গল্প ০ শেষের খেয়া
জয়া গুহ (তিস্তা)
অ+ অ-প্রিন্ট
ঘন কুয়াশার আদর মেখে, রাস্তায় প্রাতঃভ্রমনে বেরিয়েছিলাম আজ আর ও পাঁচটা দিনের মতই।
লাঠি এখন আমার অবলম্বন।নিজের পা দুটো আর দেহের বোঝা টানতে পারে না পুরোপুরি।
আর মন?? সে দায় তো কবেই চুকেবুকে গেছে।
এক দোলের দিনে বুকে ব্যথার ছুতোয় চিরজীবনের মতো আমার বুকে শেল বিঁধিয়ে তিনি টাটা করে হাঁটলেন।
হ্যাঁ এখন আমার সন্ধ্যা ঠিক ই কিন্তু তখন??
ভরা শ্রাবণের জোয়ার।
মাঝখান দিয়ে সময় হুহু করে বয়ে গেছে, মেয়ের বিয়ে দিয়ে এখন আমি ঝাড়া হাত পা। ভাগ্যিস স্কুলের চাকরি টা ছিল!!
একটা পাখি শিস দিয়ে উড়ে গেল, ভোরের হাওয়ায় মিঠেল ছোঁয়া।
একবার মনে হয় এই জীবনটা তো অন্যরকম হওয়ার কথা ছিল, মানে হতে ও তো পারত।
অফিসের পাট চুকিয়ে রেহান এখন মুক্ত সব ঝুটঝামেলার হাত থেকে, চিরকালই সে, পিছুটানহীন থাকার মধ্যে বাবা মা হারা ভাইপো ভাইঝি।
তারা এখন ঘোর সংসারি, নিতা স্টেটস এ আর শেখর অস্ট্রেলিয়ায় কর্মরত। চাকর হারু ই তার একমাত্র সহচর।
এবার রোজ নিয়মিত শরীর চর্চা, সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রনে রাখা, ছাদের ফুলগাছের পরিচর্যা আর দৈনিক ৫ টা সংবাদপত্র সারাদিনের রশদ যুগিয়ে দেয়।
একাকী মুহুর্ত প্রশ্নচিহ্ন হয় "জীবন টা তো অন্য রকম হতে ও পারত"।
ক্লাস নাইন থেকেই অভিন্নহৃদয় বন্ধু ছিল রেহান আর মেঘলা, দুজনের বাড়িতেও অবাধ যাতায়াত ছিল দুজনের। একজনের খুশীর ইদ আর একজনদের আনন্দের দুর্গাপূজা দুই পরিবারকেও একসাথে মিলিয়ে নিত।
এভাবেই কলেজ, ইউনিভার্সিটি র পালা শেষ হল। বন্ধুত্ব মোড় নিল প্রেমের পথে।
হঠাৎ এক বৃষ্টির সন্ধ্যায় খুব ঘনিষ্ঠ অবস্থায় মেঘলার দাদা আবিস্কার করল তাদের।
খুব জোরে বাজ পড়ল। অঝোরে বৃষ্টি। আকাশটা মনে হয় ভেঙ্গে পড়বে।
আজ মেঘলার বিয়ে।এক সরকারী চাকুরে ছেলের সাথে। বয়সে প্রায় ১৫ বছরের বড়।
"উফ পায়ের ব্যাথা টা এত কষ্ট দিচ্ছে", লেকের পাসে এসে বসে পড়তেই হল, মেঘলা কে, কচি ঘাসের ওপর।
"প্রায় ৫ পাক হাঁটা হয়ে গেল, নাঃ এবার একটু বসা যাক, পার্কের ঘাস গুলো বেশ নরম "বলেই ঝট করে বসে পড়ে রেহান।পাসে হাল্কা হলুদ শাড়ি তে কোনো এক ভদ্রমহিলা, একটু ইতস্তত লাগলো,কিন্তু বয়স এখন ৬০ এর কোঠায়, তাই ভাবনা গুলো প্রশ্রয় দিল না।
"চা,খাবেন নাকি মাসিমা?? চিনি কম ও পাবেন"
হ্যাঁ দাও তো এক কাপ বলে মুখ ফিরিয়ে চোখ ঝাপসা হয়ে এল,ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে কে বসে??
চুল গুলোয় পাক ধরেছে,মুখে প্রায় ২ দিনের কাঁচা পাকা দাড়ি।
ও...চা এদিকে এস একবার, বলেই চোখ আটকে যায় রেহানের হলুদ শাড়িতে,মুখে চোখে স্ট্রাগলের ছাপ, গায়ের রঙ টা পুড়ে তামাটে,চোখদুটো শুধু এক ই আছে, আগের মতো।
বাবা একটু হাত টা ধরবে?? পা টা জমে গেছে,উঠতে পারছি না,তার পর তোমার চা এর দাম নিও।
কেমন আছে ও?আজ কি আসবে?? বিয়ে করেছে?? যাই হোক আর ভেবে কি লাভ??
একটু হেঁটেই আজ ফিরে যাব,শরীর টা ম্যাজম্যাজ করছে।
"কেমন আছ??"গম্ভীর গলায় আচমকা শুনেই থ হয়ে গেলাম,অভ্যাস বসতঃ মুখ থেকে বেরিয়ে এল "ভাল"।
"চল ওই দিকে বসি,অবশ্য তোমার যদি আপত্তি না থাকে "বলেই পা বাড়াল রেহান।
"আপত্তি কি কোনদিন ছিল আমার?? " মনে মনে বলে ওকেই অনুসরণ করল আর এক ছায়া।
অতীতের কথা, গল্প সব চাপা ই থাকল,নিজেদের বর্তমানের কথা আর পুরানো বন্ধুরা কে কেমন আছে, এই সব বলেই শেষ হল সময়।
আজ কি হাল্কা নীল শাড়ী টা পোরবো?? সোনাই এ বছর পুজোতে দিল যেটা,ওর তো নীল রঙ খুব পছন্দের।
ধুর কি সব ছাইপাঁশ ভাবছি যে এই বয়সে আবার সাজগোজ!!
না ঘরে পড়ার আটপৌরে শাড়ি ই মর্রনিং ওয়াকের জন্য ভাল,লাঠি টা নিয়ে বেরিয়ে পড়া যাক।
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে চলা, পার্কের রাস্তায় আবার পরিচিত কন্ঠস্বর, "একটু আস্তে, কথা আছে কিছু"।
"২/৩ পাক এর বেশী আর পারিনা আমি, আর্থারাইটিসে খুব নাজেহাল অবস্থা"
বলেই ঘাসে ঢাকা অংশ টার দিলে পা বাড়ায় মেঘলা।।
৫/৬ মাস এভাবেই কাটে,মনে দুজন র ই এক শান্তির ছোঁয়া এসে লাগে, না প্রেম নয় একাকীত্ব থেকে মুক্তি র আস্বাদ।
পূজার ছুটি আর ইদের পরব ও এবার খুব কাছাকাছি। নীতা -শেখর এল ইদে আর সোহিনী ওরফে সোনাই তার স্বামীকে নিয়ে এল মায়ের কাছে পূজার ছুটি কাটাতে।
"এই সব কি শুনছি? রহিম চাচা বলছিলেন " তুমি নাকি এই বয়সে....বেস ঝাঁজের সাথে বলল শেখর,
বয়স থাকতে সাদী না করলে যা হয়,পুরাই মাথা নষ্ট দাদার সুরে সুর মিলিয়ে বলে উঠল নীতা, "রেহানের সামনে আকাশ ভেঙে পড়ে।
"মা তুমি নাকি তোমার পুরানো প্রেম আবার ঝালিয়ে নিচ্ছ?? উফ পারো বটে,"মণিকা আন্টি বলছিলেন, তাই জানলাম"
আধুনিকা মেয়ের কথায় শেল বাজে বুকে।
"আজ এর পর আমি আর পার্কে আসব না "রেহান বলল।
"হুম, বুঝলাম তুমি ও বুড়োবয়সে প্রেম করার অপরাধে কাঠগড়ার আসামী"
"কোনো ভুল করিনি আমরা, সেদিন ও না, আজও না"
"সেদিন যারা পৃথিবীতে এনেছিলেন,তাঁদের ঝণ শোধকরার জন্য পিছিয়ে এসেছিলাম।
কিন্তু আজ অসুস্থতার খবর পেয়ে যারা ফোনে দায়িত্ব সারে,বুড়ো মা, কাকু যাদের বোঝা, তাদের কাছে নিজেদের প্রমাণ করার কোনো দায় নেই আমাদের, বুঝলে??" এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে হাঁফাতে থাকে মেঘলা।
"সব কাগুজে দায়িত্ব শেষ,"
একটা আশ্রমকে দানপত্র করে দিলাম। রেহান খুশী ভরা মুখে বলল।
" আমি তো দাদার বাড়িতে ই থাকতাম। তাই ও বালাই আমার নেই" দীর্ঘশ্বাস ফেলল মেঘলা।
রাত ১০ টার ট্রেন, পরের দিন ভোরে ওরা কাঞ্চনজঙ্ঘা'র পায়ের নীচে যখন পৌঁছায় তখন বেলা গড়িয়ে এসেছে,
মেঘগুলো ওপর থেকে নামছে। ওরা হাত ধরে, এগিয়ে চলে। মেঘের সাথে ওদের ইচ্ছা, স্বপ্নগুলোও বুঝি নামতে থাকে ওই পাহাড়ের কোলে থাকা "শেষের খেয়া" নামের বৃদ্ধাশ্রমটির গায়ে...।
১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১০:৩৬:০২