একটা ভাল কবিতা পড়লে মন অনাস্বাদিত আনন্দে ভরে যায় : বিদ্যুৎ ভৌমিক
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক
সত্যি কথা বলতে কি, আমার কবিতা সম্পর্কে কিছু বলার বা নিজের কাব্যময় অনুভব নিয়ে বলতে বড়ই দ্বিধা জাগে। আসলে এই ব্যাপারটা অনেকটাই মায়াদর্পণ, অর্থাৎ ম্যাজিক রিয়ালিটি " বলা যেতে পারে। এই দর্পণে উকি দিয়ে দেখলে কত অলীক কিছু আমরা খুঁজে পাই। অক্ষরে অক্ষরে কতযে জড়ানো বিলাপ। তাই কবিতার প্রতি আভূমি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতেই হয়। কবিতা আমার নিজের প্রাত্যহিকতাকে 

তছনছ করে, চুরমার করে। সহজভাবে চলতে - চলতে কবিতা 

মানুষকে বেসামাল করে দেয়। একটা ভাল কবিতা পড়লে মন 

অনাস্বাদিত আনন্দে ভরে যায়। আমি মনে করি, এই ভালো লাগার একটা অদৃশ্য চাপা উত্তেজনা ও অস্বস্তি থাকে। তবে কি, আমি আদ্যোপান্ত ভাবে মনে করি — আমারা এই অস্বস্তি 

থেকে মুক্তি পেতে চাই না। একটা ভালো কবিতার জন্ম হয় আসলে মেধা ও আবেগের মিলিত রসায়ন থেকেই। শুধু আবেগ কবিতার সংহতিকে নষ্ট করে। আর মেধা নির্ভর কবিতা হৃদয়কে স্পর্শ করেনা। চেনা, জানা - দৃশ্য যিনি মৃদু উত্তেজনায় ফুটিয়ে তোলেন তাঁর কবিতায় থাকে আলোর কারুকাজ। আমি খুব সতর্ক থাকি যখন কলম নিয়ে বসি কিছু একটা লেখার জন্য। কবিতার জন্ম হয় না, আবির্ভাব হয় বলতে পারি । কবি অনেকটাই নিভৃতচারী, মনন ও তাঁর জীবনধর্মী চেতনাকে নিরন্তর লালন ও পালন করে আসছেন যুগ যুগ ধরে । তার ফল সরূপ শব্দের কারুকার্যখচিত ভাব - ভাবনায় গড়া কবিতার প্রকাশ হয়। আবার বলছি কবিতার জন্ম হয় না। আমি ৭০ - এর দশকের কিছু পর থেকে কবিতা লিখছি। আমি বিশ্বাস করি না, সত্যকে স্বরচিত সুন্দরের খামের ভেতর পুরে রাখতে চাই না। তবে রাখা বা না রাখার ব্যাপারে বিশ্বাস ~ অবিশ্বাসের দোলাচল, ঐতিহ্য ও সংস্কারের মান ভঞ্জন, বিষয় না বিন্যাস — মেধা না কেবল মনন — হৃদয়ে হৃদয় খোঁড়া — প্রবাহ জোড়া কেবলই একলা হতে থাকা, নিঃস্ব। একটা বিশেষ সত্যি কথা হল, — আমি মদ না ছুঁয়েও মাতাল। আসলে কি, যে নেশা আমি ৩০ /৩৫ বছর ধরে প্রতিনিয়ত করে চলেছি তার মায়াময় অনুভূতি আমি ছাড়া অন্য কেউ অনুধাবন করতে পারবে না। 

        কিছু - কিছু অপূর্ণতা ম্যাকডেভিড মহাশূন্য মনে হয় 

        সে জন্য দিকচিহ্ন মুছে অতীত স্মরণের পথে একা হেঁটে 

        যাওয়া *****

       পাগল বৃষ্টিরদল অবুঝ শিকারী, সেখানে বিচ্ছেদজ্বালায় 

       নির্জন হয়ে থাকে পূর্বপরিচয় ।

        এই রাত্রির কাছে নামহীন তারাগুলো নির্ঘুম বহুকাল 

       অনির্দিষ্ট এই পথে আমাকে ডেকেছে কত মহত নরক 

       সেখানে দগ্ধ হয়েছে গোপন সর্বনাশ, —

       এরপর মৃত্যুঘুম থেকে তুলে নিয়ে গেল অলিক সকাল ! 

               ( কবিতা —> নির্ঘুমের উপাখ্যান < থেকে ) 

নিজের সঙ্গে অহর্নিশ যুদ্ধ চলছে, কোথাও প্রত্যন্ত গভীরে আদিম ধর্মের ক্লেদ ও দেশ - বিভাজনের ঠান্ডা অথচ রাজনৈতিক দাঙ্গা।" উক্তিটি আমারই। আমার লেখক কিম্বা কবি জীবন ঐতিহাসিক কোনো ঘটনা নয় ; যা শুনে পাঠক সমাজ - এর কাছে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সংগ্রহ হয়ে দাঁড়াবে। কবিতা লিখছি, লিখে চলেছি নির্বিবাদে। একলা ঘরে অন্ধকারে — মনে মনে। অবিন্যস্ত ছড়ানো শব্দগুলোকে একটা সাদা পৃষ্ঠায় নীলকালিতে সাজিয়ে গুছিয়ে লিখি। বড় বেয়াড়া ব্যস্ততা আমার, একটা কবিতা লেখার সময় নানান ঝঞ্ঝাট এসে সম্মুখে দাঁড়ায়! যখন এই সব ভারসাম্যহীন ঝঞ্ঝাট দেখা দেয়, 

তখন কাগজ - কলম গুছিয়ে ভালো কিছু লেখা পড়ি। আমার কথা এখন অনেকেই জেনে গেছেন, টিভি চ্যানেলের এবং পত্র পত্রিকার দৌলতে। অনেক জায়গায় আমি সংবাদ শিরোনাম! 

এই কবিতার জন্য অনেকের কাছে আমি হিংসার কারণ। যানি না, আমি তো কোনো কবিকে হিংসে করিনা তবে তাঁরা কেনযে আমাকে হিংসে করে, — এটাই ভাবতে অবাক লাগে ! ভারত ও বাংলাদেশের পাঠকবন্ধুদের ভালোবাসা প্রতিদিনই পাচ্ছি। প্রচুর চিঠি, ফোন, এস. এম. এস, — এসব তো চলতেই থাকে নিত্যদিন । আমাকে নিয়ে অনেক জায়গায় নানান খেঁজুড়ে গল্প - টল্প ইদানিং হয় বা হচ্ছে। সেসব কানেও আসছে। আমি আমার কবিতার ব্যাপারে একনিষ্ঠ, তাই কোনো কমপ্রোমাইস্ করিনা ! নিজের নামটাকে বহন করা অত সহজ সাধ্য ব্যাপার নয়।  বন্ধু মহলটা আমার ভালোই। তাঁরা নানা ভাবে আমাকে উৎসাহ দেন। আমার কবিতার চাহিদা বরাবরই ভালো। আমার কাব্যগ্রন্থ ১ /কথা না রাখার কথা ২ /গাছ বৃষ্টি চোখের পাতা ভিজিয়ে ছিলো ৩ /নির্বাচিত কবিতা'র বাজারে বেশ কাটতি আছে। আমি মনে করি কেউ যদি তাঁর সৃষ্টির ভেতর নিজেকে ১০০ ভাগ দিয়ে দিতে পারেন, তাহলে তাঁর সাফল্য হবেই। কেন কবিতা প্রকাশিত হচ্ছে না, কিম্বা কোনো প্রকাশক তাঁকে পাত্তা দিচ্ছেন না, এসব দুঃশ্চিন্তা তাহলে আর হবে না। এইসব আমি কোনোদিন চিন্তায় আনিনি । লেখাটা মন - প্রাণ দিয়ে লিখি যাই। ফলের পেছনে দৌড়াইনি কোনোদিন। একটা কবিতা সৃষ্টি হবার আগে যত যন্ত্রণা, লেখা হয়ে যাবার পর অভ্যন্তরে প্লাবিত আনন্দ!  অনেকটা একটা শিশু জন্মের আগে এবং পরে যা ঘটনা ঘটে আমাদের মায়েদের। আমি একটা ঐতিহাসিক শহর হুগলি জেলার শ্রীরামপুরে থাকি। অর্থাৎ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। এখানে আমার অনেক কবি বন্ধুরা থাকেন, যাঁরা অহর্নিশ আদ্যোপান্ত ভাবে আমাকে কবি হয়ে ওঠার দুঃসাহস দিয়ে আসছেন দীর্ঘ ত্রিশবছর ধরে। এই পশ্চিমবঙ্গ এবং সুদূর বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর বেশির ভাগ পত্র পত্রিকা, বহু কাব্য সংকলন, এবং অগুন্তি কবিতা নির্ভর লিটল ম্যাগাজিনে দীর্ঘদিন ধরে লিখে চলেছি কবিতা, শুধু মাত্র কবিতা। আমি হাজার জায়গায় খাবলাই না। আমার প্রিয় কবির মধ্যে প্রথমেই রবীন্দ্রনাথ। তবে আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সকলেরই প্রিয়। জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে, বিনয় মজুমদার, — আমাকে ভীষণ ভাবে টানে। আপনারা সবাই জানেন, সুনীল দা অর্থাৎ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাকে কবিতার জগতে একটা ব্রেক দিয়েছেন। খুব স্নেহ করতেন আমাকে তিনি। এখনকার কবিদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাঁরা আমাকে অনুপ্রাণিত করেন। তাঁরা হলেন, — জয় গোস্বামী, সুবোধ সরকার, মৃদুল দাশগুপ্ত, অজিত বাইরী, শ্রীজাত *** এদের কবিতা ভীষণ ভাবে ভালো লাগে। সবশেষে বলি, — বাংলাদেশের পাঠকবন্ধুরা যাঁরা আমাকে কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক হিসাবে চিহ্নিত করেছেন তাঁদের প্রতি রইল আমার অতল মনের কবিতাময় শুভ কামনা ও এক সমুদ্র ভালোবাসা!

১৩ মার্চ, ২০১৬ ১৭:০১:১৯