রাত আমার কাছে কবিতার অমোঘ প্রার্থনা
বিদ্যুৎ ভৌমিক
অ+ অ-প্রিন্ট
কী জানি, রাত শব্দটা আমার সেই বাল্যকালের সময়ের মধ্যে ঘুর 

পাক খায় এখনো ! এ যেন বহতা স্তব্ধতা, মুকুটহীন রাজার মত একা এবং নির্জন *** আমরা সবাই যখন পরিবার নিয়ে ঝিলবাগান নামক একটা জায়গায় থাকতাম, অর্থাৎ আমার ঠাকুরদার ভিটেতে, — সেই সময় প্রতিদিনের রাত গুলো আমার 

খুব চেনা হয়ে গিয়েছিল ! বাবা অনেক রাত করে অফিস থেকে 

বাসায় ফিরতেন ! আমি কিন্তু নির্ঘুম থাকতাম বাবা ফিরে আসা পর্যন্ত ! বাবার সাথে রাতের খাবার খেয়ে তারপর বাবার পাশে 

চুপটি করে ঘুমিয়ে পড়তাম ! এ যেন স্মৃতিময়তা, আমাকে ভীষণ 

ভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে ! ছোট বেলায় বাবার কাছে প্রচুর ভূতের 

গল্প শুনেছি, বাবা কিন্তু ওই সব গল্প নিজের মন থেকে বানিয়ে নিয়ে আমাকে এবং আমার দাদাকে শোনাতেন ! সেই গল্পগুলো —

এখনো আমার স্মৃতিপটে অক্ষয় ও অমর হয়ে আছে ! জীবনযাপনের পরিমণ্ডলে আমরা খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি ! আমার

কন্যা সন্তান বৃষ্টিকে কিন্তু আমি সেই সময়টুকু দেই না, যেটা সেই 

সময় আমার বাবা আমাকে দিতেন ! আমাকেও অনেক রাত করে 

বাসায় ফিরতে হয় ! বুঝতেই পারছেন মিডিয়ার জগতের মানুষদের কোনো হাসি - আনন্দ আছে, তার উপর যদি সেলিব্রিটি 

হই *** আর রক্ষে নেই ! মেপে মেপে পথ চলা আর কি ! এক সাথে 

এতগুলো জায়গায় লিখতে হয়, তার উপর টিভি চ্যানেল ও রেডিও - তো আছেই ! সভা - সমিতি, প্রফেশনাল স্টেজে কবিতা বলা, এই 

সব তো লেগেই থাকে আমার কপালে ! কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকের দশা দেখে আমার বাড়ির লোকজনের খুব মায়া হয় ! এতসব কাজ নিজেকে সামলাতে হয় ! আমার স্ত্রী জয়ীতা কিছুটা আমাকে

সাহায্য করে । 

                    ¤¤ সাতাশটা বছর শুধু যোগভ্রষ্ট একা নির্নিমেষ 

                           তিন হাত মাটি ছুঁতেই স্মৃতি পলাতক —

                           রাস্তার প্রবেশ পথে চৌখুপ্পি আমিও একজন 

                           ঘুমহীন নির্ঘুমে অথই নির্জন ****

                           বেশ ভালো সঞ্জীবনী অস্ফুট আঁধার 

                           সেখানে পুড়িয়ে ফিরি নিজের আকার 

                           কোথাকার পায়ের ধুলো আশির্বাদ ফিরিয়েছে 

                           ত্রিপাদ ভূমিতে — 

                           সমস্তক্ষণ নির্বাসনে মন ওড়ে বিড়ল আকাশে 

                           ওকি মৃত্যু ? না কি স্বপ্নের প্রত্যন্ত শিহরণ 

                           নবীন দর্পণে দোলে একুশভাগ সর্বনাশ এবং 

                           যোগভ্রষ্ট বিনাশ ! ¤¤

                           ( বিদ্যুৎ ভৌমিকের অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি থেকে ) 

আমার অনেক রাত পর্যন্ত মোবাইল খোলা থাকে । রাতেই সবার 

সাথে কথা হয় বলা যায় ! অনেকের কাছে এটা ডিসিপ্লিনেন মধ্যে 

পড়ে না ! আর আমি অনেকের সাথে নিজেকে মেলাই না ! আমার 

ভেতরে - গভীরে একা থাকার একটা অভ্যেস তৈরি হয়ে গেছে । 

এই একা হয়ে থাকাটা একজন কবি কাছে বিশেষ জরুরী । তানা 

হলে সৃষ্টি থেমে থাকে, তাই না ? 

একটা সত্যি কথা আপনাদের চুপিচুপি বলছি, এই রাতের বেলা 

আমার শ্রেষ্ঠ লেখাগুলো নির্বাচিত হয়েছে পাঠকবন্ধুদের কাছে ! 

তাই এই রাত অগোপন ছিল, আছে, থাকবে আমার কাছে ! কবিতা লেখার সময় এই রাত ! আমার এক সাংবাদিক বন্ধু যিনি 

সুদূর মালয়েশিয়া থাকেন, ও একবার ইন্ডিয়াতে এসে আমার বাসায় বসে বলেছিল ; রাত নাকি যৌবনের প্রতীক ! যার মধ্যে —

যৌনতা ও আদিরস ভরপুর থাকে ! " বন্ধুটির কথা শুনে আমি খুব 

বিচলিত হয়ে পড়েছিলাম সেই সময় ! 

                      ¤¤ একটি দিনের অভিযোগ আমাকে ছোঁয়, 

                              উল্কাপাতের গদ্য ভাঙার গল্প 

                               তোমাকে হয়নি বলা — তাই আমার ঠোঁট শব্দ 

                              এনেছে কুড়িয়ে, দেখি একটা কবিতা লিখতে 

                               নিশ্চয়তা পাওয়া যায় কি না ।

                               ওই রাত চাক্ষুষ, প্রত্যন্তে মেশার মতো অফুরান 

                               বাতাস রঙে সাদা **** যেখানে ব্রক্ষ্মনাদে 

                               জেগে ওঠে নীরবতার শাঁসালো শরীর 

                              সেই রাত সেতারে - সরোদে অন্ধ অচেতন 

                               মনের দর্পণে ভাসে মূর্তিমান নয়নের অবলা 

                               বিভ্রম ! ¤¤

                               ( বিদ্যুৎ ভৌমিকের কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া ) 

হিসেব করে সময় ধরে কবিতাকে নিয়ে বসা মানেই লেখাকে চুলোয় দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয় ! আমার রাত আমারই, যার 

ভাগ কারো সাথে করা যায় না । অগ্রজগণের এক সময় প্রচুর 

বকা বকি শুনতে হয়েছে এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকার কারণে ! 

এখন তাঁরাই বলেন আমি আমার কঠিন ও কঠোর পরিশ্রমের জন্য আজ বেশ কয়েকটা দেশে নাম কামিয়েছি ! এসব শুনতেও 

বেশ ভালো লাগে ! 

                               ¤¤ সেদিন থেকে 

                                       গোটা এক মাস বুকের মাঝখানটায় 

                                        গর্ত খুঁড়ে লুকিয়ে থেকেছি ।

                                        সন্দেহজনক যাঁরা এসেছিল ; 

                                        তাঁরাও নভশ্চর ****

                                        বাইরে প্রচুর রাত *** নীলাভ আকাশ 

                                         অথচ আমার পরমায়ুর থাকা না থাকার 

                                         অতলান্ত অনিশ্চয়তা ! ¤¤

                                        ( বিদ্যুৎ ভৌমিকের কাব্যগ্রন্থ থেকে ) 

রাত নিয়ে অনেকে অনেক কিছু লিখবেন, তাঁদের মনের গোপন কথা মেলে ধরবেন পাঠক মহলে ! তবে আমার রাত দিনের মধ্যেও 

সমান ভাবে চিন্তায় ও মননে সমাদৃত । এহেন আকণ্ঠ অন্ধকারে ডুবে যাওয়া একান্ত সঙ্গোপনে ! তবে একটা কথা বলতেই হয়, —

সারাদিনের মধ্যে রাতের বেলা সিগারেট ফোঁকাটা বেশি মাত্রায় 

হয় আমার ! বাড়িতে স্ত্রী জয়ীতা ও কন্যা বৃষ্টির কাছে খুব বকা - 

শুনতে হয় আমাকে ! 

                             ¤¤ এক বিছানায় রাত কেটেছে ; সেই বিছানায় 

                                     সকাল — এরই মধ্যে ব্যক্তিগত এই শরীরে 

                                     ঠান্ডা লাগে গরম লাগে ! 

                                     প্রথম থেকেই এক দেহেতে কান্না ওঠে হাসি 

                                     ওঠে, কম্প দিয়ে , —

                                     এই ঘরেতে সকাল - রাত্রি, আমার পাওয়া 

                                      দ্বিতীয় জগত ****

                                      কবিতা আমার একান্ত অনির্দিষ্ট নারী 

                                      সেই কারণে স্পর্ধাটুকু অফুরান অদেখায় 

                                      হাওয়া নির্জন , — আমার ঘরের আমার 

                                      কথা আমি শুনি মন বাড়িয়ে !!  ¤¤

                                ( বিদ্যুৎ ভৌমিকের - নির্বাচিত কবিতা থেকে ) 

সব শেষে বলি রাত মানেই যে সব - সময় অন্য কিছু, তা কিন্তু নয় ! 

আমার প্রতিদিনের রাত, যেন তারা খসা মধ্যগগনের শিমূল শাখা 

ও নির্বাসিত স্মৃতিগুলোকে উদ্ধার করার একমাত্র প্রয়াস ! আমার 

এই রাত অগোপন থাকলেও সম্পূর্ণ ভাবে মৌলিক ও আত্মগত 

স্বীকারোক্তি বলতে পারি । 

০১ জুন, ২০১৬ ২২:৫৮:৫৯