গল্প ০ এক কাপ জীবন
শন্দিপ
অ+ অ-প্রিন্ট
আমি নৈবেদ্য; বয়স চল্লিশ; বিবাহিত; ছোট সংসার; ক্যানিং ষ্টেশন থেকে একটু ভিতরে পৈত্রিক বাড়িতে থাকি। বাবা-মা গত হয়েছেন বছর চারেক হল। কলকাতার একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরী করি। 

সকাল দশটায় কার্ড পাঞ্চ করতে হয়, তাই রোজ ভোরে ঘুম থেকে ওঠার তাড়া। এককাপ চা খেয়ে বাজারে যাওয়ার তাড়া। “কই গো বাজারের থলিটা দাও...” “আজ একটু ফল এনো...আর ডাল...”

“সুমনা ফিরিস্তি রবিবার দিও...এখন সময় নেই...”

ফিরে এসে স্নান করে গোগ্রাসে দু'মুঠো গিলে ট্রেনে ওঠার তাড়া। ছোট বাচ্চাটার কারণে সুমনা রোজ সকালে বেশী কিছু বানাতেই পারে না। আর বাজারে ডাল, সবজী, মাছের দাম যা চড়া। অগত্যা কলমী শাকের ঝোল, উচ্ছে ভাজা আর আলু সেদ্ধ এই দিয়েই পেট ভরাতে হয়। এই খেয়েই ঢেকুর তুলতে তুলতে বেরিয়ে পড়া। 

 ভীড়ে ঠাসা ট্রেনে দু ঘন্টা ধরে রাজনীতির কচকচানি শুনতে শুনতে বিরক্ত লেগে যায়। ট্রেন থেকে নেমে রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে অফিসে ঢোকার তাড়ায় ধাক্কা দিতে দিতে, ধাক্কা খেতে খেতে এগিয়ে যাই। মাসে আবার তিনদিন লেট হলে একদিন ছুটি কাটা যায়। হাজার কাজের ফাঁকে বসের নজর কাড়তেই হবে। সামনেই প্রোমশনের লিস্ট বেরোবে। ‘ঠাকুর যেন আমার নামটা থাকে; তাহলে  পুঁচকেটার জন্মদিন ভাল করেই করা যাবে। আর এক-দু’দিনের জন্য বকখালি বা দীঘাতে যাওয়া যাবে।’

সুমনা রোজ মনে করে রুটি বা ভাত একটু তরকারী মিশিয়ে স্টিলের টিফিন কৌটায় ভরে দেয়। তাতেই দুপুরের খাওয়া। পনের মিনিট টিফিন টাইম পাওয়া সবদিন ভাগ্যে জুটবে সেটাও জোর দিয়ে বলা যায় না। সন্ধ্যে সাত’টার আগে বেরনো অসম্ভব। শনিবারে হাফ-ডে নামেই; বেরোতে বেরোতে সেই বিকাল চারটে। আটটার ট্রেনটা ধরতেই হবে; ঘরে ফেরার তাড়া। আর এখন গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়েছে মোবাইল ফোনটা। সকাল ন’টা থেকে রাত ন’টা পর্যন্ত ফোন। ছুটির পরেও ফোনে কাজ করতে হয়। কাস্টোমারদের ফোন, ক্লায়েন্টদের ফোন; কারোরই যেন তর সয় না। বছরে হাতে গোনা বারোটা ছুটি। তাও যেন দিতে গেলে মালিকের বুকের পাঁজর খসে পড়ে। এক কথায় অসম্ভব প্রেশার; কাজের আর তাই ব্লাড প্রেশারও ওঠা নামা হতেই থাকে।

ফেরার পথে ছোলা-বাদাম-মুড়ি বা পিঁয়াজি-বেগুনি কিনে খেতে খেতে চোখে পড়ে যায় দুরের ঐ কপোত-কপোতীকে। ঝাপসা স্মৃতিতে ভেসে ওঠে আমারও ‘পুরানো সেই দিনের কথা’, হায়! দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না...’

হঠাৎ মোবাইল ফোনের রিং টোন বেজে ওঠে। বড়বৌদির ফোন; ধরার সময় নেই ট্রেন আসছে; সেই আবার ট্রেন ধরার তাড়া। তাড়াতাড়ি না করলে বসার জায়গা পাওয়া যাবে না। সোনারপুরের পর একটু ফাঁকা হলে মোবাইলে মেসেজ করে দিলাম বড়বৌদিকে। “আমরা ভালো, তোমারা কেমন ? ছুটি পেলে যাব”। কতদিন দিন হল ওদের বাড়িতেই যাইনি। ভাইপোটা কেমন আছে কে জানে? একমাত্র শালা প্রায়ই ফোনে করে। নতুন ফ্ল্যাট কিনেছে। দেখতে ডাকে; কিন্তু যাব যাব করে যাওয়াই হয় নি।

কি যে করছি, আর কি না করছি; আর কিইবা আমাদের ভবিষ্যৎ সেটাই বুঝতে পারি না।  ভীড়ে ফাঁকা হতে জানালা দিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকে আসতেই চা-ওয়ালার কাছ থেকে এক কাপ চা কিনে গলাটা ভিজিয়ে নিতে থাকি। অদূরে আর পাঁচজন অফিস যাত্রী মনের সুখে তাস খেলছে। ওরা এত খুশি পায় কোথায়? কে জানে? ‘ছ্যা! চায়ে চিনিটা একটু বেশীই মনে হল। আজ নিয়ম ছাড়া হয়তো এক চামচ বেশী। কি আর হবে ! যেন কলের পুতুল হয়ে গেছি। দম দিয়ে অদৃষ্ট ছেড়ে দিয়েছে। জীবনটা যেন জীবনের কাছেই পূজার নৈবেদ্যের মতো হয়ে গেছে। পৃথিবীটা আজ ছোট হতে হতে যেন এক কাপ জীবন হয়ে গেছে!’ 

১৬ এপ্রিল, ২০১৬ ০৮:৩৪:২৮