গল্প ০ এক শহীদ আর দুই নারী
জয়া গুহ (তিস্তা)
অ+ অ-প্রিন্ট
হাওড়া স্টেশনে দাঁড়িয়ে একটানা ঘামছে রুমি। একে তো ভাদ্রের পচা গরম তায় আবার বাড়িতে মিথ্যা বলে অর্কর সাথে দীঘা ঘুরতে যাচ্ছে, টেনশনে হৃৎপিন্ডটা মনে হচ্ছে লাফিয়ে বেরিয়ে আসবে। অর্কটাও একেবারে যাচ্ছেতাই রকমের বাজে, এত দেরী করছে কেন কে জানে? ভাবতে ভাবতেই দেখে হন্তদন্ত হয়ে আসছে অর্ক মানে অর্কপ্রভ বসু। ভারতীয় সেনা বাহিনীর কমব্যাট ফোর্সে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনা অফিসার। 

' কি গো তোমার সেনা বাহিনীতে এই শেখায় নাকি? এতক্ষণ একলা দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়ের কাছে কত অস্বস্তিকর  তা তুমি কি বোঝ? একগাদা কৌতুহলী চোখ।" প্রায় কেঁদে ফেলে রুমি। ছয় ফুট এক ইঞ্চি লম্বা শরীর টাকে অল্প নামিয়ে রুমির কানের কাছে মুখ নিয়ে অর্ক বলে ' ক্ষমা চাইছি জাঁহাপনা'। অর্কর বলার ভঙ্গিতে হাসি পেয়ে যায় রুমির।

'চল, তুমি একটা যাচ্ছেতাই, তোমার ওপর রাগ করাই মুশকিল', কপট রাগে বলে রুমি।

কাণ্ডারি এক্সপ্রেস এ উঠে এ.সি জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল রুমি। অর্কর সাথে বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক হয়েছে রুমির। রুমিকে দেখেই অর্কর মা,বাবার পছন্দ হয়ে যায়। রূপসী বলতে যা বোঝায় রুমি তাই। তবু সারাজীবন সঙ্গী হবার  আগে দেখে নিতে চায় দুজন কে দুজনের কেমন লাগে? তাই দুবছর সময় চেয়েছিল দুজনেই। প্রায় দেড় বছর কেটে যাবার পর দুজনেই বুঝেছে যে তাদের আরও অনেক আগেই দেখা হলে বোধহয় আরো ভাল হত। এই বেড়াতে যাবার প্রস্তাবটা প্রথম অর্কই দেয়। রুমি কোনভাবেই রাজি হচ্ছিল না। বলছিল 'আমি বাড়িতে কি বলব? '

বুদ্ধিটা অর্কই দিল, বলল যে " বাড়িতে বল এম.এ প্রোজেক্ট ওয়ার্ক এর জন্য ইউনিভারসিটি থেকে ট্যুর এ যাবে।" 

' কিন্তু যদি জানাজানি হয়ে যায়?' 

'একান্ত যদি জানাজানি হয় তো হবে, বিয়ে তো আমরা করবই।"

' কিন্তু মা বাবা কষ্ট পাবে' বলেছিল রুমি।

' আরে একটু রিস্ক নাও না, তাহলে বেশ বাড়ি থেকে পালাচ্ছি এমন একটা ফিলিং হবে,দারুণ হবে কিন্তু।'

শেষমেশ রাজি হয়ে যায় রুমি। তারপরেই আজকের এই যাত্রা। দুদিন কাটিয়ে পরশু ফিরবে। এজন্য রুমির দুই বন্ধুকেও বলা আছে,যদি বাড়ি থেকে ফোন করে তো ম্যানেজ করতে।

দীঘায় গিয়ে বেশ দামী একটা হোটেল ভাড়া নিল অর্ক। রিলেশন লিখল ওয়াইফ। দেখে বেশ মজা পেল রুমি। হোটেলের ঘরে ঢুকে বলল  'বাহ্ বেশ মজা বিয়ের আগেই বৌ। যাক সে ভালই করেছ কিন্তু আর কিছু ভেব না তাহলে কিন্তু কপালে মার আছে। আর এমন চিৎকার করব, যে সেনাপতির হাজতবাস অনিবার্য।' বিকেল হয়ে এসেছিল। দুজনেই পোশাক পরিবর্তন করে সি-বিচে হাঁটতে বেরল। হটাৎ রুমি বলে 'এই আমাদের পাড়ার কাকু কাকিমা।'

' তুমি ভেলপুরি ওয়ালার পেছনে যাও। আমি তোমায় গার্ড করে দাঁড়াচ্ছি।' অর্ক বলল। কাকিমারা হেঁটে ওদের পেরিয়ে গেলেন একবার তাকালেনও না। খানিক পরে রুমি বেরিয়ে এল ' যাক বাবা দেখেনি অন্তত।'

রাতে রুম সার্ভিস ঘরে খাবার দিয়ে গেল।

খাবার পাট মিটে গেলে অর্ক বলল 'একটা কিস্, ছোট্ট করে'।

'না রাতে বেশি খেতে নেই বদ হজম হয়।'

প্লিজ প্লিজ বলে দুবার অনুরোধ করল অর্ক, তারপর বিফল হয়ে টিভি চালিয়ে বসল। হটাৎ চুলে টান লাগাতে মুখ ঘুরিয়েই টের পেল তার ঠোঁট দুটো রুমি ঠোঁটের খুব কাছে। অর্কর দীর্ঘ শরীর এবার হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিল রুমিকে। রুমির কোন বাধাই আর গ্রাহ্য করল না অর্ক। রুমির ওড়নাটা দিয়ে রুমির হাত দুটো পেছনে বেঁধে দিল অর্ক, একটানে খুলে দিল চূড়ো করে বাঁধা চুল, আর রুমি? হাত বাঁধা অবস্থায় এলিয়ে পড়ল অর্কর বুকে, তার লম্বা খোলাচুলে ঢেকে গেল ছয়ফুট লম্বা অর্কর  সুঠাম শরীরটা। আদিমতম পাপ......

সকালে ঘুম উঠে রুমি গুম হয়ে চুপ করে বসে রইল।  অর্ক বলল 'চল বাড়ি, চিন্তা নেই এই অঘ্রানেই  বিয়ে করব। প্লিজ প্লিজ  গোমড়া মুখে থেক না, এই দিনটা আর ফিরে আসবে না।'

সন্ধেবেলা থেকে বারবার টিভি তে খবরটা দেখাচ্ছে। রুমির মা, বাবা ভয়ানক আপসেট তবু রুমিকে সান্তনা দেবার চেষ্টা করছেন। ঘটনার আকস্মিকতায় পাথর হয়ে গেছে রুমি। টিভি বারবার দেখাচ্ছে ৪নং রেজিমেন্টের সেনাছাউনি তে জঙ্গি আক্রমণ। প্রায় ১০ ঘন্টা গুলির লড়াই চালানোর পর জঙ্গিদের কোনঠাসা করা গেছে। আর হয়ত এক দুদিন লাগবে জঙ্গিদের ধরতে।এই গুলির লড়াইতে প্রাণ হারিয়েছেন রেজিমেন্টএর দুজন জওয়ান এবং এক বাঙালী সেনা অফিসার।

দীঘা থেকে চলে আসার পরদিনই অর্ককে জরুরী তলবে তার অফিসে রিপোর্ট করতে হয়েছিল। দুই বাড়ি থেকেই ঠিক ছিল এই মাঘেই বিয়ে হবে। সেইমত সব প্রস্তুতিও চলছিল। পরশু রাতে whatsapp করেছিল রুমি সে মা হতে চলেছে, এবার অর্ককে ছেড়ে থাকতে তার আর কষ্ট হবে না, কারণ সে তো ছোট্ট অর্ককে নিয়ে তখন ব্যস্ত থাকবে।কোন উত্তর আসে নি।

রুমি আজ আর আর ঠিক কাঁদতে পারছে না। সবাই কি সব বলছে, শব্দগুলো কানে আসছে কিন্তু যেন কোনটার অর্থই সে বুঝতে পারছে না। দুবার গা গুলিয়ে বমি করল সে। সব ভাব, ভাবনা, বোধের উর্দ্ধে এক নির্বাক জগতের মধ্যে ঢুকে পড়েছে সে। কাউকে তার কিছু বলার নেই, আর কারুর থেকে কিছু শোনারও নেই। আরো দুদিন পর ছফুট এক ইঞ্চি লম্বা দেহ টা পতাকায় মুড়ে বাড়ীর উঠানে এল। মাথার কাছে বসে আর এক নারী, প্রায় বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত, ছেলের কপালে নিজের কপাল রেখে অঝোরে কাঁদছেন। রুমি শ্লথ পায়ে এগিয়ে গেল শহীদের দেহের কাছে। বুকের কাছটায় হাত বুলিয়ে ক্ষত টা অনুভব করতে চাইল, এই জামাটা পরেই ও দীঘায় গেছিল। হয়ত খুঁজলে আজও জামার বোতামে ক্ষত চিহ্নগুলোর পাশে অন্তত একটা লম্বা চুল অক্ষত পাওয়া যাবে। সবাই অর্কর মাকে ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে বারান্দায় বসিয়ে দিল। এবার গান স্যালুট হবে। রুমি অর্কর ঠোটে শেষ চুম্বনটা এঁকে দিল। কানের কাছে মুখ নিয়ে অস্ফুটে বলল কেউ জানে না তুমি ছোট্ট হয়ে বাড়ছ আমার শরীরে। আস্তে আস্তে রুমি উঠে অর্কর মার পা এর কাছে বসে কোলে মাথা রাখল। এক অকস্মাৎ দুর্ঘটনা যেন দুটি নারী কে এক বিন্দুতে নিয়ে এল। রুমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে শাশুড়ি কে বলল 'মা দেশ তোমার ছেলেকে হয়ত পরমবীর চক্র দেবে,গান স্যালুট দেবে,শহীদের মর্যাদা দেবে কিন্তু মা আমরাও কি শহীদ নই? দেশ কি আমাদের মনে রাখবে?'

অর্কর মা খুব আস্তে আস্তে বললেন  'আমাদের সন্তান রা সীমান্তে দাঁড়িয়ে মোকাবিলা করে বলেই তো সারা ভারত নিশ্চিন্তে রাতে ঘুমোতে যায়। নিজের সন্তান যখন নিথর হয়ে ফেরে তখন  কি মনে হয় জানিস?  আমি যদি দুহাত ছড়িয়ে ছেলের সামনে দাঁড়াতাম বর্ম হয়ে, তবে তো বুলেট ছুঁতেই পারত না।  কিন্তু তা তো হবার নয়, তাই হে ভগবান আমায় এই শোক সহ্য করার অসীম শক্তি দাও,আমার একটা বুক শুন্য হলেও আর দশটা মায়ের কোল তো শুন্য হবে না'।রুমি তলপেটটা হাত দিয়ে চেপে অনুভব করতে চাইল, একটা মৃদু কম্পন, অস্ফুটে ওর মুখ থেকে বেরিয়ে এল 'মা.......'।

(সম্পূর্ণ কাল্পনিক। শহীদদের স্মৃতিতে এবং ভারতমাতাদের প্রতি অকৃত্তিম শ্রদ্ধায় নিবেদিত।)

১১ জানুয়ারি, ২০১৬ ১২:৪৯:১৬