রমজানকে স্বাগত জানিয়ে নবীজির ভাষণ
মাহবুবুর রহমান নোমানি
অ+ অ-প্রিন্ট
এ ছোট্ট আমলটি করে অশেষ নেকি অর্জনের অবারিত সুযোগ রয়েছে। বিশাল পার্টি করে ইফতার করানো জরুরি নয়। বরং সামর্থ্য অনুযায়ী যা দিয়ে রোজাদারকে ইফতার করানো হবে 

আল্লাহ তায়ালা এর বিনিময়ে তাকে রোজাদারের সমান সোয়াব 

দান করবেন এবং এই ইফতার তার মাগফিরাত ও পরকালে জাহান্নাম থেমে মুক্তিলাভের উসিলা হবেরহমত, মাগফিরাত, নাজাতের সওগাত নিয়ে পবিত্র মাহে রমজান শুরু হতে যাচ্ছে। বেহেশতি মেহমানকে স্বাগত জানাতে আকুল হয়ে আছে প্রতিটি মোমিনের হৃদয়। মাহে রমজানকে স্বাগত জানিয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.) বিশ্ববাসীর উদ্দেশে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন তা হাদিসের কিতাবে সংগৃহীত রয়েছে নিখুঁতভাবে। মাহে রমজানকে স্বাগত জানিয়ে মহানবী (সা.) এর ঐতিহাসিক ভাষণটি এখানে তুলে ধরা হলো। 

হজরত সালমান ফার্সি (রা.) বর্ণনা করেন, শাবান মাসের শেষ তারিখে রমজানকে স্বাগত জানিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। সে ভাষণে তিনি রমজানের ফজিলত, মাহাত্ম্য, গুরুত্ব ও করণীয় তুলে ধরেন। ভাষণের সূচনা করেন এভাবেÑ ‘হে লোক সকল! তোমাদের কাছে এমন এক মাস আসছে, যা অত্যন্ত মর্যাদাশীল ও বরকতময়। এ মাসে এমন একটি রজনি রয়েছে, যা হাজার মাস থেকে শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তায়ালা এ মাসে রোজা ফরজ করেছেন এবং রাতের কিয়ামকে (তারাবির নামাজ) নফল করেছেন। যে ব্যক্তি এ মাসে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কোনো নফল ইবাদত করল সে যেন অন্য মাসে একটি ফরজ ইবাদত করল। আর যে এই মাসে ফরজ ইবাদত আদায় করল সে যেন অন্য মাসে ৭০টি ফরজ আদায় করল। এ মাস সবরের মাস। আর সবরের প্রতিদান  জান্নাত। এ মাস সম্প্রীতি ও সহানুভূতির মাস। এ মাসে মোমিন বান্দাদের রিজিক বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। যে ব্যক্তি এ মাসে কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে তা তার জন্য গোনাহ মাফ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হবে এবং তাকে রোজাদারের সমপরিমাণ সোয়াব দেওয়া হবে। কিন্তু রোজাদারের সোয়াব কমানো হবে না। সাহাবারা আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের প্রত্যেকের তো রোজাদারকে ইফতার করানোর সামর্থ্য নেই। নবীজি (সা.) বললেন, আল্লাহ তায়ালা এই সোয়াব তাকেও দান করবেনÑ যে একটি খেজুর অথবা একঢোক পানি কিংবা এক চুমুক দুধ দ্বারা ইফতার করাবে। এ মাসের প্রথম অংশ রহমতের, দ্বিতীয় অংশ মাগফিরাতের এবং শেষ অংশ জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের। যে ব্যক্তি এই মহিমান্বিত মাসে আপন কর্মচারীদের কাজের বোঝা হালকা করে দেবে আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করবেন এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। ভাষণের শেষে নবীজি বলেন, ‘এই মাসে তোমরা চার কাজ বেশি করবে। অধিক পরিমাণে কালিমাÑ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং ইস্তেগফার পাঠ করবে। আর আল্লাহর কাছে জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং জান্নাতের প্রার্থনা করবে।’ (ইবনে খুজাইমা, ইবেন হিব্বান, বায়হাকি)। 

উপরোক্ত হাদিস দ্বারা জানা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি রমজান আগমনের আগেই সাহাবাদের এ মাসের ফজিলত ও মর্যাদা সম্পর্কে বিশেষভাবে নসিহত করেছেন এবং তাদের সতর্ক করে দিয়েছেন, যেন এ মোবারক মাসের একটি মুহূর্ত অবহেলায় না কাটে। উক্ত ভাষণে নবীজি (সা.) বিশেষ কয়েকটি বিষয়ের প্রতি সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। সংক্ষেপে সেগুলোর বিশ্লেষণ করছি :

শবেকদর 

রমজানের এক বিশেষ মর্যাদার রাত শবেকদর; যা হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এই রাতের তালাশে রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফ করতেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, শেষ দশক আসামাত্রই নবীজি (সা.) কোমরে লুঙ্গি বেঁধে ইবাদতে লেগে যেতেন। রাত জেগে নামাজ পড়তেন এবং বিবিদের জাগিয়ে দিতেন। তিনি এরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি শবেকদরের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয় সে প্রকৃতই মাহরুম।’ (নাসায়ি : ২৪১৬)।

সবরের মাস

রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসকে সবরের মাস আখ্যায়িত করেছেন। সবর শব্দের অর্থ ধৈর্য, সংযম। রমজানে ক্ষুধার যন্ত্রণায় অনেকের আচরণে রুক্ষতা প্রকাশ পায়। আবার অনেকে রোজা রেখেও টিভির পর্দায় হারাম জিনিস দেখে সময় পার করে। তা বর্জন করতে হবে। রমজান মাসের পবিত্রতা রক্ষায় সব ধরনের নাজায়েজ কর্ম পরিহার করা অপরিহার্য। ইবাদতে ধৈর্য ধারণ এবং পাপ থেকে বেঁচে থাকার সংযম সাধনার মাস রমজান। গ্রীষ্মের তীব্র গরমে দিনের বেলায় রোজা এবং রাতে ২০ রাকাত তারাবির নামাজ ধৈর্যের সঙ্গে আদায় করতে হবে। যে কোনো ইবাদতের জন্য ধৈর্যের প্রয়োজন রয়েছে। তেমনি পাপ থেকে বিরত থাকার জন্যও বড় প্রয়োজন ধৈর্যের। ধৈর্য ধারণ শুধু বিপদাপদে নয়, ইবাদত এবং পাপের ক্ষেত্রে ধৈর্যের পরিচায় দেওয়াও অত্যাবশ্যক। এই ধৈর্যের শিক্ষা আমরা রমজান মাসে অর্জন করতে পারি। আল্লাহ তায়ালা ধৈর্যশীলদের অত্যন্ত ভালোবাসেন। পবিত্র কোরআনে ধৈর্যশীলদের অশেষ মর্যাদা ও অফুরন্ত পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে। 

সহানুভূতির মাস

রমজানকে সহানুভূতির মাস হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ মাসে অসহায় ও গরিবদের প্রতি সহানুভূতিশীল  হওয়া এবং তাদের দান-দাক্ষিণ্য করা উচিত; যাতে তারাও রমজানের ইবাদত নির্বিঘেœ পালন করতে পারে। রমজান উপলক্ষে কর্মচারীদের প্রতি সদয় হওয়া, তাদের কাজের বোঝা হালকা করে দেওয়া এবং তাদের বেতন-বোনাস বাড়িয়ে দেওয়া মানবতার দাবি। সাহরি-ইফতারিতে অন্য ভাইকে বিশেষ করে প্রতিবেশীকে শামিল করা। রমজানের প্রতিদিন কিছু না কিছু দানের অভ্যাস গড়া উচিত। বোখারির বর্ণনায় রয়েছেÑ ‘রমজান মাসে নবীজির দানের অবস্থা ছিল প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও বেশি বেগবান।’ (হাদিস নং-০৬)। 

রমজানে রিজিক বৃদ্ধি করা হয়

রিজিক বলতে আমরা কেবল খানাপিনার বিষয়টি বুঝি। অথচ রিজিকের অর্থ ব্যাপক। মানুষের জন্য কল্যাণকর সবকিছুই রিজিকের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং রমজানে আল্লাহর পক্ষ থেকে মোমিন বান্দাকে ক্ষমা প্রদানের ঘোষণা, অজস্র রহমতের বারি বর্ষণ, ইবাদতের তৌফিক, গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা সবই রিজিক। খানাপিনার বিষয়টিও চিন্তা করলে দেখা যায়, অন্য মাসের তুলনায় রমজানে ধনী-গরিব সবার জন্য ভালো খাবারের তৌফিক হয়।

ইফতারের ফজিলত 

নবীজি (সা.) তাঁর ভাষণে বিশেষভাবে ইফতারের ফজিলতের কথা বর্ণনা করেছেন। রমজান মাসে এ ছোট্ট আমলটি করে অশেষ নেকি অর্জনের অবারিত সুযোগ রয়েছে। বিশাল পার্টি করে ইফতার করানো জরুরি নয়। বরং সামর্থ্য অনুযায়ী যা দিয়ে রোজাদারকে ইফতার করানো হবে আল্লাহ তায়ালা এর বিনিময়ে তাকে রোজাদারের সমান সোয়াব দান করবেন এবং এই ইফতার তার মাগফিরাত ও পরকালে জাহান্নাম থেমে মুক্তিলাভের উসিলা হবে।  লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া উসমানিয়া দারুল উলুম সাতাইশ, টঙ্গী 

 

০৬ মে, ২০১৯ ০৯:৩৩:৫৬