মৃত্যুর ফাঁদে
মৌসুমী প্রামাণিক
অ+ অ-প্রিন্ট
রাতের বেলা সমুদ্র নাকি ভয়ঙ্কর; সাধ্য নেই কারোর, যে একা একা বালিয়াড়িতে বসে রাতটা কাটিয়ে দেবে অনায়েসে। শ্মশানে একটা রাত কাটানো যেতে পারে ভয়ে বা নির্ভয়ে, তবুও সী-বীচে কদাচ নয়। আমি কিন্তু চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করলাম।
উইক-এণ্ডে বন্ধুদের সঙ্গে গোপালপুর বেড়াতে গিয়েছিলাম দিন তিনেকের জন্যে। গলা অবধি ড্রিংক করে তর্ক বাধল এই বিষয় নিয়েই।
“কার কত বুকের পাটা আছে দেখি...কাটাক একটা রাত সী-বীচে...” সুধন্য বলল।
“আমি যাব...পুরো রাত কাটাব সী-বীচে...” বলেই ফেললাম আমি; কিন্তু কেন, তা জানি না।
“দেখ ভাই, আজ কিন্তু ঘোর অমাবস্যার রাত...” অতীন বলে।
“অন্ধের কিবা রাত্রি কিইবা দিন...থুড়ি...কি অমাবস্যা কিইবা পূর্ণিমা?”
“মানেটা কি...?” সোমার চোখে প্রশ্ন। সোমা অতীনের বাগদত্তা হলেও আমাদের কমন ফ্রেণ্ড, ভাল বন্ধু।
“মানে আর কি? আমার তো কোন পিছু টান নেই তোদের মত...”
“তা বলে একা একা সারারাত। তার ওপর যেরকম পাওয়ার কাট চলছে সারাদিন ধরে...চল আমিও যাব তোর সঙ্গে...”
“না না। তোর যাওয়া হবে না। কতদিন বাদে তোকে একা পেয়েছি। আজ সারাটা রাত ধরে তোকে আদর করব।”
“যা! অসভ্য!”
“আরে কাউকে যেতে হবে না। ভয়-ডর কি আমার কোন কালে ছিল?”
“কিন্তু ভাই তোমার কিছু হলে আমাদের নিয়ে যেন টানাটানি না হয়...” সুজিত বলে। সুজিতটা চিরকালই স্বার্থপর, শুধু নিজের কথা ভাবে।
আমি অমনি একটা সাদা কাগজে খসখস করে লিখে সাইন করে দিলাম যে আমার মৃত্যুর জন্যে কেউ দায়ী নয়। মোবাইল ফোনটা সুইচ অফ করে ওদের কাছেই জমা রাখলাম। তারপর সিগারেটের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। হোটেল থেকে বীচ পনেরো মিনিটের রাস্তা। সমুদ্রের কাছে গিয়ে বসলাম। শুনশান বীচ; যতদূর চোখ যায়, কেউ কোথাও নেই, শুধু সাদা সাদা ফ্যানা নিয়ে ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে তো পড়ছেই। আকাশটা লাল হয়ে আছে; ভাদ্র মাস, তাই বোধহয় গুমড়ে আছ। সেই কারণেই সম্ভবত অমাবস্যার রাত হলেও একটা হালকা আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
কতক্ষন বসেছিলাম জানি না; হঠাৎ একটা কান্নার শব্দ ভেসে এল। শব্দটা অনুসরণ করে এগিয়ে গেলাম। দেখি পাথরের আড়ালে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় বসে রয়েছে একজোড়া কপোত-কপোতী। মেয়েটি কাঁদছিল। ছেলেটি কথা বলল, “ কেঁদো না সোনা, আর একটু পরেই তো আমরা এক হয়ে যাব, বলো? আর কেউ চাইলেও আমাদের আলাদা করতে পারবে না।”
“ কেন এমন হয় রাজা? হিন্দু- মুসলিমে এই ভেদাভেদ কি কোনদিনই মিটবে না?”
“জানি না। স্বাধীনতার এত বছর পরেও এই একটা ব্যাপারে আমরা পরাধীন...”
“এই বিশাল সমুদ্রের গভীরতায় আজ আমাদের পরাধীনতা ঘুচে যাবে চিরতরে...তাই না?”
বুঝলাম যে, ওরা সুইসাইড করার পরিকল্পনা করেছে। ভাবলাম, যাই ওদের বাধা দিই, কিন্তু বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে যাওয়ার আগেই ওরা দুজনে গভীর চুম্বনে আবদ্ধ করল; খোলা আকাশের নীচে, খোলা হাওয়ায় নগ্ন যৌনতার স্বাদ আস্বাদন করতে থাকল আর আমি ছিটকে সেখান থেকে সরে এলাম।
দুটি সবুজ, তরতাজা প্রাণের এমন ব্যাথাময় এণ্ডিং এর প্ল্যান আমাকেও ব্যাথিত করে তুলল। তাই পায়চারী করে মনটা হালকা করে নিতে চাইলাম। সমুদ্রের ধার দিয়ে হাঁটতে থাকলাম। ঢেউ এসে পা ভিজিয়ে দিয়ে যেতে থাকল। কতক্ষন হেঁটেছিলাম জানি না, ঝাউবনটার কাছাকাছি যেতেই দেখলাম দুটি ছায়ামূর্ত্তি নিজেদের মধ্যে কুস্তী লড়ছে।
সেকি? এত রাতে আখড়া খোলা আছে নাকি? আরো একটু কাছে যেতেই ওদের কথোপকথন কানে এল। ওদের আবছায়া দেখতেও পেলাম। একি? ওরা মারামারি করছে কেন?
“বল শালা, কত টাকা ঝেড়েছিস?”
“বিশ্বাস করো ঘোষদা, ঐ কমিশনটুকুই যা নিয়েছি...”
“আমাকে বোকাচোদা পেয়েছিস নাকি? কোম্পানী বন্ধ হয়ে যাওয়ার মাসে যে মালগুলো তোলা হয়েছিল, সেগুলো তো জমা পড়েনি...”
“আমি জানি না দাদা...”
“শালা মেরে তোকে পুঁতে ফেলব রে হারামজাদা! দশ কোটি টাকা কি কপ্পুরের মত উবে গেল নাকি? বল কোথায় সরিয়েছিস, বল...”
“আমাকে মারো আর যাই করো, ও টাকার হদিশ তুমি কি পাবে? সমীরদা মন্ত্রীর হাত দিয়ে সে টাকা বিদেশে পাচার করে দিয়েছে...”
“তোকে কে বলেছে...?”
“সবাই জানে। মালিক বেপাত্তা হওয়ার আগে থেকেই তো ওরা টাকা সরাচ্ছিল। অ্যাম্বুলেন্সে করে সারারাত ধরে টাকা পাচার করেছে।”
“আমায় আগে বলিসনি কেন?”
“ভয়ে। যদি চাকরী নিয়ে টানাটানি পড়ে যায়...”
“আর এখন তো চাকরীটাই আর থাকল না...কি করবি? সিবিআই তো কোম্পানীর ঝাঁপ বন্ধ করে দিয়েছে। আর কোনদিন ও কোম্পানী খুলবে না, দেখে নিস...”
“তবে আমার আর বেঁচে থেকে লাভ নেই। তুমি বরং আমায় মেরেই ফেল। তুমি না মারলেও কাস্টমারেরা আমায় মেরে তক্তা বানিয়ে ছাড়বে। ওদের সারা জীবনের পুঁজি ওরা বিশ্বাস করে আমার হাতে তুলে দিয়েছিল।”
“সে তো...আমিও ছাড়া পাব না। আর তাই তো হন্যে হয়ে ঘুরছি আসাম থেকে উড়িষ্যা, ত্রিপুরা সব জায়গায়...কোথাও থেকে যদি অন্ত্যতপক্ষে দু-তিন কোটি টাকার খোঁজ পেতাম, তাহলে অন্তত নিজের ও পরিবারের প্রাণটা বাঁচাতে পারতাম।”
বুঝলাম যে ওরা বন্ধ হয়ে যাওয়া কোন একটি চিট- ফাণ্ড কোম্পানীর এজেন্ট। সারা দেশে এরকম লক্ষ লক্ষ এজেন্টের মৃত্যুদশা চলছে শুধুমাত্র সরকারী ঔদাসীনতার কারণে। আমি আর নিজেকে নতুন করে সমস্যায় জড়াতে চাইলাম না, তাই উল্টো দিকে হাঁটা দিলাম।
কিছুদূর যেতেই এক ষাটোর্ধ্ধ মানুষের মুখোমুখি হলাম। “আপনি...?”
“আপনি এখানে, এত রাতে...জানেন না গভীর রাতে সী- বীচ খুব একটা সেফ প্লেস নয়?”
“আপনিও তো এসেছেন...?”
“আমার তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে...”
“তাতে কি? জীবনটা তো সকলের কাছেই প্রিয়?”
“হ্যাঁ। সেটা ছিল একদিন। আজ আর নয়।”
“কিরকম?”
“সারাটা জীবন নাটক, থিয়েটার, অভিনয় এইসব নিয়েই থেকেছি। নিজের প্যাশানকে প্রায়রিটি দিতে গিয়ে বাড়ী, পরিবার ত্যাগ করেছি। আমার প্রেমিকা আমায় ত্যাগ করেছে। সংসারে আবদ্ধ হতে মন চায়নি কোনদিন...। যখন ইচ্ছে হয়েছে, টাকা দিয়ে মায়াবী রাত কিনেছি। কিন্তু আজ বড় একা লাগে মোশাই...”
“সেটাই তো স্বাভাবিক...”
“কিন্তু কিছুই তো দিয়ে যেতে পারলাম না পরবর্তী প্রজন্মকে...মন-কষ্টে ভুগছি জানেন?”
“তাহলে এখন কি করবেন? সুইসাইড?”
“কি জানি...। সে যাক । আপনি তো তরুন, আপনি এসময়ে এখানে কেন? ব্যর্থ প্রেমিক?”
“না! প্রেম স্বার্থক করতেই এসেছি।”
“বুঝলাম না...”
“সমুদ্র-প্রেম স্বার্থক করতেই এখানে আসা । রাতের সমুদ্রকে দুচোখ ভরে দেখব বলে- নতুন করে পাব বলে...”
হঠাৎ মনে হল, কারা যেন আসছে। পাহারাদারের বাঁশীর শব্দ শোনা গেল। বৃদ্ধ বললেন,
“মনে হচ্ছে, কেউ আসছে...চলুন ঐ আড়ালটায় যাওয়া যাক। রাতের বেলা মোটেই নিরাপদ নয় জায়গাটা...”
ওনার কথামত আমরা কালভার্টের পেছনে গিয়ে বসে পড়লাম আর উঁকি মেরে দেখতে থাকলাম। দুজন খাঁকি পোষাক পরা কনস্ট্যাবল। একজনের বগলে লাঠি আর একজনের হাতে। একজন খৈনি ডলছে আর একজন বাঁশীতে ফুঁ দিচ্ছে।
“ইধারমে তো মালুম হোতা হ্যায়... কোই খাতড়া নাহি... চলো ঘর চলতে হ্যায়...শো-লেতে হ্যায় থোড়ী দের...” হাই তুলতে তুলতে বলে একজন। অন্যজন উত্তর করে, “ অ্যায়সে তো রাতমে লোগ ইধার আনে মে ডরতা হ্যায়...ফিরভী থোড়ী দের রুক যাতে হ্যায়...পিছলে সাল সিজনকে টাইম এক লাফড়া হুয়া থা...”
“ক্যায়সা...?”
“ষোলা সালকে এক লড়কীকা বলাৎকার হুয়া থা...রাত দেড় বাজে...তবসে ডিউটি চালু...”
“অ্যায়সা কেয়া...?”
“আউর নাহি তো কেয়া...?”
“লেকিন আভী তো অফ সিজন হ্যায়...টুরিস্ট ভী কম...”
“সো তো হ্যায়...চলো তব...থোড়ী দেড় আরাম করতে হ্যায়...”
ওরা চলে যেতেই আমরা কালভার্ট থেকে বেরিয়ে এলাম। বয়স্ক ভদ্রোলোকের সঙ্গে আবার বীচে গিয়ে বসলাম। অখণ্ড অবসর; শুধু ঢেউ গুনে যাওয়া। ‘আরে! এরম তো কথা ছিল না! কথা ছিল যে আমি একা একা সীবীচে রাত কাটাবো।’ মনে হতেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠলাম। বৃদ্ধের চোখ গভীর সমুদ্রের দিকে, তিনি আমায় খেয়াল করলেন না বা হয়তো চাইছিলেন যে আমি তাঁকে একা ছেড়ে দিই। আমি হাঁটতে হাঁটতে আরো অন্ধকারের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিলাম।
একটু পরেই ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করল। আমার কিন্তু বেশ লাগছিল। আমি একটা উঁচু বালিয়াড়িতে গিয়ে বসলাম। হাওয়া তার গতিবেগ বাড়াতেই থাকল। ‘উড়িয়ে নিয়ে যাবার প্ল্যান নাকি?’ ঝাউগাছগুলি নিজেদের মধ্যে ঘষাঘষি খেতে থাকে। মাছ ধরার লঞ্চগুলি, যাদের বিন্দু বিন্দু আলো দৃষ্টি আকর্ষন করছিল, তারাও দৃষ্টির অগোচরে চলে গেল। ‘আরে! ঢেউগুলোর উচ্চতা হঠাৎ করে বেড়ে গেল মনে হচ্ছে! কি কাণ্ড!’ হ্যাঁ। তাইতো কি বিশাল বিশাল উচ্চতার এক একটা ঢেউ আছড়ে পড়ছে বালিয়াড়িতে বিকট শব্দ করে।
ভরা কোটালের সময় এরকম হয় বলে শুনেছি, তা বলে এত বিভৎস! সত্যি। আমার প্রিয় সমুদ্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই কি ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করল! সমুদ্র ক্রমশঃ আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকল। এবার আমি সত্যি ভয় পেয়ে গেলাম। পায়ে পায়ে পিছিয়ে আসতে থাকলাম। না, এত ধীর পায়ে চললে হবে না। আমি দৌড়াতে শুরু করলাম। ক্রমে দেখলাম যে সেই বৃদ্ধ, যুবক-যুবতী, এজেন্টরা সকলেই দৌড়াচ্ছে, যে যদিকে পারছে; মৃত্যুভয়ে। ওরা তো মরতেই এসেছিল, তবে দৌড়াচ্ছে কেন?
আমি ওদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম। “তোমরা পালাচ্ছো যে! তোমরা তো মরতেই চেয়েছিলে?”
“হ্যাঁ, চেয়েছিলাম। কিন্তু তার জন্যে তো আমরা দায়ী নই। সমাজব্যবস্থা দায়ী...পরিবেশ পরিস্থিতি আমাদের বাধ্য করেছিল...” কেউ একজন বলল।
“ঠিক তাই...” অন্যরা বলল।
আমি বললাম, “তা হোক। এত ভাল সুযোগ কিন্তু আর পাবে না। সুযোগের সদ্ব্যবহার কর।”
“আর তুমি...?” ওদের মধ্যে একজন প্রশ্ন করল।
“আমি? আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। একমাত্র আমিই দায়ী।”
দেখতে দেখতে সকলে ঢেউয়ের আড়ালে চলে গেল। কন্সট্যাবল দুজনকে জলে হাবুডুবু খেতে দেখা গেল। সমুদ্র আমার পা ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যেতে থাকল। আমি বালির মধ্যে ওলোট পালট খেতে থাকলাম। পেটের নীচ থেকে বালির বোঝা কখনো আবার সরে সরে যেতে থাকল। আমি খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইলাম। আবার ডুবলাম। নোনা জল গলা দিয়ে পেটের দিকে নেমে যেতে থাকল। চোখ আপনা হতেই বুজে আসল।
যখন খুললাম, দেখলাম শুয়ে আছি সরকারী হাসপাতালের বেডে। বন্ধুরা আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। বিড়বিড় করতে থাকি, “ বাকীরা...?”
ওরা সমস্বরে বলে ওঠে, “ কারা...?”
নার্সরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল গত দুদিনে নাকি শতাধিক লোকের মৃত্যু হয়েছে সামুদ্রিক ঝড়ে। বুঝলাম, হয়তো তাদেরও সলিল সমাধি ঘটেছে। কিন্তু আমি বেঁচে গিয়েছি কারণ আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম। ঈশ্বরকে অসংখ্য ধন্যবাদ। ‘আমি বাঁচতে চাই। বাঁচার মত করে বাঁচতে চাই। ভয়কে জয় করে বাঁচতে চাই।’
০৯ মে, ২০১৬ ০৯:০২:১১