পরিহিত এক ব্যাক্তি। নাম স্নেহাশিস চক্রবর্তী। 'কলম' সাহিত্য পত্রিকার প্রধান সম্পাদক তিনি। গত রবিবার ৫ জুন ছিল 'কলম' সাহিত্য পত্রিকার প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যার প্রকাশ অনুষ্ঠান। সময় যতো গড়িয়ে আসছে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে এদিন অনুষ্ঠানে একে একে আসতে শুরু করেছেন কবি ও সাহিত্যপ্রেমী মানুষেরা। সময় বিকেল ঠিক ৪টা বেজে০২ মিনিট। সকলের সমস্ত চিন্তায় কার্যত জল ঢেলে দিয়ে  অপেক্ষার অবসান ঘটালো 'কলম'। 'কলম' কথার অর্থ সৃষ্টির সোপান।| 'কলম' সাহিত্য পত্রিকাটির সৃষ্টির ইতিহাস ঘাটলেই তার ছবিটা পরিস্কার হয়ে উঠবে। কেমন ছিল সেই দিনটা যেদিন প্রথম জন্ম হয়েছিল কলমের। দিনটা ছিল ৯ জুলাই ২০১৫। বরানগরের বাসিন্দা পেশায় ঔষধ প্রস্তুতকারী সংস্থার বিপনন বিভাগের আধিকারিক বিশ্বরূপ ঘোষের মাথায় হটাৎ করেই একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের ভাবনার উৎপত্তি ঘটে।বিশ্বরূপ বাবু সম্পূর্ণভাবে সাহিত্য জগতের বাইরের মানুষ। বাংলা সাহিত্যে অবাধ পান্ডিত্যের অধিকারী তিনি নন।তবু কিছুটা বেখেয়ালেই একদিন সহধর্মিনী পিয়ালী ঘোষের সঙ্গে পরামর্শ করে ফেসবুকে 'কলম' নামক সাহিত্য গোষ্ঠীর সৃষ্টি করেন। বিশ্বরূপ বাবুর হাত ধরে সেই পথচলা শুরু

'কলমের'। মাত্র কয়েকমাসের মধ্যেই নবীন ও প্রবীণ সাহিত্য মনজ্ঞ মানুষদের কাছে 'কলম' হয়ে ওঠে মুক্তমঞ্চ।ধীরে ধীরে 'কলমের' প্রসার হচ্ছে বুঝতে পেরে ঘোষ দম্পতি সিদ্ধান্ত নেন 'কলমকে' সাহিত্যের একটি অনন্য

প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার। ঠিক এমন সময়ই শহর কলকাতার লেকটাউনের বাসিন্দা

স্নেহাশিস চক্রবর্তীর সঙ্গে

ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় হয় বিশ্বরূপ বাবুর সহধর্মিনী শ্রীমতি পিয়ালি ঘোষের। স্নেহাশিস বাবু

লেখালেখির জগতের মানুষ।কিন্তু প্রথমে নিজেদের ইচ্ছের কথা জানাতে কুন্ঠাবোধ করলেও পরবর্তী সময়ে তাঁদের ইচ্ছের কথা স্নেহাশিস বাবুকে জানান ঘোষ দম্পতি। স্নেহাশিস বাবুর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলোচনার পর 'কলমের'

দায়ভার স্নেহাশিস বাবুর হাতে অর্পণ করেন ঘোষ দম্পতি। এবং নিজেরাও 'কলমের' জন্য অক্লান্ত

পরিশ্রম করতে থাকেন।

স্নেহাশিস বাবুর হাতেই মূলত নবজন্ম পায় 'কলম'। স্নেহাশিস বাবুর প্রচেষ্টায় গত বছর ২৯ নভেম্বর বাংলা সাহিত্য জগতের বিশিষ্ট কবি শঙ্খ ঘোষের স্নেহধন্য লাভ করে শহর কলকাতার হেদুয়া অঞ্চলে 'ধর' ভিলাতে

'কলমের' প্রথম বর্ষ, প্রথম সংখ্যার আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করে এবং সেদিনের অনুষ্ঠান থেকেই 'কলম'

গোষ্ঠীর সদস্যরা সিদ্ধান্ত নেন 'কলম' শুধুমাত্র ফেসবুক নেটওয়ার্কিংএ আবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন সামাজের বিভিন্ন কাজে নিজেদের নিয়োজিত করবে| এবার সেই 'কলম' সাহিত্য পত্রিকার প্রথম বর্ষ,দ্বিতীয় সংখ্যার অনুষ্ঠান হল উত্তর কলকাতার হেদুয়া অঞ্চলে ধর ভিলাতে। গমগম ভিড়ে বেশ মনমাতানো সাহিত্যের আসর। কেউ কবিতা পাঠ করলেন, কেউবা গল্প। এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট লেখিকা মন্দাক্রান্তা সেন| অনুষ্ঠানের শুরুতে উপস্থিত সকল ব্যাক্তিত্বদের বরণ করে নেন 'কলম' পত্রিকার সদস্যা কেয়া রায়, স্নিগ্ধা চক্রবর্তী, পিয়ালী বসু ঘোষরা। এদিন সৌম্যদীপ রায় পাঠ করেন তাঁর 'হ্যাকার' কবিতাটি, স্বপন সিনহাবাবু 'আমি প্রথমা বলছি' পাঠ করেন এছাড়াও কবিতা পাঠ করেন    পীযুষ কান্তি দাস ,প্রসুন ঘোষাল , অতনু নন্দী ,সুপম রায়, অঞ্জন চক্রবর্তী, সঞ্চিতা রায় চৌধুরী ,প্রীতি সুতার পাঠ করেন স্বরচিত একটি চিঠি। এদিন অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে পূর্ব প্রতিশ্রুতি মতো তিনজন দুঃস্থ ছাত্র-ছাত্রীর হাতে সারাবছরের পড়াশোনার খরচ তুলে দেওয়ার কথা থাকলেও গ্রহণকারীরা উপস্থিত না থাকায় সেই অর্থ এদিন তুলে দেওয়া যায়নি। এদিন পত্রিকার গ্রুপ বিষয়ক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় জয়ী সৌম্যদীপ রায়, জোৎস্না রহমান, অর্কায়ন বসু, চন্দ্রানী বসু, সঞ্চিতা রায়চৌধুরী, অজয় কুমার দত্তের হাতে পুরস্কার তুলে দেন বিশিষ্ট লেখিকা মন্দাক্রান্তা সেন| অনুষ্ঠান মঞ্চে মন্দাক্রান্তা সেনের হাতেই পত্রিকার সম্পাদক স্নেহাশিস বাবুর পুস্তক 'সোমেশ্বরীর এপার ওপার ', 'অষ্টাদশী', 'ত্রিধারা' এবং অন্যতম সদস্যা কেয়া রায়ের পুস্তক 'নৈবেদ্য', স্বপন সিনহাবাবুর 'পথের ঠিকানায় স্বনির্বাচিত শত কবিতা' , স্নেহাংশু বিকাশ দাসের 'একবিন্দু ইরাবতী' ছাড়াও প্রকাশিত হয় অনির্বান মজুমদারের গল্পগুচ্ছ 'দশ এ দশ'। কলমের ডাকে সাড়া দিয়ে এদিন নিবেদিতা বিশ্বাসের নেতৃত্বে নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর থেকে আগত  'ঐতিহ্য' সংস্থা অনুষ্ঠান মঞ্চে তাদের বিশেষ অনুষ্ঠান মঞ্চস্থ করেন। এবারের 'কলম' দ্বিতীয় সংখ্যায় মোট ১৫০ জনের কবিতা,অনুকবিতা,গল্প প্রকাশিত হয়েছে| ওপার বাংলা তথা বাংলাদেশের কবিদের কবিতাও স্থান পেয়েছে দ্বিতীয় সংখ্যায়। এদিন অনুষ্ঠান মঞ্চে স্বপন সিনহাবাবু স্বরচিত কবিতা 'আমি প্রথমা বলছি' পাঠ করতেই অনুষ্ঠান কক্ষ থমথমে হয়ে ওঠে। কবিতাটি সত্যিই চোখে জল এনে দিয়েছিল সকলের। সমগ্র অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করেন স্নিগ্ধা চক্রবর্তী। বেশ হৈ হুল্লোড় আর আনন্দের মধ্যে দিয়েই সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ শেষ হয় অনুষ্ঠান।

 

০৭ জুন, ২০১৬ ১৩:৫৭:৩৮